কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
চতুর্বিংশ পর্ব

হিয়া কিছু না বলে বাঁকা হাসি হাসল, মনে মনে ভাবল, 'আগামী একমাস শিউলিকে নিয়ে যা নাটক করার করে নাও আকাশ ব্যানার্জী, তারপরের সময়টা শুধুই আমার!'
শিউলিকে হসপিটালে ভর্তি করল আকাশ। আকাশ চিন্তিত মুখে ওয়েট করছিল, হঠাৎ ডাক্তার এলেন।
— 'পেশেন্টের হাসব্যান্ড কি আপনি?' ডাক্তার প্রশ্ন করলেন আকাশকে।
— 'হাসব্যান্ড?'
— 'হ্যাঁ, কেমন হাসব্যান্ড আপনি? এই অবস্থায় ওয়াইফের সামান্য কেয়ারটুকুও করেন না?'
— 'মানে? কি হয়েছে ওর?'
____________________________
একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ : পড়ুন
______________________________
— 'বাহ্, এটাও দেখছি জানেন না! আপনার স্ত্রী প্রেগন্যান্ট, এই অবস্থায় সিঁড়ি থেকে পড়ে যাওয়াটা কতটা বিপজ্জনক জানেন?'
— 'স্মৃতি প্রেগন্যান্ট?' আকাশ বাকরুদ্ধ হয়ে গেল হঠাৎ।
— 'হ্যাঁ, আর ওনার অবস্থা খুবই ক্রিটিক্যাল। আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছি ওঁকে সুস্থ করে তোলার, হোপ ফর দ্য বেস্ট।'
ডাক্তার চলে যাওয়ার পর আকাশ বসে পড়ল। এতক্ষণ যা যা ঘটল তার রেশটা কাটতে না কাটতেই এ কোন সত্যির সামনে এসে দাঁড়াল ও! বেশ কিছুক্ষণ পর যখন ঘোর কাটল ওর, তখন কান্নায় ভেঙে পড়ল আকাশ।
— 'হিয়া, রুমকিদি এদের সাথে আমার আর কোনো তফাৎ রইল না স্মৃতি! ভেবেছিলাম তোমার জীবনটা আনন্দে ভরিয়ে দেব আমি, কিন্তু না, আমিও ওদের মতো তোমায় বিপদের মুখেই ঠেলে দিলাম, তাও জেনে শুনেই।'
হিয়ার দৌলতে চৌধুরীবাড়ির সবার কাছেই পৌঁছে গেল শিউলির হসপিটালে ভর্তি হওয়ার ঘটনাটা। আকাশ ডাক্তারকে শিউলির প্রেগন্যান্সির খবরটা অন্যকাউকে জানাতে বারণ করেছিল, তাই চৌধুরীবাড়ির কেউই আসল সত্যিটা জানল না, এমনকি হিয়াও না। শুধু আকাশ আর রুমকিই জানল সত্যিটা। সবাই চলে যাওয়ার পর রুমকি আকাশকে বলল, 'যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কাহিনীকে বিয়ে করে চৌধুরীবাড়ি থেকে বের করে নিয়ে যাও। ওই বাড়ির একজন মানুষও যদি সত্যিটা জানতে পারে তাহলে তুলকালাম হবে!'
— 'এসব নিয়ে আমি চিন্তিত নই রুমকিদি, কারণ বাবা আমাদের সম্পর্কটা মেনে নিয়েছেন, সামনের মাসেই আমাদের বিয়ে।' চিন্তিত আকাশ বলল, 'আমি ভাবছি স্মৃতি সুস্থ হয়ে উঠবে তো? আবার আগের মতো ওকে ফিরে পাব তো আমি?' গলা বুজে এল আকাশের।
— 'কান্নাকাটি কোরো না আকাশ। দেখো এর আগেও তো আমি, হিয়া কতবার ওর ক্ষতি করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু সফল হয়েছি কি? দেখো এবারেও কাহিনীর কিচ্ছু হবেনা, ও একদম ঠিক হয়ে যাবে।'
— 'আমি যদি কোনোভাবে জানতে পারতাম সত্যিটা, তাহলে এই অঘটনটা ঘটতেই দিতাম না জানেন!'
— 'আমি জানি আকাশ।'
একটু পরেই ডাক্তার এলেন, 'এই যে মিস্টার ব্যানার্জী, আপনার স্ত্রী সুস্থ হয়ে উঠেছেন, উনি আর বেবি দুজনেই সুস্থ আছেন একদম।'
আকাশের মনটা খুশিতে ভরে উঠল সবটা শুনে। রুমকিও নিশ্চিন্ত হল খুব।
— 'তবে হ্যাঁ, দেখবেন এরকম অ্যাক্সিডেন্ট যেন আর না হয়, তাহলে কি হবে বলাটা মুশকিল।'
— 'না ডাক্তারবাবু, এই ঘটনার রিপিট হবে না আর।'
— 'আকাশ, কি বলেছিলাম? মিলল তো আমার কথা?'
আকাশ হাসিমুখে সায় দিতে যাবে হঠাৎ দেখে, রুমকির বাঁ হাতে কালশিটের দাগ।
— 'একি রুমকিদি, আপনার হাতে কালশিটে কেন?'
