শত্রুমিত্র
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
তৃতীয় পর্ব
— 'এই কি ব্যাপার রে!' রিমঝিম এগিয়ে গিয়ে বলল, 'এত জটলা কিসের এখানে?'
— 'আরে এই তো রিম এসে গেছে,' সুদেষ্ণা অত্যন্ত উৎসাহিত হয়ে বলল,'দেখ না রিম,ঝুমির কান্ডটা দেখ শুধু!এত আনন্দের একটা খবর,তাও নাকি ট্রিট দেবে না বলছে!কি হাড়কিপ্টে মাইরি!'
— 'কেন রে?কি আনন্দের খবর রে?' রিমঝিম অবাক মুখে প্রশ্ন করল।
— 'আর বলিস না!উনি রিলেশনশিপে আছেন জানিস!'
— 'ওমা তাই নাকি!' রিমঝিম উৎসাহিত হয়ে ঝুম্পাকে প্রশ্ন করল,'ছেলেটা কে রে ঝুমি?বল্ না!'
— 'সৌরভ!' লাজুক মুখে বলল ঝুম্পা।
— 'ওয়াও,কংগ্রাচুলেশনস বস,তা ছেলেটা কি আমাদের কলেজেরই?না অন্য কলেজের?'
— 'আমাদের কলেজেরই রে রিম,কেমিস্ট্রিতে অনার্স পড়ে।' অন্য এক ক্লাসমেট সুজয় বলল।
— 'ও বাব্বা,তাহলে তো জমে ক্ষীর!তা ছেলেটার ছবি দেখি তো!আমাদের ঝুমির প্রেমিক বলে কথা,একবার ছবিটা তো দেখি!'
ঝুম্পা লাজুক মুখে মোবাইলের গ্যালারি খুলে সৌরভের ছবি দেখাল রিমঝিমকে।
ছবি দেখেই রিমঝিমের চোখ ছানাবড়া!
— 'আরে এ তো সেই ছেলেটা!' অজান্তেই মুখ থেকে বেরিয়ে এল রিমঝিমের।
— 'তুই চিনিস ওকে?' ঝুম্পা জিজ্ঞেস করল।
— 'হ্যাঁ,ফিজিক্স পাসের ক্লাসে দেখেছি।বাট পার্সোনালি আলাপ নেই।' কথা ঘুরিয়ে দিল রিমঝিম।
কিন্তু মনে মনে রিমঝিম খুব অস্থির হয়ে উঠল।এ তো সেই ছেলেটা,যাকে শিপ্রার সাথে রেস্টুরেন্টে দেখেছে ও।তাহলে কি ছেলেটা চিট করছে শিপ্রাকে!শুধু শিপ্রাকে তো নয়,সেই সাথে ঝুম্পাকেও!
'যতই শিপ্রা আমার শত্রু হোক,তাই বলে এভাবে জেনে বুঝে তো ওর জীবন নষ্ট হতে দেওয়া যায় না!' রিমঝিম ঠিক করল,'কিছু একটা করতে হবে।'
সেদিন শুক্রবার।রিমঝিমের এই দিন একটু আগে ছুটি হয়,আর শিপ্রার একটু পরে।রিমঝিম কলেজ ছুটির পরই কলেজের গেটে শিপ্রার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।
রিমঝিমের ছুটি হওয়ার প্রায় ঘন্টাখানেক পর ক্লাস শেষ হল শিপ্রার।সৌরভ আজ কলেজ আসেনি,শিপ্রা একাই এগিয়ে গেল কলেজের গেটের দিকে।রিমঝিম এগিয়ে এল ওর দিকে।
— 'তোর সাথে কিছু কথা ছিল।'
— 'আমার সাথে তোর কথা?আমি শিপ্রা,দেখতে পাচ্ছিস তো?নাকি চোখে কম দেখছিস আজকাল?'
— 'ঠিকই দেখছি আমি।আমি তোর সাথে কিছু কথা বলতে চাই।'
— 'কিন্তু তোর সাথে তো আমার কোনো কথা নেই!'
— 'তোকে কিচ্ছু বলতে হবে না।তুই শুধু আমার কথাটা শোন।'
— 'আমার অনেক কাজ আছে।ফালতু টাইম ওয়েস্ট করার ইচ্ছে একদমই নেই।সর সামনে থেকে।'
— 'শিপ্রা,অন্তত আজকের দিনটার জন্য ভুলে যা আমাদের সম্পর্কটা।প্লিজ শিপ্রা,অন্যদিন না হয় ঝগড়া করিস!'
— 'বাব্বা,আমায় আবার প্লিজ বলছেন ম্যাডাম!সূর্য কি পশ্চিমে উঠেছে নাকি আজ!'
