কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
সপ্তম পর্ব
চড় খেয়েই হিয়া কিছুক্ষণ বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ও স্বপ্নেও ভাবেনি যে বাড়িতে সবাই ওকে মাথায় তুলে রাখে, মুখ থেকে কথা খসতে না খসতেই সেই জিনিস টা এসে যায় ওর হাতে, ওর পছন্দের খাবারটাও চাইতে না চাইতেই মুখের সামনে এসে হাজির হয়, এমনকি কখনো একটা কড়া কথা পর্যন্ত কেউ শোনায়নি ওকে এই বাড়িতে, সেই বাড়িতেই ওকে চড় খেতে হবে।
হিয়া চোখে জল নিয়ে ছুটতে ছুটতে নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল ভেতর থেকে।
_________________________
একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ : পড়ুন
_________________________
কাকলি দৌড়ে এল, 'এটা কি করলি বল্ তো তুই ছোট, একটা কাজের মেয়ের জন্য নিজের মেয়ের গায়ে হাত তুললি? বুঝিয়েও তো বলতে পারতিস নাকি!'
- 'ও ও তো পারত দিদি, ও ও তো চা টা পছন্দ না হলে বুঝিয়ে বলতে পারত শিউলিকে, কই সেটা তো করেনি ও? আজ যদি মেয়েটার লেগে টেগে যেত তখন?' রাগীস্বরে জবাব দিল সায়নী।
কাকলি মনে মনে প্রমাদ গুনল। ও তাড়াতাড়ি রুমকিকে আড়ালে নিয়ে গিয়ে বলল, 'এ কোন্ মেয়েকে নিয়ে এলি বল দেখি কাহিনী সাজিয়ে? এ তো নিজেও ডুববে, সাথে আমাদেরও ডোবাবে!'
— 'কি বলি বলো তো মা! গাধাটাকে কত করে বোঝালাম, যে কাহিনী এরকম উগ্র রগচটা স্বভাবের নয়, ও শান্ত স্বভাবের, তাই রাগ হলেও কন্ট্রোল করো, কে শোনে কার কথা?'
— 'ওকে যেভাবেই হোক ঠিকভাবে কাহিনীর অ্যাক্টিংটা চালিয়ে যেতে বল্! তোদের ঠাকুর্দা লোকটি কিন্তু মোটেও সুবিধার নয়, হিয়ার প্রতি বিরক্ত হয়ে যদি বুড়োটা বেঁকে বসে একবার, তাহলে তুই বা হিয়া কেউই সম্পত্তির কানাকড়ি পাবি না, এই লিখে দিলাম আমি!'
— 'না না, এত সহজে তা হতে দেব না আমি! দাঁড়াও আজকেই মাথামোটাটার কানে কামড়ে সবটা বলি!'
হিয়াকে নিজের ঘরে ডেকে এনেই ওর ওপর চোটপাট করতে লাগল রুমকি।
— 'কতবার বলেছি তোমায় কাহিনীর স্বভাব এরকম ছিল না? তুমি কি চাও তুমি আর আমি দুজনেই ধরা পড়ে যাই?'
— 'রুমকিদি, কি করব বলো, ওই শালা শিউলিকে দেখলেই আজকাল আমার গা রি রি করে জ্বলে। ইচ্ছে হয় কুপিয়ে কুপিয়ে খুন করি শয়তানটাকে!'
— 'আরে বাবা, তোমার ওর ওপর রাগ আছে, তো সেটা সবার আড়ালে মেটাও না, কে বারণ করেছে? কিন্তু বাড়ির একঘর লোকের সামনে তুমি আজ যেটা করলে সেটা খুবই অন্যায় করেছ!'
রুমকির কথামতো হিয়া বাড়ির সকলের সামনে শিউলির কাছে ক্ষমা চেয়ে নিল, বাড়ির সকলেও খুব খুশি হলেন, হিয়াকে খুশিমনেই ক্ষমা করে দিলেন তাঁরা।
— 'এবার অনেক কষ্টে সামাল দিলাম, কিন্তু বারবার পারব না, মনে থাকে যেন!' রুমকি রাগীস্বরে বলল।
বাড়িতে হিয়া শিউলির সাথে স্বাভাবিকভাবে কথা বললেও কলেজে ও সুযোগ পেলেই অপমান করে শিউলিকে। হিয়ার কিছু বন্ধুবান্ধব আছে যারা হিয়াকে সাহায্য করে এসব কাজে। শিউলি যে বেঞ্চে বসে, কখনো কখনো তাতে জল পড়ে থাকে, কখনও বা ধুলোময়লা। শিউলি মনে মনে সবটাই বুঝলেও কখনো এসবের প্রতিবাদ করেনি ও। যে চৌধুরীবাড়ি ওদের ঠাঁই দিয়েছে, ভালো খাবার, পোশাক পরিচ্ছদ দিয়েছে, মাস গেলে মাইনে দিয়েছে এমনকি তার কলেজে পড়ার খরচটা পর্যন্ত বহন করে, সেই বাড়ির