লাকি ডল
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
প্রথম পর্ব
- 'ধুস, আর ভালো লাগেনা ছাই! গরিব মানুষ বলে মাইনেটা পর্যন্ত ঠিক সময়ে দেবেনা, আবার চাইতে গেলে কথা শোনাতেও ছাড়বেনা! কেন যে বেঁচে আছি ছাই কে জানে!'
- 'কি হলো কি মিঠি? চাঁদমুখে আজ হাসি নেই কেন?' জিজ্ঞেস করলো মিঠির বর বাদল।
- 'কি করে হাসি থাকবে বলো? রোজ আধপেটা খেয়ে থাকি কোনো রকমে, আর যাদের বাড়ি কাজ করি, তারা সব কত্ত পয়সাওয়ালা, রোজ রোজ কত খাবার ফেলা যায়, না ফেলে তো আমাদের দিতে পারে নাকি? দুটো ভালোমন্দ খেতে তো আমাদেরও মন চায় নাকি! আচ্ছা সে নয় না ই দিক, অন্তত মাইনেটা তো সময়ে দিতে পারে! সে ও দেবেনা! ধ্যার!'
- 'মিঠি, এটা ঠিক যে আমাদের হয়তো অত পয়সা নেই, বড়ো বাড়ি নেই, খাওয়া বলতে ওই শাক-নুন-ভাত, মাঝেমধ্যে টাকা জমিয়ে মাছ খাওয়া হয়, আর বাড়ি বলতে ওই এক খানা দরমা দেওয়া মাটির ঘর, সবই বুঝি আমি। কিন্তু মিঠি, আমাদের ঘরে যে সুগন্ধি ফুলের মতো ভালোবাসা আছে, গভীর দীঘির মতো শান্তি আছে, আছে রঙিন প্রজাপ্রতিটার মতোই জীবনীশক্তি। আমাদের এই এক ফালি ঘরে অভাব আছে, অনটন আছে, কিন্তু অশান্তি নেই, ঝগড়া নেই, নেই কোনো প্রতিযোগিতা, নেই কোনো রেষারেষি, আছে দিন শেষে কথা বলার মানুষ, আছে শান্তির ঘুম। এটুকুই যে সব মিঠি।'
- 'হ্যা সেসব বুঝলাম, কিন্তু যদি অনেক টাকা থাকত আমাদের, দেখতে এইসব কিছু আরও সুন্দর হয়ে ধরা দিতো আমাদের কাছে।'
- 'সত্যি মিঠি? টাকা দিয়ে সব কেনা যায়? তাহলে তুমি যে চৌধুরী বাড়িতে কাজ করো সেই বাড়ির বড়ো মেয়ে আত্মহত্যা কেন করল গত মাসে? ওর তো বাপের বাড়ি অত বড়োলোক, বিয়ে হলো আরও বড়োলোক পরিবারে, তাহলে বিয়ের একমাসের মাথাতেই কেন এই পথ বেছে নিতে হলো ওকে মিঠি? জবাব দাও!'
- 'আরে বাবা ওর তো শুনেছি বরের স্বভাব চরিত্র নাকি ভালো ছিলোনা, অনেক মেয়েমানুষের সাথে মেলামেশা ছিল, গিনি দিদিমনি এসব জানতে পেরেই নাকি....'
- 'তাহলে মানছ তো যে টাকা থাকলেই শান্তি আসেনা? শোনো মিঠি, তুমি জানোই না, আমাদের যা আছে সেটাই কত বড়ো বড়ো মানুষরা পাবে বলে কত কিই না করে বেড়ায়!'
- ' আরে হ্যাঁ তা তো আমি জানি....'
- 'শোনো মিঠি, তুমি সারাদিন খেটেছ অনেক, এখন তোমার বিশ্রামের দরকার। এসো আমি তোমার কপালে হাত বুলিয়ে দিই।'
বাদল হাত বুলোতে থাকে মিঠির কপালে। অচিরেই মিঠির দু চোখে ঘুম নেমে আসে।
ঘুমের মধ্যে এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখল মিঠি। দেখল এক বড়ো দালানের মতো বাড়িতে আছে ও আর বাদল। মিঠির পরনে দামী ঢাকাই জামদানী, ঠিক যেরকম শাড়ি সেদিন ও দেখেছিল মল্লিক বাড়ির নতুন বৌয়ের পরনে। আর গলায় সেই দামী হীরের নেকলেসটা, যেটা ও সেদিন দত্তদের বাড়িতে যখন টিভি চলছিল, তখন গয়নার বিজ্ঞাপনে দেখেছিল। আর বাড়িটা? রাজবাড়ির চেয়ে কোনো অংশে কম নয়, আর বাদলের পরনেও দামী জামা কাপড়। শুধু তাই নয়, যেসব অবস্থাপন্ন বাড়িতে ও কাজ করে, তাদের বাড়ির মতোই দশ বিশটা কাজের লোক ও মহিলা ও ঘুরে বেড়াচ্ছে বাড়িতে। মিঠি যেমনভাবে নির্দেশ দিচ্ছে, সেভাবেই কাজ করছে তারা, আর সে দামী পালঙ্কের নরম বিছানায় বসে আরামে টিভি দেখছে একমনে। হঠাৎ বাদলের গলা শোনা গেলো পাশের ঘর থেকে, ও বলছে, 'মিঠি এইবার ওঠো বিছানা থেকে, অনেক বেলা হল যে, তোমায় কাজে বেরোতে হবে না?'
