এনকাউন্টার
দ্বিতীয় পর্ব
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
রবি তাড়াতাড়ি অভ্রদের ফ্ল্যাটে গেল।দেখল পার্টি চলছে সেখানে,আর প্রত্যেকের হাতের কাচের গ্লাসে মাদক।অনেকে তো রীতিমতো হাঁটার ক্ষমতাই হারিয়ে ফেলেছে,চোখ লাল করে একপাশে পড়ে আছে।চারিদিক দেখেও অভ্রকে কোথাও খুঁজে পেল না রবি।ও চিৎকার করে ডাকতে লাগল অভ্রকে, 'অভ্র,এই অভ্র,কোথায় তুই?'
রবিকে দেখে পার্টিতে উপস্থিত বেশ কিছু ছেলে মেয়ে হেসে উঠল,ওদের মধ্যে একজন বলল, 'কই রে দেখ দেখ,অভ্রর সেই আনকালচার্ড গেঁয়ো বন্ধুটা এসেছে!'
সেটা দেখে বাকিরা হেসে ফেলল।অন্য একজন নেশার ঘোরে জবাব দিল, 'হ্যাঁ যা বলেছিস,এই মুক্তোর মতো পার্টিতে ও যেন বাঁদর!'
— 'বাব্বা,পেটে পড়লেই কবি হয়ে যাস নাকি তুই মাইরি?'
— 'তবে যাই বলিস,ও ভুল কিন্তু কিছু বলেনি।'
রবি একটু ঘরোয়া পোশাক পরিচ্ছদ পরে,ছাপোষা সাজগোজ করে,তাই কলেজের অনেকেই তাকে গেঁয়ো,আনকালচার্ড বলে ডাকে।প্রথম প্রথম এসব শুনে কষ্ট পেলেও এখন এসব গা সওয়া হয়ে গেছে রবির,সর্বোপরি অভ্র সবসময়ই পাশে এসে দাঁড়িয়েছে তার,সে কারণেই মনে জোর পেয়েছে ও।
তাই আজও এসব কথায় কান না দিয়েই রবি অভ্রকে খুঁজতে ফ্ল্যাটের ভেতর চলে গেল।বেডরুমের দরজাটা ভেজানো ছিল,দরজাটা খুলে ঢুকতে গিয়ে কিছু কথা কানে এল রবির।
শুনল রবিদেরই এক ক্লাসমেট প্রীতম অভ্রকে বলছে, 'জানাজানি হবে না তো ব্যাপারটা?তাহলে কিন্তু ভাই আমরা সবাই কেস খাব!'
— 'ধুর,ও আবার কি কেস খাওয়াবে আমাদের?কি করার ক্ষমতা আছেটা কি ওর?' আত্মবিশ্বাসী গলায় জবাব দিল অভ্র।
— 'কি জানাজানির কথা বলছিস তোরা?' রবি ঘরে ঢুকেই প্রশ্ন ছুড়ে দিল।
হঠাৎ করে এসময় রবিকে আশা করেনি অভ্ররা।একটু হকচকিয়ে গিয়েই অভ্র প্রশ্ন করল, 'রবি তুই?তুই এখন এখানে?'
— 'হ্যাঁ আর বলিস না অভ্র,এখানে একরকম বাধ্য হয়েই আসতে হল।'
— 'কি হয়েছে রে রবি?সবটা খুলে বল।' চিন্তিত গলায় বলল অভ্র।
— 'জানিস অভ্র,হোস্টেলে ফেরার সময় হঠাৎ রাস্তায় হেনাদির সাথে দেখা।'
— 'হেনাদি?' অভ্র যেন একটু চমকে উঠল, 'হেনাদি তো সেই আটটায় এখান থেকে বেরিয়ে গেছে রে,তুই এখন হেনাদিকে কোথায় পেলি?'
— 'সেটাই তো আমি বলছি রে অভ্র।হেনাদি রোজ এই ফ্ল্যাট থেকে আটটায় বেরিয়ে যায় আমি জানি,কিন্তু আজ ন'টার সময় আমি রাস্তায় দেখলাম হেনাদিকে,আর হেনাদির কি অবস্থা হয়েছে কি বলব রে!আমি কতবার জিজ্ঞেস করলাম হেনাদি কিচ্ছু বলল না!কি হয়েছে বলতো অভ্র?তুই কিছু জানিস?'
— 'আরে ধুর বাবা!' প্রীতম রীতিমতো বিরক্ত হয়ে বলল, 'এর যেন দুনিয়ার সবার ওপর পীরিত উথলে পড়ে সবসময়!আরে ভাই হেনার যাই হোক তাতে তোর কি?তোর মায়ের পেটের দিদি হয় বুঝি?'
