Advertisement

কাহিনী (একবিংশ পর্ব)

কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
একবিংশ পর্ব




— 'ন্যায্য কথা শুনলে সবারই গায়ে লাগে ডিয়ার বীণামাসি, তাই বলে সত্যিটা মিথ্যে হয়ে যায়না! ছোটমা ই তো বলে, তোমার নাকি টাকাপয়সা, গয়নাগাঁটি এসবে ভীষণ লোভ!'

— 'সায়নী এতবড়ো কথা বলেছে? আমি শুধু টাকার জন্য কাহিনীকে মানুষ করেছি?' কান্নাভেজা গলায় বীণাপানি বলল, 'কাহিনীকে আমি কখনো অন্যের মেয়ে হিসেবে দেখিনি, আর আজ তাকে ফিরে পেয়েই কিনা! আসলে আমারই ভুল, মানুষ যে কত অকৃতজ্ঞ হয় সে তো আর কম দেখলাম না! যাকগে, তোর ছোটমাকে বলে দিস, তোদের বীনামাসি ভিখারি নয়, সে চাকরি করে, বান্ধবীর শ্বশুরবাড়ির সম্পত্তির প্রতি তার কোনোদিন কোনো ইন্টারেস্ট ছিলনা, আর হবেও না কোনোদিন। আর শুধু তোর বিয়ে কেন, ওই বাড়ির পথ বেঁচে থাকতে কোনোদিনও মাড়াব না আমি।'


বীণাপানি ফোন কেটে দিল। রুমকি কান্নায় ভেঙে পড়ল।

____________________________


একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ :  পড়ুন

______________________________


এগিয়ে এল কলেজ ফেস্টের দিন। ফেস্ট হওয়ার দুদিন পরেই রুমকির বিয়ের ডেট।

শিউলি সন্ধ্যেবেলায় ফেস্টে যাবে বলে রেডি হচ্ছে, হঠাৎ ওর ঘরে হাজির রুমকি।

— 'কাহিনী, তুই আজ ফেস্টে যাবি না।'

— 'কেন?'

— 'আমি হিয়ার ঘরের পাশ দিয়ে যেতে যেতে শুনলাম, কিসব প্ল্যান আঁটছে ও, তোর ক্ষতি করবে ও আজ রাতে, তাই বলছি প্লিজ আজ যাস না তুই!'

— 'তা হয়না রুমকিদি। আমি একজনকে কথা দিয়েছি, তাই আজ যেতেই হবে আমায়।'


শিউলি আর দাঁড়াল না। রেডি হয়েই বেরিয়ে পড়ল ও।


রুমকি তাড়াতাড়ি আকাশকে কল করল।

— 'হ্যালো, কে বলছেন?'

— 'আমি তোর্সা চৌধুরী, কাহিনীর রুমকিদি।'

— 'ও বাব্বা, কি সৌভাগ্য আমার! আজ কার মুখ দেখে সকালে উঠেছিলাম যে আপনি ফোন করলেন এই অধমকে!'

— 'প্লিজ আকাশ, এটা মজার সময় নয়। কাহিনীর খুব বিপদ, প্লিজ সেভ হার!'

— 'কি বিপদ হবে স্মৃতির?'

— 'সঠিক জানিনা আকাশ, শুধু এটা জানি হিয়া কিছু একটা কান্ড ঘটাবে আজ, আপনি প্লিজ তাড়াতাড়ি কলেজ যান।'

— 'হ্যাঁ আমি বেরোচ্ছি এখন। তাহলে এখন রাখি আমি রুমকিদি?'

— 'হ্যাঁ রাখুন, আর শুনুন না!'

— 'বলুন।'

— 'কাহিনীকে চোখে চোখে রাখবেন প্লিজ!'

— 'ভয় নেই, আমি সবসময় আপনার বোনের পাশে আছি।'


আকাশ আজ নিজেই ড্রাইভ করে চলল কলেজের পথে। কলেজে ঢোকার পর একটু পরেই ও মুখোমুখি হয়ে গেল শিউলির।


— 'তার মানে আমার দেওয়া গাউনটা ম্যাডামের পছন্দ হয়নি!'

— 'আপনি ভুল ভাবছেন স্যার, বাসে গাউন পরে আসাটা একটু মুশকিলের, তাই গাউনটা আমি নিয়ে এসেছি সাথে, এখানে চেঞ্জ করবো বলে।'

— 'ওহ, তাই বলো।'

— 'স্যার, আপনি একটু ওয়েট করুন, আমি আসছি।'


শিউলি গার্লস কমন রুমের দিকে হেঁটে গেল। আকাশ ক্যাম্পাসেই ওয়েট করছিল, হঠাৎ ওর চোখে পড়ল হিয়া কমন রুমের দিক থেকে হাসিমুখে হেঁটে আসছে। দেখেই কেমন খটকা লাগল আকাশের, রুমকির বলা কথাগুলো কানে বাজতে লাগল ওর। আর দেরি না করে গার্লস কমন রুমের দিকে ছুটে গেল আকাশ।


কমন রুমে ঢোকার মুখে দাঁড়িয়েছিল হিয়ার বান্ধবীরা। আকাশকে দেখেই ওরা হাসাহাসি করতে  লাগল, 'স্যার আবার মেয়েদের কমন রুমের দিকে কি কাজে এল রে?'

