লাকি ডল
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
পঞ্চম পর্ব
মিঠি তাড়াতাড়ি পিজ্জা গুলো নিয়ে রান্নাঘরে চলে গেল, আর দুটো থালায় সার্ভ করতে লাগল। পুতুলকে নিজের আঁচলে লুকিয়ে রেখেছিল ও, যাতে বাদল ওর সন্ধান না পায়। পুতুলটাকে বের করেই ও বলল, 'সত্যিই তো দেখছি তুমি যাদু পুতুল!'
পুতুলের ভেতর থেকে এক মৃদু হাসির শব্দ শোনা গেল।
পুতুলটাকে আঁচলে বেঁধে নিয়ে মিঠি গেল বাদলকে ডাকতে।
— 'এই খাবার তুমি কোথায় পেলে?' বাদল জিজ্ঞেস করল।
মিঠি সুতপামাসির ব্যাপারটা খুলে বলল।
— 'সে কি মিঠি, উনি দিলেন আর তুমি অমনি হাত পেতে নিয়ে নিলে? মিঠি আমরা গরিব হতে পারি, কিন্তু আমাদের আত্মসম্মান আছে এটা ভুলে যেও না।'
— 'আরে দূর, তোমার আত্মসম্মান নিয়ে তুমি থাকো তো! আর শোনো, আমার বহুদিন ধরে এই পিজ্জা খাওয়ার শখ, আমি এটা খাবোই! তোমার ইচ্ছে হলে খাও, নইলে খেও না।'
— 'মিঠি রাগ কোরো না। দেখো আমরা খেটে খাই, যেটুকু খাবার জোটে সেটুকু নিজেদের উপার্জনেই জোটে, কখনো অন্যের কাছ থেকে চেয়ে নয়। আর এতেই তো মাথাটা উঁচু করে আমরা গরিবরা বেঁচে থাকি। কিন্তু অন্যের দান নিলে আর...'
— 'হয়েছে হয়েছে, আর নীতিকথা শুনিও না তো, খেতে দাও এখন।'
মিঠি ভীষণ খুশি মনে পিজ্জা খেতে লাগল। বাদলও বাধ্য হয়ে কিছুটা খেল।
— 'উফফ, কি দারুণ খেতে!' গোটা মুখে হাসি ছড়িয়ে মিঠি বলল।
লটারি টিকিটের কথাটা ও বাদলকে এখনো বলেনি। বাদল কাজে বেরিয়ে যাওয়ার পর পুতুলটাকে আর লটারির টিকিটটা আঁচলে বেঁধে সেও বেরিয়ে পড়ল কাজে।
প্রথমে ও গেল দত্তবাড়িতে। সে বাড়ির কর্তা স্বদেশ দত্ত সবে চা আর খবরের কাগজ নিয়ে বসেছেন, হঠাৎ মিঠি সেখানে এসে বলল, 'কত্তাবাবু, একটিবার কাগজটা দেন না!'
স্বদেশবাবু খবরের কাগজটা দিলেন মিঠির হাতে। মিঠি আঁচলের গিঁট খুলে লটারির টিকিটটা বের করল, তারপর খবরের কাগজের প্রথম পাতাটা খুলল।
— 'ওহ, এই ব্যাপার?' হেসে উঠলেন স্বদেশবাবু, 'আমায় তোর লটারিটা দে, আমি মিলিয়ে দিচ্ছি নম্বরটা।
— 'হুররে!' স্বদেশবাবু চেঁচিয়ে উঠলেন, 'এই কে কোথায় আছ, দেখে যাও গো, আমাদের মিঠি লটারি জিতেছে, তাও আবার এক্কেবারে ফার্স্ট প্রাইজ, দু'কোটি! তোর তো ভাগ্য খুলে গেল রে মিঠি!'
