Advertisement

লাকি ডল (চতুর্থ পর্ব)

লাকি ডল
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
চতুর্থ পর্ব



মুখে অবশ্য কিছু প্রকাশ করে না মিঠি, কারণ যতই হোক বাদলের মনে ও দুঃখ দিতে চায় না। আর তাছাড়া মিঠি ভাবে, কালকেই ওদের ভাগ্য পরিবর্তিত হবে, তখন ও আর বাদলও শৌখিন চেয়ার টেবিলে বসে বড়োলোকি খাবার খাবে, কাল থেকে ওকেও আর কাজে যেতে হবে না, আর বাদলকেও আর দিনমজুরের কাজ করতে হবে না। সেই কোন্ বয়স থেকে খেটে খেটে শরীর শেষ হয়ে গেছে, এতকাল পরে একটু জিরোতে পারবে ওরা।

_________________________


একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ :  পড়ুন

_________________________


এসব ভেবেই অন্যমনস্ক হয়ে মিঠি সিঙ্গারা আর জিলিপি গুলো দুটো বাটিতে ঢালল, তারপর একটা বাটি বাদলকে দিল, একটা বাটি নিজে নিয়ে মাটিতে বসল।
মিঠির আর তর সইল না, ভাবল বাদলকে এক্ষুনি লটারির কথাটা বলবে, কিন্তু যদি টিকিটটা না লাগে তখন বাদল আবার ওকে নীতিকথা শোনাবে, সেই ভেবে মিঠি চুপ করে গেল, আর রাতের অপেক্ষা করতে লাগল যে কখন বাদল খেয়ে ঘুমিয়ে পড়বে।

সেই মতো মিঠি কোনোরকমে সিঙ্গারা আর জিলিপি খেয়ে রাতের খাবার বানাতে বসল। 
— 'কি গো মিঠি, আজ এত তাড়াতাড়ি রান্না চাপালে যে!'
— 'আসলে আজ তুমি এত দেরি করে বাড়ি এলে, নিশ্চয়ই খুব ক্লান্ত তুমি, আর আমিও ভাবছি আজ তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ব, তাই জন্যেই আর কি।'

মিঠি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রান্না শেষ করেই বাদলের ভাত বেড়ে দিল, তারপর নিজেও ভাত বেড়ে খেতে বসল। মনে মনে মিঠি ভাবল, 'পান্তাভাত খেয়ে ঘুমোতে যাওয়ার দিন শেষ, এবার আমিও বড়োলোকদের মতো প্রতিদিন মাছ, মাংস আর পঞ্চব্যঞ্জন খেয়ে ঘুমোতে যাব, কাল থেকেই, উফ ভেবেই যে কি আনন্দ হচ্ছে!'
 
বাদল আর মিঠি চটপট খেয়ে নিল সে রাতে। কিন্তু সেই রাতে বাদল ক্লান্ত থাকা সত্ত্বেও ঘুমোতে চাইল না, বরং তার প্রিয়তমাকে ঘনিষ্ঠভাবে কাছে পেতে চাইল।
— 'এ কি বাদল,দরজাটা বন্ধ কেন করছ? আমার কিছু কাজ আছে, দাঁড়াও সেগুলো আগে সেরে আসি।'
— 'না মিঠি রাণী, সারাদিন অনেক কাজ করেছ তুমি, এখন আর কোনো আজ আমি করতে দিচ্ছি না তোমায়। যা কাজ সব কাল হবে, এখন তোমায় আমি কাছে পেতে চাই', বলেই মিঠির আঁচল টেনে ধরল বাদল।

মিঠি খুব অস্বস্তিতে পড়ল, কারণ ওদিকে লাকি তার অপেক্ষায় বসে আছে, আবার এদিকে বাদলকে বাধা দিলেও ও সন্দেহ করতে পারে, তাই মিঠি আর কোনো আপত্তি করল না।

সেই বৃষ্টিস্নাত রাতে মিঠি আর বাদল ডুবে গেল অন্তরঙ্গতায়। প্রথমে মিঠি একটু বিরক্ত হলেও বাদলের উষ্ণ ছোঁয়া পেয়ে একটু পরেই সেও মেতে উঠল এই শরীরী খেলায়, লাকির কথা বেমালুম ভুলেই গেল সে।

পরেরদিন সকালে ঘুম ভাঙতে একটু দেরিই হল মিঠির। বাদল তখনও ঘুমোচ্ছে। ও বাদলকে ডাকতে যাবে এমন সময় ওর মনে পড়ল লাকির কথা। মনে পড়তেই ও পড়ি কি মরি করে আমগাছটার দিকে ছুটে গেল। 
 আমগাছটার কাছে গিয়েই ও অবাক। লাকি কোত্থাও নেই, তার জায়গায় আম গাছের নীচে রয়েছে একটা পুতুল। পুতুলটা হুবহু লাকির মতো দেখতে, এমনকি তার পরনের পোশাক, গয়না সবটাই লাকির মতো, এমনকি পুতুলটারও একরাশ লম্বা চুল লাকির মতোই।

দেখেই কেমন গা শিরশির করতে লাগল মিঠির। ওর হঠাৎ মনে হল, 'লাকিদিদি কি তবে পুতুল হয়ে গেল? কিন্তু তাই বা কিভাবে সম্ভব?'

