লাকি ডল
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
ষষ্ঠ পর্ব
এসে গেল সেই প্রতীক্ষিত রাত। এই রাতেই লাকি ডলকে নিয়ে আসতে হবে চাঁদের আলোয়। পাশে শুয়ে বাদল অঘোরে ঘুমোচ্ছে, কিন্তু মিঠির চোখে ঘুম নেই। ও সমানে সেই বিশেষ মুহূর্তটার জন্য অপেক্ষা করে চলেছে।
অবশেষে যখন মানুষের কন্ঠস্বর ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে মিলিয়ে গেল, রাতের অন্ধকার রাস্তার গাড়ি চলার শব্দটুকুও গিলে খেল, দিনের পাখিরা ঘুমের অতলে তলিয়ে গেল, চারিদিক খান খান হয়ে গেল পেঁচার ডাকে, তখনই সন্তর্পণে বিছানা থেকে নামল মিঠি। পা টিপে টিপে রান্নাঘরে গেল, তারপর পুতুলটাকে নিয়ে এল বাইরে। এরপর চাঁদের আলোয় আনল ও পুতুলটাকে।
— 'যাদু পুতুল, এবারে উপায় বলো।'
— 'শোনো, এবারে দু'কোটি না, একশো কোটি কামাবে তুমি।'
— 'কি?' উৎফুল্ল হয়ে পড়ে মিঠি।
— 'হ্যাঁ, তবে একটা শর্তেই সব সম্ভব হবে। তোমাকে সম্পূর্ণ আমার কথা মতো চলতে হবে, আর কাউকে এ বিষয়ে একটাও কথা জানালে চলবে না।'
— 'হ্যাঁ গো হ্যাঁ তাই হবে, আর এবারে আমি একটাও ভুল করব না তুমি দেখো।'
— 'শোনো, এই বস্তি থেকে বেরিয়েই যে বড়ো রাস্তাটা পড়ে, ওই রাস্তা দিয়ে সোজা হেঁটে গেলে একটা কলেজ পড়ে, টাউন কলেজ, চেনো তো? ওই কলেজের গায়ে লাগোয়া হোস্টেলটা পেরিয়েই দেখবে একটা গলি পড়বে। ওই গলি বরাবর কিছুটা হেঁটে গেলেই একটা হোটেল পড়বে, রাজ হোটেল। আমি তোমায় একটা বিশেষ ড্রেস, জুতো আর পারফিউম দেব, সেগুলো লুকিয়ে নিয়ে বেরিও কাল কাজে যাবার নাম করে, তারপর যে হোটেলের কথা বলছি ওই হোটেলের একটা রুমে গিয়ে ড্রেসটা পরে নিও। আর তারপরেই...'
— 'তারপরেই কি?আর হোটেলের কোনো ঘরে আমাকে ঢুকতে দেবেই বা কেন?'
— 'কারণ রাজ হোটেলের একটা রুম তোমার নামে অলরেডি বুক করা থাকবে, তুমি শুধু ম্যানেজারকে গিয়ে তোমার নামটা বলবে ব্যস, সাথে সাথেই ঘরের চাবি পেয়ে যাবে তুমি। অবশ্য আস্তে আস্তে দেখবে ওই হোটেলে প্রায়ই তোমায় যেতে হবে, তবে সেটা পরের কথা।'
মিঠির মনে অনেক প্রশ্ন জাগলেও ও প্রশ্নগুলো করতে পারছিল না ভয়ে। লাকি ডল বোধহয় ওর মনের ভাব বুঝতে পেরেছিল, তাই সে হেসে বলল,'চিন্তা নেই,কালই সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবে তুমি। তারপর শোনো, ওই হোটেল থেকে আমার দেওয়া ড্রেস আর জুতো পরে তুমি চলে যাবে বাঁদিকে। বাঁদিকের রাস্তা ধরে বেশ কিছুটা হাঁটলেই এক বিশাল অফিস দেখতে পাবে তুমি, আর.কে. গ্রুপ অফ কোম্পানিস। সোজা ঢুকে যাবে ওই অফিসের ভেতরে, আর ঢুকেই যাকে সামনে পাবে জিজ্ঞেস করবে, আপনাদের মালিক কোথায় বসেন? ওরা দেখিয়ে দেবে, তারপর সোজা চলে যাবে মালিকের ঘরে। উনি তোমার কিছু পরীক্ষা নেবেন, তারপরেই মোটা মাইনের চাকরি পাবে তুমি!'
— 'সে কি? আমার পড়াশোনা মোটে কেলাস ফাইভ অব্দি, এই পড়াশুনায় কি করে মোটা মাইনের চাকরি পাব?'
— 'কে বলেছে? তুমি মোটেও ফাইভ পাস নও, তুমি কমার্স গ্র্যাজুয়েট।'
— 'কি বলছ তুমি এসব?'
