কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
চতুর্দশ পর্ব
একদিন সকালে শিউলি চা নিয়ে রুমকির ঘরের দিকে যাচ্ছে, হঠাৎ ওই ঘর থেকে ওর কানে এল কিছু কথা। শিউলি পর্দার আড়াল থেকে কথাগুলো শোনার চেষ্টা করতে লাগল।
— 'ওই আপদটাকে ছোটমার চোখে ছোট অলরেডি করে দিয়েছি, এরপর আরও কিছুটা ছোট করতে হবে। তাহলেই আমাদের আর কিচ্ছুটি করতে হবে না, ছোটমাই ওকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবে।'
— 'সত্যি মাইরি! গুরুমা নাকি কাহিনীর জন্মের পর বলেছিল, এ মেয়ের জীবন বিপদসংকুল হবে! কোথায় বিপদসংকুল? একে তো খাদে ফেললে মরে না, চরিত্রে কাদা ছেটালেও সেসব গায়ে মাখে না!'
— 'আস্তে কথা বলো হিয়া, দেওয়ালের কান থাকে কিন্তু!'
____________________________
একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ : পড়ুন
______________________________
এই পর্যন্ত শুনেই শিউলি চলে এল সেখান থেকে। ও স্পষ্ট বুঝতে পারল ওর সাথে রুমকি আর কাহিনীর কিছু তো একটা সম্পর্ক আছে, নইলে ওকে বারবার কেন টার্গেট করছে ওরা? শিউলি ঠিক করল, একদিন যখন রুমকিরা বাড়ি থাকবে না, সেই সময় ওদের ঘরগুলো ভালোভাবে খুঁজে দেখবে ও। ওর বিশ্বাস, ওদের ঘরেই কিছু না কিছু ঠিকই পাওয়া যাবে। সেই মতো একদিন সন্ধ্যেবেলায় যেই রুমকি আর হিয়া গেছে পার্টিতে, আর কাকলি আর সায়নী বেরিয়েছে শপিংয়ে, তখনই ঘর পরিষ্কারের নাম করে শিউলি প্রথমে রুমকির ঘরে ঢুকল। কিন্তু ঘরটা তন্নতন্ন করে খুঁজেও সেরকম কিছুই পেল না শিউলি। এরপর ও ঢুকল হিয়ার ঘরে। হিয়ার ঘরটা অনেকক্ষণ খোঁজার পর একটা ডায়েরি পেল ও। একটা ড্রয়ারে ধুলোমাখা হয়ে পড়ে ছিল ডায়েরিটা। এই লাল মলাটের ডায়েরিটা ভীষণ চেনা লাগল শিউলির, ও ওড়না দিয়ে ডায়েরির ধুলো পরিষ্কার করেই সবার চোখের আড়ালে ওটা নিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল। ঘরে এসেই দরজা বন্ধ করে ডায়েরিটা পড়তে লাগল শিউলি। এই ডায়েরিতে কাহিনী লিখত তার রোজকার জীবনের কথা। কিন্তু অদ্ভুত ভাবেই কাহিনীর আঠারো বছর পূর্ণ হওয়ার পর থেকেই ডায়েরিটা আর লেখা হয়নি। শিউলি ডায়েরিটা শুরু থেকে পড়তে শুরু করল। কাহিনীর জীবনে যা যা ঘটেছে, সবটাই লেখা আছে এই ডায়েরিতে। পাঁচ বছর বয়সে বীনামাসির কাছে যাওয়া থেকে শুরু করে হিয়ার ওর প্রতি হিংসার কথা, রুমকির এসে ওকে নিয়ে যাওয়ার কথা সবটা। ডায়েরিটা পড়তে পড়তেই আস্তে আস্তে সব স্মৃতি ফিরে আসতে শুরু করল শিউলির। ওই যে আসলে কাহিনী, আর এখন কাহিনী সেজে থাকা মেয়েটা যে হিয়া এটুকু বুঝতে আর বাকি রইল না শিউলির। ওকে পাহাড় থেকে ধাক্কা দেওয়ার ঘটনাটাও মনে পড়ে গেল ওর। কান্নায় ভেঙে পড়ল শিউলি। নিজের বাড়িতেই আশ্রিতার পরিচয়ে থাকা যে কতটা হৃদয়বিদারক তা এই মেয়েটার চেয়ে ভালো আর কে বুঝবে? কিন্তু একটা প্রশ্ন ওর মনে খুঁতখুঁত করতে লাগল সমানে, তা হল রুমকির ওকে শেষ করতে চাওয়ার কারণটা। ও ঠিক করে, এই প্রশ্নটার উত্তরও ওকেই খুঁজে বের করতে হবে, তারপরেই বাড়ির সবাইকে সত্যিটা জানাবে ও। প্রশ্নটার উত্তর ক'দিন পরেই পেয়ে গেল শিউলি। একদিন বসার ঘরে ত্রিদিববাবু বলছিলেন, কাহিনীর বয়স কুড়ি পূর্ণ হওয়ার পরেই চৌধুরীবাড়ির যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি রুমকি আর কাহিনীর নামে সমান দু'ভাগে ভাগ হবে। এই সিদ্ধান্ত শুনে রুমকি আর হিয়া একে অপরের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসি হাসল। কাকলি চাপা গলায় হিয়াকে বলল, 'কাহিনীর কুড়ি বছর হতে আর মাত্র একটা বছরই বাকি, আর তারপরেই....' - 'তারপরেই সওওওওবটা হবে এই তোর্সা চৌধুরীর নামে।' রুমকি ক্রূর হাসি হাসল। সব কথাটাই শিউলির কানে গেল। - 'এত সহজে সবটা হবেনা রুমকিদি, এক বছর অনেকটা সময়, তার আগেই তোমাদের মুখোশ আমি খুলে দেব।' মনে মনে হেসে শিউলি চলে গেল সেখান থেকে। আজ বুধবার। আজ কলেজের লাস্ট ক্লাসটা আকাশের। লাস্ট ক্লাসটা শুরু হওয়ার পর থেকেই শিউলির একটা অস্বস্তি কাজ করছিল কেমন শরীরে। ফ্যানের তলায় বসেও কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম হচ্ছিল, আর তলপেটে একটা ব্যাথা হচ্ছিল হালকা। শিউলি মন দিয়ে শুনতেই পারছিল না আকাশের লেকচার। মাঝে মাঝেই জল খাচ্ছিল আর ওড়না দিয়ে কপালের ঘাম মুচ্ছিল। - 'শিউলি, এনি প্রবলেম?' - 'না স্যার।' - 'আর ইউ ওকে?' - 'হ্যাঁ স্যার, আমি ঠিক আছি।' - 'ওকে।' ক্লাস শেষ হওয়ার পর সবাই যখন বেরিয়ে যাচ্ছিল ক্লাস থেকে, তখন আকাশ বলল, 'শিউলি, তুমি দাঁড়াও, বাকিরা যাও।' - 'আজ মন দিয়ে ক্লাসটা করেনি তো, তাই স্যার ঝাড় দেবেন ওকে ভালো মতো দেখিস!' হিয়া ওর বন্ধুদের বলল চাপা গলায়, তারপরেই বেরিয়ে গেল ক্লাসরুম থেকে। - 'কি ব্যাপার স্মৃতি? আজ কেমন অসুস্থ দেখাচ্ছে তোমায়! বাড়িতে আবার কিছু প্রবলেম হল নাকি?' - 'না স্যার, বাড়িতে কিছুই হয়নি। আর আপনি আবার ভুল করলেন, আমি স্মৃতি নই, শিউলি।' - 'ধুস রোজ এই এক ভুল হয়! এই শোনো, আমি এবার থেকে তোমায় স্মৃতি নামেই ডাকব ওকে?' - 'ওকে স্যার।' হেসে বলল শিউলি। মনে ভাবল, 'আমি শিউলিও নই, আবার কাহিনী হিসেবেও আমায় জানেনা কেউ, তাই আমায় তো যেকোনো নামেই ডাকা যায়!' - 'কি ভাবছ অত? শোনো, আজ তুমি ভালোভাবে পড়াটা বোঝোনি সেটা আমি ভালোই বুঝতে পারছিলাম, কারণ মনটা আজ অন্যদিকে ছিল। তাই ইম্পরট্যান্ট টপিক গুলো বুঝিয়ে দেব বলেই দাঁড়াতে বললাম।' শিউলির পেটে ব্যাথাটা ক্রমশ বাড়ছিল, বসে থাকতেও কষ্ট হচ্ছিল কেমন, তবুও ব্যাথাকে গুরুত্ব না দিয়েই পড়া বুঝছিল ও। বোঝানো শেষ করে আকাশ বলল, 'সবটা বুঝেছ?' - 'হ্যাঁ স্যার।' - 'ওকে, এবার তোমার ছুটি, বাড়ি যাও এখন।' শিউলি বাড়ি যাওয়ার জন্য যেই রওনা দিয়েছে, আকাশের চোখে পড়ল শিউলির জামায় রক্তের দাগটা। - 'স্মৃতি দাঁড়াও।' আকাশ ডাকল। - 'হ্যাঁ স্যার?' - 'শোনো তুমি এক কাজ করো, ওড়নাটা কোমরে বেঁধে নাও।' শিউলি অবাক হয়ে গেল এরকম অদ্ভুত কথা শুনে। - 'কি অত ভাবছ? যেটা বললাম করো!' শিউলি আর কিছু না বলে ওড়নাটা গলা থেকে খুলে কোমরে জড়িয়ে বাঁধল। - 'শোনো, আজ আর বাসে ট্রামে ফিরতে হবেনা, আমার গাড়িতে গিয়ে বোসো, আমি আজ পৌঁছে দিচ্ছি।' শিউলির মনে পড়ল আগের দিনের অপমানের কথা। ও বলে উঠল, 'না স্যার, আপনি প্লিজ যাবেন না, আমি ঠিক চলে যাব।' - 'তুমি কেন যেতে বারণ করছ আমি বুঝতে পারছি, কিন্তু তবুও আমি পৌঁছে দেব। এই অবস্থায় তোমায় একা ছেড়ে দিতে পারিনা আমি। কথা নয়, যাও চুপচাপ গাড়িতে গিয়ে বোসো।' অগত্যা শিউলি সাদা গাড়িতে গিয়ে বসল।পরবর্তী ভাগ পড়ুন : পঞ্চদশ পর্ব

1 মন্তব্যসমূহ
বড়ই ভালো লাগল পড়ে এই পর্বটি, আকাশ এর ব্যবহার প্রশংসার দাবি রাখে। এছাড়া শিউলি ওরফে আসল কাহিনীর নিজের ডাইরি পড়ে সবটা মনে পড়ে যাওয়াটা দুর্দান্ত লাগলো, সব মিলিয়ে বড়ই সুন্দর লাগলো পড়তে, অনেক অনেক ভালোবাসা রইল এবং পরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম ❤️❤️❤️
উত্তরমুছুন