সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
রক্ষণশীল ঘরে জন্মেছিলাম আমি,
একান্নবর্তী পরিবার ছিল আমাদের,
দাদা দিদি ভাই বোনেদের সাথে বেড়ে উঠেছিলাম
একসাথে,
সবাই বলত,আমার নাকি দাদা দিদি ভাই বোনেদের মতো অত বুদ্ধিসুদ্দি নেই,
পড়া ভুলে যাই,সকলে ভাবল পড়াশুনা না হোক,ঘরের কাজকর্ম অন্তত শিখবে,
যতই হোক মেয়েমানুষ,ঠিকই গছিয়ে দেওয়া যাবে অন্য ঘরে,
কিন্তু হায়!আমি এতটাই বোকা ছিলাম,যে কোনোকিছু শেখাই আমার দ্বারা হল না,
দিদি বোনেরা হাসত,মা মাঝে মাঝেই চিৎকার করত,খুব বেশি রাগ হলে গায়েও হাত তুলে দিত,
বলত,'তুই মানুষ হবি না কোনোদিন?বোঝা হয়ে থাকবি আমাদের?'
আমার বোকার মতো চুপ করে থাকা দেখে আরও চটে যেত মা,
মায়ের সে লাল চোখ দেখে ভয়ে দৌড়ে পালিয়ে যেতাম চিলেকোঠার ঘরে,
জানলা দিয়ে পাখি দেখতাম,গাছ দেখতাম,বিড়াল দেখতাম,
মনে হত,আহা!মানুষ না হয়ে যদি গাছ,পাখি,বা বেড়াল হতাম,
এত চোখরাঙানি,হাসিঠাট্টা সইতে হত না,
'আমি কেন অন্যদের মতো নই' এ কথাও শুনতে হত না উঠতে বসতে,
ভগবানের কাছে প্রার্থনা করতাম,যদি পরজন্ম থাকে,তবে যেন আর মানুষ করে পাঠিয়ো না আমায়,
কিন্তু হঠাৎই একজন এল আমার জীবনে,যে আমায় সম্মান দিল,
তার সাথে কথা বলার সময় মনে হত,আমিও মানুষ!
সে আমায় ধরে ধরে সে কত্তকিছু শেখাল,না পারলে আরও ভালোবেসে শেখাত আমায়,
কক্ষনো বকেনি মারেনি হাসেনি বাড়ির মানুষগুলোর মতো,
ও সমীরণ,বোনকে টিউশন পড়াতে আসত রোজ বিকেলে,
যেদিন গুলোয় ও আসত না,বড্ড কষ্ট হত,সেই সঙ্গে এক ভয়ও কাজ করত,ওকে হারিয়ে ফেলার ভয়!
তারপরেই একদিন ঘটল বিপদ!জেঠুর চোখে একদিন আমরা ধরা পড়ে গেলাম,
পরের দিনই চরম অপমান করে সমীরণকে তাড়িয়ে দেওয়া হল বাড়ি থেকে,
কারণ 'অমন চালচুলোহীন ছেলে কিনা হবে রায়বাড়ির জামাই!'
আমাকে মারতে মারতে টেনে ঘরে এনে দরজা বন্ধ করে দিল বাড়ির মহিলারা,
'বোকা মেয়ে,এদিকে বিপথগামী হওয়ার শখ কত!'বলে বিয়ের ব্যবস্থা করা হল আমার তড়িঘড়ি,
আজ আমার বিয়ে,পাত্রের স্বভাব চরিত্র একেবারেই ভালো নয়,কানে এসেছে আমার,
'তা হোক!বনেদী বাড়ির একমাত্র ছেলে বলে কথা,ওটুকু দোষ মানিয়ে নিতে হয়!' বলে উঠল বাড়ির বড়োরা,
আমি জানিয়ে এসেছিলাম,মত নেই আমার এ বিয়েতে,
সমীরণই যে শিখিয়েছিল আমায়,যে সকল প্রাপ্তবয়স্ক মানুষেরই নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তার জীবনের কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না কেউ,
আবারও একদফা মার জুটল আমার কপালে,
প্রচন্ড যন্ত্রণায় জ্বরে পড়লাম,তবু সে অবস্থাতেই তুলে এনে কনে সাজানো হল,
আমায় সাজানো শেষ হওয়ার পরেই খবর এল,বর এসেছে!
'দেখো,যেন মন্ডপে গিয়ে আবার জ্বরে অজ্ঞান হয়ে যেও না!'বলে ওষুধ রেখে গেল ওরা,
থার্মোমিটারটা কাছেই ছিল,দেখলাম আমার গায়ের তাপমাত্রা ১০৪°,
শুনেছিলাম এর বেশি উষ্ণতা হলে নাকি মানুষ আর বাঁচে না,
খেলাম না ওষুধ,মেঝেতে শুয়ে পড়লাম সমীরণের ছবিটা বুকে নিয়ে,
ওদিকে সকলে বরযাত্রীদের নিয়ে ব্যস্ত,এদিকে আমার জ্বর ক্রমশ বাড়ছে,
বুঝতে পারছি আর আয়ু বেশিক্ষণ নেই,
হাসি পাচ্ছে,ভীষণ হাসি পাচ্ছে এখন আমার,
ওরা আমায় সারাজীবন অপমান করেছে,মানুষ ভাবেনি কেউ,
বন্দি করেছে আমায়,বিয়ে দিচ্ছে আমার মতের বিরুদ্ধে,
তবুও যে শেষরক্ষা হল না!আমায় বেঁধে রাখতে পারল কই?
1 মন্তব্যসমূহ
Bastob akdom
উত্তরমুছুন