কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
অষ্টাদশ পর্ব
— 'আসলে স্মৃতি, এই মা-সন্তানের সম্পর্কটাই আমার কাছে একটা মিথ্যে, একটা ভাঁওতা মনে হয়। সবাই 'মা' শব্দটাকে গ্লোরিফাই করতে চায়, কিন্তু কেন করতে চায় সেটা আমি বুঝিনা, হয়ত বা তাদের জীবনে সেরকম কিছু ঘটনা আছে তাই তারা সুখ পায় এসব করে, সে যাক গে, অন্যদের মতামতে আমার রাগ নেই, কিন্তু আমার কাছে এসব মূল্যহীন বলেই মনে হয়।'
শিউলি হাঁ করে আকাশের কথাগুলো গিলছিল। আকাশও ওর জীবনে এমন মনোযোগী শ্রোতা পায়নি কখনই, তাই ও ও মনে সামান্যতম দ্বিধা না রেখে বলে যেতে লাগল জীবনের সব অজানা কথা।
— 'জানো স্মৃতি, আমার যখন মাত্র দেড় বছর বয়স, তখনই আমার জন্মদাত্রী মা আমায় ছেড়ে, বাবাকে ছেড়ে চলে যান তাঁর প্রেমিকের হাত ধরে। তারপর আমার মা আনার উদ্দেশ্যে বাবা আবার বিয়ে করেন, কিন্তু আমার দ্বিতীয় মা....' শ্লেষের হাসি হাসল আকাশ, 'তিনি তো অর্থলোভে বিয়ে করেছিলেন বাবাকে, আমার মা হওয়ার বিন্দুমাত্রও ইচ্ছে ছিল না ওঁর, তাই আমি সেই মাতৃহারাই রয়ে গেলাম। আমার দ্বিতীয় মা ব্যস্ত থাকেন শাড়ি গয়না আর তাঁর নিজের ছেলেমেয়েদের নিয়ে। আর বাবা? থাক, তাঁর কথা যত কম বলা যায় ততই ভালো', দীর্ঘশ্বাস ফেলে আকাশ বলল, 'তিনি নামী ইউনিভার্সিটির প্রফেসর, সর্বক্ষণ বই নিয়েই বসে থাকেন তিনি। সংসারে কি ঘটছে না ঘটছে, ওঁর ছেলেমেয়েরা মরল না বাঁচল সেসব ব্যাপারে বিশেষ আগ্রহ নেই তাঁর। ওঁর কাছে দায়িত্বপালন বলতে শুধু সংসার চালানোর খরচটুকু দেওয়া, ব্যস।' আকাশ বলে যেতে লাগল, 'আমার জীবনেও সবাই আছে, মা আছে, বাবা আছে, ভাইবোন আছে, কিন্তু কেউই নেই, ঠিক তোমার মতো। মাঝে মাঝে মনে হয় আমি বোধহয় বাড়িতে একাই থাকি, আর বাকি চরিত্রগুলো কাল্পনিক, যাদের বাস্তবে কোনো ঠাঁই নেই।'
আকাশ হঠাৎই শিউলির হাতদুটো ধরল, 'আসলে স্মৃতি, তুমিও অনাথ, আমিও তাই। আমাদের কাছে পরিবার বলতে শুধু কয়েকটা চেনা মানুষের সাথে এক ছাদের নীচে থাকা, ব্যস।'
লাইব্রেরিতে একরাশ নিস্তব্ধতা বিরাজ করছিল। আকাশই নিস্তব্ধতা ভাঙল।
— 'আর আমার ধারণা যে ভুল নয় সেটা তো তোমার জীবনেও প্রমাণিত, তাই না? তোমার জন্মদাত্রী মায়ের কথাই ভাবো না, মাত্র তেরোটা বছর তুমি দূরে ছিলে, তবুও তিনি তোমায় চিনতে অপারগ! তিনি হিয়াকে কাছে টেনে নিয়েছেন শুধুমাত্র তার চুলের গড়ন কাহিনীর সাথে মেলে বলে! লোকেরা যে কতকিছু বলে, কিসব 'নাড়ির টান' না কি যেন, কোথায় সেসব? আসলেই এসব ভাঁওতা ছাড়া আর কিছুই নয়।'
এতক্ষণে মুখ খুলল শিউলি। বলল, 'আপনার জীবনে যা যা ঘটেছে স্যার, তার পর মা আর সন্তানের মধ্যে সম্পর্কটা মিথ্যে মনে হওয়াই স্বাভাবিক, আমারও হয়ত এরকমটাই মনে হত, যে মা শব্দটা শুধুই একটা মায়া, মিথ্যে দিয়ে গড়া, কিন্তু আমার জীবনে দুজন যে যশোদা মাকে পেয়েছি, তারাই আমায় প্রতিটা মুহূর্তে বিশ্বাস করতে বাধ্য করেছে যে, মাতৃত্ব শব্দটা মিথ্যে একেবারেই নয়।'
— 'হুম, তোমার দিক দিয়ে তুমি সঠিক, তোমার জায়গায় থাকলে হয়ত আমিও বিশ্বাস করতাম যে মা শব্দটা ভাঁওতা নয়, কিন্তু আমার জীবনে তো এরকম কাউকে আমি দেখিনি নিজের চোখে, যেদিন দেখব সেদিন নিশ্চয়ই বিশ্বাস করব লোকের বলা কথাগুলো, যে মা সন্তানের জন্য যতটা দূর যাওয়া যায় যেতে পারে, এগুলো মিথ্যে নয়, বরং সারসত্যি।'
— 'দেখুন স্যার, আপনার চিন্তাধারা তো আমি বদলাতে পারব না, আপনার ভাবনাকেও আমি সম্মান করি, তবে এটুকু বলতে পারি আমি', সামান্য হেসে শিউলি বলল, 'একদিন না একদিন আপনার এই বিশ্বাসটা ভাঙবেই, মিলিয়ে নেবেন।'
— 'আচ্ছা, সে যখন বিশ্বাস ভাঙবে, তখন দেখা যাবে, এখন ব্যাগ গুছিয়ে নাও তাড়াতাড়ি, লাইব্রেরি বন্ধ হয়ে যাবে এক্ষুণি।' আকাশ স্মিত হেসে বলল।
শিউলি আর আকাশ বেরিয়ে পড়ল কলেজের গেটের বাইরে, কিন্তু আকাশের গাড়িটা যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেদিকে না গিয়ে উল্টোদিকে হেঁটে চলল আকাশ।
— 'বাড়ি যাবেন না স্যার?'
