লাকি ডল
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
সপ্তম পর্ব
মিঠি অফিসেরই একজনকে জিজ্ঞেস করে চলল মালিকের ঘরের দিকে। ওকে দেখে কিছু কিছু মেয়ে বাঁকা হেসে বলল, 'বসের পরীক্ষায় পাসটা কোরো যেন, নইলে আর চাকরি হবে না!'
মিঠি ওদের কথার অর্থ ঠিক বুঝতে পারল না, তবে অজানা এক ভয় কাজ করছিল ওর মনে। ওর সার্টিফিকেটটা তো সত্যি নয়, এটা যদি বস ধরে ফেলেন?
হাজার দ্বিধা দ্বন্দ্ব ভয় মনে চেপেই মিঠি চলল বসের ঘরের দিকে। ঘরে ঢুকতে গিয়ে ও দেখে, ঘরের দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ। এইবার খুবই ধন্দে পড়ে গেল মিঠি। একবার ভাবল, দরজায় নক করবে। কিন্তু তাতে যদি আবার বস রেগে টেগে যান? বস আসলে কেমন মানুষ সেটাও তো ওর অজানা।
মিঠি সাতপাঁচ ভাবছিল যখন, তখনই দরজাটা কে যেন খুলল ভেতর থেকে। মিঠি দেখল, দরজাটা খুলে বেরিয়ে এল একটা মেয়ে, মেয়েটার পরনেও মিঠির মতোই পোশাক। মিঠি দেখল, মেয়েটার চোখের কাজল ঘেঁটে গেছে, লিপস্টিকও উঠে গেছে, আর চুলগুলো এলোমেলো। কোনোরকমে নিজেকে সামলে নিয়েই মেয়েটা কোথায় যেন চলে গেল।
এইবার মিঠির কাছে সবটা পরিষ্কার হল, যে লাকি ডল আসলে কোন্ পরীক্ষার কথা বলেছিল। ও এটাও বুঝল, যে মেয়েগুলো কেন হাসছিল। ভেবেই ঘৃণায় গা রি রি করে উঠল ওর। ভাবল, এখানে আর এক মুহূর্তও নয়। টাকার জন্য বাদলকে কিছুতেই ঠকাতে পারবে না ও, ভাঙতে পারবে না মিঠির প্রতি ওর অগাধ বিশ্বাস।
এইসব ভেবে মিঠি যখন ফেরার পথ ধরল, হঠাৎই ওর ভ্যানিটি ব্যাগের ভেতর থেকে ভেসে এল এক নারীকন্ঠ, 'মিঠি, তুমি বড়োলোক হতে চাও না? কোটিপতি হতে চাও না তুমি?'
ভীষণ চমকে ভ্যানিটি ব্যাগ খুলে মিঠি দেখে, ব্যাগের ভেতরে রয়েছে লাকি ডল। কিন্তু এ কিভাবে সম্ভব? লাকি ডলকে তো ও হোটেলের ঘরে রেখে এসেছিল, তাহলে ব্যাগের ভেতরে ও কিভাবে এল?
মিঠিকে চিন্তা করার সুযোগ না দিয়েই লাকি ডল বলে যেতে লাগল, 'কি হবে ওইসব চরিত্র, সতীত্ব, বিশ্বাস দিয়ে? খিদের সময় পেট ভরায় খাবার, গালভরা কথাগুলো নয়, তীব্র গরমের দিনে শরীর ঠান্ডা করে এ.সি., ফালতু নীতি আদর্শ নয়, বৃষ্টিদিনে ঠান্ডা থেকে বাঁচায় পাকা বাড়ি, মাটির দরমা দেওয়া ঘর নয়। আর আমায় পাওয়ার সৌভাগ্য খুব কম মানুষেরই হয় এ দুনিয়ায়। আজ তুমি ফিরে যাচ্ছ যাও, কিন্তু এর জন্য যেন সারাজীবন আফসোস কোরোনা কোটিপতি হতে পারোনি বলে।'
মিঠি দাঁড়িয়ে পড়ল কথাগুলো শুনে। লাকি ডল একটা কথাও ভুল বলেনি। টাকার যে কি মূল্য, সেটা ওর মতো খেটে খাওয়া মানুষেরাই বোঝে, যারা সামান্য কিছু টাকার জন্য উদয়াস্ত পরিশ্রম করে। আর বাদল ওকে কি দিতে পেরেছে সারাজীবনে? ক'টা রক্ত গরম করা কথা ছাড়া? জীবনেও দামী শাড়ি গয়না দিতে পেরেছে ও মিঠিকে? নাকি আনতে পেরেছে দামী খাবার? যে মানুষের বৌয়ের সামান্যতম শখগুলো মেটানোর মুরোদ নেই, সে কোন্ অধিকারে মিঠির শরীর দাবি করে ফালতু ভালোবাসার দোহাই দিয়ে?
