Advertisement

কাহিনী (অষ্টম পর্ব)

কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
অষ্টম পর্ব


রুমকি আর হিয়া বেরিয়ে পড়ল বাড়ির গাড়িটা নিয়ে। হিয়া যাবে কলেজ, আর রুমকি যাবে শপিং মল।


কিন্তু শিউলির আর কলেজ যাওয়া হল না সেদিন। মনোরমাকে হাসপাতালে নিয়ে গেল অজিত, অনন্ত, কাকলি, সায়নী আর শিউলি। অন্যদিকে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে  গোল্ড মেডেল পাওয়ার কথা ছিল শিউলির, কিন্তু ও অনুপস্থিত থাকায় ওর বাড়ির লোক হিসেবে হিয়াই নিল মেডেলটা, আর হিয়ার জন্য বরাদ্দ ছিল সিলভার মেডেল।

— 'দেখ কাহিনী, দেখ শুধু ওপরওয়ালার খেল। ওই গরীবের হদ্দ মেয়েটা ফার্স্ট হল ঠিকই, কিন্তু মেডেলটা গলায় ঝোলাতে পারল না, ওটা পেলি কিন্তু তুইই!' হিয়ার বন্ধুবান্ধবরা ফুট কাটল।

— 'তাছাড়া আর কি! ও যদি গোল্ড মেডেলটা পেত, তাহলে বাঁদরের গলায় মুক্তোর মালার মতো কেস হত, বুঝলি?'

— 'তা যা বলেছিস বস!' হেসে উঠল সবাই।

_________________________


একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ :  পড়ুন


_________________________


অন্যদিকে হাসপাতালে সবাই চিন্তিত মুখে অপেক্ষারত। একটু পরেই বেরিয়ে এলেন ডাক্তারবাবু।

— 'মা কেমন আছে স্যার?' উদ্বিগ্ন শিউলি প্রশ্ন করল।

— 'কি হল স্যার? চুপ করে আছেন যে?' সায়নী জিজ্ঞেস করল।

— 'সরি মিসেস চৌধুরী, আর কোনো আশা নেই। মাথার চোটটা এতটাই গুরুতর আর এতটাই ব্লাড লস হয়ে গেছে, যে আমরা আর কোনো আশার আলো দেখতে পাচ্ছি না।'

হঠাৎই ছুটে এল একজন নার্স, 'আপনাদের মধ্যে শিউলি কে আছেন?'

শিউলি এগিয়ে আসতেই নার্স বলল, 'আপনার মা কিছু কথা বলতে চান আপনার সাথে, তাড়াতাড়ি যান আপনি, ওনার হাতে কিন্তু আর সময় নেই একদম।'

শিউলি তাড়াতাড়ি ছুটল কেবিনে।

ও আসতেই মুমুর্ষু মনোরমা ওর হাতদুটো নিজের হাতে কোনোরকমে নিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, 'আমি তো আর থাকব না রে মা, এবার যে আমায় ছাড়াই তোকে বাঁচতে হবে। তাই আমি চাই সব সত্যিটা তুই জান, যেটা এতদিন আমি তোর কাছ থেকে লুকিয়েছি।'

— 'কোন্ সত্যি মা?'

মনোরমা সবটা খুলে বলল শিউলিকে। শিউলি যে আসলে তার নিজের সন্তান নয়, তাকে যে খাদে পেয়েছিল মনোরমা রক্তাক্ত অবস্থায়, সেই সবটা খুলে বলল কোনোরকমে।

সবটা শুনে শিউলির পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল। মনে হল ও যেন আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না।

অন্যদিকে এই সবটা কথা আড়াল থেকে কাকলিও শুনল। শুনেই সে ভাবল, 'ওরে ব্বাবা, শিউলি মনোরমার নিজের মেয়েই নয়! কুড়িয়ে পাওয়া মেয়ে! এটা তো এক্ষুণি রুমকিকে জানাতে হচ্ছে!' 

কাকলি রুমকিকে ফোন করতে হাসপাতালের বাইরে গেল।

— 'মা, এসব কথা তুমি আগে কেন জানাওনি মা!' কান্নাভেজা গলায় বলে উঠল শিউলি।

— 'আসলে মা, এক মেয়েকে তো হারিয়েছি, আরেক মেয়েকে আর হারাতে চাইনি রে মা।' মনোরমার চোখ দিয়েও গড়িয়ে পড়ল জল, কিন্তু সেই চোখদুটো আর বন্ধ হল না, স্থির হয়ে গেল বরাবরের মতো। 

শিউলি ব্যস্ত হয়ে ডাক্তারকে ডাকল।

ডাক্তারবাবু থমথমে মুখে নিথর চোখদুটো বন্ধ করে দিলেন, তারপর বললেন, 'সি ইজ নো মোর।'

একে তো অজানা এক সত্যি আজ জানল শিউলি, তার ওপর মনোরমার মৃত্যু, আর সইতে পারল না ও। শোকাহত মেয়েটা বসে পড়ল মেঝেতে।


— 'শপিং করছি তো মা, হঠাৎ কল কেন করলে?'

