Advertisement

লাকি ডল (তৃতীয় পর্ব)

লাকি ডল
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী 
তৃতীয় পর্ব

- 'কি কান্ড বলো দেখি! এই তো দিব্যি সব ঠিকঠাক ছিল, এখন কোত্থেকে ঝড় উঠলো বলো দেখি! আকাশের যা অবস্থা মনে হচ্ছে এক্ষুনি বৃষ্টি আসবে।' মিঠি বলল, 'তাড়াতাড়ি পা চালাও বুঝলে মেয়ে, বৃষ্টি নামার আগেই বাড়ি ঢুকে পড়তে হবে!'

মিঠি আর মেয়েটি তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে বাড়ি ঢুকে পড়লো। বাদল তখনও ফেরেনি। আজ ওর ফিরতে একটু দেরিই হবে, কাজে বেরোনোর সময়েই বলে গেছে।
- 'এই নাও মেয়ে, জল খাও', বলেই এক গ্লাস জল দিল মিঠি মেয়েটির হাতে।

_________________________


একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ :  পড়ুন

_________________________


তৃষ্ণার্ত মেয়েটি ঢকঢক করে এক চুমুকেই গ্লাস খালি করে দিল।

মিঠি জিজ্ঞেস করল, 'হ্যাঁ গো মেয়ে, তুমি বা আমি আমরা কেউই তো একে অপরকে চিনিনা, তবে তুমি আমার নাম জানলে কি করে?'
- 'বাহ্, এ আর এমন কি কঠিন কাজ? আমি তোমায় চিনি, নামটাও জানি। অবশ্য এটা জানি যে তুমি আমায় চেনো না।'
- 'কি রকম?'
- 'তুমি রায়বাড়ির বাচ্চাটাকে দেখাশুনা করো, তাই না? ওই রায়দের দূর সম্পর্কের আত্মীয় হই আমি, কদিন আগেই রায়বাড়ির ওই বাচ্চাটার তিন বছরের জন্মদিন গেল না, ওইদিন আমিও নিমন্ত্রিত ছিলাম ওই বাড়িতে। সেদিনই তো তোমায় দেখলাম, তোমার নাম যে মিঠি সেটাও জানলাম।'
- 'ওহো এইবার সবটা পরিষ্কার হল আমার কাছে!' সলজ্জ হেসে মিঠি বলে, 'এদিকে আমায় দেখো! তোমায় চিনতেই পারিনি।'
- 'আরে দূর বোকা, অত গেস্ট এসেছিলো সেদিন, সবাইকে মনে রাখা সম্ভব নাকি?'
- 'এই দেখো, এত কথার মাঝে তোমার নামটাই তো জানা হল না! নাম কি তোমার?'
- 'আমার নাম লাকি, লাকি ডল।'
- 'তোমার পদবি ডল? এমন অদ্ভুত পদবি তো আগে কখনো শুনিনি!' অবাক মিঠি বলে উঠল। 
- 'কি আর করি মিঠি, সারনেম তো আর মানুষ শখ করে রাখে না! আমার নিজেরও খুব হাস্যকর লাগে, কিন্তু কি আর করব? সারাজীবন এটাকেই বয়ে বেড়াতে হবে!' দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেয়েটি। 
- 'আচ্ছা, তোমায় কি নাম ধরে ডাকব? লাকি দিদি বলে ডাকি?'
- 'আরে ধুস, আবার দিদি টিদি কেন? শুধু লাকি বলেই ডাকো না!'
- 'কি যে বলো, রায়বাড়ির আত্মীয় তুমি, তোমায় নাম ধরে ডাকব? না না, তা হয় নাকি? তোমায় আমি লাকি দিদি বলেই ডাকব।'
- 'আচ্ছা বেশ, তাই বোলো তুমি। আচ্ছা মিঠি, তোমার টাকার খুব প্রয়োজন, তাই না?'
- 'হ্যাঁ গো, সে তো বটেই, কিন্তু তুমি জানলে কি করে সেই কথা?'
- 'তোমার বড় দোষ কি জানো? বড্ড প্রশ্ন করো তুমি কথায় কথায়! ভেবেছিলাম তোমায় বেশ কিছু টাকা পাওয়ার বন্দোবস্ত করে দেব, কিন্তু এত প্রশ্ন করলে সেটা আর পসিবল না!'
- 'এই না না না!' মিঠি ব্যস্ত হয়ে পড়ল, 'আমি আর একটাও প্রশ্ন করব না গো, তুমি যা ব্যবস্থা করার করো না গো!'
লোভে মিঠির চোখ চকচক করতে লাগল। সেটা লক্ষ্য করে বাঁকা হাসল লাকি। হেসেই ওর ওড়নার গিঁটটা খুলে একটা ভাঁজ করা কাগজ দিল মিঠির হাতে, 'এটা লটারি টিকিট, দু'কোটির। শখের বশে কেটেছিলাম আর কি! কিন্তু এটা আমার প্রয়োজন নেই, তোমার প্রয়োজন আছে, তাই তুমিই এটা রাখো।'
মিঠি ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়েছে, তাই ও বাংলা আর ইংরেজি দুটোই পড়তে পারে মোটামুটি। ও পড়ে দেখল, সত্যিই লটারি টিকিট ওটা, প্রথম পুরস্কার দু'কোটি, দ্বিতীয় পুরস্কার আশি লাখ, আর তৃতীয় পুরস্কার পঞ্চাশ লাখ।
- 'কিন্তু লাকি দিদি, লটারিটা যে লাগবেই সেটা কি করে....'
- 'আবার প্রশ্ন?' কপট গাম্ভীর্য সহকারে বলল লাকি।
- 'খুব খুব ভুল হয়ে গেছে লাকিদিদি, আর এ ভুল হবে না!'
- 'হুম মনে থাকে যেন! আর শোনো, এই লটারির ফলাফল ঘোষণা হবে কালকেই, নিউজ পেপারের ফার্স্ট পেজের নীচের দিকটা ভালো করে খুঁজো, পেয়ে যাবে। আর হ্যাঁ আর একটা ইম্পর্ট্যান্ট কথা তো বলতেই ভুলে গেছি!'
মিঠি মনোযোগ দিয়ে শুনে যেতে লাগল। লাকি বলতে থাকে, 'ভুলেও আমার কথা কাউকে বলবে না, এমনকি তোমার বরকেও না!'
— 'সে কি গো? ওকেও বলব না?'
— 'না বলবে না! যদি আমার কথা তোমার আর আমার বাইরে এই দুনিয়ার আর একটা মানুষও জানে, তাহলে কিন্তু তোমার বড়োলোক হবার স্বপ্নটা স্বপ্নই থেকে যাবে, কোনোদিনও পূরণ হবে না, জেনে রেখো।'
— 'না না দিদিমণি, তোমার কথা আমি কাউকে বলব না গো, এই কথা দিলাম তোমাকে!'
— 'মনে থাকে যেন!'

