Advertisement

শত্রুমিত্র (দ্বিতীয় পর্ব)



শত্রুমিত্র
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী  
দ্বিতীয় পর্ব

— 'আজকের এই অনুষ্ঠানে এসে তোরা এভাবে ঝগড়া মারামারি করছিস,এর শাস্তি তো তোদের পেতেই হবে!' ইউনিয়নের ছেলে মেয়েরা বলল।
 শাস্তির নাম শুনে ঝগড়ায় ক্ষান্ত দিল ওরা।
 শাস্তি হিসেবে ওদের একে অপরের হাত ধরে গোটা কলেজ ক্যাম্পাস ঘুরে আসতে বলা হল।মনে মনে ভীষণ বিরক্ত হওয়া সত্ত্বেও ওরা একে অপরের হাত ধরে গোটা ক্যাম্পাস এক চক্কর ঘুরে এল।এরপর সকলের সামনে ওদের দুজনকে প্রমিস করানো হল,যে ওরা কখনো ঝগড়া করবে না নিজেদের মধ্যে।
 মনে একরাশ বিরক্তি নিয়ে প্রমিস করল ওরা।সেদিনের মতো ওদের ঝগড়াটা ওখানেই শেষ হল,আর এগোলো না।
  কিন্তু বাড়িতে এসে ভীষণ রাগারাগি শুরু করল দুজনেই।
— 'পিপি,ওই হতভাগী যে আমার কলেজে ঢুকেছে,সেটা আমায় বলো নি কেন?' রিমঝিম রাগী গলায় বলল ওর পিসিকে।
 হাসি চেপে কপট গাম্ভীর্যের সাথে উত্তর দিলেন পিসি,'কার কথা বলছ?'
— 'থাক পিপি,আর না জানার ভান কোরো না।এসব যে তোমারই প্ল্যান তা আমার বুঝতে বাকি নেই!'
— 'প্ল্যান?কিসের প্ল্যান?' 
— 'এতদিন জানতাম,ওই অনামুখো শিপ্রা অন্য কলেজে পড়ে।কিন্তু আজ জানলাম সে কলেজেও পিছু ছাড়েনি,এসে হাজির হয়েছে এখানেও!'
 — 'দেখো কলেজ তো তোমার আমার সম্পত্তি নয়,' হাসি চেপে বললেন পিসি,'যে কেউ ভর্তি হতেই পারে,এতে তোমার আমার তো কিছু বলার থাকতে পারে না তাই না!'
— 'ধুর,তোমার সাথে আর কথাই বলব না আমি!' একরাশ অভিমান নিয়ে দুমদুম করে হেঁটে নিজের ঘরে চলে গেল রিমঝিম।
 ওদিকে শিপ্রাও বাড়ি ফিরেই চোটপাট শুরু করল।
— 'তোমরা এটা করতে পারলে বাপি?মাম্মাম?আমার ওই শত্রুটা যে আমার পিছু নিতে নিতে এখানে এসে জুটেছে সে খবরটা এতদিন জানাওনি আমায়!'
— 'সে কি রে মা!রিমঝিম তোদের কলেজে পড়ে?বলিস কি?' হাসি চেপে বললেন শিপ্রার মা-বাবা।
— 'যাও তো যাও,এমন ভাবে কথা বলছ যেন আকাশ থেকে পড়লে?এদিকে সবই তো জানো!আর আমার বান্ধবীগুলোও কি শয়তান বলিহারি!বলে কিনা রিমঝিমটা নাকি দূরের কোন্ কলেজে ভর্তি হয়েছে!একবার পাই হতচ্ছাড়িগুলোকে হাতের মুঠোয়!একদম কচুকাটা করব!' 
 শিপ্রা নিজের ঘরে গিয়ে দড়াম করে দরজা বন্ধ করে দিল।
  এদিকে শিপ্রার সাথে কলেজের একটি ছেলে সৌরভের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।ছেলেটি শিপ্রা-রিমঝিমের কলেজে কেমিস্ট্রিতে অনার্স পড়ে।সৌরভই প্রোপোজ করেছিল শিপ্রাকে,তারপর কথা হতে হতেই শিপ্রা যে কখন ওর প্রেমে হাবুডুবু খেতে শুরু করল তা সে টেরই পেল না।
