শত্রুমিত্র
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
প্রথম পর্ব
— 'উফ, স্কুলে ঢুকতে না ঢুকতেই অলুক্ষুণেটার মুখ দেখতে হল!' রিমঝিম গজগজ করতে লাগল নিজের মনে,'দিনটাই না আজ খারাপ যায়!'
— 'হে ভগবান, শয়তানটা যেন এই স্কুলে চান্স না পায় একটু দেখো প্লিজ!' শিপ্রা কাতরভাবে প্রার্থনা করল মনে মনে,'আমার লাইফটা হেল করে ছাড়বে!'
শিপ্রা আর রিমঝিমের একই পাড়ায় না হলেও একই শহরে বাড়ি।প্রাইমারি স্কুল থেকে ওদের আদায়-কাঁচকলায় সম্পর্ক। সামান্য ব্যাপার নিয়ে ঝগড়া মারামারি করতে ওদের জুড়ি নেই।একে অপরের মুখ দেখতে চায় না।অথচ ওদের অভিভাবকদের মধ্যে কিন্তু যথেষ্ট ভাব-বন্ধুত্বের সম্পর্ক। রিমঝিম বাপ-মা মরা মেয়ে,কিন্তু তার বিধবা পিসি রমা কোনোদিনও বাবা মায়ের অভাব বুঝতে দেননি।পেশায় রমা একজন স্কুল শিক্ষিকা।রিমঝিমেরও পিসিকে দেখে শিক্ষিকা হওয়ায় ইচ্ছা প্রবল।
শিপ্রার অবশ্য বাবা মা আছেন।তাঁদের সাথে রমার যথেষ্ট বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক।দু পক্ষের অভিভাবকই কত চেষ্টা করেন দুজনের মধ্যে বন্ধুত্ব করাতে,কিন্তু সেকথা তারা শুনলে তো!ঝগড়া-চিৎকার-মারামারির চোটে বিরক্ত হয়ে ক্লাস টিচার যে কতবার ওদের নিল ডাউন করিয়েছেন তার হিসেব বোধহয় তাঁর নিজেরও নেই।তবু কি ওদের শিক্ষা হয়!নিল ডাউন করতে গিয়েও ঝগড়া, চুলোচুলি! বিরক্ত হয়ে স্কুলের প্রিন্সিপাল গার্জেন কলও করেছেন বহুবার,তবু ওদের তাতে কিছুই আসে যায় না!অন্যজনকে অসুবিধায় ফেলাই যেন ওদের দুজনের একমাত্র লক্ষ্য!
যেদিন ক্লাস ফোরের ফাইনাল পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোলো,সেদিন যেন দুজনেই হাঁফ ছেড়ে বাঁচল,'যাক বাবা,আর হতচ্ছাড়াটার মুখ দেখতে হবে না!'
কিন্তু শেষদিনেও তারা ঝামেলা করতে ছাড়েনি,রিমঝিমের রেজাল্ট দেখে শিপ্রা বলল,'হুঃ,উনি আবার অঙ্কে পেয়েছেন একশো!কি বোঝে ও অঙ্কের?নির্ঘাত টুকলি করেছে!'
রিমঝিমও তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,'ইংরাজীর বানানই লিখতে পারে না,উনি আবার ইংরাজীতে টপ করেছেন স্কুলে!হুঃ!আসলে ইংরাজীর ম্যাম ওকে বেশি ভালোবাসেন কিনা,তাই!'
— 'কি বললি?আমি ম্যামকে হাত করেছি?'
— 'ঠিক বলেছি!তুই কেন বললি যে আমি টুকলি করেছি?'
