কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
ত্রয়োবিংশ পর্ব
— 'যতসব বাজে কথা! দেখেই বোঝা যাচ্ছে মেয়েটার এতে কোনো দোষই নেই, কয়েকটা বখাটে ছেলে ওকে একা পেয়ে অ্যাটাক করেছে!' রুমকি বলে উঠল।
— 'অভিজিৎদা, তোমার বউ কিন্তু বড্ড বেশি কথা বলে, ওকে সামলে রেখো বুঝলে!' কথাটা মজার সুরে বলল ঠিকই হিয়া, কিন্তু যে আক্রোশ অন্তর্নিহিত আছে কথাটার মধ্যে, তা বুঝল কেবল শিউলি আর রুমকি।
— 'চিন্তা কোরো না ছোটশালী, একবার বাড়িতে নিয়ে যাই তো তোমার দিদিকে, তারপর দেখো একেবারে আমার মতো বানিয়ে নেব।' বাঁকা হেসে অভিজিৎ বলল।
— 'সে তো হবে, কিন্তু এই চরিত্রহীন মেয়েটাকে যদি চৌধুরীবাড়িতে রাখা হয়, এ কিন্তু এ বাড়ির সম্মান একদম ধুলোয় মিশিয়ে ছাড়বে।'
— 'একদম ঠিক বলেছিস কাহিনী। আর তাছাড়া ওর দোষ নেই মানে? এত মেয়ে কলেজে পড়ে, শুধু ওর পেছনেই বখাটে ছেলেরা পড়তে গেল কেন শুনি?' কাকলি হিয়ার সুরে সুর মেলাল, 'ছোট, এই মেয়েকে এখনও যদি বাড়িতে রাখিস, দেখবি কোন্ দিন ঠিক মুখ পুড়িয়ে আসবেই, মিলিয়ে নিবি।'
কিন্তু হাজার চেষ্টা করেও শিউলিকে বাড়ি থেকে বের করতে পারল না হিয়া আর কাকলি। কারণ চৌধুরীবাড়ির মানুষেরা সকলেই রুমকির সাথে সহমত হলেন। শুধু সায়নী বলল, 'যেদিন সত্যিই এরকম কিছু ঘটবে, যাতে চৌধুরীবাড়ির সম্মান নিয়ে টানাটানি হবে, সেদিন তুমি শিউলিকে বের করে দিয়ো, আমি আটকাব না, কিন্তু আজ সত্যিই শিউলি এমন কিছু করেনি যাতে আমাদের সম্মানহানি হয়।'
কেটে গেল মাস তিনেক। আকাশ বাড়ি ফিরতেই প্রমীলা বলল, 'একটা খবর আছে তোমার জন্য।'
— 'কি খবর আন্টি? বলে ফেলো।'
— 'আমি জানি আকাশ তুমি আমায় কোনোদিনই নিজের মা বলে ভাবতে পারোনি, সে আমি যতই তোমার ভালোর জন্য ভাবিনা কেন! যাক যে এসব এখন থাকুক, আসল কথাটা বলি।'
— 'হুম সেটাই বলো।' বিরক্তির সুরে বলল আকাশ।
— 'তুমি যাকে ভালোবাসো, তার সাথে তোমার বিয়ে ঠিক হয়েছে, ঠিক করেছেন তোমার বাবা।'
— 'হোয়াট?'
— 'হ্যাঁ আকাশ, বিশ্বাস না হলে বাবার সাথে কথা বলতে পারো।'
— 'তুমি একদম ঠিক শুনেছ আকাশ, তোমার পছন্দের মেয়ের সাথেই বিয়ে হবে তোমার। আমরা তো জানতাম তুমি মেয়েদের পছন্দই করো না, সেই ছেলে যে মেয়েকে পছন্দ করেছে সে তো আর যে সে মেয়ে নয়! তাই আর দেরি না করে সম্বন্ধ পাকা করে ফেলেছি।' প্রকাশ বললেন।
আকাশ কিছু না বলে লাজুক হাসল।
— 'মেয়ে চৌধুরীবাড়িতে থাকে, তাই তো?'
— 'একদম বাবা। কিন্তু তোমরা কিভাবে....'
— 'আমরা কিভাবে জানলাম, তাই তো? বিকাশই তো বলল, রোজ বাড়ি ফেরার পথে একজন দিদিমণি তোমার গাড়িতে ওঠে, আর নামে চৌধুরীবাড়িতে।'
— 'ওহ! বিকাশদা তাহলে আজকাল ঘটকগিরিটাও করছে ভালোই!'
— 'বেশ, কালকেই আমি আর তোমার মা যাচ্ছি পাকা কথা বলতে চৌধুরীবাড়িতে, ওকে?'
