মনের মানুষ
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
দ্বিতীয় পর্ব
— 'আরিব্বাস,শ্যালিকারাণী যে!' অবাকচোখে তাকিয়ে দীনেশ বলল,'কি ব্যাপার অস্মিতারাণী?বড়োলোক বরের বাড়ি যাবে বলে আর তর সইছে না বুঝি?জামাইবাবুর মধ্যবিত্ত বাড়ি আর পোষালো না বুঝি?' দীনেশ নিচু গলায় বলল,'নাকি পালিয়ে টালিয়ে যাচ্ছ?দেখেছ,ভাগ্যিস আজ সকাল সকাল বেরিয়েছিলাম দধিমঙ্গলার জিনিসপত্র কিনব বলে,নইলে তো পাখি ফুরুৎ হয়ে যেত!' বলেই ক্রূর হাসি হাসল দীনেশ।
অস্মিতা হঠাৎ উল্টোমুখে ছুটতে শুরু করল।এখন যেভাবেই হোক জামাইবাবুর হাত থেকে বাঁচতে হবে তাকে।দীনেশও ছুটতে লাগল ওর পেছনে,চেঁচিয়ে বলল,'দুদিনের মেয়ে,দীনেশ স্যান্যালের সাথে ছুটে পারবি?'
ছুটতে ছুটতে অস্মিতা এসে পড়ল একটা ফাঁকা মাঠে,তারপর মাঠ ছাড়িয়ে ছুটতে ছুটতে এসে পড়ল বড়ো রাস্তায়।অস্মিতার কোনো হুঁশ নেই,যেভাবেই হোক জামাইবাবুর হাত থেকে বাঁচতে হবে তাকে।ছুটতে ছুটতে অস্মিতা এসে পড়ল একটা বড়ো গাড়ির সামনে।ভাগ্যিস গাড়ির ড্রাইভার ব্রেক কষল সঠিক সময়ে,নইলে হয়ত অস্মিতা চাপাই পড়ে যেত।অস্মিতা মাটিতে পড়ে গিয়েছিল,পড়ে গিয়ে হাত ছড়ে রক্তও বেরোচ্ছিল কিছুটা।হঠাৎই এক চেনা গলা শোনা গেল,'কি গো মামণি,এত সকালে কোথায় পড়তে যাচ্ছিলে?বিয়ের দিন আবার কিসের পড়া গো অস্মিতা রাণী?'
অস্মিতা আশঙ্কিত মুখে তাকিয়ে দেখে,অরবিন্দবাবু।তিনিই ড্রাইভ করছিলেন গাড়িটা।অস্মিতা তাঁকে দেখে এতটাই হকচকিয়ে গেল যে বাক্যহারা হয়ে গেল,আর অরবিন্দবাবু অস্মিতাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিলেন গাড়িতে,তারপর চললেন দীনেশের বাড়ির দিকে।ঘটনাটা এতটাই আকস্মিকভাবে ঘটে গেল যে হতভম্ব অস্মিতা প্রতিবাদ করতেও ভুলে গেল।
দীনেশের বাড়িতে তখন হুলুস্থুল কান্ড।দীনেশ রাগারাগি করছে প্রচন্ড,আর উর্মিলাকে ঝাঁঝালো কন্ঠে বলছে,'কি আক্কেল দেখো মেয়ের!বোনকে এতই বিশ্বাস যে দরজাটা শুধু ভেজিয়েই চলে গেছে!কোন্ দিন দেখব তোমার জন্য আমায় খুন হয়ে যেতে হবে!'
উর্মিলাও রাগী গলায় বলতে থাকে,'অনামুখো মেয়ের পেটে পেটে এত,তা কেন জানত?এমন শান্ত হয়ে ছিল কাল যে ভেবেছিলাম বিয়েতে মত আছে আবাগীর!'
— 'দেখলে তো,এইজন্যই বলে মেয়েমানুষের বুদ্ধি হাঁটুর নীচে!তোমার অর্ধেক বয়সী মেয়েটা নাকের ডগা দিয়ে পালাল,ধরতেই পারলে না!'
সেই সময়েই হঠাৎ প্রবেশ অরবিন্দবাবুর,তাঁর বজ্রমুষ্ঠিতে বন্দি কিশোরী অস্মিতার নরম হাত।তিনি ঢুকেই বলতে লাগলেন,'নিজেদের মধ্যে ঝগড়া না করে আমার বৌ টাকে আগলে রাখলে তো কাজে দিত নাকি!অতগুলো টাকা দিয়েছি কি নাকে তেল দিয়ে ঘুমোনোর জন্য!'
বলেই অস্মিতাকে ঠেলে দিলেন তিনি,পিঠে ব্যাগসুদ্ধু অস্মিতা ছিটকে পড়ল উঠোনে।উর্মিলা গিয়ে চুলের মুঠি ধরল অস্মিতার,রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল, 'জানোয়ার মেয়ে,যে জামাইবাবু খাওয়ায়-পড়ায়,তার নাক কাটার ব্যবস্থা করতে গিয়েছিলি?'
