নবম পর্ব
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
রবি মনে মনে ঠিক করে,অভ্রকে একটু চোখে চোখে রাখবে সে,অভ্রর আসল চেহারাটা সে খুঁজে বের করবেই!হেনাদির চিঠিটা সে অবিশ্বাস না করলেও ছোট থেকে দেখে আসা বন্ধুর সম্পর্কে এত বড়ো কথাটা ও পুরোপুরি বিশ্বাসও করে উঠতে পারেনি।তাই রবি কলেজ ছুটি হওয়ার পর থেকেই ফলো করতে লাগল অভ্রকে।এইভাবে প্রায় মাসখানেক ফলো করতে লাগল রবি অভ্রকে,কিন্তু সন্দেহজনক কোনো কিছুই সে দেখল না।এমনকি অভ্রদের ফ্ল্যাটে এখন যে নতুন মেড জয়েন করেছে মেনকা,তার সাথেও কথা বলেছিল রবি।মেনকা একটু বয়স্ক,প্রায় পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই হবে তার বয়স।সোজাসুজি রবি কোনো কথাই বলেনি মেনকাকে,হেনার কথা তো একেবারেই না,শুধু কথার কায়দায় জানতে চেয়েছিল যে অভ্রর সাথে তার সম্পর্ক কেমন,কিন্তু মেনকা বলেছে,অভ্র তার নিজের ছেলেরই মতো।মেনকা যখন কাজ সেরে বাড়ি ফেরে,তখন রবি ফলোও করেছে তাকে,হেনা যে বস্তিতে থাকত,সেই বস্তিতেই সে থাকে।রবি খোঁজ নিয়ে জেনেছে,নিঃসন্তান মেনকা কয়েকদিন আগেই হারিয়েছে স্বামীকে,তাই বিধবা মেনকা শ্বশুর ভিটে ছেড়ে এই বস্তিতে এসে উঠেছে।এখন অন্যের বাড়িতে কাজ করে নিজের পেটটুকু চালায় সে।মেনকাকে ফলো করেও বিশেষ সন্দেহজনক কিছুই চোখে পড়েনি রবির।শেষ পর্যন্ত বেশ ধন্দে পড়েছে রবি,তবে কি হেনা মিথ্যে কথা বলল তাকে?কিন্তু তাতেই বা হেনার লাভ কি?কোনো উত্তর পেল না রবি।
কিন্তু একদিন একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল।রবি টিউশন পড়িয়ে ফিরছিল হোস্টেলে,হঠাৎই দুজন ভদ্রলোক ওর পাশ দিয়ে হেঁটে গেলেন,তাঁরা একে অপরের সাথে কথা বলছিলেন,রবি স্পষ্ট শুনতে পেল তাঁদের কথা।তাঁদের মধ্যে একজন বললেন, 'কম বয়সে এ কি দুর্মতি বলো দেখি?ওই যে সবুজ রঙের ফ্ল্যাটবাড়িটা,ওর তিনতলায় একটা ছেলে থাকে,ও কলেজে পড়ে।কি অভ্রদীপ না কি যেন একটা নাম,বন্ধুদের নিয়ে মাঝে মাঝেই পার্টি করে!'
অন্যজন বললেন,'হ্যাঁ ওই বড়োলোকের আদরে বখে যাওয়া বাঁদর ছেলে আর কি!'
— 'আরে আর বলছি কি!ওই ছেলেটার ফ্ল্যাটে যে মহিলা কাজ করে,কি মেনকা নাম,সে নাকি শুনেছি ওইসব বাজে পাড়ার মহিলা!'
— 'অ্যাঁ!সে কি কথা গো!নিষিদ্ধ পল্লী?'
— 'নয়ত আর বলছি কি!সে নাকি ওই ছেলের ফ্ল্যাটে কাজ করে,আর ওই ছেলের বাপের তো অগাধ পয়সা শুনেছি,তা সেই পয়সা দিয়েই নাকি ওই ছেলে মেনকাকে বস্তিতে একখানা ঘরও করে দিয়েছে,যাতে মেনকার আসল পরিচয় লোকে না জানতে পারে!কিন্তু এসব কথা কি আর গোপন থাকে বলো তো!'
— 'তা যা বলেছেন,এসব কথা ঠিকই সামনে আসে।'
রবি আবারও বিস্মিত হল,সবটা কেমন যেন জট পাকিয়ে গেল ওর মাথায়।কোনোরকমে হোস্টেলে ফিরল ও,ঠিক করল অভ্রকে আরও ভালোভাবে চোখে চোখে রাখতে হবে।
পরের দিন কলেজে গেল রবি,অভ্রর পাশে গিয়ে বসল সে রোজকার মতো।অভ্রকে একদমই বুঝতে দিতে চায় না সে কিচ্ছু।তারপর টিফিন হল যখন,হঠাৎই রবিদের এক ক্লাসমেট লাবণ্য এসে বসল ওদের বেঞ্চে,তারপর অভ্রকে বলল, 'আমার একটা নোটস বুঝতে একটু প্রবলেম হচ্ছে রে অভ্র,একটু বুঝিয়ে দিবি?'