বাড়িসুদ্ধ লোক স্বদেশবাবুর ডাক শুনে সেখানে হাজির, আর মিঠি লটারি পেয়েছে শুনে সবাই খুব এক্সাইয়েড। ওরাই মিঠিকে কোথায় টাকাটা আনতে যেতে হবে বুঝিয়ে দিল।
লটারি কোম্পানি যেখানে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল, সেখানে প্রথমে বাস, তারপর অটো ধরে পৌঁছল মিঠি। একটু পরেই মিঠিকে ডাকা হল স্টেজে, তারপর তাকে অভিনন্দন জানিয়ে তার হাতে তুলে দেওয়া হল দু'কোটির চেক। মিঠির কাছে সবটা কেমন স্বপ্নের মতো লাগছে এখনও, নিজের ভাগ্যকে ও বিশ্বাস করতে পারছে না।
স্টেজ থেকে নেমেই মিঠি তাড়াতাড়ি চেকটা নিয়ে ছুটল ব্যাঙ্কে।
ব্যাঙ্ক থেকে টাকাটা তুলল সে, দত্তবাড়ি থেকে একটা সুটকেস দিয়েছিল ওকে, তাতেই পুরো টাকাটা ভরে নিল ও। ভাবল, আর না, এইবার বাদলকে সবটা জানাতেই হবে, ভেবেই বাদলকে ফোন করল সে। বাদল ফোনটা ধরতেই মিঠি উৎসাহের চোটে সবটা বলে দিল গড়গড়িয়ে, লাকির কথাটাও সে বলল বাদলকে, ভুলেই গেল লাকির নিষেধাজ্ঞার কথা।
সবটা শুনে বাদল বলল, 'আচ্ছা বেশ, সাবধানে বাড়ি এসো, আমিও যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাড়ি ফিরছি।'
'যাক, এইবেলা অন্তত লোকটা খুশি হল, আর নীতিজ্ঞান দিল না!' ভেবেই মিঠি যেই সুটকেস নিয়ে ব্যাঙ্ক থেকে বেরিয়েছে, অমনি কোথা থেকে একটা বাইক এল, আর তাতে বসে থাকা মুখ ঢাকা দুজন দুষ্কৃতি মিঠির হাত থেকে সুটকেসটা ছিনিয়ে নিয়ে গেল।
মিঠি উদভ্রান্তের মতো 'আমার টাকা ফেরত দাও!' বলে চেঁচাতে চেঁচাতে বাইকটার পেছনে ছুটতে লাগল, কিন্তু বাইকটা খুব স্পীডে চলতে চলতে কোথায় যে অদৃশ্য হয়ে গেল আর টিকিটিও দেখা গেল না তার।
হতাশ মিঠি রাস্তায় বসে কাঁদতে লাগল। ওর মনে পড়ল লাকির নিষেধাজ্ঞার কথা।
— 'দুর, কেন যে আমি সব কথা গড়গড়িয়ে বলতে গেলাম ওকে! লাকি দিদি কতবার বারণ করল আমায়, তাও সেই ভুলটাই আমি করলাম! এতগুলো টাকা আমার হাতছাড়া হয়ে গেল!'
ও তাড়াতাড়ি আঁচলের খুঁট থেকে পুতুলটাকে বের করল, করে বলল, 'বড্ড অন্যায় হয়ে গেছে গো আমার, আর এ ভুল হবে না! দয়া করে আর একটা উপায় করে দাও আমায় টাকা রোজগারের!'
— 'ভুল যখন করেছ তখন মাশুল তো দিতেই হবে! এখন দুদিন তুমি কিচ্ছুটি পাবে না আমার কাছ থেকে। দুদিন পর পূর্ণিমা। পূর্ণিমার রাতে যখন চারিদিক নিশ্চুপ হয়ে যাবে, শুধু নিশাচরদের ডাক ছাড়া আর কারোর গলা শোনা যাবে না, সেই সময় আমায় চাঁদের আলোয় নিয়ে যেও, তখনই আমি উপায় বলব।' বলেই পুতুলের ভেতর থেকে ভেসে আসা নারীকন্ঠ চুপ করে গেল।
পুতুলটাকে আবার আঁচলে বেঁধে মুখ কালো করে মিঠি চলল বাড়ির পথে। আজ সবটা ঘটল শুধু ওর জন্য, নইলে আজকেই ওর ভাগ্য পরিবর্তিত হয়ে যেত।
কিন্তু সবটা শুনে বাদল মোটেও অখুশি হল না, ও বরং বলল, 'একদিকে ভালোই হয়েছে গো মিঠি। এই টাকার লোভ বড়ো ভয়ানক। তুমি যদি আজ দু'কোটি কামাও, কাল ইচ্ছে করবে চার কোটি কামাতে, তার পরের দিন দশ কোটি। মানুষের লোভ আর চাহিদার কোনো অন্ত নেই মিঠি, তাই এত টাকাপয়সা থেকে আমাদের দূরে থাকাই মঙ্গল।'
মিঠির অবশ্য বাদলের কথায় মন নেই একদমই। ও শুধু পূর্ণিমার রাতের অপেক্ষা করছে।
পরবর্তী ভাগ পড়ুন : ষষ্ঠ পর্ব
0 মন্তব্যসমূহ