তাড়াতাড়ি পুতুলটার কাছে গিয়ে ও দেখে, পুতুলটার কোলে রাখা রয়েছে একটা ভাঁজ করা কাগজ৷ কাগজটা তাড়াতাড়ি খুলল মিঠি, খুলেই কাগজে যা লেখা আছে সেটা সে পড়তে শুরু করল।

কাগজে লেখা আছে - 'মিঠি, আমি লাকি। কাল অনেক রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করেছি তোমার জন্য এই গাছতলায়, কিন্তু তুমি এলে না। যাই হোক, এখন দিনের আলো ফুটেছে, তাই আমি চললাম। রাতের অন্ধকারে যে রাস্তা হারিয়েছি, দিনের আলোয় নিশ্চয়ই সেই হারানো পথ আবার খুঁজে পাব, তাই না বলো? আর তোমাকে কাল যেটা দেওয়ার কথা বলেছিলাম, সেটা এই পুতুলটা। এই পুতুলটা কিন্তু যেমন তেমন পুতুল নয়, এর নাম লাকি ডল। নিশ্চয়ই ভাবছ, এটা তো আমার নাম, তাহলে পুতুলেরও কেন একই নাম বললাম? শোনো তাহলে। আসলে এই পুতুলটা হল যাদু পুতুল, এর কাছে তুমি যা চাইবে তাই পাবে। টাকা পয়সা, গয়না গাঁটি, গাড়ি বাড়ি যা চাইবে সেটাই পাবে। কিন্তু ভুলেও এই পুতুলের কথা যেন ঘুণাক্ষরেও কাউকে বলবে না, এমনকি বাদলকেও না,তাহলেই কিন্তু তোমার মনের ইচ্ছে আর পূরণ হবে না। এই যাদু পুতুল আবার কথাও বলতে পারে, তবে ওর কথা তুমি ছাড়া আর কেউ শুনতে পাবে না, বাদলও না। যাই হোক, আমি চললাম। তুমি পুতুলটাকে সাবধানে রেখো, কেমন?'

মিঠি হাঁ করে চিঠির লেখাগুলো গিলছিল। চিঠি পড়া শেষ হতেই সে পুতুলটাকে তুলে নিল, বলল, 'তুমি যে আমার আলাদীনের প্রদীপ, তোমায় যত্নে রাখব না, তা কি হয়?'
 
কিন্তু আনন্দিত হলেও মরমে মরে যাচ্ছিল সে নিজের আচরণে। যে লাকি তার এত বড়ো উপকার করল, সেই লাকি তার জন্য অপেক্ষা করা সত্ত্বেও সে আসেনি গতকাল রাতে।
তবে এই লজ্জা তার কেটে যেতে বেশিক্ষণ সময় লাগল না। একটু পরেই সম্বিৎ ফিরল তার,ভাবল পুতুলের কাছ থেকে বড়োলোকি খাবার চেয়ে নেওয়া যাক আগে।
সেই মতো সে পুতুলকে হুকুম করল, 'আমার আর বাদলের জন্য দুটো পিজ্জা আনার ব্যবস্থা করো দেখি!'
পুতুলটার ভেতর থেকে বেরিয়ে এল এক মোলায়েম নারী কন্ঠ, 'তথাস্তু।'

পুতুলকে এভাবে কথা বলতে দেখে প্রথমে একটু ভয়ই পেয়ে গেল মিঠি, কিন্তু সেই ভয়কে জোর করে ঠেলে সরিয়ে দিল ওর মনের ভেতর জমে ওঠা লোভের বুদবুদ।

হঠাৎই দরজার বাইরে থেকে কে যেন হাঁক দিল, 'ও মিঠি,ঘরে আছিস?
- 'হ্যাঁ আছি', বলে তাড়াতাড়ি দরজাটা খুলে মিঠি দেখে, পাশের বাড়ির সুতপামাসি।
- 'হ্যাঁ মাসি, বলো।'
- 'আর বলিস নে মিঠি আমাদের জামাইয়ের কান্ড। জামাই তো জানিস শহরের নামী ব্যবসায়ী তরফদার পরিবারের বাঁধা ড্রাইভার, ওর মাইনেও তেমন। ও ই কাল হঠাৎ অনেকগুলো পিজ্জা নিয়ে এসে হাজির। আমাদের বাড়িতে তো আছি দুই বুড়োবুড়ি, আমরা কি আর এত খেতে পারি বল্ দেখি? তাই তোদের দিয়ে গেলাম রে মা, তোরা জোয়ান মানুষ,  এসব তোদেরই খাওয়া মানায়, বলেই পিজ্জার প্যাকেটগুলো মিঠির হাতে ধরিয়ে দিয়েই সুতপা চলে গেল। মিঠি কতবার তাকে বাড়ির ভেতর আসতে বলল, কিন্তু সুতপা 'তাড়া আছে' বলে বেরিয়ে গেল।

পরবর্তী ভাগ পড়ুন : পঞ্চম পর্ব

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