অভ্র হেসে বলল, 'আমার কাছে এলি কেন?আমার of পাশে বসে আছে ক্লাসের ফার্স্ট বয়,ওর কাছে বুঝে নে,ও বেটার বোঝাবে তোকে।'
লাবণ্য তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, 'কি?ওই গেঁয়োটার কাছে বুঝতে যাব?তার চেয়ে ডাইরেক্ট বললেই পারতিস অভ্র,যে তুই আমায় বোঝাতে পারবি না!'
ক্লাসে যে স্টুডেন্ট গ্যাং রবিকে কথায় কথায় অপমান করে,তাদের মধ্যে লাবণ্য অন্যতম।
রবি বলল, 'আহ অভ্র,তুই ই বুঝিয়ে দে না ওকে,একই তো ব্যাপার!'
নিমরাজি অভ্র বলল, 'বেশ,তাহলে আজ কলেজ ছুটির পর আমার ফ্ল্যাটে আসিস,বুঝিয়ে দেব।'
রবি মনে মনে ঠিক করল,আজ ওদের দুজনকেই ফলো করবে সে।
যেমন ভাবা তেমন কাজ।রবি অন্যদিন কলেজ ছুটির পর অভ্রর সাথেই বেরোতো কলেজ থেকে,কিন্তু আজ রবি লাইব্রেরী যাবার অজুহাত দিয়ে অভ্রর সাথে গেল না,বলল ওর দেরি হবে।তাই অভ্র একাই আজ বেরোল কলেজ থেকে,রবি চুপিসারে ফলো করতে লাগল ওকে।কলেজের গেটের কাছাকাছি লাবণ্য দাঁড়িয়ে ছিল,অভ্রকে দেখে ও বলল, 'চল তোর ফ্ল্যাটে যাই!'
— 'ওকে চল!'
অভ্র আর লাবণ্যকে ফলো করে রবি অভ্রদের ফ্ল্যাট পর্যন্ত পৌঁছে গেল।ও দেখল,লাবণ্য আর অভ্র ফ্ল্যাটে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দিল।এক্ষুনি দরজা খুলে ফ্ল্যাটে ঢুকলে ধরা পড়ে যেতে পারে ভেবে রবি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে লাগল।একটু পরেই আর একটা দরজা বন্ধ করার শব্দ হল,এটা অভ্রর বেডরুমের দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ,এই শব্দটা রবির পরিচিত।এই শব্দটা পাওয়ার পর রবি খুব সন্তর্পণে দরজাটা খুলতে গিয়ে দেখে,দরজা ভেতর থেকে লক করেনি অভ্র।সাবধানে দরজা খুলে আস্তে আস্তে ফ্ল্যাটে ঢুকল রবি।জুতো সে বিল্ডিংয়ে ঢোকার আগে একদম বাইরে খুলে এসেছে,কারণ অভ্রর ফ্ল্যাটের বাইরে জুতো খুলে এলে সে ধরা পড়ে যেতে পারে,রবির জুতো অভ্র চেনে খুব ভালোভাবেই।
এরপর আস্তে আস্তে বেডরুমের জানলাটার দিকে এগিয়ে যায় রবি,তারপর বেডরুমের দিকে সন্তর্পণে উঁকি মারে অভ্র।কিন্তু এরপর যে দৃশ্য ও দেখে তাতে ওর বুকের রক্ত হিম হয়ে যায়,মনে হয় ও বুঝি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না,মাথা ঘুরে পড়ে যাবে মেঝেতে।ও দেখল অভ্র আর লাবণ্য বিছানায় ঘনিষ্ঠ অবস্থায়।যে অভ্রকে সে এতদিন এত ভালোবাসত,বিশ্বাস করত,সেই অভ্রকে চিনতে ও এত বড়ো ভুল করেছে এতদিন!ঘৃণায়,লজ্জায় ওর মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছা করছিল।অভ্র যে শুধু রবিকে ঠকিয়েছে তাই নয়,ও যে রবির মনের মানুষ সাগরিকাকেও ভালোবাসার নামে চিট করছে প্রতিনিয়ত!রবি বুঝতে পারে,হেনাদির লেখা চিঠির একটা বর্ণও মিথ্যে ছিল না,অভ্রর পক্ষে এরকম কাজ করা খুব একটা অসম্ভব নয়।যে অভ্র হেনাদিকে বস্তি ছাড়তে বাধ্য করেছে,রাণীর দিকে নোংরা দৃষ্টিতে তাকাতেও দু'বার ভাবেনি,সেই অভ্রই কিনা বস্তিতে গিয়েছিল ওর সাথে হেনাদির খোঁজে!কি সাংঘাতিক বিশ্বাসঘাতক অভ্র!আর ভাবতে পারে না রবি।
1 মন্তব্যসমূহ
দারুন লাগলো
উত্তরমুছুন