Advertisement

লাকি ডল (দ্বিতীয় পর্ব)

লাকি ডল
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
দ্বিতীয় পর্ব



- 'আরে বাবা আমি জানি কাত্তিকদার রোগের কথা, কিন্তু তুমিও একবার আমাদের কথা ভাবো! বছর দুই তিন হল বিয়ে হয়েছে, এবার তো একটা ছেলেপুলে আসবে ঘরে নাকি! তাকে কি এরকম অভাবে বড় করব আমি?'
- 'বাহ্ মিঠি, ভালো বললি তো! যে এখনও আসেনি তার জন্য যে আছে তাকে তিলে তিলে বিনে ওষুধে মরতে দিবি?'
- 'আরে দুর বাবা, আমার বরটার মতো সব সময় নীতিকথা শুনিয়ো না তো! এখন সরো দিকি, মেলা কাজ আছে আমার, তাছাড়া মল্লিকবাড়ির কাজ গেছে তো কি, অন্য বাড়ি খুঁজে নাও কাপড় কাচার জন্যে!'

_________________________


একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ :  পড়ুন

_________________________


- 'আর ন্যাকা সাজিস না মিঠি!' ঝাঁঝিয়ে উঠল বেনু, 'এক বাড়িতে কাজ চলে গেলে যে বদনাম রটে যায় তাতে করে আর সহজে কাজ পাওয়া যায়না অন্য বাড়িতে! মল্লিকবাড়ি আমায় ছাড়িয়ে দিল, এবার এটা চাউর হয়ে গেলে অন্য বাড়ি গুলোও বের করে দেবে আমায়, তখন তুই খরচ যোগাস আমার ঘরের রুগীটার!'
- 'উফ, মেলা বকবক করোনা দিকি, সরো এখন!' বিরক্তমুখে চলে এলো মিঠি নিজের বাড়িতে।

পরের দিন সকালে কাজে বেরোনোর পথে সরলার সাথে দেখা। টোন কেটে সে বলল, 'রায়বাড়ির খোকাবাবুর দেখাশুনার দায়িত্ব তুই নিয়েছিস শুনলাম। ভালোই পয়সা বুঝতে শিখেছিস দেখছি!'
- 'হ্যাঁ এবার বেনুদির মতো তুইও জ্ঞানের ঝাঁপি খুলে বোস সকাল সকাল! শোন, কাজ পেতে না দম লাগে, সেই দম তোদের নেই বলে জ্বলছিস! হুঁহ!' মুখ ঘুরিয়ে মিঠি চলে এলো সেখান থেকে।

এভাবে যাদের কাজ চলে গেছে মিঠির জন্য, সকলেই মিঠিকে কথা শুনিয়েছে মুখোমুখি হতেই, কিন্তু ও পাত্তা দেয়নি সেসব কথায়, বরং নিজের মনে গজগজ করেছে, 'যত্তসব! কার বরের অসুখ, কার মেয়ের বিয়ে, কার ছেলের ইস্কুলের খরচাপাতি সেসব নাকি এই মিঠি রানীকে জোগাড় করে দিতে হবে! কেন রে বাপু তোদের হাত নেই? পা নেই? একটা কাজ চলে গেছে বলে অন্য একটা জোটে না যাদের, তাদের আর বাইরে বেরিয়ে খেটে খাবার দরকার নেই! যত্তসব!'

আঁচলটা ভালো করে কোমরে জড়িয়ে চা বসায় ও।

হঠাৎ পিছন থেকে মিঠির চোখদুটো চেপে ধরে দুটো পুরুষালি হাত।
- 'বাদল, এখন ইয়ার্কি মেরো না, হাতদুটো সরাও, মেলা কাজ আছে আমার এখন!'
- 'মিঠি, তোমার জন্য একটা জিনিস এনেছি, দেখলেই একদম চমকে যাবে তুমি!'
- 'উপহার এনেছ আমার জন্য? কি এনেছো দেখাও না!'
- 'মিঠি জানো, আজকে ফেরার পথে দেখি উত্তরের মাঠে বিশাল মেলা বসেছে, দেখো সেখান থেকে কি কিনে এনেছি আমি তোমার জন্য,' বলেই বাদল একটা কাগজের প্যাকেট বের করল, 'এটা খুলে দেখো।'
মিঠি সোৎসাহে খুলে দেখে, এক গোছা লাল কাচের চুড়ি। উপহারটা দেখে উৎসাহে কিছুটা ভাঁটা পড়ল তার, তবে সেটা প্রকাশ করল না সে বাদলের সামনে।
- 'লাল চুড়ি তোমার কত্ত প্রিয় বলো তো হুম?' বলেই বাদল চুড়িগুলো পরম যত্নে পরিয়ে দিল তার প্রিয়তমার হাতে, 'কি মিঠি, পছন্দ তো?'
- 'হ্যাঁ গো, দারুন পছন্দ হয়েছে আমার।' কাষ্ঠ হেসে মিঠি বলল।
'দাঁড়াও, এখানেই শেষ নয়, আরও একটা জিনিস আছে', বলেই দুটো পলাশ ফুল বের করল ও, 'এই দুটো ফুল চুলে লাগালে তোমায় আরও সুন্দর দেখাবে।'
বাদল ফুলদুটো মিঠির খোঁপায় আটকে দিল। মিঠি ওপরে ওপরে হাসল তবে ভেতরে বিশেষ উৎফুল্ল হল না ও।

