Advertisement

কাহিনী (বিংশ পর্ব)

 কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
বিংশ পর্ব



শিউলি কারোর কথায় কান দিল না। এসব ওর গা সওয়া হয়ে গেছে। ও ভাবছিল, কে পাঠাল পার্সেলটা।
উত্তরটা ও কলেজ থেকে ফেরার সময়েই পেয়ে গেল।
আকাশ মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করল, 'ম্যাডামের নীল রং ভালো লাগে তো?'
শিউলিও হাসিমুখে জবাব দিল, 'খুব, বিশেষ করে যদি নীল গাউন হয় তাহলে তো কথাই নেই!'
- 'বাহ্, পছন্দ তো জিনিসটা?'
- 'ভীষণ!'
- 'তাহলে ফেস্টের দিন ওটা পরে আসা হচ্ছে তো?'
শিউলি কিছু বলল না, লাজুক হাসি হাসল।

____________________________


একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ :  পড়ুন

______________________________


অন্যদিকে রুমকির বিয়ের দিন ক্রমশ এগিয়ে এল। একদিন রুমকি আর হিয়া বেরোল ওদের বন্ধুবান্ধবদের নেমন্তন্ন করতে। ওইদিন আকাশ কলেজ আসেনি, শিউলি তাই বাসেই ফিরল বাড়ি। বাস থেকে নেমেই শিউলি একটা দোকানে ঢুকল কিছু বই কিনবে বলে। বেরোতে গিয়েই ও দেখল রুমকি আর হিয়া হেটে আসছে উল্টো দিক থেকে। হিয়া ছিল ফুটপাথের দিকে আর রুমকি ছিল রাস্তার দিকে। হঠাৎ শিউলির চোখে পড়ল একটা লরি আসছে এদিকেই, কিন্তু রুমকি আর হিয়া এতটাই খোশগল্পে মগ্ন যে সেদিকে কোনো খেয়ালই নেই ওদের। শিউলি প্রাণপনে ছুটে গিয়ে রুমকিকে টেনে সরিয়ে আনল ফুটপাথের দিকে, লরিটা প্রায় গা ঘেঁষে বেরিয়ে গেল রুমকির।

- 'একটু দেখেশুনে চলবে তো নাকি? যদি বেঁচেই না থাকো, তাহলে বিয়েটা হবে কি করে?' বাঁকা হেসে শিউলি চলে গেল।


সেদিন বাড়ি ফিরে রুমকি সেই যে ঘরের দরজা বন্ধ করল, সারারাত আর দরজা খুললই না ও। সবাই এসে বারবার ডাকাডাকি করা সত্ত্বেও রুমকি ঘর থেকেও বেরোল না, আর খাবারও খেল না।


পরেরদিন সকালে শিউলি সবে বিছানাপত্র গুছিয়ে পড়তে বসার জোগাড় করছে, রুমকি হাজির হল।

- 'কি ব্যাপার? এত বড়ো মানুষ হঠাৎ কাজের লোকের ঘরে কি মনে করে?' শিউলি গলা নিচু করে বলল, 'নাকি নতুন কোনো প্ল্যান আঁটছ আবার?'

নীরব রুমকি হঠাৎ মেঝেতে বসে পড়ল, ঝরঝর করে কাঁদতে লাগল ও। শিউলি এবার বেশ অবাক হল।

- 'কাহিনী, আমি জানি আমার অন্যায়ের ক্ষমা হয়না, তবুও আমি ক্ষমা চাইতে এলাম রে তোর কাছে, যা যা করেছি এতদিন সেসবের জন্য! কাল সারাটা রাত আমি ঘুমোতে পারিনি, শুধু ভেবে গেছি কোন্ মুখে তোর সামনে গিয়ে দাঁড়াব! অনেক কষ্টে আমি মনে সাহস জুগিয়েছি রে, এতগুলো দিন যদি নির্লজ্জের মতো নিজের বোনেরই ক্ষতি চাইতে পারি, তাহলে আবার তার সামনে আমাকে দাঁড়াতেই হবে, নির্লজ্জের মতোই!' রুমকি সহসা শিউলির হাতদুটো ধরে ফেলল, 'বোন রে, কালকের ছোট্ট একটা ঘটনা তোর এই অমানুষ দিদিটাকে অনেক বদলে দিয়েছে রে, ট্রাস্ট মি! হ্যাঁ আমি জানি বিশ্বাসের যোগ্য আমি নই, তবু....'

- 'রুমকিদি, তুমি সোজাসুজি বলো দেখি, কি চাও তুমি? রোজ রোজ তোমার আর হিয়ার নাটক দেখতে দেখতে আমি ক্লান্ত বিশ্বাস করো!'

