কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
প্রথম পর্ব
অঝোর ধারায় বৃষ্টি হয়ে চলেছে সমানে। পাল্লা দিয়ে চলছে ঝোড়ো হাওয়া আর প্রচন্ড শব্দে বজ্রপাত। একটা অ্যাপার্টমেন্টের গ্যারেজে আশ্রয় নিয়েছে দুজন যুবক যুবতী। যুবতীটি যুবকের বুকে মাথা রেখে অঘোরে ঘুমোচ্ছে, বাইরে প্রকৃতির তাণ্ডবেও তার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটছে না এতটুকুও। এ তো হবারই কথা, সারাদিন ধরে কম তো ধকল যায়নি মেয়েটার ওপর দিয়ে। একে তো সবে জ্বর ছেড়েছে ওর, তার ওপর প্রায় সারাটাদিনই কেটেছে কিচ্ছুটি না খেয়ে, খাওয়ার মধ্যে সামান্য জলটুকুই খাওয়া হয়েছে ওর।
যুবকটিও সারাদিনে ঘটে চলা ঘটনার বন্যায় ভীষণই পরিশ্রান্ত, তবু মেয়েটার চোখের জল, কপালের গভীর ক্ষত তাকে ঘুমোতে দিচ্ছেনা একদমই, তার দুচোখে জ্বলছে আগুন, তার অত্যন্ত প্রিয় মানুষটির ওপর এতদিন ধরে হয়ে চলা অত্যাচারের জবাব যে তাকে দিতেই হবে, নইলে যে নিজের কাছেই নিজে ছোট হয়ে যাবে সে। নিজের অজান্তেই যুবকটির চোখে জল এল, গড়িয়ে পড়ল মেয়েটির এলো ঘন চুলে।
_________________________
একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ : পড়ুন
_________________________
ঘটনাটা শুরু থেকে জানতে হলে আমাদের চলে যেতে হবে আজ থেকে প্রায় উনিশ-কুড়ি বছর আগে। দিনটা ছিল পয়লা অক্টোবর। চৌধুরী বাড়িতে সেদিন বাজছে আনন্দের সুর, চৌধুরী বাড়ির ছোট ছেলে অনন্ত চৌধুরীর কন্যাসন্তান জন্মেছে যে! চৌধুরী বাড়িতে সাতটি প্রাণী বাস করেন। বাড়ির কর্তা ত্রিদিব চৌধুরী, তাঁর স্ত্রী হেমনলিনী চৌধুরী, তাঁদের বড়ো ছেলে অজিত, তার স্ত্রী কাকলি আর তাদের একমাত্র মেয়ে তোর্সা ওরফে রুমকি। ছোটো ছেলে অনন্ত আর তার স্ত্রী সায়নী।
সায়নী মেয়েকে কোলে নিয়ে বলল, 'মেয়ের নাম কিন্তু আমি রাখব!'
— 'বেশ বেশ তাই হবে!' বাড়ির সকলে হাসিমুখে সায় দিলেন।
— 'আমি কিন্তু নাম ঠিক করে ফেলেছি মেয়ের। এ মেয়ের নাম হবে কাহিনী, কাহিনী চৌধুরী।'
কেটে গেল কয়েক বছর। আজ কাহিনীর এক বছরের জন্মদিন। আজ চৌধুরীবাড়িতে আসছেন বাড়ির গিন্নি অর্থাৎ কাহিনীর ঠাকুমা হেমনলিনী চৌধুরীর গুরুমা কল্যাণী। জ্যোতিষী হিসেবে শুধু রাজ্যেই নয়, দেশেও ভালোই নামডাক আছে তাঁর। আর চৌধুরীবাড়ির মানুষেরা জ্যোতিষ শাস্ত্রে খুবই বিশ্বাস করেন, তাই ছোট্ট কাহিনীর ভবিষ্যৎ জীবন কেমন চলবে তা জানতেই কল্যাণীর ডাক পড়েছে।
কল্যাণী অনেকক্ষণ ধরে কাহিনীর হাতের রেখা পর্যবেক্ষণ করলেন, তারপরেই শুরু হল তার ভাগ্যগণনা। শেষে চিন্তিত কল্যাণী মুখ খুললেন, 'এ মেয়ের তো দেখছি জীবন বড়োই বিপদসংকুল হবে। প্রতি পদেই বিপদের সম্মুখীন হতে হবে ওকে। তবে,' কল্যাণী একটু থেমে বললেন, 'সবচেয়ে বড়ো যে ফাঁড়াটা, সেটা তোমার মেয়ের জীবনে আসবে আঠারোয় পা দিলে। এই ফাঁড়া কাটাতে না পারলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে ও।'
— 'এসব কি বলছেন গুরুমা?' সায়নী প্রায় কেঁদে উঠল।
— 'কিন্তু এই ফাঁড়া কাটানোর কিছু একটা উপায় তো থাকবে গুরুমা।' চিন্তিত মুখে বললেন হেমনলিনী দেবী।
— 'হুম তা তো আছে, কিন্তু সে নিয়ম বেশ কঠিন, তোমাদের বেশ কষ্ট হবে নিয়ম পালন করতে। তবুও বলছি আমি, কারণ এছাড়া আর কোনো পথ আমার জানা নেই।'
বাড়ির সকলে আগ্রহী মুখে তাকিয়ে রইলেন কল্যাণীর মুখের দিকে।
কল্যাণী বলে যেতে লাগলেন, 'পাঁচ বছর হওয়ার আগেই ওকে অন্য কোথাও রেখে আসতে হবে। পাঁচ বছর পেরোনোর পরেও যদি ও এবাড়িতে থাকে, তাহলে বিপদ ঘনিয়ে আসবে ওর ওপর। তাই পাঁচ বছর পেরোনোর আগেই ওকে বাড়ির বাইরে পাঠিয়ে দিতে হবে বিশ্বাসী কোনো মানুষের কাছে, যে পরম স্নেহ আর যত্ন দিয়ে ওকে বড়ো করে তুলবে। তারপর কাহিনীর যখন বয়স আঠারো পেরোবে, তখন তোমরা আবার ওকে ফিরিয়ে এনো এই বাড়িতে। আর শোনো, যতদিন না কাহিনীর বয়স আঠারো পূর্ণ না হচ্ছে, এবাড়ির কেউ ওর ছবিও দেখতে পাবে না।'
সবটা শুনে সায়নী মেয়েকে বুকে নিয়ে কাঁদতে লাগল, 'তেরোটা বছর ওকে ছেড়ে থাকব কি করে আমি?'
