এনকাউন্টার
তৃতীয় পর্ব
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
— 'আচ্ছা বেশ রবি,চল এখনই যাই,কিন্তু আমার একটা শর্ত আছে।'
— 'কি শর্ত?'
— 'তোকে বড্ড ক্লান্ত দেখাচ্ছে রে রবি,একটু কিছু মুখে দে আগে অন্তত!পিৎজা আছে এখন,খাবি?'
— 'না রে অভ্র এখন কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না!'
— 'আচ্ছা বেশ রে,তাহলে একটু কফি খা অন্তত!প্লিজ রবি না করিস না!'
— 'আচ্ছা বেশ তাহলে দে কফি!'
— 'তুই যাস্ট এক মিনিট বোস কেমন,আমি কফি বানিয়ে আনি তোর জন্য!'
একটু পরেই কফির ট্রে হাতে হাজির অভ্র।তার আর রবি দুজনেরই কফি আছে ট্রেতে।একটা কাপ রবির হাতে দিল সে,আর একটা নিজে নিল।
কফির কাপে চুমুক দিয়ে রবি বলল, 'আচ্ছা অভ্র এত কথার মাঝে একটা কথা জিজ্ঞেস করতেই ভুলে গেছি।তুই আর প্রীতম তখন কিসব বলছিলি না কিসব জানাজানি হবে নাকি,কি জানাজানির কথা বলছিলি রে তোরা?'
— 'আরে ওটা তো একটা ছোট্ট ব্যাপার,' অভ্র হেসে বলল,'প্রীতমকে ওর এক রুমমেট সিনিয়র দাদা কিসব নোট টোট টুকে দিতে বলেছিল ওকে,আই মিন অর্ডার করেছিল,বুঝতেই তো পারছিস র্যাগিং আর কি!তো প্রীতম তখন আমায় ফোন করে জানতে চাইল যে কি করা উচিত ওর,আমি তখন বললাম যে র্যাগিং করাটা কিন্তু অন্যায়,আর সেটা তুই মানবি কেন?কিচ্ছু নোটস লিখে দিবি না একদম!আর সেটা শুনে ও সিনিয়র দাদার খাতায় কিছু না লিখে ফাঁকা খাতাটা দাদার বিছানায় ফেলে চলে এসেছে পার্টিতে,যদিও একটু ভয় ছিল ওর মনে।ওইজন্যই ও তখন জিজ্ঞেস করছিল যে এই ব্যাপারটা জানাজানি হবে না তো সিনিয়রদের মধ্যে?তাহলে বিপদে পড়ব কিন্তু আমি আর প্রীতমই!'
— 'আচ্ছা এই ব্যাপার,' রবি বলল, 'একদম ঠিক কথা বলেছিস রে তুই অভ্র,সত্যিই তো ওরা সিনিয়র বলেই যখন তখন যা খুশি করাবে আমাদের দিয়ে?আর সেটা আমাদের মেনে নিতে হবে মুখ বুজে?'
— 'হ্যাঁ রে রবি,কি আর বলি বল,এত আইন,এত নিয়ম,তারপরও র্যাগিং চলছে খুল্লম খুল্লা!কি বলি আর!'
— 'সত্যি রে!এই অভ্র শোন না,আমার কফি খাওয়া প্রায় শেষ,এবার তুই রেডি হয়ে নে কেমন,আমাদের বেরোতে হবে তো!আমার মাথাটা কেমন যেন ঝিমঝিম করছে!'
— 'তা করবে না?মাথার আর দোষ কি বল?সেই সকাল থেকে রাত পর্যন্ত টিউশন,কলেজ,নিজের পড়াশুনা,অ্যাসাইনমেন্ট একের পর এক চলছে তো চলছেই।শরীরের আর দোষ কি!আমি এইজন্যই বললাম যে আজ এত ক্লান্ত,কালই বরং যাব,কিন্তু তুই তো কথা শুনবি না আমার!'