— 'শিপ্রা,আমার কিছু ইমপরট্যান্ট কথা আছে তোর সাথে,' শিপ্রার হাতদুটো ধরল রিমঝিম,'প্লিজ শোন আমার কথাগুলো!প্লিজ!'
রিমঝিমের এহেন ব্যবহারে শিপ্রার মন গলল,বলল,'বেশ বল তাহলে,কি বলবি।'
— 'শিপ্রা,তুই আমাকে যতই অপছন্দ করিস,এটুকু তো মানবি যে আমি কারণ ছাড়া মিথ্যে বলিনা!'
— 'হুম,তা ঠিক।তুই ঝগড়ুটে মারকুটে যাই হোস,মিথ্যেবাদী না একদমই।'
— 'থ্যাংকস রে!আচ্ছা শোন,আমি তোকে সৌরভের সম্পর্কে কিছু বলতে চাই।'
— 'সৌরভ?তুই ওর ব্যাপারে জানলি কি করে?'
— 'শিপ্রা,সেসব কথা পরে হবে,আগে আমার পুরো কথাটা...'
— 'না না,পরে হবে কেন?আচ্ছা,এইবার আমি বুঝলাম,যে বাপিকে আমার আর সৌরভের ছবিটা কে পাঠিয়েছিল!তুই ই সেই অনামুখোটা না?'
— 'হ্যাঁ শিপ্রা,আমিই সেই জন।বাট আমার কথাটা তো আগে...'
— 'কিন্তু জানিস,তোর প্ল্যান মাঠে মারা গেছে।ভেবেছিলি সৌরভ আর আমার ছবি বাপিকে পাঠিয়ে আমায় কেস খাওয়াবি,বাট সেটা হয়নি।বাপি সৌরভকে মেনে নিয়েছেন,আর বলেছেন দুজনে এস্টাব্লিশড হওয়ার পর বিয়ে দেবেন আমাদের।সো,তোর প্ল্যান পেল বিগ জিরো,হে হে হে!' হাসতে লাগল শিপ্রা,'যাকগে বল,কি বলবি!'
— 'সৌরভ ছেলেটা একদমই ভালো না রে শিপ্রা।ও তোর সাথে রিলেশনে আছে,এদিকে আমার এক ক্লাসমেট ঝুম্পার সাথেও রিলেশনে আছে।ঝুম্পাকেও সাবধান করব আমি,বাট আগে তোকে জানালাম ব্যাপারটা।'
— 'যাস্ট শাট আপ রিমঝিম!যা মুখে আসছে তাই বলে যাচ্ছিস দেখছি! সৌরভের সম্পর্কে এরকম কথা বলার সাহস কিভাবে হয় তোর?তাও আমার সামনে!ছি ছি,একটা ভালো মানুষের সম্পর্কে যা খুশি তাই....'
— 'ও ভালো মানুষ নয় শিপ্রা,বিশ্বাস কর।ও ঠকাচ্ছে তোকে!'রিমঝিম মরিয়া হয়ে শক্ত করে চেপে ধরল শিপ্রার হাত দুটো,'তুই আমায় যা খুশি খারাপ কথা বল,আমায় মার,কিন্তু প্লিজ ওই ছেলেটার থেকে দূরে থাক,ও তোর জীবন নষ্ট করে দেবে শিপ্রা!'
— 'হাতটা ছাড়!আমি জানি আমায় সুখী দেখলে তোর বড়ো জ্বালা ধরে মনে,তাই বলে তুই সৌরভকে টেনে নিচে নামাতে চাস?ছিঃ!এতটা নীচ তুই!'
— 'শিপ্রা,ট্রাস্ট মি!আমি মিথ্যে বলছি না!'
— 'বিশ্বাস!আর তোকে!হুঃ!এতদিন জানতাম তুই যা ই করিস অন্তত লায়ার নোস!আজ দেখি আমি ভুল জানতাম!সর,এক্ষুণি সর আমার চোখের সামনে থেকে!'
রিমঝিমকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে শিপ্রা এগিয়ে গেল।
— 'আর আমি যদি প্রমাণ দিই তাহলে?তাহলেও একই কথা বলবি তো?'
রিমঝিমের এই কথাটা শুনে শিপ্রা দাঁড়িয়ে পড়ল।পিছন ফিরে বলল,'যদি প্রমাণ দিতে পারিস,তাহলে মেনে নেব তোর সব কথা।কিন্তু আমি হলফ করে বলতে পারি,যে প্রমাণ তুই দিতে পারবি না!'
— 'আচ্ছা বেশ,প্রমাণ আমি খুব শিগগিরই দেব।সেদিন বিশ্বাস করতেই হবে তোকে আমার কথা,দেখে নিস।'
পরবর্তী ভাগ পড়ুন : চতুর্থ পর্ব
1 মন্তব্যসমূহ
Darun lagche. Ek nishwas a porchi
উত্তরমুছুন