কেটে গেল কয়েক মাস। মিঠি একদিন সন্ধ্যেতে বেশ খুশি মনে বাড়ির পথে ফিরছিল, কারণ এ মাসে বেশ ভালো রোজগার হয়েছে তার। ওদের বাড়ি ফেরার পথে একটা বড়ো দীঘি পড়ে, আর দীঘিটা পেরিয়েই বাঁশ ঝাড়। দীঘিটা পেরিয়ে মিঠি যখন বাঁশঝাড়টার পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, হঠাৎ এক মৃদু নারীকন্ঠ শুনতে পেল ও। শুনতে পেল, একজন মেয়ে তাকে ডেকে বলছে, 'মিঠি! মিঠি!'

মিঠি চমকে ফিরে তাকাল, কিন্তু কাউকেই দেখতে পেল না। ভুল শুনেছে ভেবে ফিরে যাচ্ছিল ও, হঠাৎ আবার মৃদু কণ্ঠে সেই ডাক।
এবারে মিঠি বেশ ভয় পেয়ে গেল, ডাকটা বাঁশঝাড়ের দিক থেকে আসছে।
- 'ওরে বাবা রে! বাঁশঝাড়ে তো রাতের বেলায় তেনারা থাকেন!' মনে মনে ভেবে ভয় পেয়ে মিঠি আর পিছন না ফিরে তাড়াতাড়ি হাঁটতে গেল, হঠাৎ কে যেন ওর আঁচল টেনে ধরল।
- 'ও বাবা গো! আমায় যেতে দাওনা গো!' ভীষণ ভয়ে পিছনে তাকিয়েই অবাক হয়ে গেল ও।
মিঠি ফিরে দেখে, এক সুন্দরী যুবতী তার আঁচল ধরে টানছে। তার পরনে নীল ঘাঘরা, নীল ব্লাউজ আর গোলাপি ওড়না। সেই সাথে সে পরে আছে দামী অলংকারও। সোনার নেকলেস গলায়, কপালে সোনার টিকলি আর সেই সাথে দুহাতে সোনার বলা, আর পায়ে চকচকে পাম্পসু। আর সেই সাথে একরাশ খোলা লম্বা চুল, দেখলেই বোঝা যায় অনেক বড় ঘরের মেয়ে ও।
- 'ও কি গো মেয়ে, কে তুমি? আর ভর সন্ধ্যেবেলায় এখানে কি করছ?'
- 'আর বোলোনা গো, অন্ধকারে পথ হারিয়েছি আমি। অনেক চেষ্টা করেও সঠিক রাস্তাতে আর ফিরতে পারলাম না', দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেয়েটি বলে, 'তেষ্টায় গলা শুকিয়ে যাচ্ছে গো, একটু জল খাওয়াবে?'
- 'হ্যাঁ হ্যাঁ তুমি এসো না, আমার বাড়ি এই তো সামনেই। চলো।'
- 'একটা অচেনা অজানা মেয়েকে নিজের বাড়ি নিয়ে যাবে? পরে কোনো সমস্যায় পড়লে?'
- 'ধুস, সমস্যা আবার কি? কিচ্ছু হবেনা, চলো দিকি!'
- 'শেষবারের মতো বলছি, ভেবে নাও। পরে আফসোস করলে কিন্তু আমায় দোষ দেবে না!'
- 'আরে ধুর, এমন সুন্দর লক্ষীপ্রতিমার মতো মেয়ে, তার জন্য আমার অসুবিধে হবে? না না, ওসব তুমি ভেবোনা, আর তাছাড়া তুমি রাস্তা হারিয়েছ, একা মেয়েমানুষ রাতটা রাস্তায় কাটাবে নাকি? মেলা বোকোনা তো আর, চলো এখন!'
- 'বেশ, চলো।'

মিঠি মেয়েটার হাত টা ধরল, আর তখনই হঠাৎ আকাশ কালো মেঘে ছেয়ে গেল, আর ভীষণ জোরে বাতাস বইতে লাগলো, আর শুরু হল মেঘগর্জন।

পরবর্তী ভাগ পড়ুন : তৃতীয় পর্ব

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