- 'নাটক নয় রে বোন, ওটা তো এতদিন করতাম আমি। আজ আমি যা বলছি সব সত্যি বিশ্বাস কর, সবটা সত্যি!' রুমকি আর দাঁড়াল না, কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।


- 'কি পাগলের মতো বকছিস? নেশা টেশা করেছিস নাকি সকাল সকাল?' কাকলি একরকম মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল।

- 'ন্যায্য কথা বলছি মা। বাড়ির আসল মেয়েটা এককোণে পড়ে থাকবে, আর একটা বাইরের মেয়ে কিনা কাহিনী চৌধুরী হয়ে থেকে যাবে? সেটা হয়না মা, আমি আজকেই বাড়ির সবাইকে সবটা বলব।'

- 'তুমি কেমন মেয়ে গো রুমকিদি? নিজের মাকে গরাদের ওপারে পাঠাবে? একটুও লজ্জা করবে না তোমার মেয়ে হিসেবে?'

- 'এতদিন দিদি হিসেবে যা করেছি তাতে যখন লজ্জা করেনি তখন আজ একটা ন্যায্য কাজ করতে কেন লজ্জা লাগবে?'

- 'দেখো হিয়া, দেখো! এ মেয়েকে কিভাবে বড়ো করলাম আর কেমন অদ্ভুত কথা বলছে আজ! ওরে গাধা, কাল শিউলি তোকে বাঁচিয়েছে বলে এতো ন্যাকামি করছিস তো? ওটা ও নিজের ডিউটি করেছে মাত্র, ওর জায়গায় যেকোনো মেড থাকলেই করত!'

রুমকি কাকলি আর হিয়ার কথায় গুরুত্ব না দিয়ে চলল বাড়ির সবাইকে সবটা বলতে, কিন্তু হিয়া আটকাল।

- 'যেটা করতে যাচ্ছ করো, কিন্তু আজ যদি বিকেলে কলেজ থেকে শিউলি জ্যান্ত না ফেরে, তার বদলে ওর রক্তমাখা লাশ ফেরে, তখন যেন আমায় দোষ দিও না।'

- 'ইউ স্কাউণ্ড্রেল!' রুমকি গর্জে উঠল।

- 'রাগ করে কি লাভ রুমকিদি? আমি কালসাপ জেনেই তো নিয়ে এসেছিলে আমায়, এখন আমার লেজে পা দিলে তো ছোবল খেতেই হবে! শুধু কি শিউলি? সত্যিটা সবাই জানলে বাড়ির অন্য কারোর যে কি হয়ে যাবে কখন তা তুমি টেরই পাবেনা!' 


ক্রূর হেসে হিয়া চলে গেল। কাকলি যাওয়ার আগে বলে গেল, 'কিছু দেখে শেখ! তোর থেকে ছোট অথচ বুদ্ধিতে ডবল! আজ মনে হচ্ছে তুই আদৌ আমার মেয়ে তো?'

রুমকি হতাশ হয়ে বসে পড়ল মেঝেতে। হিয়া যে কতটা ভয়ংকর সেটা ও আজ ভীষণভাবে উপলব্ধি করল, কিন্তু ওর মনের ভেতর থেকে কে যেন বলে উঠল, 'রুমকি, বড্ড দেরি করে ফেলেছিস রে!'


এগিয়ে এল রুমকির বিয়ের তারিখ।

- 'শোনো রুমকিদি, তোমার বিয়েতে বীনামাসিকে ইনভাইট করা হয়েছে। এবার বীনামাসির এখানে আসাটা কিভাবে আটকাবে তুমি, সেটা তোমার ডিসিশন।'

- 'বীনামাসিকে কেন আটকাব হিয়া? তার চেয়ে শিউলিকে অন্য কোথাও পাঠিয়ে দিলে....'

- 'এই রুমকিদি!' ক্রোধভরে গর্জন করে উঠল হিয়া, 'তোমায় আমি একফোঁটাও বিশ্বাস করি না! তুমি বীনামাসির আসাটা আটকাবে, আর শুধু তাই নয়, এই জন্মে আর কখনো যাতে চৌধুরীবাড়িতে ওই মহিলার পা না পড়ে, সেই ব্যবস্থাও করবে তুমিই।

রুমকি ভালোই বুঝতে পারছিল, ও হিয়ার হাতের পুতুলে পরিণত হয়ে গেছে। বাধ্য হয়েই বীনামাসিকে কল করল রুমকি।

- 'এসব কি কথা বলছিস তুই রুমকি? আমি বাইরের লোক? আমার কোনো অধিকার নেই তোর বিয়েতে যাওয়ার?'

- 'না নেই! তুমি কি ভেবেছ বীনামাসি তোমার উদ্দেশ্য আমি বুঝিনা? ভালো করেই যেন আমাদের সম্পত্তির পরিমাণ, ওতে ভাগ বসাবে বলেই তো কাহিনীকে নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলে তেরোটা বছর!'

- 'শাট আপ রুমকি!


পরবর্তী ভাগ পড়ুন : একবিংশ পর্ব

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