Advertisement

এনকাউন্টার (দশম পর্ব)

এনকাউন্টার 
দশম পর্ব
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী 


রবি ভাবে,অভ্রর এই স্বরূপটা সাগরিকার জানা দরকার,কিন্তু রবির মুখের কথা যে সাগরিকা বিশ্বাস করবেনা এতটুকুও সেকথা রবি জানত,তাই জামার পকেট থেকে মোবাইলটা কোনোরকমে বের করল রবি,তারপরেই কয়েকটা ছবি,আর ভিডিও তুলে নিল,যেগুলো অভ্রর এই কুৎসিত স্বভাবের প্রমাণ।ছবি আর ভিডিও গুলো তুলে নিয়েই রবি ফিরতে যাবে,হঠাৎ তার সামনে এসে হাজির মেনকা!রবি ভীষণ চমকে গেল,মনে হল হার্ট বন্ধ হয়ে যাবে তার এই বুঝি!কিন্তু রবি কিছু বলার আগেই মেনকার দু'চোখ জলে ভরে গেল,নিচু স্বরে মেনকা বলল,'তুমি আজ দেখলে বাবা,আমি রোজই দেখি!এক একদিন এক একটা মেয়ে আসে!এই তো সেদিন সকালে,একটা মেয়ে এল,কি যেন নাম শর্বরী না কি যেন!তাকে নিয়ে অভ্র বাবা দরজা বন্ধ করে দিল!' বলেই মেনকা কেঁদে ফেলল,শাড়ির আঁচলে চোখ মুছল সে।
রবির কথা বলার ক্ষমতা যেটুকু ছিল,শর্বরীর নামটা শুনে ও সেটুকুও হারিয়ে ফেলল,কারণ শর্বরীও লাবণ্যর মতো রবিদের ক্লাসমেট।
মেনকা কান্নাভেজা গলায় বলতে লাগল,'কি বলব বাবা,তোমরা আমার ছেলের মতো।আমি অভ্র বাবাকে কতবার বারণ করেছি,বলেছি শুধরে যাও,ভালো মানুষ হয়ে যাও!কিন্তু সে শোনে না আমার কথা!আর মেয়েগুলোও বলিহারি,ওর স্বভাব ওরকম জেনেও এখানে আসে,ওই যে পয়সার লোভ,ক্ষমতার লোভ!'

_________________________

একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ :  পড়ুন

_________________________

— 'মানে?পয়সার লোভ,ক্ষমতার লোভ বলতে?'

— 'এখানে আর কোনো কথা নয় বাবা,তুমি অন্য ঘরে চলো,এখানে কথা বললে অভ্র বাবা শুনে ফেলতে পারে।'

— 'কিন্তু মাসি আমি বেশিক্ষণ বসব না,অভ্র বেরিয়ে এসে আমায় দেখলে সন্দেহ করবেই করবে!'

— 'ও এখন সহজে বেরোবে না গো,দেরি হবে অনেক।আজ তো দেখছি না,সেই কাজে আসার প্রথম দিন থেকে দেখছি।'

— 'তাহলে মাসি সেদিন যখন তোমায় জিজ্ঞেস করলাম রাস্তায়,তুমি সেদিন বললে না কেন কিছু?'

— 'ভয়ে বাবা,ভয়ে!আমি গরিব মানুষ,কখন কোন্ বিপদে পড়ে যাব!তাছাড়া তুমিও বিশ্বাস করতে পারতে না গো!'

— 'সেকথা সত্যি মাসি,আসলে ছোটবেলার বন্ধু তো,নিজের চোখে না দেখলে আজও বিশ্বাস করতাম না!'

— 'এখানে আর কোনো কথা নয় বাবা,পাশের ঘরে চলো!'
রবি আর মেনকা পাশের ঘরে গেল।
 রবিকে বিছানায় বসতে বলে মেনকা বলল, 'তুমি বড়ো ক্লান্ত বাবা,একটু জল খাও।'

_________________________

Subscribe my YouTube channel : Suchandra's Gaming

_________________________

— 'সত্যি গো মাসি,আমি সত্যি বড় ক্লান্ত জীবনপথে চলতে চলতে,মাঝে মাঝে মনে হয় এই বুঝি মুখ থুবড়ে পড়ব,আর উঠে দাঁড়াতে পারব না।'

