অসুখী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
দীর্ঘদিন শারীরিকভাবে অসুস্থ মানুষেরা হয়ত শরীরের দিক থেকে ভীষণ দুর্বল হন, ঠিকভাবে হাঁটাচলা টুকুও করতে পারেন না নিজে থেকে, কিন্তু মানুষের মন তাঁরা পড়ে ফেলতে পারেন এক লহমায়। কোন্ মানুষ তাঁকে সত্যি করে আগলাতে চায়, তাঁর কষ্টে গোপনে চোখের জল ফেলে সেটা যেমন তাঁরা নিমেষে বুঝে যান, তেমনই তাঁদের প্রতি বিরক্তি,অবহেলাও তাঁরা বুঝতে দেরি করেন না। শারীরিকভাবে অসুস্থ মানুষ তাঁর কপালে একটা স্নেহমাখা হাতই শুধু চান, চান যে পরম ভালোবাসায় মাখা একটা উষ্ণ স্বর তাঁর কানে কানে বলুক, 'আর তো কটা দিন, তারপরেই তো আর পাঁচটা মানুষের মতোই রোজ সকালে তড়িঘড়ি উঠে স্নানে যাবে, রিকশা না পেলে হেঁটেই চলে যাবে বাসস্ট্যান্ড, তারপর বিকেল সাড়ে পাঁচটায় বাড়ি ফেরা, সন্ধ্যায় মোড়ের মাথায় গিয়ে ফুচকা, সবটাই আবার স্বাভাবিক হয়ে যাবে, শুধু কয়েকটা দিন মাত্র তুমি বিছানায় কাটাও, আর একটু কষ্ট করে স্বাদহীন পথ্যগুলো খেয়ে নাও, যাস্ট কয়েকটাই তো দিন!' তারপর মাথার কাছটায় একটু বসে থাকা। কিন্তু এটুকুও দিতে কিছু মানুষ অপারগ, কাছের মানুষকে দুটো পজিটিভ কথা বলতেও তাঁদের বড্ড বাধে, সেজন্য অনেক সময় মানুষটির জন্য মাসে মাসে কত খরচ হয় ডাক্তার-ওষুধের জন্য সেই নিয়ে খোঁটা দেন,কখনো বা, 'ধুস,তুমি তো সবসময়ই ভোগো, তোমার জন্য না তো কোথাও বেড়াতে যাওয়ার উপায় আছে, না তো বাড়িতে দুটো আনন্দ অনুষ্ঠান করার উপায় আছে!'
_________________________
একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ : পড়ুন
_________________________
আর অসুস্থ মানুষটা যেই বলেন, 'বুঝেছি,আমি এখন তোমাদের বোঝা! কেন খরচ করো মাসে মাসে,রোজ রোজ যেভাবে কথার ছুরি মারো,তার চেয়ে না হয় একেবারেই মরে যাবো! কেন করো না আনন্দের অনুষ্ঠান? এ পৃথিবীর বুকে কোনো কিছুই কারোর জন্য থেমে থাকেনা তো!'
অমনি উল্টোদিকের মানুষেরা বলবে, 'সারাবছর ভোগে,জলটুকু পর্যন্ত নিজের নিয়ে খাওয়ার মুরোদ নেই,আবার বড়ো বড়ো ডায়ালগ!' কারণ অসুস্থ মানুষের অভিমান করার অধিকার নেই, নেই সামান্য চাওয়া পাওয়ার অধিকারটুকুও। হাজার ওষুধ চিকিৎসার পরও মানুষটা মৃত্যুর মুখে এগিয়ে যায় আস্তে আস্তে, কারণ অনবরত মনের আনাচে কানাচে বিষ ঢাললে তারও কি প্রভাব কিছু কম পড়ে বলুন?
শুধু একটাই কথা মনে রাখবেন, কোনো মানুষই সারাজীবন সুস্থ থাকে না, অসুস্থ একদিন আপনিও হবেন, কিন্তু সেদিন আপনার মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়ার কাউকে পাবেন না, কারণ স্নেহের আধার মানুষটিকে আপনিই মেরে ফেলেছেন সাত বছর আগে, কথার বাণে বিদ্ধ করে।
1 মন্তব্যসমূহ
দারুন লাগল
উত্তরমুছুন