Advertisement

সুখের মৃত্যু


সুখের মৃত্যু
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী 

কিছু মৃত্যু বড্ড সুখের,
কিছু মৃত্যুতে চোখে জল আসে না,
তৃপ্তি আসে,হাঁফ ছেড়ে বাঁচার আশা জন্মায়,
এই যেমন ধরুন তৃণার কথা,
তিন বোন ছিল ওরা,
তৃণা ছিল সবার বড়ো,
বাবার থেকেও বয়সে বড়ো লোকের সাথে বিয়ে হয়েছিল তার,
নাম ছিল সুধীর,
তৃণা আপত্তি করেছিল,
কিন্তু 'হীরের আংটি কি ব্যাঁকা হয় রে পাগলি' বলে হেসে গড়িয়ে পড়েছিল বাবা মা,
ওর আপত্তিকে কেউ গুরুত্ব দেবার প্রয়োজনই বোধ করেনি,
কেনই বা করবে?
সুধীরবাবুর কত জমি আছে,
ঘরে খাওয়া পরার অভাব হবে নাকি তৃণার?
আর মেয়েমানুষের কথায় অত যুক্তিও খুঁজতে নেই,
তাই বিয়েটা হয়েই গিয়েছিল শেষমেশ,
ফুলশয্যার রাতেই সুধীরের আসল রূপ টের পায় তৃণা,
হিংস্র পশুর মতোই তৃণাকে ভোগ করল সে,
এরপর সামান্য ভুল হলেই বিড়ির ছ্যাঁকা,চুলের মুঠি ধরে দেওয়ালে ঠুকে দেওয়া হয়ে গিয়েছিল নিত্যনৈমিত্তিক, 
একদিন গরম ডালের বাটিটাই ছুড়ে দিয়েছিল সে তৃণার গায়ে,
শাশুড়িমা পাশ থেকে মুখ বেঁকিয়েছিলেন,'কেমন বৌ গা তুমি?স্বামীকে ভালো রান্না করেও খাওয়াতে শেখোনি!'
সে পোড়া দাগ সে মা কেও দেখিয়েছিল,
মা বলেছিলেন,'ওরম একটু আধটু হয় সব সংসারে,মেয়েদের এইটুকু তো মানিয়ে নিতেই হয়,যে খাওয়াচ্ছে পরাচ্ছে সে গায়ে হাত তুলতেই পারে!
তৃণা আর কখনো মাকে জানায়নি তার যন্ত্রণার কথা,
প্রতিদিন যখনই খাওয়াদাওয়া করে সুধীর বেরোত কাজে,
তৃণা প্রার্থনা করত মনে মনে ভগবানের কাছে,আর যেন সে বাড়ি না ফেরে!
একদিন ভগবান ওর কথা হয়ত শুনলেন,
রোড অ্যাক্সিডেন্টে সুধীরের স্পট ডেথের খবর এল বাড়িতে,
বাড়িতে কান্নার রোল,
কেবল তৃণারই চোখে জল নেই,
আছে শুধু মুক্তির আনন্দ,
এক নির্দোষ জেলখানা থেকে মুক্তি পেলে হয়ত এমন করেই হাঁফ ছাড়ে,
কতজন তৃণাকে অপয়া বলল,তা সে বলুক গে না!
যে মুক্তির স্বাদ সে পেয়েছে,সে আনন্দ কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না তার কাছ থেকে!
অথবা ১৩ বছরের পরেশের কথাই ধরুন না!
বেচারার মা মারা গিয়েছিল সেই কোন্ ছোটবেলায়,
তাই তো ওর বাবা আবার বিয়ে করল,
শিশু পরেশ যদি নতুন মা কে পেয়ে মাতৃশোক কিছুটা হলেও ভোলে!
পরেশের বাবা চাকরি করতে বেরোয় সেই কোন্ সকালে,
আর ফেরে রাত নটায়,
বাবার সামনে অবশ্য নতুন মা পরেশকে খুবই যত্ন আত্তি করে,
এক্কেবারে নিজের সন্তানের মতো,
তার বাবাও বেশ স্বস্তি পায় মনে,
সে তো জানে না তার অবর্তমানে তার মা তাকে ঠিকঠাক খেতেও দেয় না,
বাড়ির যত কাজ সমস্তটাই করে পরেশ,
এঁটো বাসন মাজা,রান্না করা,তারপর মাঝেমধ্যে নতুন মায়ের পা টিপে দেওয়া,মাথা টিপে দেওয়া,
সামান্য ভুল হলেই পিঠে চাবুকের মার পড়ে,
কোনো কোনোদিন খেতেও পায় না দুপুরে,
কখনো বা ঘরে আটকে রাখে তাকে নতুন মা,
বাবাকেও ভয়ে কিছু জানাতে পারে না পরেশ,কারণ নতুন মা যে প্রায়ই বলে,
'বাপের কাছে যদি খুলেছিস মুখ,বঁটি দিয়ে নামিয়ে দেব মাথা তোর ধড় থেকে।'
এভাবে কতদিন কেটে গেল,
৫ থেকে ১৩ য় পা দিল পরেশ,
তবু যন্ত্রণা উপশম হল না,
হঠাৎ একদিন ঘন কালো মেঘ জমল আকাশে,
কালবৈশাখী উঠল,আর সেই সাথে বজ্রপাতের সে কি শব্দ!
ভীষণ ভয় করে পরেশের,
একটা স্নেহমাখা কোল খোঁজে ছেলেটা,
হঠাৎই মায়ের আদেশ,'আমগুলো কুড়িয়ে আন বাগান থেকে।'
মনে প্রচন্ড ভয় নিয়েই বাগানের পথে পা বাড়াল সে,
হঠাৎ কানফাটানো এক শব্দ কানে এল পরেশ,
ভীষণ ভয় পেয়ে সে ঘুরে দেখে,তাদের একতলা দু কামরার বাড়িটায় বাজ পড়েছে,
আর তাতেই মারা গেছে পরেশের নতুন মা,
বাবাও খবরটা পেল,
ঝড়জল মাথায় করেই অতিকষ্টে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরল সে,
'ছেলেটার কপালই মন্দ,এই মাকেও হারাল!'
কাঁদতে কাঁদতে ছেলেকে বুকে টেনে নিল সে,
কিন্তু পরেশের চোখে একফোঁটা জল নেই,
আছে একমুঠো তৃপ্তি,স্বাধীন জীবনের আশ্বাস।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