অষ্টম পর্ব
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
রবি বেশ কিছুক্ষণ বসে ছিল তারপর নদীর পাড়ে।আস্তে আস্তে সন্ধ্যে নামল।রবি এতক্ষণে অনেকটা সামলে নিয়েছে নিজেকে,সে উঠে পা বাড়াল হোস্টেলের দিকে।মনে মনে সে স্থির করল,সাগরিকাকে ভুলে যাবে সে,কারণ সাগরিকা এখন তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু অভ্রর,তাই আজ থেকে আর সাগরিকাকে প্রেমিকা হিসেবে ভাববে না রবি।এসব ভেবেই রবি এগোচ্ছিল হোস্টেলের পথে একটু অন্যমনস্কভাবে,হঠাৎই এক মহিলার সাথে ধাক্কা লাগল তার,আর মহিলাটি রবির হাতে একটা কাগজ গুঁজে দিয়েই তাড়াতাড়ি চলে গেল।মহিলার পরনে বোরখা ছিল,আর তার মুখটাও ঢাকা ছিল বোরখায়,তাই রবি মহিলার মুখ দেখতে পেল না।আচমকা এই ঘটনায় যথেষ্ট চমকে গেল রবি।সে হাতের মুঠো খুলে দেখে একটা চিঠি।রবি তাড়াতাড়ি চিঠিটা ব্যাগে ভরে নিয়েই এগিয়ে গেল হোস্টেলের দিকে।
রবির হোস্টেলে রুমমেট ছিল দু'জন,কিন্তু আজ তারা কেউই ঘরে ছিল না,কারণ বাড়ি গিয়েছিল তারা।
রবি ঘরের আলোটা জ্বালিয়ে চিঠিটা পড়তে লাগল।চিঠিতে লেখা,
'ভাই রবি,আমি তোর হেনাদি রে।জানি তুই এতদিন ধরে আমায় অনেক খুঁজেছিস,বস্তিতেও গেছিস আমার খোঁজে,পার্বতীমাসি নিশ্চয়ই সবটা বলেছে তোকে।আর তুইও পার্বতীমাসির সব কথা সত্যি বলে মেনেছিস!কিন্তু পার্বতীমাসি তোকে ঠিক কথা বলেনি,আসলে মাসির কোনো দোষ নেই রে রবি,আমি মাসিকে যা বুঝিয়েছি মাসি সেটাই তোকে বলেছে,বলেছে যে আমার বরের অত্যাচার-উৎপাতের ভয়েই আমি মেয়েকে নিয়ে ঘরছাড়া হয়েছি,কিন্তু এটা সম্পূর্ণ ভুল,মিথ্যে।আসল সত্যিটা কেউ জানে না,জানি শুধু আমি আর রাণী,আর আরও একজন জানে,তা হল অভ্র।অভ্রর নামটা শুনে নিশ্চয়ই অবাক হচ্ছিস তুই,কিন্তু এটাই সত্যি।এই সত্যিটা তোকে জানাতে বড্ড দেরি হয়ে গেল রে,আরও আগে জানানো উচিত ছিল।
রবি তোর মনে পড়ে সেই রাতের কথা,যেদিন তুই দেখেছিলি আমি ছেঁড়া শাড়ি পরে চোখেমুখে ভয় নিয়ে পালাচ্ছিলাম,সেদিনই আমাদের ভাইবোনের শেষ দেখা।বিশ্বাস কর রবি,সেদিন আমার বর আমায় মারেনি,ভয়ও দেখায়নি,হয়ত লোকটা এজন্মে আমায় ভালোবাসল না,সংসার করল না আমায় নিয়ে,অন্য মেয়েমানুষ নিয়ে আমার ঘর ছেড়েছে সে,নেশা টেশাও করত,ছাইপাস গিলত,কিন্তু কখনো আমার গায়ে হাত তোলেনি রে,এজীবনে তুলবে বলেও বিশ্বাস করিনা।