কিন্তু আকাশ সেসব কথা কানেই নিল না, ও তাড়াতাড়ি কমন রুমের সামনে গিয়ে দেখে, দরজা ভেতর থেকে বন্ধ, ধস্তাধস্তি আর গোঙানির শব্দ আসছে ভেতর থেকে। আকাশ কোনোরকমে ঘরের একটা জানলা খুলে দেখে, শিউলির মুখটা বাঁধা রয়েছে, আর তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে দিপু আর তার বখাটে বন্ধুরা। দিপু বাঁকা হেসে বলছে, 'শিউলিরানী, আজ এমন হাল করব তোমার যে সোসাইটিতে মুখই দেখতে পারবে না তুমি। তখন আমাকে বিয়ে করতে বাধ্য হবে তুমি!'

আকাশ আর দেরি না করে বন্ধ দরজাটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। পুরোনোদিনের দরজা, এত জোরে ধাক্কা খেয়েই ছিটকিনি খুলে গেল। আকাশ তাড়াতাড়ি ঢুকে পড়ল ঘরে। ওর ক্যারাটে জানা ছিল, তাই এদের কুপোকাত করা বিশেষ কঠিন ছিল না ওর পক্ষে। দিপুর অন্য বন্ধুদের যখন প্রায় কুপোকাত করে এনেছে আকাশ, তখনই একটা ভাঙা মদের বোতল দিয়ে আকাশকে পিছন দিক থেকে আঘাত করতে উদ্যত হল দিপু, কিন্তু শিউলি আটকাল ওকে। ঘরে থাকা একটা পুরোনো ভাঙা চেয়ার দিয়ে দিপুর পিঠে সজোরে আঘাত করল শিউলি। অশ্রাব্য গালাগাল দিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল দিপু। ওর বন্ধুরা আকাশের কাছে এলোপাথাড়ি মার খেয়ে কোনোরকমে পালিয়ে বাঁচল। জ্ঞানহীন দিপুকে টানতে টানতে ঘরের বাইরে বের করে দিল আকাশ, আর তারপরেই ঘরের দরজাটা ভেতর থেকে আটকে দিল আকাশ। শিউলি ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল আকাশকে। আকাশও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল শিউলিকে।


— 'যাই বলো স্মৃতি, আজ কিন্তু পুরো ক্রেডিটটাই রুমকিদির।'

— 'মানে?'

— 'উনি যদি আমায় ফোনে সবটা না জানাতেন, তাহলে হয়তো আমি বুঝতেই পারতাম না যে কমন রুমের ভেতরে এসব হচ্ছে!'

— 'সত্যি স্যার, রুমকিদি একেবারে অন্য মানুষ হয়ে গেছে। প্রথমে আমি বিশ্বাস করিনি, কিন্তু আস্তে আস্তে বুঝলাম ওর পরিবর্তন।'

— 'হিয়াকে কিন্তু আমি ছাড়ব না স্মৃতি। ও ই দিপুকে লাগিয়েছিল আজ। ছি ছি নিজে একটা মেয়ে হয়ে কিনা!'

— 'কি আর বলব স্যার, চেঞ্জ করার জন্য ঘরে ঢুকে যেই দরজা বন্ধ করেছি, হঠাৎ কোথা থেকে দিপুরা এসে আমার মুখ বেঁধে দিল, আর তারপরেই আমায় চেপে ধরল বিছানায়।'

— 'তার মানে আগে থেকেই ঘরে লুকিয়ে ছিল ওরা, কি সাংঘাতিক!'


আকাশ ঘেমেনেয়ে একাকার হয়ে গিয়েছিল, খুব তেষ্টা পেয়েছিল ওর। টেবিলে একটা কাচের গ্লাসে জল রাখা ছিল, ঢকঢক করে সেই সবটা জল খেয়ে নিল ও। কিন্তু জলটা খাওয়ার পরেই কেমন নেশা লাগল আকাশের সারা শরীর জুড়ে।

— 'জলটা খেয়ে এরকম ফিল হচ্ছে কেন বলো তো স্মৃতি?'


পরবর্তী ভাগ পড়ুন : দ্বাবিংশ পর্ব

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