মিঠির ভীষণ রাগ হল বাদলের ওপর। এই রাগই ওকে চালিত করল কোম্পানির মালিক কাম বস আর.কে., অর্থাৎ রমিত কাঞ্জিলালের ঘরের দিকে।
মিঠি যখন বেরোলো আর.কে. র ঘর থেকে, তখন ওর চুল বিধ্বস্ত, ঠোঁটের লিপস্টিকও ঘেঁটে একাকার, কিন্তু মিঠির সারা মুখ জুড়ে হাসি, কারণ চাকরিটা তার হয়ে গেছে, মাস মাইনে পঞ্চাশ হাজার। এত টাকা যে একমাসে আয় করা যায়, এ যেন ওর কাছে স্বপ্নের মতো। ও যে কম্পিউটার ব্যবহার করতে পারে না এটাও ও বলেছে আর.কে. কে, তবে আর.কে. আশ্বাস দিয়েছেন নিজের হাতে তিনি সবটা শিখিয়ে পড়িয়ে নেবেন।
অফিস থেকে বেরিয়ে মিঠি রাজ হোটেলে ফিরল আবার। হোটেলে ঢুকে ও প্রথমে স্নান করে নিল, তারপর মিনিস্কার্ট, জুতো আর টপটা খুলে শাড়িটা পরে নিল আবার, লাকি ডলের কথা মতো পোশাক গুলো হোটেলের ঘরেই রাখা রইল, তারপর মিঠি ফিরতে লাগল বাড়ির পথে।
লাকি ডলের কথামতো দু'কোটি টাকাটা যে ব্যাঙ্কের বাইরে চুরি গেছে একথা সে যেসব বাড়িতে কাজ করে তার একটা বাড়িতেও বলেনি, তাই মিঠি যে কাজ করতে আসেনি এতে তাদের মনে কোনো সন্দেহ উপস্থিত হয়নি, বরং এটাকেই স্বাভাবিক বলে গণ্য করেছে সকলে।
সেই রাতে আবারও মিঠি আর বাদল কাছাকাছি এল। মিঠির মনের মধ্যে কেমন অপরাধবোধ কাজ করছিল, বারবার ওর মনে কাঁটার মতো বিঁধছিল, বাদলকে ঠকিয়েছে ও, ওর বিশ্বাসকে গলা টিপে খুন করে এসেছে আজ। কিন্তু তারপর যখনই পঞ্চাশ হাজার টাকাটার কথা মনে পড়ল, ওর অনুশোচনা কোন্ আকাশে যে মিলিয়ে গেল, তা টেরই পেল না ও।
এইভাবে কেটে গেল কয়েক মাস। কিন্তু হঠাৎ একদিন ঘটল বিপত্তি। বাদল হঠাৎ মিঠিকে বলল, 'কাল থেকে যদি আমি তোমায় কাজের বাড়িতে ছেড়ে দিয়ে আসি, কোনো আপত্তি নেই তো তোমার?'
— 'কি? কি বলছটা কি তুমি?' মিঠির মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল।
— 'না দেখো, সারাদিনই আমরা কাজে ব্যস্ত থাকি, একসাথে সময় কাটানো বলতে এই সন্ধ্যে আর রাতটুকু, মাঝেমধ্যে তো সন্ধ্যেটাও পাইনা। তাই আমি ভাবছিলাম, তোমায় যদি পৌঁছে দিই, এতে তোমার সাথে আরও কিছুটা সময় কাটাতে পারব আমি।'
মিঠি খুব ভয় পেয়ে যায় হঠাৎই। বাদল কি সন্দেহ করেছে কিছু? নাকি সবটা জেনে গেছে?'
কিন্তু সেই ভাবটা প্রকাশ করল না মিঠি। বরং এ যেন খুব মজার বিষয় এরকম ভাব দেখিয়ে হেসে বলল, 'বাদল, তুমি সেই ছেলেমানুষই রয়ে গেলে। আচ্ছা আমি কি বাচ্চা মেয়ে, যে তুমি পৌঁছে দেবে আমায়?'
— 'না বাচ্চা মেয়ে নও ঠিকই, কিন্তু এখনো কিসে ভালো হবে আর কিসে মন্দ, সেটা তুমি ঠিকভাবে বুঝতে শেখোনি। ভয় হয়, কখন অন্যের কথায় ভুল পথে চালিত হও তুমি, আর তারপর গর্তে পড়ো।'
পরবর্তী ভাগ পড়ুন : অষ্টম পর্ব
0 মন্তব্যসমূহ