- 'না, আমি এখন বসে টিভিতে সিনেমা দেখব, কোনো কাজ ফাজ করতে পারবোনা এখন!'
- 'মিঠি, ঘুমের ঘোরে কিসব আবোলতাবোল বকছ তুমি? কোথায় টিভি? মিঠি ওঠো, অনেক বেলা হল!'
মিঠির ঘুম ভাঙলো বাদলের হাঁকডাকে, উঠেই মিঠি করুণ স্বরে বলল, 'যাহ, এটা স্বপ্ন ছিল? দূর বাবা ভাল্লাগে না!'
গোমড়া মুখে মিঠি উঠে পড়ল ঘুম থেকে, তারপর চা বানিয়ে বাদলকে দিয়ে নিজেও বসল চা খেতে।
- 'কি মিঠি রানী, ঘুমের মধ্যে কি টিভির স্বপ্ন টপ্ন দেখছিলে নাকি?' মুচকি হেসে বলল বাদল।
- 'আর সেসব শুনে তোমার কি হবে? এজন্মে আর ওই স্বপ্নটা সত্যি হবে বলে মনে হয়না!'
- 'মিঠি,' গম্ভীর গলায় বলল বাদল, 'কদিন ধরেই দেখছি তুমি বড্ড টাকার মোহে পড়েছ! কিন্তু মিঠি, মানুষের অতিরিক্ত চাহিদা কিন্তু বিপদ ডেকে আনে, এটা মাথায় রেখো।' চায়ের কাপটা জলের কলের কাছে নামিয়ে রেখে বলল বাদল, 'যাক গে, আমি আসি। তুমিও তৈরী হয়ে বেরিয়ে পড়ো চটপট, কেমন?'
বাদল কাজে বেরিয়ে গেল। মিঠি মুখ বেঁকিয়ে বলল, 'ধুস ছাই! এই লোকটাও হয়েছে এক! কোনো বড় ইচ্ছে নেই, বেশি টাকা কামানোরও মুরোদ নেই, আছে খালি একপেট বড় বড় জ্ঞান দেবার ক্ষমতা! অরে বাবা জ্ঞান শুনে তো আর দিন চলে না, সুখের জন্য চাই টাকা, আরও অনেক অনেক টাকা! কিন্তু সেটা এই লোকটা শুনলে তো!'
- 'কি হয়েছে? মাইনে বাড়াব? কোন দুঃখে শুনি?' মল্লিক গিন্নি মুখ বেঁকিয়ে বললেন।
- 'গিন্নিমা, তোমাদের বাড়িতে বাসন কোসন মাজার জন্যি আমায় রেখেছ, আর কাপড় কাচার জন্যি ওই বেনুদিকে রেখেছ! তা তার কাপড় কাচার নমুনা আমি নিজের চোখে দেখেছি হুঁ, ওটাকে আর যাই হোক কাপড় কাচা বলেনা। আমি বলি কি তার চেয়ে তুমি ওই অকর্মার ঢেঁকিটাকে ছাড়িয়ে আমায় কাপড় কাচার কাজে একবার লাগিয়ে দেখো, কথা দিচ্ছি নিরাশ করবনি গো!'
- 'এটা অবশ্য তুই মন্দ বলিসনি, তবে শোন আমার একটা শর্ত আছে।'
- 'কি শর্ত গিন্নিমা?'
- 'তুই বাসন মাজার জন্যে পাস হাজার, আর কাপড় কাচার জন্যে বেনু পায় হাজার। তোকে কিন্তু বাপু দু'হাজার দিতে পারবোনা, তোকে আঠারোশো দেব, চলবে তো?'
- 'হ্যাঁ হ্যাঁ গিন্নিমা, খুব চলবে।'
- 'বেশ, তাহলে পরের মাস থেকেই লেগে পড়, কেমন?'
মনে মনে বড্ড আনন্দ পায় মিঠি। এইভাবে যদি ও পাঁচটা বাড়িতেও আট-নয়শো বেশি পায় তাহলেও তো অনেকটা বেশি টাকা আসে সংসারে। কিন্তু সেটা বাদল বোঝে না! ও অল্পেই খুশি!
এইভাবে রায়বাড়িতে দু'বছরের ছেলেটার দেখভালের দায়িত্ব, চৌধুরী বাড়িতে রান্নার দায়িত্ব, দত্তবাড়ির বুড়োকত্তামার সেবার দায়িত্ব এরকম বেশ কিছু বাড়িতে বাড়তি কাজ নিয়ে মিঠি বড্ড খুশি মনে বাড়ি ফিরছিল আজ, হঠাৎই রাস্তায় বেনুর সাথে দেখা। ম্লান হেসে বেনু বলল, 'কটা টাকা বেশি পাবি বলে এইভাবে আমার বাঁধা কাজটা খেয়ে নিলি মুখপুড়ি? জানিস না আমার বরের ক্যান্সার, চিকিৎসার জন্যে কত্ত খরচা! সবটা জেনেও তুই কিনা! এত লোভী তুই মিঠি?'
পরবর্তী ভাগ পড়ুন : দ্বিতীয় পর্ব
0 মন্তব্যসমূহ