কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
ত্রয়োদশ পর্ব
- 'আপনি বসুন না স্যার, শিউলি, তুইও বোস, আমি শরবত নিয়ে আসি।' সায়নী রান্নাঘরের দিকে গেল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই হিয়া গোল্ড মেডেল নিয়ে এল, আর শিউলির গলায় পরিয়ে দিয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, 'এটা তুই ডিসার্ভ করিস রে, ভুল করে আমি নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলাম।' তারপরেই শিউলির হাত দুটো ধরে হিয়া বলল, 'আমায় ক্ষমা করে দে প্লিজ, আমি সত্যিই তোকে দেব ভেবেও ভুলে গিয়েছিলাম, আই অ্যাম রিয়েলি ভেরি সরি রে!' কাঁদতে কাঁদতে হিয়া ঘরে চলে গেল।
রুমকিও নকল কান্নার সুরে আকাশকে বলল, 'আসলে কি জানেন স্যার, কাহিনীকে আর ওকে তো কখনো আলাদা করে দেখিনি, ভেবেছিলাম দিদি হিসেবে ওকে যেমন ভালোবাসি তেমনি ওর ওপর অধিকারও আছে আমার, তাই আমার বান্ধবীর বাড়িতে জিনিসগুলো দিয়ে আসতে বলেছিলাম। ঠিক আছে শিউলি, তুই যদি আমায় বলতিস একবারটি যে তুই কাজটা করতে পারবিনা, আমি তোর কপালে পিস্তল ঠেকিয়ে করাতাম না রে, এতটাও অমানুষ আমি নই!' রুমকিও চোখের জল মুছে চলে গেল নিজের ঘরের দিকে।
ইতিমধ্যে সায়নী সরবতের গ্লাস নিয়ে এল।
- 'সরি আন্টি, আমি আর কিছু খাবোনা আজ। অন্য একদিন না হয় আসব আবার, আজ উঠি।'
আকাশ যাওয়ার আগে শিউলির কাছে এসে নিচু স্বরে বলল, 'তোমার ওপর অন্যায় হচ্ছে দেখে প্রোটেস্ট করে দেখছি এক নতুন বিপদের মুখে ঠেলে দিলাম তোমায় আমি! আই অ্যাম সরি!'
শিউলি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু আকাশ আর দাঁড়াল না, গটগট করে হেঁটে বেরিয়ে গেল ও।
কাকলি বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল, তারপর আকাশের গাড়িটা বেরিয়ে যেতেই ও শুরু করল শিউলির ওপর চোটপাট।
- 'বাহ্ রে মেয়ে, তোকে বাইরে থেকে যতটা সাধাসিধে লাগে আসলে তো তুই তার কানাকড়িও নোস্! এই বাড়িতে রাজার হালে আছিস, খাচ্ছিস, ভালো কলেজে পড়ছিস, গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরছিস, আবার বাইরের লোকের কাছে এই বাড়ির লোকদের নামেই বদনাম করছিস! বাহ্ বাহ্, আবার কার কাছে নিন্দেমন্দ করছিস? কলেজের স্যারের কাছে! দেখ রে ছোট, যাকে আর একটা মেয়ে বলিস, সে তোর নিজের মেয়েকেই কেমন গোটা কলেজের কাছে ছোট করল! আচ্ছা কাহিনী যদি ভুল করে মেডেলটা নিজের কাছে রেখেই থাকে, এই বাড়ির অন্দরমহলের সামান্য কথাও বাইরের পুরুষমানুষের কাছে লাগাল ও? এত লোভ ওর সামান্য একটা মেডেলের জন্য? কেন রে ছোট, আমাদের কাহিনী চোর না ডাকাত?'
সায়নী চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। শিউলি এতক্ষণ চুপ করে সব শুনছিল, এবার ও প্রতিবাদ করল।
- 'আমি ওনাকে কিছুই বলিনি বড়মা, গোল্ড মেডেলটার ব্যাপারে কোনো আগ্রহই আমার ছিল না, যদি থাকত তবে এতদিনে কি কাহিনী দিদির কাছ থেকে ওটা চেয়ে নিতাম না আমি? আর রুমকিদির ব্যাপারেও আমি কিছুই বলিনি ওনাকে, উনি যদি নিজে থেকেই এসব বলেন তো আমি কি করব? স্যার হন উনি, ওনার সাথে কি ঝগড়া করতাম আমি?'
- 'বাব্বা, মেয়ের মুখে আজকাল চোপাও হয়েছে আবার! প্রথমে রুমকির হবু বরটাকে বাগে আনতে গেছিল, অভিজিৎ আমাদের ভালো ছেলে তাই সুবিধা করতে পারেনি, এখন আবার কলেজের স্যারকেই! সত্যি মাইরি, হাঘরে হলে কি হবে, চোখ কেবল বড়ো মাছের দিকে, না রে?'
ঠিক এই ভয়টাই পেয়েছিল শিউলি, আর তাই বারবার ও আকাশকে বাড়ি পর্যন্ত আসতে বারণ করেছিল। লজ্জায় অপমানে ওর চোখে জল এসে গেল। সায়নী তবু চুপ করে রইল। শিউলি বারবার তাকাচ্ছিল সায়নীর দিকে, ভেবেছিল এবাড়ির অন্য কেউ ওকে না বুঝলেও এই মানুষটা ঠিকই বুঝবে, কিন্তু হায়!
