Advertisement

কাহিনী (দ্বাবিংশ পর্ব)

কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
দ্বাবিংশ পর্ব




— 'আপনি যেটা খেলেন ওটা জল নয়, মদ। দিপু ওই গ্লাসে মদ ঢেলেছিল খাবে বলে, পাশে দেখুন, বোতলটাও রয়েছে।'

— 'তুমি বারণ করলে না কেন স্মৃতি?' নেশাতুর গলায় বলল আকাশ।

— 'আমি সবে বারণ করতে যাব তার আগেই তো আপনি গলায় ঢেলে ফেলেছেন সবটা।!'

— 'যাক গে, তা বেশ করেছো! এটা হেব্বি জিনিস কিন্তু, আমার তো ইচ্ছে হচ্ছে গোটা বোতলটাই শেষ করে দিই!'

____________________________


একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ :  পড়ুন

______________________________


— 'না স্যার, একদম না! আপনি আর ওইসব ছাইপাঁশ খাবেন না তো!'

— 'ধুস, একদম না নয়, এখন শুধু হ্যাঁ আর হ্যাঁ, ব্যাস!' আকাশ টলতে টলতে বোতল থেকে কিছুটা মাদক গ্লাসে ঢালল, তারপর শিউলিকেও খাইয়ে দিল কিছুটা জোর করে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও শিউলি মাদক খেয়ে নিল, নেশা গ্রাস করল শিউলিকেও।

বাইরে অনেকক্ষণ ধরেই মেঘ ডাকছিল, এখন শুরু হল মুষলধারে বৃষ্টি। ঘরের আলোটা নিভিয়ে দিল আকাশ, আর তারপরেই শরীরী খেলায় মেতে উঠল ওরা। একে ওপরের শরীর-আত্মায় মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল দুজন।

সারারাত ধরে চলল ফেস্ট। নাচগান, খাওয়াদাওয়া সব মিলিয়ে সবাই দারুণ এনজয় করল এই রঙিন রাতটা। সূর্যদেব যেই উঁকি দিলেন পুব আকাশে, ওমনি সবাই ব্যাগ গুছিয়ে বাড়ি যাওয়ার তোড়জোড় শুরু করল। আকাশের ঘুম ভাঙল পাখির কলকাকলিতে। উঠেই দেখে ও আর শিউলি ঘনিষ্ঠ অবস্থায় ঘুমিয়েছে, একে অপরকে জড়িয়ে। চমকে উঠল ও, মুহূর্তেই মনে পড়ে গেল গতরাতে নেশার ঘরে ঘটা দুর্বল মুহূর্তগুলো। তাড়াতাড়ি পোশাক পরে নিল ও, শিউলিকেও পরিয়ে দিল গাউনটা। শিউলি তখনও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল আকাশ। একটা অপরাধবোধ কুরে কুরে খাচ্ছিল ওকে। ওদের সম্পর্কটা একদম শুরুর দিকে ছিল, এই একটা রাত যেন এক ধাক্কায় অনেকটা এগিয়ে নিয়ে গেছে ওদের সম্পর্ক। আকাশ আর দেরি না করে ঘুমন্ত শিউলিকে কোলে তুলে গাড়ির দিকে গেল।

আকাশ বসল ড্রাইভারের সিটে, আর পাশের সিটে শিউলিকে বসিয়ে সিটবেল্ট লাগিয়ে দিল ও।

— 'আই অ্যাম সরি স্মৃতি, ভেরি সরি। জানিনা তুমি জেগে থাকলে তোমার মুখোমুখি হতে পারতাম কিনা!' শিউলির হাতদুটো ধরে আকাশ বলল, 'আমায় ক্ষমা করো তুমি স্মৃতি!'

— 'যা হয়েছে তা তো দুজনের সম্মতিতেই হয়েছে, তাহলে আপনি কেন ক্ষমা চাইছেন?' শিউলি চোখ খুলে বলল।

— 'তুমি জাগলে কখন?'

— 'এই জাস্ট। শুনুন, এভাবে সরি বলবেন না বারবার, তাহলে কিন্তু আমি নেমে যাব গাড়ি থেকে।'

— 'আচ্ছা বেশ, আমি একটাই শর্তে আর ক্ষমা চাইব না।'

— 'শুনি কি শর্ত?'

— 'আজ থেকে তুমি আর আমায় আপনি, স্যার এসব বলে ডাকবে না, আকাশ বলে ডাকবে, ডান?'

— 'ওক্কে ডান! এবার যদি ভরা ক্লাসে আমি সবার সামনে তুমি, আকাশ এসব বলে ডেকে ফেলি অভ্যাসের বশে, আপনি কিন্তু দোষ দিতে পারবেন না আমায়!'  