তার মেয়েকে সে আজও ভালোবাসে রে,মাঝেমধ্যে টাকা পাঠাত আমাদের মা-মেয়েকে,যদিও সে টাকা কখনো নিই নি আমি,ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছি,কিন্তু যাক সেসব কথা।আসল কথায় আসি,সে রাতের কথায় আসি।রবি তোর মনে আছে ভাই,সেই রাতে অভ্রদের ফ্লাটে পাটি না কি যেন বলিস তোরা,যেখানে ছেলে মেয়ে সব একসাথে নাচে,ছাইপাস গেলে,তারপর রাতে খাওয়াদাওয়া করে নেশার ঘোরে বাড়ি ফেরে সেই অনুষ্ঠান হচ্ছিল।অভ্র আমায় বলল আমায় আর রাঁধতে হবে না সে রাতে,কিসব পিজ্জা অর্ডার করেছে রাতে খাবে বলে,বলল,'হেনাদি তুমিও রাতে খেয়ে যেও,রাণীর জন্যও নিয়ে যেও।' তা আমি সেকথা শুনে খুব খুশি মনে রান্নাঘরে গেলাম,কফি করতে বলেছিল ও ওদের বন্ধুদের জন্য,আনন্দ মনে কফি বানাচ্ছিলাম।তারপর কফি বানানোর পর সবাইকে দিতে গেলাম যেই রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে,অভ্র হঠাৎ ওর ঘরে ডাকল।কিছু হয়ত কাজ আছে সেকথা ভেবে যেই ঘরে গেলাম,অমনি আমায় ঘরে একরকম টেনে নিয়েই দরজার ছিটকিনি বন্ধ করে দিল অভ্র।ঘরে অভ্রর ছেলেবন্ধুগুলোও সবাই ছিল।আমি অবাক হলাম বেশ,কিন্তু কিছু বলার আগেই অভ্র আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল বিছানায়,তারপর বলল 'শাড়ি খুলে ফেলো চটপট।' এতক্ষণে আমি ওর আসল মতলব টের পেলাম,তাড়াতাড়ি বিছানা থেকে নেমে পালাতে যাব হঠাৎ অভ্র আমার আঁচল টেনে ধরল,একটানে শাড়ি খুলে নিল আমার,তারপর দাঁত বের করে হাসতে হাসতে পাষণ্ডটা বলল,'পালাতে চাইছিলে না?এইবার পালিয়ে যাও!' আমার চোখে জল এসে গেছে তখন,কাঁদতে কাঁদতে বললাম,'শাড়িটা ফেরত দাও ভাই,আমি তোমায় এতদিন ভাইয়ের মতোই দেখে এসেছি,সেই সুন্দর সম্পর্কটা এভাবে শেষ কোরোনা।' কিন্তু অভ্র হেসে বলল,'দেব তো!শাড়ি ফেরত দেব!আগে আমার মনের ইচ্ছেটা পূরণ করো!' আমি চেঁচিয়ে উঠে বললাম,'একটা মেয়েমানুষের মান ইজ্জত নিয়ে এভাবে টানাটানি করছিস কাপুরুষের বাচ্চা!' সে তখন আরও হেসে বলল,'তোমার মান ইজ্জতের কথা ভাবি বলেই তো বলছি হেনাসুন্দরী!আমার কথামতো চললে তোমার মান ইজ্জত বন্ধ দরজার আড়ালে যাবে,কিন্তু না শুনলে গায়ে যেটুকু পোশাক আছে ওটুকুও কেড়ে নেব,তারপর রাস্তায় টেনে বের করে দেব,তখন আমার মতো হাজারটা কাপুরুষ এসে খোলা রাস্তাতেই!' বলেই হাসতে লাগল জানোয়ারটা,আর ওর আর এক ইতর বন্ধু আছে না,প্রীতম না কি বেশ নাম,সে এগিয়ে এল,বলল,'কি ঠিক করলে হেনাসুন্দরী?তাহলে কি বাকি পোশাকগুলো কেড়ে নেব?'