— 'দীনেশ দা ও তো আমার মত নেয়নি একবারও দিদি!' নীচের দিকে তাকিয়ে ভীত কন্ঠে বলল অস্মিতা।
— 'চোপ!অন্যায় করে আবার মুখে মুখে চোপা!আজ তোরই একদিন কি আমারই!' উর্মিলা অস্মিতার চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে নিয়ে গেল ঘরে,তারপর বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে তালা ঝুলিয়ে দিল ঘরে,'মতি ফিরেছে ভেবে একটু ছেড়েছিলাম কি ছাড়িনি,অমনি তিনি পালিয়ে গেছেন!ভেবেছেন বিয়ে করবেন না!শোন্ অস্মিতা,তোর বিয়ে আজকেই হবে,আর অরবিন্দবাবুর সাথেই হবে,কেউ আটকাতে পারবে না!'
উর্মিলা চলে গেল।অস্মিতা কাঁদতে কাঁদতে দরজায় ধাক্কা দিতে লাগল,'দিদিভাই,তোর পায়ে পড়ি,প্লিজ খুলে দে দরজাটা!'
কিন্তু অস্মিতার কথায় কেউ কর্ণপাত করল না।
দীনেশ অরবিন্দবাবুকে বলল, 'আপনি রাগ করবেন না স্যার,আসুন না বাড়ির ভেতরে বসবেন।কি গো উর্মি,মানুষটাকে একটু জল মিষ্টি দেবে না নাকি গো?'
— 'আরে না না না দীনেশ,আমি জল মিষ্টি খেতে আসিনি,আর বসতেও আসিনি,শুধু আমার বৌটাকে কিছুক্ষণের জন্য তোমাদের কাছে গচ্ছা রেখে গেলাম,দেখো যেন আবার হাত ফসকে না পালায়!আমি এখন চলে যাচ্ছি,সন্ধ্যেবেলা আসব টোপর মাথায়,তখনই বিয়ে করে মিষ্টি খাব,আর যদি বিয়ে না করতে পারি তাহলে তোমাদের স্বামী-স্ত্রীর কোমরে দড়ি পরিয়ে সব টাকা উসুল করে নেব,আর তোমারও চাকরি নিয়ে টানাটানি হবে দীনেশ,মনে রেখো!'
অরবিন্দবাবু গটগট করে হেঁটে বেরিয়ে গেলেন।
অন্যদিকে কান্নাকাটি,ডাকাডাকি করে অস্মিতা হাঁপিয়ে উঠল।আজ বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত অস্মিতার খাওয়া বন্ধ,বলে দিয়েছে উর্মিলা।ক্লান্ত অস্মিতা কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে কাঁদতে কাঁদতে,খেয়ালই নেই তার।সন্ধ্যে নামল,উর্মিলার চেঁচামেচিতে ঘুম ভাঙল তার।নাবালিকার বিয়ে,তাই উৎসব অনুষ্ঠান হচ্ছে,তবে লোকচক্ষুর আড়ালে।কাউকে সেভাবে নেমন্তন্নও করা হয়নি কয়েকজন বিশ্বস্ত বন্ধুবান্ধব-আত্মীয়স্বজন ছাড়া।যে কয়েকজন চেনাজানা মহিলা আর পুরুষ আনা হয়েছিল বিয়েতে বাড়ি সাজানো,আর রান্নাবান্না করার জন্য,তাদেরই তাড়া দিচ্ছে উর্মিলা,'বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে হল,কাজকর্মগুলো একটু তাড়াতাড়ি করো হাত চালিয়ে!বর এলে তারপর সব আয়োজন করবে নাকি তোমরা!'
