Advertisement

কাহিনী (দশম পর্ব)

 কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
দশম পর্ব


শিউলি আঁচড়ে কামড়ে কোনোরকমে নিজের হাতদুটো ছাড়িয়েই কনুইয়ের গুঁতো মারল অভিজিতের বুকে। আঃ শব্দ করে অভিজিৎ বিছানায় বসে পড়ল। বাড়ির সবাই এসে হাজির হয়েছেন ততক্ষণে।

হিয়া আর রুমকি সবটাই জানত, ওদেরই প্ল্যান ছিল এটা। রুমকি ছুটে এসেই শিউলিকে চড় মারল, 'অসভ্য মেয়ে একটা, বড়োলোকের ছেলে পেয়েই অমনি সিডিউস করার চেষ্টা না?'

- 'আমি কাউকে সিডিউস করিনি রুমকিদি, বরং তোমার হবু বরকেই জিজ্ঞেস করো সে কি করতে এসেছিল ঘরে!'

____________________________


একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ :  পড়ুন

_______________________________


- 'না তোর্সা, ট্রাস্ট মি! আমি নিজে থেকে এই ঘরে আসিনি, এই মেয়েটাই আমায় নিজের ঘরে ডাকল, তারপর কি বলল জানো? বলে কিনা ওই রুমকিদির মধ্যে কি এমন আছে যে ওকে বিয়ে করতে চাও তুমি? ওর না আছে রূপ আর না আছে গুন, তার চেয়ে আমাকে বিয়ে করলেই তো পারতে!'

- 'সাহসটা কতখানি বেড়েছে মেয়ের দেখো শুধু!' কাকলি গলায় ঝাঁঝ মিশিয়ে বলে উঠল, 'হাজারবার বললাম ওই হাভাতেটাকে এত মাথায় তুলো না, তা আমার কথা তো এবাড়ির লোক কানেই তোলে না, ছোট তো আবার শিউলি বলতে অজ্ঞান! দেখ ছোট, দেখ কোন কালসাপকে আশ্রয় দিয়েছিস তুই!'

- 'যা বলেছ বড়মা! এত সাহস যে রুমকিদির বিয়ে ভেঙে নিজে বিয়ে করবে জিজুকে?' হিয়া নকল রাগের সুরে বলে উঠল।

- 'শুধু কি তাই?' অভিজিতের গলায় ফুটে উঠল নকল কান্নার সুর ,'আমি ওর প্রোপোজাল ফিরিয়ে দিয়েছি বলে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল হঠাৎ, বলল, 'তুমি যদি আমার কথা মতো না চলো তাহলে চিৎকার করব!' এই দেখুন আন্টি, আমার হাতে কেমন কামড়ে দিয়েছে দেখুন, রক্ত পড়ছে এখনো!'

- 'ও ব্বাবা, এ তো শুধু বাজে চরিত্রের মেয়ে তাই নয়, এ তো দেখছি দিন কে রাতও করতে পারে! কি রে ছোট, জেনে শুনে একটা ক্রিমিনালকে বাড়িতে রাখবি মেয়ের পরিচয়ে?'

- 'বড়মা, আমি যা করেছি বাধ্য হয়ে করেছি, নিজেকে বাঁচানোর জন্য করেছি। ছোটমা, তুমি অন্তত আমায় বিশ্বাস করো!'

- 'আমি মানুষ চিনি দিদি, শিউলিকে এতদিনে যেটুকু চিনেছি এমনি এমনি ও কাউকে কামড়ে আঁচড়ে দেবে আমি বিশ্বাস করিনা। বরং তুমিই এই ছেলেকে নিজের জামাই করবে কিনা ভেবে দেখো।'

- 'মরণ! হিরে ফেলে কয়লাকে বিশ্বাস করব এতো মাথামোটা আমি নই রে ছোট।'

- 'রুমকিকে আমি নিজের মেয়ের মতোই দেখি তো, তাই বললাম ওর ভালোর জন্য, এবার তুমি তো মা, তুমিই ডিসিশন নেবে যা নেবার। তবে আমি যদি রুমকির মা হতাম ওই ছেলের সাথে কখনোই মেয়ের বিয়ে দিতাম না।'

সায়নী শিউলির হাত ধরে চলে গেল সেখান থেকে। বাড়ির সবাই না হলেও বেশিরভাগ মানুষ সায়নীর কথার সাথেই একমত হলেন। হিয়া আর রুমকি নিজেদের পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ায় রেগেমেগে চলে গেল যার যার ঘরে।


মনোরমা মারা যাওয়ার প্রায় সপ্তাহখানেক পর কলেজ গেল শিউলি। বন্দিতা ম্যাম সবটাই জানতেন, তাই তিনি কোনো প্রশ্ন করেননি শিউলিকে। কিন্তু শিউলি সমস্যায় পড়ল দ্বিতীয় ক্লাসে, অর্থাৎ আকাশ ব্যানার্জীর ক্লাসে।

— 'রোল নাম্বার ওয়ান।'

— 'ইয়েস স্যার।'

— 'কি ব্যাপার? তুমি গত সাতদিন কলেজ আসোনি কেন?'