অভ্র নেশার ঘোরে প্রীতমকে চেঁচিয়ে বলল,'শালা!আমার বাগানের ফুল,তার মধু আমার আগে তুই খাবি?'
প্রীতম রাক্ষসের মতো হেসে বলল,'সরি বস!তুইই আগে যা!'
তারপর কি হল তা নিশ্চয়ই তুমি বুঝতে পারছ ভাই!অভ্র আর তার পুরুষবন্ধুগুলো মিলে সে রাতে আমায়!কি বীভৎস অত্যাচারটাই চলেছে আমার ওপর!তারপর সবটা মেটার পর অভ্র চেষ্টা করেছিল আমায় মদ গেলাতে বারবার,কিন্তু আমি খাইনি,গ্লাসের মদ ছুড়ে দিয়েছিলাম অভ্রর দিকে।অভ্রর চোখ লাল হয়ে গেল রাগে,সে আর তার বন্ধুরা মিলে কি মারটাই না মারল সেদিন আমায় ভাই রবি!তারপর অভ্র বলল,'জানিস তো আমার বাবা কে?পুলিশ,মন্ত্রীমহলের সাথে বাবার ঘনিষ্ঠতা কারোর অজানা নয়।কিছুই করতে পারবি না থানায় গিয়ে,তার চেয়ে যদি নিজের মেয়েটাকে বাঁচাতে চাস,তাহলে এ শহর ছেড়ে অনেক দূরে চলে যা,রবি যেন কোনোদিন তোদের টিকিটিও না দেখতে পায়,আজকের রাত যেন শুধু আমাদের মধ্যেই থাকে,বাইরে গেলেই তোর মেয়েটাকেও তুলে এনে তোর মতোই ভোগ করব!'
তাই আমি বাধ্য হয়ে সে রাতেই বস্তি ছেড়েছি মেয়েকে নিয়ে,আর অভ্রর কথাতেই আমার বরটাকে আসামী বানিয়েছি সবার সামনে,অথচ বিশ্বাস কর রবি,সেই লোকটা এসবের কিছুই জানে না!
যাই হোক রবি,দিদি হিসেবে এটাই বলব,অভ্রর থেকে দূরে থাক,ও বড়ো সাংঘাতিক ছেলে,কালসাপ,কোন্ দিন তোকেও ছোবল মারবে হয়ত,সাবধানে থাক ওর থেকে।আর এই চিঠিটা আমি রাণীকে দিয়ে লেখালাম।আমাদের জন্য চিন্তা করিস না রবি,আমরা মা মেয়েতে ভালোই আছি,এতদিন ধরে অনেক চেষ্টা করেছি তোকে সবটা জানাতে,সাহস করে উঠতে পারিনি,কিন্তু আরও আগেই তোকে জানানো উচিত ছিল সবটা।ভালো থাকিস রবি,অভ্রর থেকে দূরে থাকিস।
— হেনাদি
রবি চিঠিটা হাতে নিয়েই মেঝেতে বসে পড়ল,চিঠিটা সত্যিই রাণীর লেখা,রাণীর হাতের লেখা সে চেনে,মাঝে মাঝেই রাণী আসত তার কাছে পড়া বুঝে নিতে,তাই তার হাতের লেখা স্পষ্ট মনে ছিল ওর।আজ কলেজে ফ্রেসার্সে হওয়া ঘটনাটা,তারপর হেনাদির এই চিঠি!রবির সবটা দুঃস্বপ্নের মতো মনে হচ্ছিল,মনে হচ্ছিল এবার বুঝি ও পাগল হয়ে যাবে!সব ঘটনাটা রবির বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল,যে অভ্রকে ও ছোট থেকে চেনে,যে ওর সবচেয়ে কাছের বন্ধু,তার বাইরের মুখোশ খসে আসল চেহারার বীভৎসতা বেরিয়ে আসতে দেখা ওর পক্ষে সহ্য করা অসম্ভব!
1 মন্তব্যসমূহ
দারুন লাগলো
উত্তরমুছুন