— 'সারাটা জীবন ওকে ছেড়ে থাকার কষ্ট সহ্য করার চেয়ে তেরোটা বছর ওকে ছেড়ে থাকার কষ্টটা একটু হলেও কম হবে গো মা, তাই না বলো?' সায়নীর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন কল্যাণী।
কাহিনীর বয়স চার পেরিয়ে গেল। বাড়ির সকলে মিলে তোড়জোড় শুরু করলেন কাহিনীকে অন্য কোথাও পাঠানোর জন্য, কিন্তু বিশ্বাসী লোক তেমন মিলবে কোথায়? সায়নীই সমাধান দিল।
সায়নীর এক বান্ধবী আছে, বীণাপাণি মিত্র। এখন সে থাকে বাঁকুড়ায়, ওখানকারই একটা স্কুলে পড়ায় সে। বীণাপাণি অবিবাহিতা, একলার সংসারে যদি কাহিনীকে পায় সে, তবে মন্দ হয়না। সায়নীর কাছে সবটা শুনে বীণাপাণি হেসে বলেছিল, 'আপত্তি কি রে? একা মানুষ, সারাদিন কথা বলার লোক নেই, একটা কথা বলার মানুষ তো পাব নাকি! তোর কোনো চিন্তা নেই সায়নী, কাহিনীর এতটুকু অযত্ন হবে না এখানে। তুই যদি দেবকী হোস, তবে আমি যশোদার মতো বুকে আগলে রাখব তোর মেয়েকে।'
কিন্তু হায়! তখন কি আর কেউ ভেবেছিল যে কাহিনী একজন নয়, দুজন যশোদা মা পাবে? কাহিনী নিজেও কি ভাবতে পেরেছিল কখনো?
সব ঠিকঠাক হয়ে গেল। কাহিনীর পাঁচ বছর পূর্ণ হতে যখন আর এক সপ্তাহ বাকি, তখনই সকলে মিলে ওকে রেখে এলেন বীণাপাণির কাছে। যাওয়ার সময় কাহিনীকে বুকে করে সায়নীর সে কি কান্না! সকলে মিলে অনেক কষ্টে থামালেন ওকে।
বীণাপাণি ব্যঙ্গ করে বলল, 'আজ এত কাঁদছিস মেয়ের জন্য, ও যখন আঠারোর হবে, তখন দেখব ও তোর সামনে এসে দাঁড়ালে তুই কেমন চিনতে পারিস ওকে!'
— 'তোর সবসময় মস্করা! যাকে দশমাস পেটে ধরেছি, তাকে নাকি আমি চিনতে পারব না! তুই বলিসও এক একটা কথা বটে!'
— 'হ্যাঁ হ্যাঁ, সেদিন দেখব আমি!'
কেটে গেছে অনেকগুলো বছর। কাহিনী আজ সতেরো বছরের মেয়ে, সামনেই তার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হবে। ওর আঠারো হতে আর মাত্র একটা মাস বাকি।স্কুলে একটা অনুষ্ঠান ছিল আজ, স্কুল থেকে ফিরেই কাহিনীর সে কি হাসি! হাসতে হাসতে ককিয়ে যাচ্ছে ও।
— 'কি রে আমার ক্ষ্যাপা মেয়ে, এত হাসছিস কেন? মাথার স্ক্রু খুলে টুলে গেল নাকি?' বীণাপাণি বলে উঠল।
পরবর্তী ভাগ পড়ুন : দ্বিতীয় পর্ব

2 মন্তব্যসমূহ
প্রথম পর্ব অসাধারণ লাগলো, অধীর আগ্রহে রইলাম পরের পর্ব গুলি পড়ার জন্যে 💙💙💙
উত্তরমুছুন☺️☺️☺️💓💓💓
মুছুন