— 'ও কিছু না আকাশ', শাড়ির আঁচল দিয়ে তাড়াতাড়ি ক্ষতটা ঢাকার চেষ্টা করে রুমকি, 'এখন কি আমায় নিয়ে ভাবার সময় বলো তো হ্যাঁ? কোথায় নিজেদের সামনের জীবন নিয়ে ভাববে তা না!'
— 'আপনার স্ত্রীর জ্ঞান ফিরেছে, যান দেখে আসুন।' ডাক্তার বললেন।
আকাশ তাড়াতাড়ি ছুটল কেবিনের দিকে। রুমকি আর দাঁড়াল না, মুখে একরাশ হাসি নিয়ে বিদায় নিল ও।
শিউলি চোখ বন্ধ করে ছিল। আকাশ এসে ওর কপালে হাত রাখতেই চোখ খুলল শিউলি, তারপরেই চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল ওর।
— 'স্মৃতি আমি জানি সত্যিটা তুমিও জানতে না, তাই শক পাওয়াটাই স্বাভাবিক, কিন্তু প্লিজ তুমি কেঁদো না', শিউলির হাতদুটো ধরে আকাশ বলল, 'আমি তো আছি সবসময় তোমার পাশে। তাছাড়া সামনেই তো আমাদের বিয়ে, বাবা নিজে গিয়ে তোমায় দেখে এসেছিলেন, চৌধুরীবাড়িতে পাকা কথাও বলে এসেছিলেন, তাহলে আর কিসের চিন্তা বলো?'
— 'কি? তোমার বাবা এসেছিলেন আমায় দেখতে? কবে?'
— 'এই তো ক'দিন আগেই গো স্মৃতি, বাবা আর আন্টি গিয়েছিলেন তোমাদের বাড়ি, ভুলে গেলে?'
— 'হ্যাঁ, একজন ভদ্রলোক আর তাঁর স্ত্রী এসেছিলেন ঠিকই, কিন্তু ওঁরা তো আমার বিয়ে ঠিক করতে আসেননি আকাশ, এসেছিলেন হিয়ার বিয়ে ঠিক করতে।'
— 'হোয়াট?' আকাশ হতবাক হয়ে গেল।
— 'হ্যাঁ গো, আমি সেই সময় বসার ঘরে ছিলাম না, নিজের ঘরে বসে পড়ছিলাম, তাই পাত্রের কি নাম অতশত জানতে পারিনি, শুধু শুনলাম যে ওঁদের বড়ো ছেলে নাকি হিয়াকে ভালোবাসে, রোজ কলেজ থেকে ফেরার সময় বাড়িতে ড্রপ করে দেয়, এসব। হিয়াকে দেখেছেন ওঁরা ওইদিন, পছন্দও করেছেন। তুমি তো জানোই ওর ব্যাপারে আমার কোনো ইন্টারেস্ট নেই তাই কার সাথে বিয়ে হবে ওর এসব ব্যাপারেও মাথা ঘামাইনি আমি একদমই।'
— 'সর্বনাশ!' আকাশের মাথায় হাত পড়ে গেল, 'সবটা গন্ডগোল হয়ে গেছে দেখছি! আজই বাড়ি ফিরে বাবার সাথে কথা বলতে হবে।'
— 'বাবা তুমি কার সাথে আমার বিয়ে ঠিক করেছ?'
— 'কেন, যাকে তুমি ভালোবাসো, চৌধুরীবাড়ির ছোট মেয়ে কাহিনী চৌধুরীর সাথে। যাই বলো, মেয়েটি কিন্তু খুবই ভালো।'
— 'ছবি দেখাও তো পাত্রীর।'
— 'আমার কাছে পাত্রীর ছবি আছে আকাশ, এই দেখো।' প্রমীলা ছবি দেখাল।
ছবি দেখেই আকাশের কপালে হাত। এটা হিয়ার ছবি।
— 'আরে বাবা, তোমরা ভুল বুঝেছ। একে আমি ভালোবাসিনা, আমি ভালোবাসি শিউলি নস্করকে।'
— 'কি বলছ টা কি তুমি আকাশ? শিউলি তো ওই বাড়ির আশ্রিতা, মেয়ে তো নয়!'
— 'আমি কি একবারও বলেছিলাম যে আমি ওই বাড়ির মেয়েকে ভালোবাসি?'
— 'বাহ, তুমিই তো বললে যে তুমি যাকে ভালোবাসো সে চৌধুরীবাড়িতে থাকে, আমরা খোঁজ করে দেখলাম, ওই বাড়ির দুই মেয়ে। বড় মেয়ে তোর্সা চৌধুরীর বিয়ে হয়ে গেছে, ছোট মেয়ে কাহিনী চৌধুরী, যে কলেজে তুমি পড়াও, সেই কলেজেই সেও পড়ে, তাই তো ভাবলাম...'
— 'না বাবা, একদমই না। আমি শিউলিকে নস্করকে ভালোবাসি, কাহিনী চৌধুরীকে নয়। যদিও দুজন একই মানুষ!'
শেষ লাইনটা বিড়বিড়িয়ে বলল আকাশ।
পরবর্তী ভাগ পড়ুন : পঞ্চবিংশ পর্ব
0 মন্তব্যসমূহ