কাকলি যত পারল গালমন্দ করে গায়ের জ্বালা মিটিয়ে চলে গেল। সায়নীও কিছু না বলে থমথমে মুখে চলে যাচ্ছিল, শিউলি ডাকল, 'ছোটমা!'
সায়নী ভাবলেশহীন মুখে বলল, 'বল্।'
- 'তুমিও কি বড়মার মতোই ভাবো আমাকে?'
- 'দেখ শিউলি, আমি কি ভাবি কি ভাবিনা তাতে কার কি এসে যায় বল্? আমি খুব সামান্য একজন মানুষ, তবে এটুকুই বলব, কাহিনী বা রুমকির ওপর তোর রাগ হলে বাড়ির ভেতরেই ওদের যা বলার বলতিস! শুধু শুধু সামান্য কারণে স্যারের কাছে নালিশ না জানালেই পারতিস রে! কাহিনী, রুমকি ওরা কত কষ্ট পেল বল্ তো?'
সায়নী চলে যাওয়ার পর শূন্য বসার ঘরের মেঝেতে বসে পড়ল শিউলি। চোখের জলে ভিজে গেল মেঝে। তখনই সেখানে এল রুমকি আর হিয়া।
- 'কি রে, এই বাড়িতে নিজের জায়গাটা বুঝেছিস তো? এই বাড়িতে তোর চোখের জলের চেয়ে আমাদের চোখের জল অনেক দামি। যদি মানসম্মান বলে কিছু থাকে, মানে মানে কেটে পড় এখান থেকে!'
- 'সত্যি রুমকিদি যা বলেছ! তোর জায়গায় যদি আমি থাকতাম না, হয় গলায় দড়ি দিতাম নয়তো বিষ খেতাম! এত অপমান নিয়ে আবার কেউ বেঁচে থাকতে পারে নাকি?'
- 'ছেড়ে দে কাহিনী, এদের মতো পাবলিকদের গায়ে গন্ডারের চামড়া থাকে। এতকিছুর পরেও দেখবি আমাদের বাড়ির খাবারই গান্ডেপিন্ডে গিলবে!'
শিউলি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। ছুটে নিজের ঘরে চলে গেল। দেয়ালে টাঙানো মনোরমার ছবিটা খুলে নিল ও, তারপরেই ছবিটা বুকে নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ল ও।
- 'তুমি বলেছিলে তুমি নাকি আমায় জন্ম দাওনি, তবু তোমার মতো করে কখনো আমায় কেউ বোঝেনি মা গো!'
শিউলি ঠিক করে, এত অপমান সয়ে আর এই বাড়িতে থাকবে না ও। যেভাবেই হোক, ওর আসল পরিচয় ওকে খুঁজে বের করতে হবে, তারপর নিজের আসল বাড়িতে ফিরে যাবে ও।
শিউলির কাছে যেটুকু টাকা ছিল, তা দিয়েই কিছু খাবার কিনে আনল ও।
- 'কি ব্যাপার মহারানী, রুমকি সকালে দুটো ব্যাগ বইতে দিয়েছিল বলে তো বড্ড কষ্ট হয়েছিল ওই ফুলের শরীরে! তা এখন ভর দুপুরে যে পাড়া বেড়াতে গেছিলি, রোদে কষ্ট হল না?'
- 'থাক না বড়বৌমা, বাচ্চা মেয়ে, না হয় ভুল করে ফেলেছে তাই বলে এত কথা কেউ শোনায়?' হেমনলিনী দেবী স্নেহের সুরে বললেন।
শিউলি কিছু না বলে চুপচাপ নিজের ঘরে চলে গেল। ওকে বারবার জোর করা সত্ত্বেও এই বাড়ির সামান্য খাবারটুকুও মুখে তুলল না ও।
— 'হুঁহ, ওর কত গুমর তা জানা আছে! খাবার তো কিনে এনেছে সেই আমাদের টাকা দিয়েই!'
— 'না গো বড়মা, এ আমার স্কলারশিপের পাওয়া টাকা, তোমাদের টাকা নয় গো।'
— 'হ্যাঁ হ্যাঁ তো ওই টাকাটাও তো আমাদের দয়াতেই পেয়েছিস! যদি কলেজে না ভর্তি করতাম তোকে, না তো ফার্স্ট হতিস আর না পেতিস স্কলারশিপ!'
শিউলি ততক্ষণে ঘরের দরজা বন্ধ করে দিয়েছে, তাই কাকলির শেষ কথাগুলো আর কানে এল না ওর।
পরবর্তী ভাগ পড়ুন : চতুর্দশ পর্ব

2 মন্তব্যসমূহ
এই পর্বটি প্রকাশ এর নোটিফিকেশন পেয়েই পড়তে চলে এলাম। তবে পর্বে শিউলির কষ্ট দেখে মন টা খারাপ হয়ে গেলো খুব। খুব অপমানিত হতে হলো বেচারীকে। তবে আগামী পর্বে নিশ্চই প্রকৃত দোষী শাস্তি পাবে এই অপেক্ষায় থাকলাম। নিশ্চয়ই আগামী পর্ব গুলিতে দারুন কিছু চমক অপেক্ষা করছে আমাদের জন্যে। খুব সুন্দর লাগছে কাহিনী ধারাবাহিক টি 💙💙
উত্তরমুছুন🤗🤗🤗🌹🌹🌹
মুছুন