ভিন্নস্বাদের লেখা
প্রিয় পাঠক পাঠিকা,আপনাদের জন্য রইল দুটি ভিন্নস্বাদের লেখা।
১)
সবই পর
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
লিখতে লিখতে খাতার ওপর ঢলে পড়ল সুরঞ্জনা।পাতাটা আগেই ফোঁটা ফোঁটা চোখের জলে ভিজেছিল,এখন গাল বেয়ে নামা নোনতা স্রোতের সবটাই লেপে গেল পাতাটায়।
'সে' তো অনেকদিন আগেই সুরঞ্জনাকে নিজের জীবনে অপ্রয়োজনীয় মনে করে প্রাক্তন করে দিয়েছে।আজ দাদার মেয়েটাও,যাকে সে সন্তানের মতো স্নেহ করে,সেও বলল,'মা তোমার সাথে বেশি মিশতে বারণ করেছে।' সুরঞ্জনা বুঝল,সবই পর,কিছুই তার আপন নয়,শুধু এই লেখাগুলো ছাড়া।
২)
কিছু কথা
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
সে অনেককাল আগের কথা,যখন বিচার হত আদালতে,এখন তো ফেসবুক থেকে শুরু করে যেকোনো সোশ্যাল মিডিয়াই এক একটা বিচারসভা,সকলেই বিচারক এখানে।যার কমেন্ট যত বেশি জাজমেন্টাল,যত বেশি খিল্লির মশলা মেশানো,তার কমেন্টে তত বেশি হাহা,সে তত বেশি বোদ্ধা।আবার কিছু কিছু মানুষ আছেন,তারা আপনি যাই লেখেন বা ছবি পোস্ট করেন না কেন আপনার,কিছু একটা নেগেটিভ কমেন্ট করা তাদের চাই ই চাই।অর্থাৎ আপনি নিজস্ব মতামত লিখলেন সোশ্যাল মিডিয়ায়,বা নিজের জীবন সম্পর্কিত কোনো অভিজ্ঞতা লিখলেন,একজন না একজন কমেন্ট করতে আসবেই,যে বলবে,না এরকমটা হতেই পারে না!যেন গোটা দুনিয়ার প্রতিটি কোণ সে প্রতিমুহূর্তে দেখতে পায় কোনো ম্যাজিক মিররে!
তো এইবার আসি কিছু উদাহরণে।আমি একবার একটি লেখায় লিখেছিলাম,আমার প্রিয় শহর কলকাতা, এবং এমনটা লেখার কারণও আমি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছিলাম নিজের মতো।একবারের জন্যও কোথাও লিখিনি যে,কলকাতা শহর আমার প্রিয় বলেই তা সকলের কাছেই প্রিয় হতে হবে,বা কলকাতা শহরের প্রশংসা করলাম মানেই অন্যান্য গ্রাম বা শহরকে তুচ্ছ জ্ঞান করলাম।কিন্তু সেখানে বেশ কয়েকটি কমেন্ট পড়ল,যে কেন ম্যাডাম?শুধু কলকাতা শহরই ভালো?আর গ্রামবাংলা বুঝি খুব খারাপ! অন্য এক ব্যক্তি কমেন্ট করেছিলেন যে,হ্যাঁ কলকাতা শহর তো সুন্দর বটেই,সেই জন্যই শেষ জীবনে রবীন্দ্রনাথ কলকাতা ছেড়ে শান্তিনিকেতনে বাস করতেন একটু শান্তি আশায়।অন্য একজন লিখেছিলেন,কখনো আমাদের শহরেও আসবেন,দেখবেন আপনার ভুল ধারণা পালটে যাবে!প্রসঙ্গত জানাই,আমার জন্ম বর্ধমানে,বেড়ে ওঠা নদীয়ায়,এবং পরবর্তীতে পড়াশুনার জন্য কলকাতায় আসা।কাজেই কলকাতা শহর যেমন আমার কাছে আপন,তেমনই গ্রামবাংলাও একইরকমের আপন,কিন্তু এতকিছু না জেনেই মানুষ সভা বসাচ্ছে আমায় নিয়ে,আমার লেখা নিয়ে!অর্থাৎ মানুষ এত জাজমেন্টাল এই ভার্চুয়াল জগতে,যে নিজস্ব মতামত, পছন্দ অপছন্দও আপনি লিখতে পারবেন না স্বাধীনভাবে।আপনাকে বারবার জবাবদিহি করতে হবে নিজস্ব মতটুকু লিখতে গেলেও!