— 'ওসব এখন রাখ, আগে যেটা বলি মন দিয়ে শোন, ওই মনোরমা মরে গেছে আজ হসপিটালে।'

— 'হ্যাঁ সেটা তো সবাই জানত, তো কি করব আমি? বাড়ির কাজের লোক মরে গেছে বলে কি শোকপ্রকাশ করব এখন?'

— 'আহ, তুই বড্ড বেশি বকিস! আমি কি তাই বলেছি? আগে তো পুরোটা শোন্! তুই এখন চটপট বাড়ি চলে আয় ওসব কেনাকাটা রেখে, অনেক কথা বলার আছে তোকে।'

— 'ওকে মাদার ইন্ডিয়া, তোমার হুকুম তো রাখতেই হবে! আমি আসছি বাড়ি।'

— 'হুম চলে আয় তাড়াতাড়ি।'


অন্যদিকে হিয়া আর তার বন্ধুরা কলেজ ক্যাম্পাসে দিব্যি খোশগল্পে মগ্ন, হঠাৎই একটা সাদা গাড়ি ঢুকল কলেজ ক্যাম্পাসে। গাড়ি থেকে নেমে এল এক সুঠামদেহী যুবক।

— 'এটা কে রে ভাই? একে তো আগে কখনো কলেজে দেখিনি!' হিয়া চাপা গলায় বলল বন্ধুদের।

— 'কি জানি, নতুন স্টুডেন্ট হয়ত।'

— 'ধ্যুৎ পাগলা, দেখছিস না বয়স ছাব্বিশ কি সাতাশ হবে! এই বয়সে কেউ কলেজে পড়ে নাকি?'

— 'হবে না কেন? ওই যে ফেলু মদনা আছে, ওটার কি কম বয়স নাকি?'

— 'দিপুর কথা বলছিস?'

— 'আরে হ্যাঁ হ্যাঁ, ওই যে সুদীপ গুছাইত আছে না, ওটার কি কম বয়স ভেবেছিস নাকি? বাপের পয়সা আছে, প্রত্যেক বছর কলেজকে এত এত ডোনেশন দেয়, তাই প্রতিবছর ফেল মেরেও কলেজে রয়ে গেছে, জন্মে তো একটা ক্লাসও করতে দেখলাম না, খালি ইউনিয়ন রুমে বসে মদ খায় আর মেয়েদের দেখলে টোন করে, ওটার বয়সও তো পঁচিশের ওপর।'

— 'যা বলেছিস, তবে একে দেখে তো সেরকম পাবলিক মনে হচ্ছে না, বেশ ভদ্র ভালো লোক বলে মনে হচ্ছে!' হিয়া বলল, 'এই, এ সেই নতুন টিচারটা না তো? আগের দিনই ম্যাম বলছিলেন, নতুন একজন স্যার জয়েন করবেন কিছুদিনের মধ্যেই, ইনিই কি সেই?'

— 'হ্যাঁ হ্যাঁ, সেটাই হবে বোধহয়।'

— 'উফ, যাই বলিস, দারুণ হ্যান্ডসাম কিন্তু মাইরি!' হিয়ার চোখ চকচক করে উঠল।

— 'বাব্বা, এই তো উনি এলেন, এরই মধ্যে ক্রাশও খেয়ে গেলি? দেখ দেখ, একেই বলে লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট, প্রথম দেখাতেই কাহিনী ভালোবেসে ফেলল কেমন দেখ শুধু!'

হিয়া কিছু না বলে মুচকি হাসল কেবল।


অন্যদিকে মনোরমাকে দাহ করা হল। শোকাহত শিউলি মুখাগ্নি করল মনোরমাকে, মনে মনে বলল, 'তুমি আমার আপন মা নও তা কে বলল গো? তুমিই যে সেদিন আমার প্রাণ বাঁচিয়েছিলে, এতগুলো দিন বুকে আগলে রেখেছ আমায়, তুমি সারাজীবন আমার মা হয়েই থাকবে গো।  আমি জানিনা আমার জন্মদাত্রী মা কোথায় আছে, তবে তাকে যদি কখনো আমি খুঁজেও পাই, তবু তোমায় কখনও ভুলব না আমি মা!'

কান্নায় ভেঙে পড়ল শিউলি। সায়নী বুকে টেনে নিল তাকে, বলল, 'তোর এক মা হারিয়ে গেছে, আরেক মা তো আছে।  তোর এই ছোটমাকে আজ থেকে মা মনে করতে পারবি তুই?'

— 'একদম দিদিভাই।' শিউলির মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন  হেমনলিনী দেবী, 'কাহিনী আর রুমকি দিদিভাইয়ের মতো তুমিও আজ থেকে চৌধুরীবাড়ির আরেকটা মেয়ে হয়ে থাকবে গো দিদি।'


পরবর্তী ভাগ পড়ুন : নবম পর্ব

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

2 মন্তব্যসমূহ