হেসে উঠল দুজন। আকাশ শিউলিকে বুকে টেনে নিল।


— 'ও হিয়া, ওই শিউলিটাকে তাড়ানোর ব্যবস্থা করলে কিছু? আমার মেয়েটা তো এখন সন্ন্যাসিনী হয়েছেন, সম্পত্তির ওপর আর ওনার চোখ নেই, দুনিয়াসুদ্ধু সব্বার উপকারে নেমেছেন উনি!' কাকলি বলে উঠল।

— 'যা বলেছ বড়মা! তুমি একদম ভেবো না, রুমকিদির বিয়ের দিনেই ওই জঞ্জালটাকে ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলব আমি, জাস্ট ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ!'


— 'তুই যে কাল বিপদ থেকে বেঁচেছিস, এটা শুনে যে কতটা নিশ্চিন্ত হয়েছি কি বলব।'

— 'হ্যাঁ রুমকিদি, আকাশ আমায় বাঁচিয়েছে।'

— 'হুম রে, সবটাই শুনলাম। আকাশ খুবই ভালো ছেলে, সবাই ওর মতো মানুষ জীবনে পায় না। তুই যখন পেয়েছিস, সারাটাজীবন আগলে রাখিস ওকে, কখনও হাত ছাড়িস না ওর।'

— 'রুমকিদি, একটা কথা বলি তোমায়? যদি কিছু মাইন্ড না করো?'

— 'ধুস পাগলী, মাইন্ড কেন করতে যাব? তুই বল তো কি বলবি।'

— 'রুমকিদি, তোমার কাল বিয়ে, এখনো সময় আছে হাতে, এই বিয়েটা ভেঙে দাও গো, অভিজিৎদা একদমই ভালো মানুষ নয়, ওকে বিয়ে করলে তুমি সুখী হবে না কখনো।'

— 'আমি জানি রে কাহিনী।'

— 'জানো? জেনে শুনেও নিজের সর্বনাশ করছো?'

— 'হ্যাঁ রে কাহিনী, আমি এতদিন যা যা অন্যায় করেছি তার তো একটা শাস্তি হওয়া দরকার বল, তাই নিজের শাস্তি আমি নিজেই মাথা পেতে নিয়েছি। কাল আমি বিয়ে করতে যাচ্ছি সংসার করতে নয়, নিজেকে বলি দিতে।'

— 'রুমকিদি!'

— 'আর তাছাড়া এই বাড়িতে সবাই তোকে হ্যাটা করে, বিশেষ করে মা আর হিয়া। এসব দেখতে আমার আর ভালো লাগে না রে, আরো বেশি অপরাধবোধে ভুগি আমি, তাই এই বাড়ি থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দূরে চলে যেতে চাই রে।' শ্লেষের হাসি হাসল রুমকি, 'এতদিন তো অনেক সুখ ভোগ করলাম, আর সুখ চাইনা রে আমি। এখন শুধু চাই, তুই জীবনে বড়ো হ, তারপর আকাশকে বিয়ে করে সুখী হ। আমায় নিয়ে তুই আর ভাবিস না রে বোন, এখন তুই নিজের কথা ভাব।' চোখের জল মুছে রুমকি দৌড়ে চলে গেল।


এগিয়ে এল বিয়ের তারিখ। সবাই খুব আনন্দিত হলেও শিউলি একদমই খুশি ছিল না। মনমরা হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল ও, হঠাৎ কনে সেজে ওর সামনে হাজির রুমকি।

— 'কি রে কাহিনী, কেমন লাগছে আমায়?'

— 'কেন মুখে মিথ্যে হাসিটা লাগিয়ে রেখেছ জোর করে?'

— 'বা রে, মিথ্যে কেন হতে যাবে? আমি তো সত্যিই খুশি, তাই জন্যই তো হাসছি!'


দেখতে দেখতে বিয়েটা হয়ে গেল রুমকি আর অভিজিতের। বাসরঘরে যখন সবাই রয়েছে, তখনই হিয়া জোর গলায় বলে উঠল, 'আমি সবাইকে কিছু দেখাতে চাই।'

সবাই উৎসুক চোখে তাকাতেই হিয়া ঘরে থাকা টিভিটা চালিয়ে দিল। টিভিতে ফুটে উঠল শিউলি আর দিপুর কিছু ছবি। ছবিগুলোয় দেখা যাচ্ছে কলেজ ফেস্টের রাতে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনার টুকরো ছবি। শিউলির মুখ বেঁধে দিপু আর ওর বন্ধুবান্ধবরা ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে সেই ছবি। সেই রাতে আকাশ আসার আগে হিয়া ঘরের জানালা দিয়ে ওর মোবাইলে কিছু ছবি তুলে নিয়েছিল, সেগুলোই দেখাল ও সবাইকে টিভিতে।

— 'দেখো দেখো, সবাই দেখো শিউলির চরিত্র! একটা ঘরে এতজন ছেলের সাথে! ছি ছি!'


পরবর্তী ভাগ পড়ুন : ত্রয়োবিংশ পর্ব

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