রবি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল,কিন্তু ও কিছু বলার আগেই অভ্র চিৎকার করে বলে উঠল, 'মুখ সামলে কথা বল প্রীতম!তোর সাহস কি করে হয় আমারই সামনে রবিকে এভাবে অপমান করিস?আর হেনা কি?হেনাদি কত বড়ো আমাদের থেকে জানিস?প্রায় নয় দশ বছরের বড়ো!তার নাম ধরে ডাকছে!শিক্ষা দীক্ষা কিচ্ছু নেই তোর ছি ছি!' অভ্র উত্তেজিত হয়ে বলে যেতে লাগল, 'আর রবির মতো ভালোমানুষেরা আছে বলেই পৃথিবীটা আজও এতটা সুন্দর,ঠিক আছে!সবাই যদি তোর মতো সেলফিস হত,তাহলে আর...'
— 'আরে ইয়ার আমি তো যাস্ট ক্যাসুয়্যালি বললাম কথাগুলো!'
— 'বাহ প্রীতম বাহ!এতগুলো কথার পর বলছিস ক্যাসুয়্যালি বলেছি!তুই বেরিয়ে যা,এই মুহূর্তে আমার ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে যা,যদি না বেরিয়ে যাস তো গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দেব!'
— 'অভ্র শান্ত হ!এভাবে রাগ করিস না প্লিজ!' রবি সামলানোর চেষ্টা করল অভ্রকে।
— 'না রবি না!এইভাবে যে কেউ এসে তোকে অপমান করে দিয়ে চলে যাবে আর সেটা আমি মেনে নেব তা তো হবে না!জানিস যখন শহরে এসেছিলাম পড়তে,বাবা বারবার বলে দিয়েছিল, 'রবি সরল সাধাসিধে ছেলে,জীবনের এতো মারপ্যাঁচ ও বোঝে না,ওকে আগলে রাখার দায়িত্ব কিন্তু তোর!আমিও বাবাকে কথা দিয়েছিলাম যে আমি থাকতে রবিকে কোনো কষ্ট পেতে দেব না,অথচ সবাই তোকে এত অপমান করে,আমি কিচ্ছু করতে পারি না!' অভ্রর চোখে জল এসে গেল।
— 'এভাবে কাঁদিস না অভ্র,আমি একটুও কষ্ট পাইনি রে!তোর মতো বন্ধু যার আছে তার কিসের দুঃখ বল?'
— 'আমি সবসময় তোর পাশে দাঁড়াব রে রবি!' রবির হাতদুটো নিজের মুঠোয় নিয়ে বলল অভ্র।তারপর প্রীতমের দিকে ফিরে বলল, 'কি রে তোকে চলে যেতে বললাম যে,এখনও গেলিনা?'
প্রীতম আর কথা না বাড়িয়ে চলে গেল।
রবি অভ্রর চোখের জল মুছিয়ে দিল,বলল, 'অভ্র,তোর এই বন্ধুটার একটা কথা রাখবি?'
— 'বল না রবি!'
— 'হেনাদিকে দেখে একদমই ভালো লাগল না আমার।শাড়িটা ছিঁড়ে গেছে জায়গায় জায়গায়,গায়ে কালশিটে দাগ,রক্তের দাগ,আমি জিজ্ঞেস করা সত্ত্বেও কিচ্ছু বলল না।আমার বড্ড চিন্তা হচ্ছে রে অভ্র,একটিবার চল না হেনাদিদের বাড়ি!'
— 'হেনাদিদের বাড়ি?এখন?'
— 'হ্যাঁ রে অভ্র,আমরা তো চিনি হেনাদির বাড়ি,আগেও তো গেছি,চল না অভ্র এখনই!আমার মনে হচ্ছে হেনাদি খুব বিপদে আছে,এখনই না গেলে কোনো বড়ো ক্ষতি হয়ে যেতে পারে!'
— 'হ্যাঁ সেটা তুই ঠিকই বলেছিস রবি!হেনাদিকে ওই অবস্থায় তুই রাস্তায় দেখেছিস শুনে আমারও ভীষণ ভয় করছে,টেনশন হচ্ছে।কিন্তু রবি,কাল সকালে গেলে হত না?'
— 'না রে অভ্র,কাল সকালে গেলে বড্ড দেরি হয়ে যাবে রে!'
পরবর্তী ভাগ পড়ুন : তৃতীয় পর্ব
0 মন্তব্যসমূহ