— 'নাহ, এখন ভাবছি একটু গঙ্গার পারে যাব, এই গোধূলির সময়টা বড্ড সুন্দর লাগে গঙ্গার পার। তুমি যাবে? যেতে পারো, ভালোই লাগবে।'
— 'হ্যাঁ।'
আকাশ আর শিউলি ব্যস্ত রাজপথে হাঁটতে লাগল পাশাপাশি। প্রায় মিনিট পনেরো হাঁটার পর ওরা এসে পৌঁছাল গঙ্গার পারে। মৃদু হাওয়ায় শিউলির অবাধ্য খোলা চুল চোখেমুখে পড়ছিল, ওড়না উড়ছিল নিজের খেয়ালে। পাখির কলকাকলি পরিবেশটাকে যেন আরও সুন্দর করে তুলেছিল। আকাশ মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল শিউলির দিকে।
— 'ভেবেছিলাম কখনো কোনো মেয়ের সাথে সম্পর্কে জড়াব না, প্রেম ভালোবাসা সম্পর্ক বিয়ে এসবে তো সেই ছোটবেলা থেকেই তীব্র অবিশ্বাস আমার, মেয়েদের সঙ্গ আমি এড়িয়ে চলি। কিন্তু এই মেয়েটার মধ্যে এমন কি আছে যে এর সঙ্গ এত মধুর লাগে আমার? আর পাঁচটা মেয়েদের থেকে স্মৃতিকে কেন এতটা আলাদা মনে হয় আমার?' আপনমনেই বিড়বিড় করে উঠল আকাশ।
শিউলি ধীরপায়ে ঘাটের সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামতে লাগল, তারপর একদম শেষ সিঁড়িটায় পা ঝুলিয়ে বসল ও, রাঙা পা দুটো জলের সাথে খেলা করতে লাগল, আর জলও ছলাৎ ছলাৎ শব্দে সেই খেলাকে প্রশ্রয় দিতে লাগল যেন পরমানন্দে। সূর্যদেব তখন প্রায় অস্তমিত, আকাশ উঠেছে রাঙা হয়ে, ঠিক যেন নববধূর লজ্জায় রাঙা মুখখানি। সব মিলিয়ে আকাশের মনে হল এর চেয়ে সুন্দর দৃশ্য আর কিছু হতেই পারে না।
আরও কিছুটা সময় গঙ্গার পারে কাটিয়ে ওরা রওনা দিল আবার কলেজের দিকে। আকাশের গাড়িটা যে ওদিকেই আছে। শিউলি চেয়েছিল বাসে করেই বাড়ি ফিরে যেতে, কিন্তু আকাশের একটা কথা ওকে চুপ করিয়ে দিয়েছে একদম।
— 'দেখো স্মৃতি, আমরা দুজনেই আমাদের জীবনের অতীত একে অপরের কাছে প্রকাশ করেছি, যেটা আর কারোর সাথে আগে কখনও করিনি আমরা। এর অর্থ কি জানো? আমাদের মধ্যে একটা বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, গড়ে উঠেছে বিশ্বাসের সম্পর্ক। দুজনেরই দীর্ঘ বন্ধুহীন জীবনে বন্ধু যখন পেয়েছি, তখন যতটা সময় একে অপরকে দিতে পারব, ততই সুন্দর স্মৃতি থেকে যাবে আজীবন। স্মৃতি, আমরা কেউই আজ জানিনা যে কাল কি হবে, বিশেষ করে তোমার আমার মতো মানুষ, তাই আজকের দিনটা যতটা সম্ভব সুন্দর করে তুলি,চলো না!'
এরপর আর শিউলি কিই বা বলবে, ও উঠে বসল আকাশের গাড়িতে।
আকাশের গাড়িটা চৌধুরীবাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। শিউলি গাড়ি থেকে নামতেই মুখোমুখি হল কাকলি, রুমকি আর হিয়ার।
পরবর্তী ভাগ পড়ুন : ঊনবিংশ পর্ব

0 মন্তব্যসমূহ