এনকাউন্টার
প্রথম পর্ব
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
রবির মৃত রক্তাক্ত শরীরটা রাস্তায় পড়ে আছে। গভীর নিশুতি রাতে দূরের হালকা আলো এসে পড়েছিল ওর মুখে। ওই আলোয় দেখা যাচ্ছে, মৃত শরীরের খোলা চোখদুটোতে যেন অনেক প্রশ্ন! সে প্রশ্ন কার উদ্দেশ্যে? হয়তো বা চেনা মানুষের অচেনা রূপটা বেরিয়ে আসার কারণ জানতে চায় চোখদুটো, বা হয়তো সমাজের, আইনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করতে চায়, বা হয়তো মৃত্যুর কারণটা জানতে চায়.....
ঘটনার সূত্রপাত প্রায় পাঁচ ছয় মাস আগে। আজ থেকে প্রায় দেড়বছর আগে অভ্রদীপ শিকদার আর রবি মিত্র দুজনেই ভর্তি হয়েছিল শহরের অন্যতম নামী কলেজে। মফস্বলে বেড়ে ওঠা দুটো ছেলেরই, তারপর উচ্চশিক্ষার জন্যই শহরে আসা। প্রাইমারি স্কুল থেকেই অভ্রদীপ আর রবির গলায় গলায় বন্ধুত্ব, শিক্ষক-ছাত্র সকলে তাদের মানিকজোড় বলে ডাকে। তাদের মা-বাবার মধ্যেও যথেষ্ট বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। রবির পরিবারের অবস্থা বিশেষ স্বচ্ছল নয়, তার বাবা সূর্যদেব মিত্র টিউশন পড়িয়ে সংসার চালান, আর মা চিন্ময়ী মিত্র গৃহবধূ। অভ্রদীপের বাবা অভিজিৎ শিকদার ওই মফস্বলেই অবস্থিত একটা কলেজের প্রফেসর, আর মা তনিমা শিকদার স্কুলের শিক্ষিকা। অধ্যাপনার পাশাপাশি এলাকার এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাও বটে অভিজিৎ বাবু। কানাঘুষো শোনা যাচ্ছে, শহরের নামী কলেজে রবি নিজস্ব যোগ্যতায় চান্স পেলেও অভ্রদীপ নাকি ডোনেশন দিয়ে ভর্তি হয়েছে কলেজে। সেদিন রবি আর অভ্রদের অন্য এক ক্লাসমেট পীযূষ রবিকে বলতে এসেছিল, 'জানিস রবি, অভ্র নাকি এন্ট্রান্স ক্লিয়ার করেনি কলেজের শুনলাম, অভিজিৎ কাকু তো বড়ো নেতা কাম প্রফেসরও, তোদের কলেজের প্রিন্সিপালের সাথে নাকি হেব্বি দহরম মহরম আছে কাকুর, তাই ঘুষটুষ খাইয়েই অভ্রকে কলেজে ঢুকিয়েছে কাকু!'
কথাটা শুনে রবি বিশ্বাসই করেনি, বলেছে, 'ধুস, কাকুকে আর অভ্রকে আমি ছোট থেকে চিনি, ওরা খুব ভালোমানুষ রে, অমন বলিস না ওদের সম্পর্কে।'
— 'আসলে কি জানিস তো রবি, তুই নিজে খুব সরল সাধাসিধে তো, তাই দুনিয়াশুদ্ধু মানুষকে নিজের মতো ভাবিস! আমি কিন্তু এখনও বলছি ভাই, অভ্রর সাথে অত মিশিস না, পস্তাবি একদিন, ও মোটেই ভালো ছেলে নয়!'
— 'ধুস তুই যা তো, আজেবাজে বকিস না!' রবি চলে এসেছিল সেদিন পীযূষের কাছ থেকে।
এরপর দুজনে মিলে রওনা দিয়েছিল শহরের পথে। রবি থাকত কলেজের হোস্টেলে, আর অভ্র থাকত একটা ফ্ল্যাটে, ফ্ল্যাটটা অভিজিৎবাবুদেরই, তবে ওখানে কেউ থাকে না, আর কলেজ থেকে অনেকটা কাছেও, তাই অভ্রকে ওখানেই রাখার ব্যবস্থা করা হল। রবির মা বাবাকেও অনুরোধ করেছিলেন অভিজিৎবাবু, যাতে রবিকেও তাঁরা হোস্টেলে না রেখে তাঁদের ফ্ল্যাটেই রাখেন অভ্রর সাথে, বলেছিলেন,
'রবি কি আমার ছেলের থেকে কিছু কম? দুই ছেলে একসাথে থাকত, খেত, পড়াশুনা করত, আড্ডা দিত, কত ভালো হত বলুন তো! আর একজন মেডকেও রাখার ব্যবস্থা করেছি আমি, ওদের কুটোটিও নাড়তে হবে না, শুধু খাবে আর পড়বে, রাজি হয়ে যান না সূর্যদেব বাবু!'
