সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
কৃষ্ণার মাঝেমাঝেই মনে হয়,
সে জন্মে ক্ষমাহীন অপরাধ করে ফেলেছে,
একে মেয়ে, তায় কৃষ্ণবর্ণা!
তার দিদি অবশ্য এমনটি নয়,
দিদির চামড়া ধবধবে, তাই ঠাকুমা ভালোবেসে নাম দিল গৌরী,
যতই ফর্সা সুন্দরী হোক গৌরী, তবু মেয়ে তো?
একটা ছেলে না হলে এত সম্পত্তি সামলাবে কে?
দ্বিতীয়বার যখন গৌরীর মা গর্ভবতী হল,
সকলে ভাবল এবার গোপাল আসবে বুঝি,
কিন্তু সকলকে হতাশ করে জন্ম নিল কৃষ্ণা,
একে মেয়ে, তায় কালো! মাথায় হাত পড়ল বাপ-ঠাকুর্দা-ঠাকুমার,
এমনকি অভাগীর মাও ভ্রূ কুঁচকালো,
বাড়িতে বড় মাছের টুকরোটা, পার্বণের সময় দামী জামাটা গৌরীর ভাগে পড়ল,
বাড়ির এহেন বৈষম্যে গৌরীও তাচ্ছিল্যের নজরে দেখতে লাগল বোনকে,
বয়স যতই বাড়তে লাগল, কৃষ্ণার মেধার কুঁড়ি ততই ফুল হয়ে ফুটতে লাগল,
গৌরী কোনোরকমে কলেজ পাশ করে পালিয়ে বিয়ে করল,
অন্যদিকে কৃষ্ণা পা বাড়াল উচ্চশিক্ষার পথে,
মেয়ের মেধা দেখে বাপ-ঠাকুর্দার মন কিছুটা গলল বটে,
তবু মহিলামহল তাকে তাচ্ছিল্যের চোখেই দেখতে লাগল,
কি হবে মেয়েমানুষের অত পড়ে? অমন মেয়েকে বিয়ে করবে কোন্ পাত্র শুনি?
গৌরীর প্রতি সদয় মা-ঠাকুমার অনুরোধে বাপ ফিরিয়ে আনল মেয়ে আর নেশাখোর জামাইকে,
ঘর জামাই করে রাখা হল তাকে,
কৃষ্ণা এক নামকরা কোম্পানিতে চাকরির সুযোগ পেল,
ততদিনে তার জন্য পাত্র খোঁজা শুরু হয়েছে,
তাদের বাবা এক পাত্র খুঁজে নিয়ে এলেন, সেও বড় চাকুরে, নাম রণিত,
রণিতের আগে এক প্রেমিকা ছিল প্রমিতা,
সে রণিতকে ভালোবাসি ভালোবাসি বলেও বিয়ের আগের দিন অন্য একজনের সাথে পালিয়েছিল,
কৃষ্ণাকে পেয়ে আগেরবারের ক্ষত অনেকটাই সেরে উঠেছিল তার,
তবু সন্দেহবাতিক মানসিকতা বড় ভয়ঙ্কর,
কৃষ্ণাকে ভালোবাসলেও সন্দেহ হত মাঝে মাঝেই তার ওপর,
ভাবত যদি প্রমিতার মতো সেও ঠকায় কোনোদিন তাকে!