— 'আসলে স্যার, আমার মা মারা গিয়েছেন, তাই....' থমথমে মুখে বলল শিউলি।

— 'ওহ আচ্ছা।' আকাশ ভাবলেশহীন মুখে বলল, 'কারোর মৃত্যু সত্যিই দুঃখের, তাই বেশি কিছু বললাম না, তবে নেক্সট টাইম দেখো যেন এতদিন কামাই না হয়, এতে তোমারই লস হবে। যাই হোক, বোসো।'

— 'অদ্ভুত মানুষ তো! মা মারা গেছে বললাম, সেটা শুনেও এরকম শক্ত কথা বলল?' মনে মনে বিড়বিড় করে শিউলি বসে পড়ল।

হিয়া টোন কাটল, 'ভেবেছিল মায়ের মরার খবর দিয়ে স্যারকে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল করবে, কিন্তু ও তো আর জানে না যে এই নতুন স্যার কলেজের বাকি টিচারদের মতো ওকে মাথায় তুলে নাচবে না! উনি বেশ কড়া যা বুঝলাম, এঁকে শিউলি বাগে আনতে পারবে না একদমই।'

হিয়ার অন্যান্য বন্ধুবান্ধবরা সায় দিল, 'আর সেজন্য বেচারির মনটা একেবারেই ভেঙে গেছে গো!'

শিউলিকে টোন কাটতে গিয়ে হিয়ার যে রোলনাম্বার পেরিয়ে গেছে তা ওর খেয়ালই নেই। আকাশ রোল নাম্বার তিন বলতেই হিয়ার খেয়াল হল।

— 'কি রে হিয়া, তুই প্রেজেন্ট দিলি না যে!'

— 'আর বলিস না ইয়ার, একদমই খেয়াল করিনি, এইবার ঝাড়টা খেতে হবে রে!'

সবার রোলকল শেষ হলে হিয়া থমথমে মুখে উঠে দাঁড়াল।

— 'কি হয়েছে? প্রেজেন্ট দাওনি তো? দেখেছি আমি, ক্লাসে খোশগল্প করলে শুধু প্রেজেন্ট মিস হয় তাই না, সাথে গোল্ড মেডেলটাও মিস হয়, বুঝলে?'

শেষ কথাটার মধ্যে যে তীরটা ছিল, সেটা হিয়াকে অপমানের আগুনে দগ্ধ করল ভীষণ। চোখমুখ লাল করে ও দাঁড়িয়ে রইল মাথা নীচু করে।

— 'আজ কলেজে ফার্স্ট ক্লাস আমার, তাই ছেড়ে দিলাম, নেক্সট টাইম রিপিট হলে ক্লাস থেকে বের করে দেব, মাইন্ড ইট। বোসো।'


হিয়া রাগে অপমানে ফুঁসতে ফুঁসতে বসে পড়ল।


সেদিন কলেজ থেকে বাড়ি এসেই সটান রুমকির ঘরে চলে গেল হিয়া।

— 'শোনো রুমকিদি, ওই শয়তান মেয়েটাকে আর এক মুহূর্তও টলারেট করতে পারছি না আমি চোখের সামনে, যে করেই হোক তুমি ওকে তাড়াও, শুধু বাড়ি থেকেই নয়, সাথে কলেজ থেকেও, নইলে কিন্তু আমি ওকে খুনই করে ফেলব!'

— 'বাপ রে, ম্যাডামের দেখছি আজ খুব মাথা গরম!'

— 'হবে না রুমকিদি? জানো আজ ওর জন্য কলেজে ভরা ক্লাসে কি হিউমিলিয়েটেডই না হয়েছি আমি, সব শুধু ওর জন্য! এবার কিছু একটা করতেই হবে রুমকিদি!'

— 'আরে আমি কি আর কিছু করছি না! দেখছ তো প্রত্যেকবার বেঁচে যাচ্ছে ও! আমারও তো ইচ্ছে করে ওকে ঘুমের মধ্যে গলায় বালিশ চাপা দিয়ে মেরে ফেলি!'

— 'তো সেটাই করো না রুমকিদি, এখন তো ওর মা টাও মরে গেছে, আর কিসের বাধা?'

— 'হিয়া বোকার মতো কথা বোলো না। বাড়ির মধ্যে এভাবে খুন করলে তুমি আমি কেউ বাঁচবে? গরাদের ওপারে যেতে হবে!'


রাতে ডিনারের পর হিয়া শোয়ার তোড়জোড় করছিল, হঠাৎ সায়নী হাসিমুখে ঘরে ঢুকল, 'কাহিনী, তোর যশোদা মা কাল আসছে, বুঝলি?'

— 'যশোদা মা, মানে বীণামাসি?'


পরবর্তী ভাগ পড়ুন : একাদশ পর্ব

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

4 মন্তব্যসমূহ