কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
ষষ্ঠ পর্ব
— 'তা আমি কি করব? ভেবেছি বড়োলোকদের বড়োলোকি ব্যাপার স্যাপার, তাই জন্যেই তো....' চাপা গলায় জবাব দিল হিয়া।
— 'কতবার তোমাকে বলেছি, বেশি পাকামো করবে না সবসময়, তা শুনলে তো? এখানে আমি যা বলব সেভাবেই চলবে, একদম নিজের বুদ্ধি খাটাবে না, মনে থাকবে?'
— 'থাকবে।'
— 'ড্যাডি? হ্যাঁ রে কাহিনী, আমাকে তো তুই বাবা বলে ডাকতিস, তেমনই তো শিখিয়েছি আমরা তোকে।'
— 'আসলে ও মজা করে বলেছে আর কি!' রুমকি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে।
— 'ওহো!' সকলে হেসে ওঠেন, আর রুমকি কটমট করে তাকায় হিয়ার দিকে।
_________________________
একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ : পড়ুন
_________________________
একটু পরেই ট্রেতে সকলের জন্য চা আর কফি নিয়ে হাজির হল শিউলি।
— 'এই তো গরম গরম চা আর কফি এসে গেছে, এবার সবাই খেয়ে নাও।' বলে উঠলেন ত্রিদিব বাবু।
শিউলিকে দেখেই ভূত দেখার মতো চমকে উঠল রুমকি আর হিয়া।
— 'কা-কা-কাহিনী!'
আর বলতে পারল না রুমকি। অজ্ঞান হয়ে সোফায় লুটিয়ে পড়ল ও।
হিয়াও ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিল, কিন্তু ও কোনোরকমে নিজেকে সামলে নিল।
বাড়ির সকলে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন রুমকিকে নিয়ে। ওকে ওর ঘরে নিয়ে যাওয়া হল, সঙ্গে গেল হিয়াও।
অনেকক্ষণ পর রুমকির যখন জ্ঞান এল, তখন ও দেখল, ঘরে আর কেউ নেই, শুধু হিয়াই বসে আছে। আসলে রুমকি যাতে জ্ঞান ফেরার পর বেফাঁস কিছু না বলে বসে, তাই ওর জ্ঞান ফেরার আগেই বাড়ির সবাইকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে ঘর থেকে বের করে দিয়েছে হিয়া।
— 'তখন তো খুব আমায় বকছিলে, তা এখন কে ডোবাচ্ছে শুনি?'
— 'হিয়া ও কাহিনী.....'
— 'না রুমকিদি, ও কাহিনীর লুক অ্যালাইক, কিন্তু কাহিনী নয় ও, একটা অন্য মানুষ ও।'
— 'তুমি সিওর?'
— 'হ্যাঁ রুমকিদি, একদম সিওর! হাড় হাভাতে ঘরের মেয়ে ও, ওর নাম শিউলি। কোথাকার এক গ্রাম থেকে এসেছে ওর মায়ের সাথে আমাদের বাড়িতে রান্না করবে বলে।' একটু থামল হিয়া, 'কিন্তু তুমি যদি এরকম করতে থাকো তাহলে নিজেদের পায়েই কুড়ুল মারব আমরা!'
রুমকি তখনকার মতো শান্ত হল ঠিকই, তবু মনের মধ্যে একটা খুঁতখুঁতানি রয়েই গেল ওর। ও ঠিক করল, মনোরমার সাথে কথা বলবে ও। অন্যদিকে শিউলিরও রুমকি আর হিয়াকে বাড়ির অন্যদের চেয়ে একটু বেশিই চেনা বলে মনে হল।
পরের দিন সকাল হতে না হতেই রুমকি হানা দিল শিউলিদের ঘরে। শিউলি তখন বিছানা গুছোচ্ছিল, মনোরমা তখন ঘরে ছিল না।
— 'তোমার মা কোথায় শিউলি?'
— 'মা তো রান্নাঘরে।' হাসিমুখে জবাব দিল শিউলি।
রুমকি আবারও ভয় পেয়ে গেল। এই মেয়েটার কাহিনীর সাথে শুধু চেহারাতেই মিল তা নয়, কণ্ঠস্বরও হুবহু এক, এমনকি এই মেয়েটাও কাহিনীর মতো শান্ত স্বভাবের, হাসিটাও একদম কাহিনীরই মতো।
— 'দুটো আলাদা মানুষের মধ্যে এতখানি মিল কি সত্যিই কোইন্সিডেন্স?' মনে মনে বিড়বিড় করে রুমকি বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
মনোরমাকে রান্নাঘরেই পেয়ে গেল রুমকি, জিজ্ঞেস করল, 'শিউলি তোমার মেয়ে?'
— 'আজ্ঞে দিদিমণি।'
— 'সত্যি বলছ?'
