Advertisement

মিথ্যে ঘটনা অবলম্বনে

মিথ্যে ঘটনা অবলম্বনে
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী 

তো হয়েছে কি,আমার এক বান্ধবী,ধরে নিন তার নাম রুমি,তার এক বান্ধবী আছে,ধরে নিন সে বান্ধবীর নাম বিদিশা।কিন্তু সে নাকি মেমসাহেবার মতো দেখতে,তাই তাকে বন্ধুমহলে বিদেশী বলে ডাকত সবাই।সেই বান্ধবী নাকি বড্ড পসেসিভ সব কিছু নিয়ে।রাস্তায় বেরোলে নাকি ভ্যানিটি ব্যাগটাকে এমন আগলে রেখে বেরোয় যেন ব্যাগ নয়,একটা বাচ্চা সেটা।কারণ তার সবসময়ই মনে হয় রাস্তার সব লোক বেরিয়েছে শুধুমাত্র তার সখের ব্যাগটা ছিনতাই করবে বলে।শুধু কি ব্যাগ?গয়নাগাঁটি,শাড়ি,এমনকি নিজের প্রিয় বান্ধবী আর বরকে নিয়েও তার পসেসিভনেসের অন্ত নেই!
রুমির মুখে সে নাকি আমার কথা এতই শুনেছে যে মনে মনে একরকম জেলাস হয়েই সেই বিদেশী,সরি বিদিশা,আমায় ডেকে পাঠিয়েছে তার বাড়িতে।সে নাকি দেখতে চায় কি এমন আছে আমার মধ্যে যে রুমি আমার এত এত গালভরা প্রশংসা করে তার কাছে!
এমনিতেই জন্ম হ্যাংলা,বাড়িতে গেলে ফুলকপির সিঙ্গারা খেতে দেবে শুনে আমি তো একপায়ে খাড়া!নাচতে নাচতে গেলাম রুমির সাথে বিদেশী সরি বিদিশার বাড়ি।বাড়িতে যেতেই বিদিশাকে দেখে বুঝলাম সত্যিই তাকে বিদেশী বলে ডাকাটা খুব অন্যায় কিছু নয়।নীল চোখের মণি,ধবধবে ফর্সা গাত্রবর্ণ,একপিঠ লালচে চুল।আমি যেতেই সে আমায় আপাদমস্তক ভালো করে পর্যবেক্ষণ করল,তারপর হাজারটা প্রশ্ন করতে লাগল।এতো মহা ফ্যাসাদ!চাকরির ইন্টারভিউ নেওয়ার সময় বসও এত প্রশ্ন করেনি!তারপর এল গরম গরম ফুলকপির সিঙ্গারা।বুঝলাম,চাকরির ইন্টারভিউয়ে ঠিকঠাক উত্তর দিলে যেমন জব পাওয়া যায়,তেমনই,এনার বাড়িতে এসে সঠিক উত্তর দিলে মেলে ফুলকপির সিঙ্গারা।মনে আছে,ক্লাস নাইনে পড়াকালীন অঙ্কের সুদকষা আর লাভক্ষতির চ্যাপ্টারটা পারতাম না বলে কি মারটাই খেয়েছিলাম বাড়িতে।বাপ বাপ করে চ্যাপ্টার গিলেছিলাম,ওটাই ছিল গরীবের প্যারাসিটামল আর কি!পড়া মুখস্থ করো,অঙ্ক ভালো করো,আর পিঠব্যাথা হওয়ার হাত থেকে বাঁচো!মনে আছে গপাগপ করে অঙ্কের চ্যাপ্টারগুলো এমন গিলেছিলাম,ওইভাবে বৃষ্টিদিনে বাঙালি খিচুড়ি গেলে কিনা সন্দেহ!আর সেবছর ফাইনালে অঙ্কে পেলাম একশোয় একশো,তাই চ্যাপ্টারগুলো আজও দুপুরে ঘুমোনোর সময় কপালের কাছে মশা ভনভন করার মতো মাথায় ভনভন করে।তাই ওগুলো মনে রেখেই চুটিয়ে সিঙ্গারা খেয়ে নিলাম অনেকগুলো,যাতে এত প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে যে স্ট্রেস গেছে আমার ওপর দিয়ে,সেটা পুষিয়ে নিতে পারি।বিদিশা কটমট করে শুধু তাকালো,কিছু বলল না।
 একটু পরেই বিদিশা একটা বড়ো ছুরি নিয়ে এল হঠাৎ,খুব চমকে গেলাম।তারপর দেখি আপেল কাটতে বসে গেল ছুরি দিয়ে।আমি কিছু বলার আগেই রুমি বলল,'বিদেশী অসাধারণ অ্যাপেল জুস বানায় রে,খেয়ে দেখ!'
 বিদিশা বাঁকা হেসে বলল,'ছুরি দিয়ে আপেল কাটতেও যেমন পারি,তেমনই কখনো যদি খবর পাই আমার হাজব্যান্ড আমায় চিট করছে,তাহলে ওর আর ওর পরকীয়া প্রেমিকার গলার নলিটাও কুচ করে কেটে দিতে জানি!'
 ঢোক গিলে বললাম,'আপনার হাজব্যান্ড কে?'
 বিদিশা কিছু না বলে দেওয়ালে টাঙানো ছবিটার দিকে ইঙ্গিত করল।ছবিটা দেখেই আমার চোখ কপালে উঠেছে,এ তো ইমন চৌধুরী,সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রথমে বন্ধুত্ব তারপর আস্তে আস্তে প্রেম জমে ক্ষীর হয়ে গেছে এখন ওর সাথে।ব্যাটাচ্ছেলে বিবাহিত হয়ে কিনা আমার কাছে সেটা লুকিয়েছে!কিন্তু ইমনের প্রতি আমার সব রাগ ক্ষোভ তুচ্ছ হয়ে প্রাণভয় আমায় ঘিরে ধরল,ভাবলাম আপনি বাঁচলে চিটারকে দেখে নেওয়ার নাম! বিদিশাকে বললাম,'এত সিঙ্গারা খেয়ে বোধহয় পেট ছেড়েছে,এক্ষুনি বলো ওয়াশরুমটা কোন্ দিকে?'
 ওয়াশরুমে একটা জানলা ছিল,বড়ো জানলা,শিকবিহীন।এই জানলার অস্তিত্বের কথা আমি রুমির কাছেই শুনেছিলাম।সেই জানলা দিয়ে প্রথমে রাস্তা,তারপর বাড়ি ফিরলাম পড়ি কি মরি করতে করতে।বাড়িতে গিয়েই আগে সোশ্যাল মিডিয়ার সব অ্যাকাউন্ট ডিলিট করলাম,ইমনকে ব্লক করেছি আগেই।ভাবছি চাকরির পোস্টিং নিয়ে অনেক দূরে চলে যাব,যেখানে বিদিশার ছুরি পৌঁছবে না!

(সমাপ্ত)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

2 মন্তব্যসমূহ