— 'তা নয় তো আর বলছি কি? শোয়ার ঘরের তাকটা একবার দেখে এসো তো!'
মিঠি সন্তর্পণে আবার শোয়ার ঘরে ঢুকল, তারপরেই ঘরের তাকটা দেখতে লাগল ভালো করে। একটু পরেই একটা কাগজ পেল, সেটা নিয়ে ও বাইরে এল।
— 'কাগজটা ভালো করে দেখো মিঠি।'
মিঠি অবাক হয়ে গেল। ও যে কমার্স গ্র্যাজুয়েট সেটাই লেখা আছে এই কাগজে।
— 'এই সার্টিফিকেটটা অফিসের মালিককে দেখাবে কাল, ওকে?'
— 'বেশ বেশ, তাই হবে।'
— 'আর এমনিতেও অফিসের বস মহিলা কর্মচারীদের ক্ষেত্রে কর্মদক্ষতা কমই দেখেন, বরং অন্য কিছুই বেশি দেখেন।'
— 'মানে?'
— 'অত মানে এখনই বুঝে করবে কি? মোট কথা, কাল বস তোমায় যা যা করতে বলবেন, তুমি তাই তাই করবে, একদম আপত্তি জানাবে না, মনে থাকবে?
— 'হুম থাকবে।'
— 'যাও, শুতে যাও এখন। আর যা যা বললাম সব মনে রেখো, একটু এদিক ওদিক হলেই তোমার বড়োলোক হবার স্বপ্নটা স্বপ্নই থেকে যাবে।'
পুতুলটাকে রান্নাঘরে লুকিয়ে রেখে মিঠি বিছানায় শুতে গেল। কাল অনেক কাজ তার।
পরের দিন বাদল বেরিয়ে যেতেই মিঠি তাদের শোবার ঘরে এসে দেখে, বিছানায় একটা লাল থ্রি কোয়ার্টার টপ, একটা লাল মিনিস্কার্ট আর সেই সাথে লাল স্টিলেটো।
— 'যাদু পুতুল এসব কি দিয়েছে আমায় পরতে? এসব পোশাক কিভাবে পরব আমি?' বিড়বিড় করে নিজের মনেই বলল মিঠি। কিন্তু পরক্ষণেই সে ভাবল, 'যাদুপুতুলের কথা মতো না চললে আমার আর কোটিপতি হওয়া হবে না, তার চেয়ে ভালো এগুলো পরে নিই আমি।'
মিঠি পোশাক গুলো পরে নিল। তারপর ও জুতো পরতে গেল, কিন্তু এরকম হিল জুতো ও কখনো আগে পরেনি, তাই ঠিক করে হাঁটতেই পারছিল না ও জুতোটা পরে, তারপর আস্তে আস্তে ও সড়োগড়ো হল ব্যাপারটার সাথে।
এরপর এক অদ্ভুত কাজ করল মিঠি, অবশ্য সবটাই লাকি ডলের কথা মতো। ও এই ড্রেসগুলোর ওপর শাড়ি পরে নিল, কারণ এই পোশাকে বাড়ি থেকে বেরোলে নানারকম কথা উঠবেই, আর সেই কথা শেষ পর্যন্ত বাদলের কানেও উঠবে, আর এতকিছু জেনে ফেললে লাকি ডলের কথা জানতে আর কতক্ষণ?'
লাকি ডলের কথা মতো শাড়ি পরে মিঠি বেরিয়ে পড়ল। তারপর চলে গেল রাজ হোটেলে, সেখানে ওর নামে বুক করা ঘরের চাবি নিয়ে সোজা চলে গেল ঘরে, তারপর সেখানে শাড়িটা খুলে ফেলল। ঘরে একটা সুন্দর ডিজাইনের দামী ভ্যানিটি ব্যাগ আগে থেকেই রাখা ছিল, ওই ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে ও হাঁটা দিল আর.কে গ্রুপ অফ কোম্পানিসের অফিসের পথে।
এরকম পোশাক আগে কখনো পরেনি মিঠি, তাই ওর ভীষণই অস্বস্তি হচ্ছিল, বেশ লজ্জাও লাগছিল, কিন্তু সেই মুহুর্তে তার মনে পড়ল লাকি ডলের কথা, লজ্জা ঘৃণা ভয়, তিন থাকতে নয়।'
হাঁটতে হাঁটতে একটু পরেই চলে এল অফিস। একটু ইতস্তত বোধ করেই ও ঢুকে পড়ল অফিসে। ওর সাজপোশাক দেখে গার্ডরাও ওকে আটকাল না।
পরবর্তী ভাগ পড়ুন : সপ্তম পর্ব
0 মন্তব্যসমূহ