— 'এরকম কথা বোলোনা বাবা,আজকের সমাজে যে তোমার মতো মানুষকে বড়ো দরকার।তোমায় যে এগিয়ে চলতেই হবে বাবা,কত অসহায় মানুষ যে তোমার মতো মানুষের জন্যই অপেক্ষা করছে!'
মুহূর্তে সাগরিকার মুখটা ভেসে উঠল রবির।এই মুহূর্তে নিজের চেয়েও এ পৃথিবীর বুকে সাগরিকাকে আরও বেশি অসহায় মনে হল তার।যে মানুষকে সাগরিকা সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে,বিশ্বাস করে,সেই মানুষটা দিনের পর দিন তার অজান্তেই তার বিশ্বাসকে গলা টিপে খুন করছে নৃশংসভাবে,তার ভালোবাসাকে পিষে মারছে।আর ভাবতে পারে না রবি।কষ্ট আর রাগ একসঙ্গে বেরিয়ে আসতে চায় তার মনের অতল থেকে।ইচ্ছে করে অভ্রকে ওই অবস্থাতেই ঘর থেকে টেনে হিঁচড়ে এনে একটা চড় কষিয়ে দেয়,কিন্তু অনেক কষ্টে নিজেকে সংযত করে রবি।সে মনে মনে ঠিক করে,সে নয়,সাগরিকাই শাস্তি দেবে তাকে নিজের হাতে।
মেনকার ডাকে সম্বিৎ ফেরে রবির,কাচের গ্লাসভর্তি জলটা রবির হাতে দিয়ে সে বলে,'ঠান্ডা জল এনেছি বাবা,খেয়ে নাও।আমি তোমার মনের অবস্থা বুঝতে পারছি বাবা,শান্ত হও,খেয়ে নাও জলটা।'
রবি গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলে,'মাসি,এইবার তুমি সব কথা খুলে বলো,যেগুলো বলতে চাইছিলে।'

— 'হ্যাঁ বাবা এই যে বলি।'

রবি মেনকার চোখ এড়িয়ে মোবাইলের রেকর্ডার অন করে দিল।মেনকা বলতে লাগল,'এক একদিন অভ্র বাবার ফ্ল্যাটে এক একজন মেয়ে আসে।সেদিন শর্বরী এসেছিল,পরশুর আগের দিন রোহিনী এসেছিল,তারপর পিয়ালী,মুস্কান,টিয়া এরাও মাঝে মাঝে আসে,এছাড়াও জানো বাবা.....'

— 'কি?রোহিনী,পিয়ালী,মুস্কান,টিয়া?এরা তো সবাই আমাদের কলেজে পড়ে!'

— 'হ্যাঁ গো বাবা,তোমাদের কলেজেই পড়ে ওরা,কথাবার্তা শুনে বুঝেছি।টিয়া বোধ হয় বয়সে ছোট,অভ্রদা বলে ডাকে শুনেছি।'

— 'হ্যাঁ মাসি,টিয়া আমাদের জুনিয়র।'

রবির সহ্যক্ষমতা শেষ হয়ে আসছিল।টিয়া সাগরিকার ক্লাসমেট,শুধু ক্লাসমেটই নয়,সাগরিকার ভালো বন্ধুও বটে,মাঝে মাঝেই সোশ্যাল মিডিয়ায় তার সাথে ছবি পোস্ট করে সাগরিকা।সেই টিয়াও এভাবে তার বান্ধবীর জীবনটা নষ্ট করায় ইন্ধন যোগাচ্ছে?এভাবে পিছন থেকে ছুরি মারছে সাগরিকার?
আর পারল না রবি।কান্নায় ভেঙে পড়ল ও,দুহাতে মুখ ঢেকে কেঁদে উঠল ডুকরে,অস্ফুটে বলল,'কেউ ভালোবাসে না আমার সাগরকে,সবাই শুধু ঠকাচ্ছে ওকে।'

— 'কিছু বললে বাবা?' মেনকা জিজ্ঞেস করল।

— 'না মাসি,ও কিছু না।আসলে কিছু মানুষ আছে,সবাইকে ভালোবাসার পরও তাদের প্রাপ্তি হয় শুধুই প্রতারণা,বঞ্চনা,আর বিশ্বাসঘাতকতা।'

— 'তা তুমি ঠিকই বলেছ বাবা।'

— 'মাসি তখন তুমি যেটা বলছিলে সেটা শেষ করো।'

— 'লজ্জার কথা কি আর বলব বলো,সেদিন অভ্র বাবা দুজন মেয়েকে নিয়ে দরজা বন্ধ করল,এই লাবণ্য আর মুস্কানকে নিয়ে!আসলে কি বলব বাবা,অভ্র বাবা মেয়েগুলোকে লোভ দেখায়,বাবাকে বলে ওদের পার্টিতে পদ পাইয়ে দেবে,তারপর টাকার গদির ওপর বসে থাকবে সারাজীবন,আর মেয়েগুলো তাতেই রাজি হয়ে নাচতে নাচতে ফ্ল্যাটে আসে,তারপর...'

— 'মাসি আর বোলোনা গো,আর সহ্য করতে পারছিনা আমি!'

মাথাটা যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছে রবির।সারা শরীরও যেন অবশ হয়ে আসছে ক্রমশ।চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে সাগরিকার সারল্যে ভরা চোখ দুটো।সাগরিকা যখন তার প্রেমিকের কীর্তিকলাপ জানতে পারবে,তখন তার সুন্দর চোখদুটো জলে ভরে যাবে,কাজল মুছে যাবে,তখন সাগরিকাকে কিভাবে সামলাবে রবি?চোখদুটো বন্ধ করে ফেলে রবি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