কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
সপ্তদশ পর্ব
— 'কি রে কাহিনী, এটাই ভাবছিস তো কিভাবে ওলটপালট হয়ে গেল সবটা?' রুমকি শিউলির কাছে এসে ফিসফিসিয়ে বলল।
— 'সবটা তুমি করেছ না রুমকিদি? সত্যি, তোমার মতো মানুষ তো দিদি-বোনের সম্পর্কটাই দেখছি অপবিত্র করে দেবে!'
— 'হ্যাঁ রে আমার জ্ঞানদায়িনী ভগিনী, সবটাই আমি করেছি। না সরাসরি কিছু করিনি, ওই কলকাঠি নেড়েছি আর কি!' একটু থেমে রুমকি বলতে লাগল, 'অভিজিতের মামা রাজনৈতিক নেতা, সেটা জানিস তো? তাই অভিজিতের অনেক লম্বা হাত, ও দিনকে রাত করে দিতে পারে, বুঝলি বেহেন?'
— 'সবটা তুমি করেছ না রুমকিদি? সত্যি, তোমার মতো মানুষ তো দিদি-বোনের সম্পর্কটাই দেখছি অপবিত্র করে দেবে!'
— 'হ্যাঁ রে আমার জ্ঞানদায়িনী ভগিনী, সবটাই আমি করেছি। না সরাসরি কিছু করিনি, ওই কলকাঠি নেড়েছি আর কি!' একটু থেমে রুমকি বলতে লাগল, 'অভিজিতের মামা রাজনৈতিক নেতা, সেটা জানিস তো? তাই অভিজিতের অনেক লম্বা হাত, ও দিনকে রাত করে দিতে পারে, বুঝলি বেহেন?'
____________________________
একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ : পড়ুন
______________________________
— 'এবার তুইই ভেবে নে, যেভাবে আছিস সেই জীবনটাই মানিয়ে নিবি, নাকি বেশি উড়তে গিয়ে ডানা কেটে এক্কেবারে রাস্তায় গিয়ে পড়বি? চয়েসটা তোর, তবে তুই যেটাই চয়েস করিস না কেন, সবটাতেই আমাদের লাভ, তাই বলছি, বেশি ওড়াউড়ি করতে যাস না।'
রুমকি আর হিয়া ক্রূর হেসে চলে গেল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে শিউলি চলে গেল নিজের ঘরে।
শিউলির চোখে আজ আর জল এল না। এ এক অদ্ভুত অনুভূতি। নিজের বাড়ির জমিতেই দাঁড়িয়ে আছে ও, তবুও কোনো অধিকার নেই ওর এবাড়ির ওপর। নিজের মা বাবা কাছে থেকেও যেন লক্ষযোজন দূরে আছে। অন্যের মেয়েকে মা পরম স্নেহে আগলে রেখেছে, আর আপন মেয়েকে করেছে অনাত্মীয়। মাকে মা বলে ডাকার অধিকারটুকুও তার নেই, মাকে ডাকতে হয় ছোটমা বলে, বাবাকেও বাবা ডাকার অধিকার নেই তার, বাবাকে সে ডাকে কাকু বলে। ঠাকুমা দাদু তাকে স্নেহ করেন ঠিকই, কিন্তু কাহিনী হিসেবে নয়, এক আশ্রিতার অসহায় মেয়ে হিসেবে। দুঃখে, লজ্জায়, অভিমানে মরে যেতে ইচ্ছে করছিল শিউলির। মনে হচ্ছিল, সেদিন খাদ থেকে কেন যে বেঁচে ফিরল ও! মরে যাওয়া হয়ত এর চেয়ে অনেক শান্তির ছিল। এই পৃথিবীর বুকে নিজেকে সবচেয়ে একা বলে মনে হল শিউলির। এর চেয়ে তবু অনাথ হওয়া অনেক ভালো ছিল, প্রতি মুহূর্তে নিজের মানুষগুলোর প্রতি জমে ওঠা অভিমানের আগুনে দগ্ধ হতে হত না ওকে। ওর বারবার মনে হতে লাগল বীণামাসির বলা কথাগুলো, 'তোর আঠারো বছর হলে দেখব, সায়নী কেমন চিনতে পারে তোকে!'
— 'চিনতে পারেনি বীণামাসি, এত কাছে থাকা সত্ত্বেও নিজের সন্তানকে মা চিনতেই পারেনি!' শ্লেষের হাসি হাসল শিউলি।
— 'চিনতে পারেনি বীণামাসি, এত কাছে থাকা সত্ত্বেও নিজের সন্তানকে মা চিনতেই পারেনি!' শ্লেষের হাসি হাসল শিউলি।
শিউলি বাড়ি থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকার চেষ্টা করে আজকাল। কলেজে ক্লাস শুরু হওয়ার অনেক আগেই চলে যায়, লাইব্রেরিতে গিয়ে পড়াশুনা করে। আবার ক্লাস শেষ হওয়ার পরেও অনেকটা সময় লাইব্রেবিতে কাটায় ও। শেষে যখন লাইব্রেরিয়ান তাড়া দেয়, লাইব্রেরি বন্ধ হওয়ার সময় হয়, তখন বাধ্য হয়েই মুখ ভার করে ফিরে যায় ও বাড়িতে। বাড়ির মানুষেরা তাতে বিশেষ দুঃখ পায় বলেও মনে হয় না শিউলির। এমনকি সায়নীও আজকাল বিশেষ খোঁজখবর নেয় না ওর। শিউলিও আর নিজেকে সবার কাছে প্রমাণ করতে চায় না, কোন্ লজ্জাতেই বা করবে ও? বরং কাহিনী চৌধুরীর পরিচয়ের থেকে শিউলি নস্করের পরিচয়টাই অনেক বেশি সম্মানের ওর কাছে।
এদিকে রুমকির বিয়ে পাকা হয়ে গেল অভিজিতের সাথে। সামনেই ওদের আশীর্বাদ, তার সপ্তাহখানেক পরেই বিয়ে। বাড়িতে রীতিমতো কেনাকাটা, বিয়ের জোগাড়যন্তরের হিড়িক পড়ে গেছে। এসবের মাঝে শিউলির নিজেকে আরও বেশি করে এঁটো পাতার মতো অপ্রয়োজনীয় মনে হচ্ছে, তাই এখন আরও বেশি করে বাড়ি থেকে দূরে থাকছে ও।
একদিন কলেজ ছুটির পর আকাশ লাইব্রেরিতে এসে দেখে, শিউলি একটা টেবিলে মুখ গুঁজে শুয়ে আছে।
— 'এই স্মৃতি, লাইব্রেরিতে এসে ঘুমোচ্ছো নাকি? এটা ঘুমোনোর জায়গা?'