  সৌরভ আর শিপ্রা নানা জায়গায় একসাথে যেত।একদিন কলেজ ছুটির পর একটা রেস্টুরেন্টে গেল ওরা,খাওয়াদাওয়া হবে,আর প্রেম-খুনসুটি-আড্ডাও হবে।রিমঝিমও সেদিন ওই রেস্টুরেন্টেই আসছিল,হঠাৎই ওর চোখে পড়ল সৌরভ আর শিপ্রা একটা টেবিলে বসে আছে একে অপরের হাতে হাত রেখে।দেখেই রিমঝিম সেখানে দাঁড়িয়ে পড়ল,একটা দুষ্টু বুদ্ধি এল ওর মাথায়।তাড়াতাড়ি ব্যাগ থেকে স্মার্টফোনটা বের করে কয়েকটা ছবি তুলে নিল ও শিপ্রা আর সৌরভের,ভাবল,'শিপ্রা রাণী,এই ছবিটা যদি আঙ্কেলের মোবাইল নাম্বারে সেন্ড করে দিই,তাহলেই তুমি মজাটা টের পাবে।রিমঝিমের পিছনে লাগার জন্য যে কতখানি দাম দিতে হয়,সেটা হাড়ে হাড়ে টের পাওয়াচ্ছি তোমায়,দাঁড়াও।'
 সেদিন শিপ্রা বাড়িতে ফিরতেই ওর বাপির মুখোমুখি।তিনি গম্ভীর মুখে বললেন,ফ্রেস হয়ে খাওয়াদাওয়া সেরে বসার ঘরে এসো,কিছু কথা আছে তোমার সাথে।'
 শিপ্রা ওর বাপিকে এরকম গম্ভীরমুখে কখনো দেখেনি।একটা অজানা আশঙ্কা কাজ করছিল ওর মনে।কোনোরকমে খেয়ে দেয়েই ও দুরুদুরু বুকে হাজির হল বসার ঘরে।মাম্মাম বাপি আগে থেকেই উপস্থিত আছেন সেখানে।শিপ্রা এসে সোফায় বসতেই মোবাইলের গ্যালারি খুলে একটা ছবি ধরলেন বাপি ওর সামনে।
 ছবিটা দেখেই শিপ্রা ভূত দেখার মতো চমকে উঠল।ওর আর সৌরভের রেস্টুরেন্টে হাতে হাত রেখে বসে থাকার ছবি।শিপ্রার বুকটা ধড়ফড় করছে,দরদরিয়ে ঘামছে,আর গলা শুকিয়ে আসছে।কোনোরকমে ও বলে উঠল,'একটু জল!'
 মাম্মাম জলের বোতলটা এগিয়ে দিলেন ওর দিকে।ঢকঢক করে অনেকটা জল খেয়ে কোনোরকমে সামলে নিয়ে কাঁপাকাঁপা গলায় শিপ্রা বলল,'এটা কোথায় পেলে?'
 — 'সেটা বড়ো কথা নয়,' কপট গাম্ভীর্য সহকারে বাপি বললেন,'ছেলেটি কে?'
 — 'সৌরভ!' কোনোরকমে ভয়ার্ত গলায় উত্তর দিল শিপ্রা।
 — 'ওকে একদিন এবাড়িতে ডেকো,কথা আছে ওর সাথে!'
 — 'কিন্তু বাপি ওকে কেন এবাড়িতে....'
— 'কোনো প্রশ্ন নয়,' বাপি বললেন,'আমি যখন বলেছি ওকে ডাকতে হবে,তখন ডাকতেই হবে।তুমি ওকে আসতে বোলো এবাড়িতে।' তিনি চলে গেলেন নিজের ঘরে।
— 'ও মাম্মাম,কি হবে এবার!' শিপ্রা অসহায়ভাবে মাম্মামের দিকে তাকাল।
— 'কি আবার হবে!তোমার বাপি নিশ্চয়ই খুব রেগে গেছেন।দেখি ওনাকে শান্ত করা যায় কিনা!' বলেই শিপ্রার মাম্মাম চলে গেলেন বাপির ঘরে।
 এর দুদিন পরেই শিপ্রা সৌরভকে নিয়ে এল ওদের বাড়ি।সৌরভকে বাপি ডেকে নিয়ে গেলেন নিজের ঘরে,তারপরেই দরজা বন্ধ করে দিলেন।শিপ্রা বেশ আশঙ্কিত হয়ে পড়ল,'বাপি সৌরভকে আলাদা ডেকে যে কি বলছে কে জানে!'
  প্রায় দেড়ঘন্টা পর বাপি দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন,বেরিয়ে এল সৌরভও।কিন্তু কারো মুখে কোনো দুশ্চিন্তার ছাপ নেই বিন্দুমাত্র,দুজনেরই মুখে যেন খুশির ঝিলিক।
  পরেরদিন রিমঝিম কলেজে গিয়েই এক অদ্ভুত কান্ড দেখল।ক্লাসে ঢুকেই ও দেখে ওর ক্লাসমেটরা অন্য এক ক্লাসমেট ঝুম্পাকে ঘিরে ধরেছে,আর ঝুম্পা কেমন লাজুক মুখে হাসছে।

পরবর্তী ভাগ পড়ুন : তৃতীয় পর্ব

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