— 'ওকে।'
আকাশের মনে লাগল খুশির জোয়ার। ও কখনও ভাবেনি যে ওর বাবা ওকে বুঝবে।
— 'স্মৃতি ম্যাডাম, আপনি আমার জীবনে আসার পর দেখছি জীবনের সব নদীই উল্টোদিকে বইছে! ' মনে মনে বিড়বিড় করে আকাশ গেল ফ্রেশ হতে।
চৌধুরীবাড়ি থেকে ফিরে এলেন প্রকাশ আর প্রমীলা খুশি মনে।
— 'আকাশ, চৌধুরীবাড়ির মানুষেরা খুবই ভালো। আমরা পাত্রীকেও দেখলাম, খুবই মিষ্টি মেয়ে।'
— 'শুধু কি তাই? ওবাড়ির বড়ো বৌ কাকলি চৌধুরী আমার কলেজজীবনের বন্ধু, জানো আকাশ?' প্রমীলা বলল।
— 'হুম তা তো হবেই, রতনে রতন চেনে আর....'
— 'কিছু বললে আকাশ?'
— 'না আন্টি, তেমন কিছু না।'
— 'বিয়ের দিনক্ষণও একদম পাকা, সামনের মাসেই তোমাদের চার হাত এক করে দেব, কেমন?'
পরেরদিন ক্লাসরুমে গিয়ে আকাশ দেখে, শিউলি আজ কলেজ আসেনি। আকাশের মুডটাই অফ হয়ে গেল, পড়ানোয় মনই বসল না ওর। ক্লাস শেষ হতেই ও তাড়াতাড়ি কল করল শিউলিকে।
— 'স্মৃতি, আজ কলেজে এলে না কেন?'
— 'আর বোলো না আকাশ, সকাল থেকে শরীরটা একদম ভালো নেই। মাঝে মাঝেই মাথা ঘুরছে, আর গা গুলোচ্ছে। কয়েকবার বমিও হলো।'
— 'তোমার শরীর তো তাহলে একদম ভালো নেই গো স্মৃতি। তুমি প্রপারলি রেস্ট নাও ওকে।'
— 'ওকে!'
পরেরদিন সকালে বেশ কিছুটা সুস্থ বোধ করছিল বলে শিউলি রওনা দিল কলেজের পথে। ও বাসেই আসবে ভেবেছিল, কিন্তু বাড়ি থেকে বেরোতেই দেখে, আকাশ গাড়ি নিয়ে হাজির। অগত্যা গাড়িতে উঠে পড়ল শিউলি।
কলেজ পৌঁছাতেই শিউলি তাড়াতাড়ি গাড়ি থেকে নামল, তারপরেই রাস্তার একপাশে ছুটে গিয়ে হড়হড়িয়ে বমি করে ফেলল ও।
— 'একি স্মৃতি? তুমি তো এখনো সুস্থ হওনি, তাহলে কলেজ চলে এলে যে?'
— 'আজ সকাল থেকে ভালোই ছিলাম আকাশ, হঠাৎ করেই গা গুলিয়ে উঠল।'
— 'হুম, আর বাড়ির সকলে যে কত দেখভাল করছেন তোমার সেটাও বুঝতে বাকি নেই আমার! যাক শোনো, কলেজ যখন চলেই এসেছ, আর ফিরতে হবেনা, দু'একটা ক্লাস করে নাও, তারপর যদি শরীরটা খুব খারাপ লাগে, আমি বিকাশদাকে বলে দিচ্ছি, তোমায় বাড়ি পৌঁছে দেবে।'
কিন্তু টিফিন পিরিয়ডে ঘটল অঘটন। শিউলিদের ক্লাসরুমটা দোতলায়, আর লাইব্রেরিটা একতলায়। ফোর্থ ক্লাসটা শেষ হওয়ার পরেই শিউলি সিঁড়ি বেয়ে নামছিল লাইব্রেরি যাবে বলে, হঠাৎ করেই শিউলির মাথা ঘুরে গেল, পা হড়কে ও পড়ে গেল সিঁড়ি থেকে। আকাশ সেই সময় ওদিকেই আসছিল, শিউলিকে পড়ে যেতে দেখেই ও ছুটে এল।
শিউলি যন্ত্রনায় কুঁকড়ে যাচ্ছিল, চোখেমুখে স্পষ্ট ফুটে উঠছিল কষ্টের ছাপ।
— 'স্মৃতি কোথায় লেগেছে তোমার? কোথায় কষ্ট হচ্ছে বলো না!' শঙ্কিত আকাশ প্রশ্ন করল।
শিউলি ভীষণ হাঁপাচ্ছিল। কোনোরকমে কথা বলার চেষ্টা করল, কিন্তু ব্যর্থ হল। ও জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ল আকাশের বুকে।
পরবর্তী ভাগ পড়ুন : চতুর্বিংশ পর্ব

0 মন্তব্যসমূহ