— 'মিথ্যে কেন বলব দিদিমণি?'
— 'না মানে ও কি তোমার নিজেরই মেয়ে নাকি..... '
— 'দোহাই দিদিমণি, এসব কথা বলবেন না। যাকে দশমাস পেটে ধরেছি সে আমার নিজের মেয়ে হবে না তো কি পরের মেয়ে হবে?'
— 'ওহ আচ্ছা।' নিশ্চিন্ত মনে ফিরে যাচ্ছিল রুমকি, কিন্তু মনোরমা আটকাল।
— 'আপনি এসব কেন জিজ্ঞেস করলেন দিদিমণি?'
— 'না মানে এমনিই....'
— 'আসলে ওকে দেখে বড়ো ঘরের মেয়ে মনে হয়, তাই না? গাঁয়ের সকলে ওর জন্ম থেকে এই এক কথাই বলে।'
রুমকি দ্বিরুক্তি না করে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। হিয়া তো আগেই নিশ্চিন্ত হয়েছিল, এখন রুমকিও সিওর হয়ে গেল, যে এ কাহিনী নয়, শিউলি।
কেটে গেল বেশ কয়েকটা দিন। হিয়া ভর্তি হল এক নামি কলেজে, শিউলিও। আসলে চৌধুরীবাড়ির মানুষেরাই শিউলিকে কলেজে ভর্তির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। কাহিনী ওরফে শিউলি কলেজে ভর্তি হল শিউলির পরিচয়ে। আসলে মনোরমার মেয়ে শিউলি গতবছর উচ্চমাধ্যমিক শেষ হওয়ার মাসখানেকের মধ্যেই মারা যায়, ওর মার্কশীটের সাহায্যেই কাহিনী ভর্তি হল কলেজে।
হিয়া বারবার আপত্তি জানিয়েছিল, 'আমি বাড়ির মেয়ে, আমি আর কাজের লোকের মেয়ে এক কলেজে পড়বে?'
কিন্তু তার আপত্তি কেউই কানে তোলেননি, বরং বলেছেন, 'ভাবনার পরিধিটা একটু বড়ো করো।'
রুমকিই শান্ত করেছিল হিয়াকে, 'আরে এসব ভিখিরি মেয়ে যতই কলেজে পড়ুক, ও কি তোমার মতো ভালো রেজাল্ট করতে পারবে নাকি? ফার্স্ট ইয়ারেই ফেল মেরে মুখ কালো করে বেরিয়ে যাবে কলেজ থেকে!'
কিন্তু কলেজে ক্লাস শুরু হতেই হিয়া আর রুমকির সেই ভুল ভাঙল। প্রতিটা মুহূর্তেই শিউলি প্রমাণ করতে লাগল, সে ই ক্লাসে প্রথম স্থানাধিকারী হতে চলেছে। প্রতিটা ক্লাসটেস্টে ফার্স্ট হওয়ার দরুন শিক্ষকশিক্ষিকাদের কাছেও প্রিয় ছাত্রী হয়ে উঠল সে। হিয়ার রাগ দিন দিন বাড়তে লাগল শিউলির ওপর, দাঁত কিড়মিড় করতে লাগল সে, 'একটা কাহিনী মরল, আবার তারই মতো দেখতে আর একটা শয়তান কোথা থেকে চলে এল আমার লাইফ হেল করতে!'
হিংসার বসে হিয়া শুধু কলেজেই নয়, বাড়িতেও শুরু করল শিউলির ওপর চোটপাট করতে। বাড়ির সকলেই এতে বেশ অসন্তুষ্ট হলেন, বিশেষ করে কাহিনীর মা বাবা সায়নী আর অনন্ত।
একদিন সন্ধ্যেবেলায় শিউলি চা নিয়ে এসেছে হিয়ার জন্য, হিয়া চা টা মুখে দিয়েই ,'এটা চা বানিয়েছিস না অন্য কিছু? এতো খারাপ চা বানিয়েও এতদিন আছিস কি করে এই বাড়িতে?' বলেই চা টা ছুড়ে দিল শিউলির দিকে। ভাগ্যিস সায়নী ঠিক সময় চলে এসে শিউলিকে সরিয়ে নিল, নইলে গরম চা সুদ্ধু কাপটা ওর গায়ে লাগত।
— 'শয়তান মেয়ে, এই শিক্ষা দিয়েছি আমরা তোকে?' সায়নী এক চড় মারল হিয়ার গালে।
পরবর্তী ভাগ পড়ুন : সপ্তম পর্ব

2 মন্তব্যসমূহ
দারুন দারুন দারুন, পুরো জমে গেছে ধারাবাহিক টা 🧡🧡🧡
উত্তরমুছুন🤗🤗🤗💗💗💗
মুছুন