হঠাৎই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ।
— 'ওই বাদল এল, যাই খুলে দিই দরজাটা।'
— 'মিঠি শোনো', লাকি ডাকল, 'আমি ওই গাছের আড়ালে  লুকোচ্ছি, বলেই আমগাছটার দিকে ইশারা করল লাকি, 'তোমার বর যখন খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়ে পড়বে, তখন তুমি এখানে এসো, তোমায় একটা জিনিস দেব আমি।'
— 'আরও একটা জিনিস!' মিঠির চোখে লোভের আগুন জ্বলতে থাকে।
— 'হ্যাঁ গো, আর সেই জিনিসটা এই লটারি টিকিটের চেয়েও দামী।'

লাকি আর দেরি না করে গাছের আড়ালে লুকোলো।

বাদল ভেতরে ঢুকেই বলল, 'কি ব্যাপার মিঠি? দরজা খুলতে এত দেরি হল কেন?'
— 'আরে কিছুনা', থতমত খেয়ে গেল মিঠি, 'ওই কাজ ছিল একটু।'
বাদল অবশ্য কিছুই সন্দেহ করেনি। ও হাসিমুখে বলল, 'এই দেখো মিঠি রাণী, কি এনেছি আজ!'
একটা প্যাকেট মিঠির হাতে দিয়ে ও বলে, 'এতে গরম গরম সিঙ্গারা আর জিলিপি এনেছি, চটপট বাটিতে বাড়ো দেখি!'
সরল মনে বাদল আজ মেলা থেকে মিঠির প্রিয় সিঙ্গারা আর জিলিপি এনেছিল। ও জানেই না তার মিঠি কতখানি বদলে গেছে! এই মিঠি আর আগের অল্পেই খুশি হওয়া মিঠি নেই, আজ সে টাকা দিয়ে সবটা বিচার করতে শিখেছে। তাই বাদলের আনা সিঙ্গারা আর জিলিপি গুলোকে তাচ্ছিল্যের নজরে দেখল ও। আজকের মিঠি আর এসবে খুশি হয়না, আজকের মিঠি খুশি হয় দামী কেক, পিজ্জা বার্গারে, যে ধরণের খাবার ও প্রায়ই খেতে দেখে রায়বাড়ি, চৌধুরীবাড়ির মতো বড়ো ঘরের মানুষদের।

পরবর্তী ভাগ পড়ুন : চতুর্থ পর্ব

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