মেয়েকে কিভাবে কড়া কথা বলবে শিউলি? তাই বেঞ্চটা নিজেই পরিষ্কার করে ও বসত। টিফিন খাওয়ার পর হিয়া ওর আর ওর বন্ধুবান্ধবদের টিফিন বক্সটা পর্যন্ত ধোয়াত শিউলিকে দিয়ে, কিন্তু শিউলি কখনোই কিছু মনে করেনি, নিজের কর্তব্য মনে করে সবটাই করত ও। মাঝে মধ্যে শিউলিকে নিয়ে টোনও কাটত হিয়া আর তার বন্ধুবান্ধবরা, 'আজকাল কলেজে কোথা থেকে সব ভিখিরিরা এন্ট্রি নিয়ে নিচ্ছে!' এছাড়া যদি হিয়া কখনো দেখত যে শিউলির পরনের জামাটা ছিঁড়ে গেছে, ওকে ডেকে ওর হাতে ছুঁচ আর সুতো ধরিয়ে দিত হিয়া, বলত, 'তোরা যা হাড় হাভাতে, এটুকু কেনার মুরোদও তো নেই, এ নে, আমাদের বাড়ির বাড়তি সুতো আর পুরোনো জং ধরা ছুঁচ, সেলাই করে নিস জামাটা।'
শিউলি মাথা নিচু করে সেসব নিয়ে চলে যেত, আর হিয়া আর তার বন্ধুদের মধ্যে হাসির হিড়িক পড়ে যেত।
এইভাবেই কাটছিল হিয়া আর শিউলির দিনগুলো। কেটে গেল একটা বছর। প্রথম বর্ষের পরীক্ষায় শিউলি প্রথম, আর হিয়া দ্বিতীয় হল। হিয়া আর রুমকি অনেক চেষ্টা করেছিল যাতে শিউলি পরীক্ষাটা না দিতে পারে, কিন্তু কোনো লাভই হয়নি।
রেজাল্ট বেরোনোর দিন সে যা রাগ হিয়ার! ওর ইচ্ছে করছিল শিউলিকেও খুন করে ফেলে কাহিনীর মতো, রুমকি অনেক কষ্টে শান্ত করল তাকে।
— 'আরে গরু, এখানে কি তুমি গোল্ড মেডেলিস্ট হতে এসেছ? নাকি সম্পত্তি হাতাতে এসেছ? যে কাজের জন্য তোমায় আনা হয়েছে মন দিয়ে সেটাই করো! আর তাছাড়া বড়োলোক বাড়ির মেয়েদের অত পড়াশুনা করে হবে কি? ঘাম ঝরিয়ে চাকরি করতে যাবে থোড়ি! তুমি ফার্স্ট হও, বা ফেলই করো, টাকার গদির ওপর বসে থাকবে তুমি, কিন্তু শিউলি সেটা পারবে কখনো?'
শেষমেশ হিয়া শান্ত হল।
আজ সকাল থেকে চৌধুরীবাড়িতে ভীষণ ব্যস্ততা। আজ কলেজে অ্যানুয়াল প্রাইজ ডিস্ট্রিবিউশন, তাই হিয়া আর শিউলি তৈরী হচ্ছে তাড়াতাড়ি কলেজে যেতে হবে বলে।
— 'বলি ও মনোরমা, শুধু খেয়ে খেয়ে গতর বাড়ালেই হবে বুঝি? হাত চালিয়ে কাজ করতে হবে না? আমাদের মেয়েরা যে টেবিলে বসে আছে খাবে বলে, তা এখনো খাবার নিয়ে আসতে পারলে না?' ঝাঁঝিয়ে উঠল কাকলি।
— 'আসছি, আসছি গো, এখুনি আসছি।' মনোরমা তাড়াতাড়ি সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল।
— 'বলি ও শিউলি, তোকে কি আবার রুমকি আর কাহিনীকে জলটা দিয়ে দেবার জন্য নেমন্তন্ন করতে হবে?'
— 'না না বড়মা, আমি এক্ষুণি দিচ্ছি।'
শিউলি তাড়াতাড়ি জল দিল রুমকি আর হিয়াকে। কিন্তু মনোরমা তাড়াতাড়ি সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়েই ঘটাল দুর্ঘটনা। পা হড়কে ও পড়ে গেল সিঁড়ি থেকে। পুরোনো দিনের সিঁড়ি, ধাপগুলো উঁচু উঁচু, তাই মারাত্মক চোট পেল মনোরমা মাথায়।
— 'কেন এভাবে মেজাজ দেখালে ওকে বৌমা? তুমি এভাবে না বললে তো আর এটা হত না।' হেমনলিনী দেবী বললেন।
— 'বাহ্ মা, সব দোষ এখন আমার হল? ও ই বা অত তাড়াতাড়ি নামতে গেল কেন? নিজে তো পড়লই, সাথে সব খাবার নষ্ট হল, এখন রুমকি আর কাহিনী কি খাবে?'
— 'মা তুমি ভেবো না, আমি আর কাহিনী বাইরে কিছু খেয়ে নেব।' রুমকি বলল।
পরবর্তী ভাগ পড়ুন : অষ্টম পর্ব

2 মন্তব্যসমূহ
উফফফ দুর্দান্ত, আবারও পরের পর্বের জন্যে অপেক্ষায় থাকলাম। পরের পর্ব খুব জমাটি হতে চলেছে, আমি নিশ্চিত 💙💙💙
উত্তরমুছুন😘😘😘💘💘💘💘
মুছুন