উর্মিলার এই কর্কশ কন্ঠ শুনে ঘুম ভেঙে গেল অস্মিতার।ক্ষীণকন্ঠে ও একটু জল চাইল,আর উর্মিলা দরজা খুলে এক গ্লাস জল মেঝেতে রেখে দিয়ে দরজাটা আবার লক করে কোথায় যেন চলে গেল।
জল খেতে খেতে অস্মিতা নিজের মনটাকে শক্ত করার চেষ্টা করছিল,কারণ ও ধরেই নিয়েছিল বিয়েটা হচ্ছেই,কোনোভাবেই বিয়েটা বন্ধ হওয়ার আশা নেই। মৃত বাবা-মাকে মনে করছিল সে,আর প্রার্থনা করছিল সামনে যে ঝড় আসতে চলেছে তার জীবনে,সেই ঝড় সামলানোর সাহস যেন সে যুগিয়ে উঠতে পারে।
ক্রমে বাইরের অন্ধকার গাঢ় হতে লাগল।দিনের শেষ আলোটুকুও নিভে এল।উর্মিলা আর কয়েকজন মহিলা মিলে সাজাতে বসল বিধ্বস্ত অস্মিতাকে।অস্মিতা কোনো বাধা দিল না,একটা কাঠের পুতুলের মতোই চুপচাপ মেনে নিতে থাকল সবটা।
বিয়ের লগ্ন রাত আটটায়।ঘড়ির কাঁটা সাড়ে সাতটা পেরোতে না পেরোতেই গাড়ি হাঁকিয়ে বরবেশে হাজির অরবিন্দবাবু।
দীনেশ আর উর্মিলা খুব খুশিমনে তাঁকে বরণ করে নিয়ে এল ছাদনাতলায়।শেষ মুহূর্তেও পালানোর চেষ্টা করেছিল কনের সাজে সজ্জিত অস্মিতা,কিন্তু দরজার বাইরে কড়া পাহারা বসানো ছিল,তাই আর সাহস পায়নি সে।
অস্মিতাকে নিয়ে আসা হল ছাদনাতলায়।অরবিন্দবাবু অস্মিতার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়েছিলেন,ঠিক যেমন পছন্দের খাবারের দিকে লালায়িত দৃষ্টিতে তাকায় সকলে।আর মাত্র কিছুটা ঘন্টা,তারপর পাকাপাকিভাবে অস্মিতা হয়ে উঠবে অরবিন্দবাবুর খাদ্যবস্তু।গলা বুজে আসছিল স্কুলপড়ুয়া অস্মিতার।
— 'কি অত ভাবছ শ্যালিকা,স্যারের গলায় মালাটা পরিয়ে দাও!' দীনেশ ঠাট্টার সুরে বলল।
অস্মিতা রোবটের মতো মালাটা নিজের গলা থেকে খুলে পরিয়ে দিতে যাচ্ছিল অরবিন্দবাবুর গলায়,হঠাৎ একটা চেনা গলা শুনে সম্বিৎ ফিরল অস্মিতার।অস্মিতা ফিরে দেখে ত্রিয়া এসেছে,সাথে এসেছে ওর মা বাবা ও,সেই সাথে ওদের স্কুলের প্রতীক স্যার,এই মানুষটিকে অস্মিতার মনে হয় একেবারে যেন বাবার মতো,আর সেই সাথে পুলিশও এসেছে।ত্রিয়া বলল,'অনেক হয়েছে,তুই কাল থেকে যথেষ্ট সয়েছিস,আর না!উঠে আয় মন্ডপ থেকে,আয় বলছি!'
অস্মিতার হঠাৎ মনে হল স্বপ্ন দেখছে না তো ও!কিন্তু প্রতীক স্যারের কথায় সেই ভুল ভাঙল ওর,শুনল তিনি বলছেন,'আয় মা,উঠে আয়,তোকে জোর করে বিয়েটা দেওয়া হচ্ছে,আমরা সবাই বুঝতে পেরেছি সেটা।'
পুলিশ ইনস্পেকটর বললেন,'একদমই তাই,তোমার ভয়ের কোনো কারণ নেই,উঠে এস!'
অস্মিতা এক ছুটে চলে এল মন্ডপ থেকে,তারপর ত্রিয়াকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ল ও।ত্রিয়া ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,'তুই ফোন করে কাল রাতে জানানোর পরও আমরা না এসে পারি বল্?'
— 'হ্যাঁ রে অস্মি,' ত্রিয়ার মা বললেন,'ত্রিয়ার বাবা আজ সকাল থেকেই সবটা নজরে রাখছিল,তারপর প্রতীকবাবুকেও জানাই আমরা সবটা।আমরা ঠিক করেই নিয়েছিলাম,বিয়ের সময়েই আসব আমরা পুলিশ নিয়ে,কারণ আগে এলে হয়ত তোর দিদি-জামাইবাবু পুরো ঘটনাটা অস্বীকার করত,আর তুইও বিপদে পড়তিস।'
উর্মিলা রাগতস্বরে বলল,'বিয়েটা ভেঙে দিলেন যে,ওই অপয়া মেয়েটাকে কে আর রাখবে বাড়িতে?আমি কিন্তু রাখব না ওকে!'
— 'একদমই তাই!' দীনেশ বলতে লাগল,'ওর জন্য আর একটা গাঁটের কড়িও খরচ করতে রাজি নই আমি!'
অন্যদিকে পরিস্থিতি কঠিন বুঝে অরবিন্দবাবু কেটে পড়লেন।
— 'হ্যাঁ হ্যাঁ জানি জানি,সে আর বলতে!তোমাদের মতো চামার খুব কম দেখেছি আমি জীবনে',প্রতীকবাবু বলতে লাগলেন,'অস্মি মা আজ আমার সাথে যাবে আমার বাড়িতে,আমার মেয়ে হয়ে থাকবে ও,ওর যাবতীয় দায়িত্ব আমার।'
পরবর্তী ভাগ পড়ুন : তৃতীয় পর্ব
1 মন্তব্যসমূহ
Darun lagche golpota
উত্তরমুছুন