কোনো দিন কাজের চাপে অফিস থেকে ফিরতে রাত হলেই রণিত শুরু করত চিৎকার চেঁচামেচি,
মাঝেমাঝেই রণিতের এমন অত্যাচারে পাগল হয়ে উঠত সে,
তবু বাপেরবাড়িতে তো মুখ খোলার যো নেই,
কারণ কৃষ্ণার বাপেরবাড়ির মতে, যে অমন কালো মেয়েকে বিয়ে করে সে অনেক বড় মনের,
তাই রণিতের কোনো দোষই থাকতে পারেনা বলে ভাবেন তারা,
দোষ যদি হয়ও তা হল কৃষ্ণার মানিয়ে নেওয়ার অক্ষমতা,
তবে অফিসে এক কলিগ কুনাল ছিল কৃষ্ণার খুব ভালো বন্ধু,
তাই দুঃখের কথা সে রণিতের চেয়ে বেশি কুনালের সাথে শেয়ার করত,
দিনটা ছিল দীপাবলির আগের দিন,
কাজের চাপে অফিস থেকে বেরোতে প্রায় সাড়ে দশটা বেজে গেল কৃষ্ণার,
হঠাৎই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি শুরু হল,
অটোও পাচ্ছিল না সে বৃষ্টির মধ্যে,
হঠাৎ কুনাল তার গাড়িটা নিয়ে এসে বলল, চলো আমি তোমায় পৌঁছে দিই,
কৃষ্ণা প্রথমে আপত্তি করলেও পরে সে রাজি হয়,
কৃষ্ণাকে অন্য একটি ছেলের সাথে ফিরতে দেখে রণিতের সন্দেহ চরমে পৌঁছায়,
কুনাল চলে যাওয়ার পরেই রণিত কৃষ্ণাকে বাড়ি থেকে চলে যেতে বলে,
— 'এত রাতে আমি কোথায় যাব রণিত? আর কি অন্যায় করেছি যে তুমি এমন ব্যবহার করছ?'
— 'কেন জানো না? কুনালের সাথে যে পরকীয়া চলছে তা কি আমি জানিনা ভাবো?'
— 'রণিত!' চরম ঘৃণায় তার গালে চড় মারে কৃষ্ণা,
কোনোরকমে ব্যাগ গুছিয়ে নিয়ে রওনা দেয় সে বাপের বাড়ির উদ্দেশ্যে,
কিন্তু পৃথিবীর বুকে সে সন্তান বড় অভাগা যে তার মা বাবাকে পাশে পায়না সংকট কালে,
তাই বাড়ির সকলের কাছে কথার শরে বিদ্ধ হল সে,
রণিতের সন্দেহকে সত্যি বিশ্বাস করে তাঁরা কাদা ছুড়লেন কৃষ্ণার দিকেই,
লজ্জায় ঘেন্নায় কালো মেয়ে ছুটে চলল গঙ্গার ঘাটের দিকে,
এমন কলঙ্কিত জীবন সে আর রাখবে না,
এক পা এক পা করে নামতে লাগল সিঁড়ি বেয়ে,
আস্তে আস্তে জল তার হাঁটু, কোমর, শেষে গলা পর্যন্ত গ্রাস করে নিল,
মুখ, নাক, চোখও আস্তে আস্তে জলের নীচে চলে গেল,
এরপর আর কিছু মনে নেই তার,
হঠাৎ এক আলো আঁধার ঘরে জ্ঞান ফিরল তার,
ঘরটা অন্ধকার, আর চারিদিকে প্রদীপ জ্বলছে,
তাড়াতাড়ি বিছানায় উঠে বসল সে,
তবে কি মৃত্যুর পরের জগতটা এমনই?
শান্ত, স্নিগ্ধ, নিবিড়?
হঠাৎ কুনালের প্রবেশ ঘরে,
— 'তুমি এখানে?'
— 'আত্মহত্যা করা কি অতই সোজা ম্যাডাম?'
— 'তুমি আমায়...'
— 'হ্যাঁ আমি তোমায় বাঁচিয়েছি, তোমার জীবনের যত অন্ধকার সবটা গঙ্গায় বিসর্জন হয়ে গেছে।'
— 'কিন্তু....'
— 'দীপাবলি কাল, প্রদীপের আলোর মতো তুমিও আলো নিয়ে এসো আমার ঘরে কৃষ্ণা, আসবে তো?'
কৃষ্ণার হাসিমুখ সায় দেয় কুনালকে।
2 মন্তব্যসমূহ
অসম্ভব ভালো লাগলো পড়ে..... অসাধারণ লেখনী সুচি ❤️❤️❤️❤️❤️❤️
উত্তরমুছুন🤗🤗🤗🤗💘💘💘💘💘
মুছুন