ব্যস আবার একচোট হাতাহাতি।কিন্তু তখন সেখানে সবাই ছিলেন,তাই হাতাহাতিটা বেশিক্ষণ চলল না।
তারপর হাইস্কুলে অ্যাডমিশন টেস্টের দিন আবার দেখা দুজনের।নেহাত নতুন স্কুল,দুজনের মনেই ভয় ছিল,তাই আর অশান্তি করার সাহস পেল না ওরা।শুধু মনে মনে গজগজ করে ওরা চলে গেল নিজেদের সীট পরা রুমে।
তারপর যেদিন টেস্টের ফল ঘোষিত হল,দুজনেই ছুটল লিস্ট দেখতে।না,লিস্টে শুধু নিজের নাম আছে কিনা তাই নয়,প্রতিপক্ষেরও আছে কিনা তাও দেখতে গেল।লিস্ট দেখে দুজনেরই চক্ষুস্থির! শুধু এক স্কুলই নয়,এক সেকশনেও!ব্যস আর কি!বাড়ি এসে শুরু হল চোটপাট!
— 'পিপি,আমি ওই স্কুলে পড়ব না!অন্য স্কুলে দেখো অ্যাডমিশন হয় কিনা।'
— 'কেন রিম,কি প্রবলেম?'
— 'জীবনের সবচেয়ে বড়ো প্রবলেমটাই তো পিছু ছাড়ছে না!এই স্কুলেও এসে জুটেছে!'
— 'কে?শিপুর কথা বলছিস?'
— 'হ্যাঁ,ওই শয়তানটা!'
— 'ছি মা,অমন করে বলে না।ও না তোমার সহপাঠী?আর এই স্কুলে একদম দুষ্টুমি করবে না।বড়ো হয়েছ,নিজের সম্মান নিজে নষ্ট কোরো না।ঝগড়াঝাঁটি করলে কেউ ভালোবাসবে না।'
আসলে দুজনের অভিভাবকরাই চান,ওদের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠুক।তাই শলাপরামর্শ করে একই স্কুলে ভর্তি করেছেন দুজনকে।
কিন্তু তাঁদের পরিকল্পনা একেবারেই জলে গেল।মিলমিশ তো হলই না ওদের,উলটে ওদের ঝগড়ার চোটে ক্লাসে ম্যাডামদের পড়ানো দায়।বাধ্য হয়েই ওদের আলাদা সেকশনে রাখার ব্যবস্থা করা হল শেষমেশ।
এইভাবেই ঝগড়া-হাতাহাতি করে ওদের হাইস্কুল জীবনও শেষ হল।ওরা উচ্চমাধ্যমিক পাশ করল।দুজনেই অভাবনীয় রেজাল্ট করল। আর্টস গ্রুপে স্কুলে প্রথম হল শিপ্রা,আর সায়েন্স গ্রুপে রিমঝিম।দুজনেই মার্কশিট হাতে এল বড়দির ঘরে,তাঁর কাছ থেকে আশীর্বাদ নিতে,কিন্তু আলাদা সময়ে।বড়দি দুজনকেই বড্ড স্নেহ করেন,তাঁর শুধু একটাই আফসোস,হাজার চেষ্টা করেও দুই মেয়ের মধ্যে কিছুতেই বন্ধুত্ব গড়ে তোলা গেল না!তাই স্কুলের শেষদিনে যখন তারা বড়দিকে প্রণাম করতে এসেছিল,তখনও বড়দি ওদের বোঝালেন,যেন ওরা নিজেদের মধ্যে এই ঝামেলা মিটিয়ে নেয়।তবু কে শোনে কার কথা!বড়দির কথাগুলো এক কান দিয়ে শুনে অন্য কান দিয়ে বের করে দিল ওরা সেদিনও।
এরপর বিভিন্ন কলেজের অ্যাডমিশনের ফর্ম বেরোতে লাগল।এইবার শিপ্রা আর রিমঝিম দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিয়েছে,অনেক হয়েছে!কলেজ আর কিছুতেই এক হওয়া চলবে না!কিন্তু দুই মেয়ের অভিভাবকরা আবারও গোপন পরিকল্পনা করলেন।ওদের অনেক বন্ধুবান্ধবদেরও এই পরিকল্পনায় সাথে নিলেন অভিভাবকরা।