— 'অনেক ধন্যবাদ অভিজিৎবাবু, আপনি অত্যন্ত ভালোমানুষ বলে এরকম প্রস্তাব দিলেন, কিন্তু আমি চাই রবি জীবনের ওঠাপড়া লড়াই সবটার মধ্য দিয়েই যাক, জীবনের চড়াই উতরাই দুটোই ধরা দিক ওর কাছে, জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার লড়াই যে শিখতেই হবে ওকে!'
— 'কিন্তু হোস্টেলের তো অনেক ফিস সূর্যবাবু! আর আপনাদের পক্ষে সেটা জোগাড় করা তো খুব একটা সহজ নয়!'
— 'কেন সহজ নয় অভিজিৎ বাবু? রবি বলেছে, শহরে গিয়ে সেও টিউশন পড়াবে, হোস্টেলের ফি ও নিজেই জোগাড় করবে!'
— 'আচ্ছা সূর্যবাবু, তবুও যদি কখনো কোনো অসুবিধা হয়, আমায় নির্দ্ধিধায় জানাবেন কিন্তু কেমন!'
এরপর কলেজজীবনে পা রাখল ওরা। রবি সকাল বিকেল টিউশন পড়াত, কলেজে যেত, তারপর হোস্টেলে ফিরে পড়তে বসত। নিশ্বাস নেওয়ার সময়টুকুও পায়না সে। অন্যদিকে কলেজ-পড়াশুনার পরেও অভ্রদীপের হাতে থাকত অঢেল সময়, আর অবসর সময়ে সে বন্ধুবান্ধবদের ডাকত ফ্ল্যাটে, পার্টি হত, ফুল ভলিউমে ডিজে বাজত, আর নেশার ফোয়ারা ছুটত। রবিকেও ইনভাইট করত অভ্র, কিন্তু রবির এসব পছন্দ ছিল না, তাই সে যেত না, নানা অজুহাত দিয়ে এড়িয়ে যেত।
এরপর ঘটল এক আশ্চর্য ঘটনা। অভ্রদীপদের ফ্ল্যাটে যে মেড ছিল, তার নাম হেনা। সে রান্না করা থেকে শুরু করে বাড়ির সব কাজকর্ম করত। একদিন রবির টিউশন পড়িয়ে ফিরতে একটু দেরি হয়ে গেছে, একটু ব্যস্তভাবেই হোস্টেলে ফিরছিল সে, তখন প্রায় ন'টা বাজে। অভ্রদীপদের ফ্ল্যাটটা ওদের কলেজ আর হোস্টেলের মাঝের রাস্তাতেই পড়ে। হঠাৎ দেখে কেমন বিধ্বস্ত অবস্থায় পাগলের মতো টলোমলো পায়ে হেঁটে এগিয়ে আসছে হেনা, তার শাড়ি ছিঁড়ে গেছে জায়গায় জায়গায়, কপাল আর ঠোঁট কেটে রক্ত পড়ছে, হাতেও কালসিটে। রবি যেহেতু মাঝে মাঝেই দেখা করতে আসত অভ্রর ফ্ল্যাটে, তাই হেনা আর রবি দুজন দুজনকে চিনত, তার থেকে প্রায় নয়-দশ বছরের বড়ো হেনাকে রবি হেনাদি বলে ডাকত, আর হেনাও রবিকে ভাইয়ের মতোই ভালোবাসত। অভ্রও হেনাদি বলেই ডাকত তাকে।
তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে রবি বলল, 'হেনাদি কি হয়েছে তোমার?'
হেনা কিছু বলল না, শুধু একবার অসহায় ভয়ার্ত চোখে অভ্রদের ফ্ল্যাটটার দিকে তাকাল, তারপরেই নিজেকে সামলে নিয়ে ছুটে পালিয়ে গেল কোনোরকমে।
রবি বারবার ডাকল তাকে, কিন্তু তার কথায় কর্ণপাতই করল না হেনা।
পরবর্তী ভাগ পড়ুন : দ্বিতীয় পর্ব
0 মন্তব্যসমূহ