এরপর আর একটি উদাহরণে আসি।অনেকে আবার দেখেছি,প্রেমিক-প্রেমিকার মধ্যে নিবিড় ভালোবাসার সম্পর্ক দেখালেই তাঁরা বলেন,এমনভাবে শুধু মা বাবা ভালোবাসতে পারেন,আর কেউ পারে না!কেন?খবরের কাগজে কখনো মা বাবার উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে গিয়ে কত সন্তানকে নিজের প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়েছে,পড়েননি?পড়েননি কত নাবালিকা নিজের মা বাবার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে নিজের বিয়ে আটকেছে! অত্যাচারিত গৃহবধূ বাপের বাড়িতে ফিরে এলে অনেক ক্ষেত্রেই মা বাবা বলেন,যে একটু মানিয়ে নে মা,ওটা তো তোরই সংসার,শোনেননি কোনোদিন কথাগুলো?আচ্ছা,এই অত্যাচারিত গৃহবধূর প্রসঙ্গে মনে পড়ল,বধূ নির্যাতন নিয়ে লেখায় কমেন্ট এসেছিল,শুধু কি বৌমা রাই অত্যাচারিত হয়?শ্বশুর শাশুড়িরা হন না?তাঁরা যান না বৃদ্ধাশ্রমে? ওরে ওরে,এদের কেউ বোঝা,আমি কালই মরে যাচ্ছি না,কাজেই এটাই আমার শেষ লেখা নয়! এই বিষয়ে লিখলে বলেন অমুক বিষয়টিও ঘটে!হ্যাঁ ঘটে তো,আমি কখন আমার লেখায় লিখলাম যে এগুলো ঘটে না?নারীদের উপর অত্যাচার নিয়ে লিখলেই কমেন্ট আসে,পুরুষরাও কষ্ট পায়।তো মশাই,আপনি আমার সব লেখাগুলো পড়ে এসেছেন কি?আগে পড়ে আসুন সব লেখাগুলো,তারপর না হয় বিচারসভা বসাবেন!
এরপর আসি তৃতীয় উদাহরণে।ইদানীং একটা ট্রেন্ড হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়,যে মা বাবা যা করেন সন্তানের জন্য,সবগুলোই ভীষণভাবে জাস্টিফায়েড। আমি সেই স্কুলজীবন থেকে আজও বিশ্বাস রাখি,যে বেদম প্রহারের চেয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে নরম সুরে সন্তানকে তার ভুলত্রুটি বুঝিয়ে বলা অনেক বেশি উপযোগী।এরকমই একটা লেখায় কমেন্ট এসেছিল,যে আমরাও মার খেয়েই বড়ো হয়েছি,কিন্তু সেযুগে মা বাবার সাথে সন্তানদের সম্পর্ক নাকি আজকের তুলনায় অনেক বেশি মধুর ছিল! বুঝুন! আরে আপনি গোয়েন্দা লাগিয়েছেন নাকি আজকের ফ্যামিলিগুলোতে?
আসলে বিচারক আজ আদালতে সংখ্যায় কম আছেন,বেশিরভাগই বিচারক আজকাল বহাল তবিয়তে বিদ্যমান এই ফেসবুকে, তথা সোশ্যাল মিডিয়ায়।
1 মন্তব্যসমূহ
Darun likhechen. Bastab
উত্তরমুছুন