এরপর কলেজে অ্যাডমিশনের দিন এসে গেল।শিপ্রা ভর্তি হবে ইংরাজীতে অনার্স নিয়ে,আর রিমঝিম ম্যাথামেটিক্সে।এক্ষেত্রে দুই সাবজেক্টের অ্যাডমিশন টাইম ছিল আলাদা,তাই দুই মেয়ের মুখোমুখি হওয়ার চান্স নেই একদমই।তাই দুই মেয়ে না জেনেই নিশ্চিন্তমনে ভর্তি হয়ে গেল কলেজে,জানল যে অপরজন এই কলেজে ভর্তি হয়নি।
কিন্তু সত্যি কি চাপা থাকে বেশিদিন? কলেজের ইউনিয়ন ফ্রেসার্সের দিন মুখোমুখি হয়ে গেল ওরা।
— 'কি ব্যাপার,তুই এখানে?তুই না এই কলেজে পড়িস না?কেন এসেছিস তাহলে আমার কলেজে?' শিপ্রা শাড়ির আঁচল কোমরে গুঁজে ঝগড়া করার জন্য রেডি হল।
— 'তোর কলেজ?কে বলল এটা তোর কলেজ?এটা আমার কলেজ,আমি এই কলেজে ভর্তি হয়েছি।তুই ই বরং বহিরাগত!' রিমঝিমও চুড়িদারের ওড়নাটাকে কোমরে পেঁচিয়ে বাঁধল,এ ঝগড়ায় ওকেই জিততে হবে!
— 'কি?আমায় বহিরাগত বললি?এই দেখ,আমার গলায় কার্ড।'শিপ্রা কলেজের আইডি কার্ডটা রিমঝিমের মুখের সামনে ধরল।
— 'হুঃ,ও কার্ড আমারও আছে এই দেখ,' রিমঝিম ব্যাগ থেকে বের করে দেখাল,'আমি যে এই কলেজে পড়ি,সেটা সবাই জানে,তাই তোর মতো গলায় কার্ড ঝুলিয়ে ঘুরে বেড়াই না দেখনদারি করতে!'
— 'কি বললি?আমি দেখনদারি করি?'
— 'নয়তো কি?আসলে তুইই ব্যাটা এই কলেজে পড়িস না,তাই কোথা থেকে নকল একটা কার্ড বানিয়ে গলায় পরে ঘুরছিস,পাছে কেউ তোকে খেদিয়ে দেয় এখান থেকে!'
— 'এই এই,কি বললি?আমার কার্ডটা নকল?মোটেও না,আসলে তোরটাই নকল,নইলে হঠাৎ কার্ড যে নকল করা যায় এই চিন্তাটা তোর মনে এলই বা কেন?ওই যে বলে চোরের মন পুলিশ পুলিশ....'
— 'ওই শিপ্রা,একদম আবোলতাবোল বকবি না! আমায় চোর বললি তুই?এতবড় সাহস তোর?'
— 'নয়ত কি! আজকের অনুষ্ঠানে সবাইকে গোলাপ আর মিষ্টি দেবে। আর তুই গোলাপের যা ভক্ত তা কি আর আমি জানিনা! ওই ফ্রিতে গোলাপ পাবি সেই লোভেই এসেছিস নকল কার্ড বানিয়ে!'
— 'শিপ্রা এবার কিন্তু বাড়াবাড়ি করছিস তুই!'
— 'বেশ করেছি!'
শুরু হয়ে গেল ওদের চুলোচুলি।শেষমেশ ওদের দুজনের ক্লাসমেটরা এসে অনেক কষ্টে ওদের বোঝাতে সক্ষম হল,যে কেউই বাইরের নয়,দুজনেই এই কলেজে পড়ে।তবু কি ওদের চুলোচুলি থামে!শেষমেষ ইউনিয়নের ছেলে মেয়েরা এসে ওদের থামাল।
পরবর্তী ভাগ পড়ুন : দ্বিতীয় পর্ব
1 মন্তব্যসমূহ
Aj 1st theke suru korechi. Golpor starting ta khub bhalo holo
উত্তরমুছুন