— 'না রে অভ্র,কাল গেলে হবে না রে!আমাদের এখনই যেতে হবে।'
— 'আচ্ছা বেশ,তুই পাঁচ মিনিট বোস,আমি রেডি হয়ে আসছি।'
রবি অপেক্ষা করতে লাগল।চোখদুটো ওর ঘুমে জড়িয়ে আসছে,মাথাটাও কেমন ঝিমঝিম করছে,মনে হচ্ছে উঠে দাঁড়াতে গেলেই পড়ে যাবে।কথা বলতে গেলে জিভটাও কেমন জড়িয়ে আসছে,চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে ক্রমশ।মনে হচ্ছে যেন নেশার ঘোর গ্রাস করেছে তাকে,আস্তে আস্তে সে তলিয়ে যাচ্ছে নেশার অতল গভীরে।আর পারল না রবি,শুয়ে পড়ল বিছানায়,চোখ দুটো বন্ধ হয়ে এল অজান্তেই।
ঘুম ভাঙল জলের ছিটেয়।রবি চোখ মেলে দেখল সকাল হয়ে গেছে,সূর্যের আলো এসে পড়েছে বিছানায়।তাড়াতাড়ি উঠে বসে রবি দেখে,ঘড়িতে সাড়ে ন'টা বাজে।চারিদিক তাকিয়ে দেখে,হোস্টেল নয়,অভ্রদের ফ্ল্যাটে রয়েছে সে,আর অভ্রই চোখে মুখে জল ছিটিয়ে তার ঘুম ভাঙানোর চেষ্টা করছে।
— 'একি?আমি ঘুমিয়ে পড়লাম কখন?' ব্যস্ত হয়ে উঠে পড়ল রবি বিছানা ছেড়ে।
— 'কাল রাতে রে রবি।কাল আমি রেডি হতে গেলাম,আর তুই ওয়েট করতে লাগলি এই ঘরে।তারপর অপেক্ষা করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিস টেরই পাসনি নিজে।আমি রেডি হয়ে এসে দেখি অঘোরে ঘুমোচ্ছিস তুই,তাই আর ডাকিনি,এমনিতেই খুব টায়ার্ড ছিলি তুই কাল।তারপর আজ সকালে তোকে কতবার ডাকছিলাম,কিছুতেই উঠছিলি না তুই,তারপর বেলা হয়ে যাচ্ছে দেখে বাধ্য হয়ে জলের ছিটে দিতে লাগলাম তোর চোখেমুখে।'
— 'খুব ভালো করেছিস অভ্র,আর একমিনিটও দেরি নয়,এক্ষুনি আমাদের বেরোতে হবে,চল।'
— 'বেরোতে হবে?কোথায়?'
— 'সেকি ভুলে গেলি?হেনাদিদের বাড়ি যেতে হবে যে!'
— 'না,এখন স্নানে যেতে হবে,তারপর এসে খেয়েদেয়ে কলেজ যেতে হবে!'
— 'না আমি হেনাদিদের বাড়ি যাব এখন,কলেজ যাব না!'
— 'পাগলামি করিস না রবি,আজ জি.পি স্যারের ক্লাসটেস্ট আছে,তুই ভালো করেই জানিস ক্লাসটেস্টে অ্যাবসেন্ট হলে উনি এক সপ্তাহ ওনার কোনো ক্লাস করতে দেন না।সবটাই তো জানিস তুই যে উনি কতটা রাগী টিচার,তাও একথা বলছিস?'
— 'না রে অভ্র আমি সবটাই জানি,কিন্তু আমি নিরুপায়,আমায় যেতেই হবে!'
— 'না তুই যাবি না!তুই এখন কলেজ যাওয়ার জন্য রেডি হবি ব্যস,আর কোত্থাও না,ক্লাসটেস্টের পরে হেনাদির কাছে আমি নিজে তোকে নিয়ে যাব কেমন,কিন্তু প্লিজ এখন কলেজ চল!'
— 'আচ্ছা বেশ,' নিমরাজি হওয়া সত্ত্বেও অভ্রর অনুরোধ ফেলতে পারল না রবি, 'কিন্তু টেস্টের পরেই আমরা ওখানে যাব।'
— 'পাক্কা।'
0 মন্তব্যসমূহ