আকাশের গলা শুনে শিউলি মুখ তুলে তাকাল। ও ঘুমোচ্ছিল না, বরং নিজের জীবনের ট্রাজিক পরিণতির কথা ভেবে চোখদুটো জলে ভরে গিয়েছিল ওর।
— 'তুমি কাঁদছ? আই অ্যাম সরি আমি বুঝতে পারিনি।' একটু থেমে আকাশ বলল, 'বাড়িতে কিছু হয়েছে আবার নিশ্চয়ই? সত্যি তুমি যেখানে থাকো সেটাকে বাড়ি কম জতুগৃহ বেশি বলা যায়, সামান্য ভুলত্রুটি হোক বা না হোক, দাউদাউ করে আগুন জ্বলবে।'
অশ্রুজলের অনেকগুলো দোষের মধ্যে একটা দোষ হল, সে যদি কথা শোনার মানুষ পেয়ে যায়, তবে তার গতি রুদ্ধ হয়না, বরং আরও তীরবেগে নির্গমন হতে থাকে চোখের কোল থেকে। শিউলির ক্ষেত্রেও তাই হল, আকাশের বলা কথাগুলোয় তার মন কিছুটা শান্ত হলেও অশ্রুজলের বেগ আরও বাড়ল।
— 'কি হয়েছে স্মৃতি?' শিউলির মাথায় হাত রেখে সস্নেহে প্রশ্ন করল আকাশ।
আহা, এইভাবে কতদিন কেউ স্নেহভরে ওর সাথে কথা বলেনি! রূঢ় ব্যবহার পেতে পেতে একসময় সেটাকেই স্বাভাবিক হিসেবে গণ্য করতে শিখে গিয়েছিল শিউলি, কিন্তু আজ সেই স্বাভাবিক ধারণাটা এলোমেলো করে দিল আকাশ।
এরপরেই এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটাল শিউলি। ও আবেগের বশবর্তী হয়ে আকাশকে জড়িয়ে ধরল হঠাৎই। চোখের জল বাগ মানল না আর। আকাশও ওকে বাধা না দিয়ে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। এ কি শুধুই শিউলির কষ্টে সমব্যথী হওয়ার কারণে না অন্য কোনো কারণে সেটা আকাশ নিজেও বুঝতে পারল না। শিউলি নিজের জীবনের যাবতীয় ঘটনা অনর্গল বলে গেল কাঁদতে কাঁদতে। সবটা খুলে বলার পর শিউলির যখন কান্না থেমে গেল, ওর হুঁশ ফিরল। আর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতেই ও তাড়াতাড়ি আকাশের কাছ থেকে সরিয়ে নিল নিজেকে।
— 'আই অ্যাম এক্সট্রিমলি সরি স্যার!'
— 'ইটস ওকে স্মৃতি। তোমার কথাগুলো খুবই মন দিয়ে শুনছিলাম আমি, কেন জানো?'
শিউলি কিছু না বলে শুনে যেতে লাগল আকাশের কথাগুলো। আকাশ বলে যেতে লাগল, 'আসলে আমার জীবনের গল্পটাও হুবহু তোমার মতো না হলেও অনেকটাই তোমার মতো। ইন ফ্যাক্ট, আমি মেয়েদের বিশেষ পছন্দই করি না জানো, তাদের কাছে ঘেঁষতে দেওয়া তো দূর, তাদের সাথে ভালোভাবে কথা পর্যন্ত বলতে ইচ্ছা হয় না আমার। তোমার মনে পড়ে স্মৃতি, যেদিন তুমি আমায় বলেছিলে তোমার মা মারা গেছেন, সেদিন আমি সামান্যতমও দুঃখ প্রকাশ করিনি, কারণটা জানো?'
সত্যিই এই প্রশ্নটা অনেকদিন ধরেই শিউলিকে কুড়ে কুড়ে খেয়েছে, যে এমন নরম মনের একজন কেয়ারিং মানুষ মায়ের মৃত্যুর খবর শুনে কিভাবে রুড হতে পারেন? আজ নিজে থেকেই সেই প্রশ্নের উত্তর ওর কাছে চলে এসেছে, তাই কোনো কথা না বলে ও চুপচাপ শুনে যেতে লাগল আকাশের কথাগুলো।
পরবর্তী ভাগ পড়ুন : অষ্টাদশ পর্ব

0 মন্তব্যসমূহ