চেনা অচেনা
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
চতুর্থ পর্ব
কোনোরকমে বাড়িতে ফিরল দিয়া।ও বাড়িতে ফিরতেই মা বাবা অবাক হয়ে গেলেন,'এ কি রে!আবীরের জন্মদিনের অনুষ্ঠান এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল?'
— 'না,আসলে আমার শরীরটা ভালো লাগছিল না,তাই চলে এলাম।'
— 'কেন রে!কি হয়েছে তোর মা!'
— 'কিচ্ছু হয়নি গো,মাথাটা ধরেছে খুব।ঘরে গিয়ে রেস্ট নিলেই ঠিক হয়ে যাবে।'
— 'ঠিক তো?যদি খুব শরীর খারাপ হয় তাহলে বল কিন্তু,ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে!'
— 'আরে না না,সিরিয়াস কিচ্ছুনা।তোমরা শুধু শুধু এত টেনশন করো!ঘরে গিয়ে একটু ঘুমিয়ে নিলেই আমি ফ্রেশ হয়ে যাব।'
— 'আচ্ছা বেশ,তাই যা!তবে শরীর বেশি খারাপ লাগলে ডাকিস কিন্তু!'
— 'হুম।'
টলতে টলতে সিঁড়ি দিয়ে নিজের দোতলার ঘরে ঢুকেই দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিল দিয়া।আয়নাটার সামনে গিয়ে সে দাঁড়াল।লেডিস ব্যাগটা জোরে খুলে ফেলে ছুড়ে দিল বিছানায়,কানের দুলদুটোও খুলে ছুড়ে দিল মেঝেতে।চোখের কাজল মুছে ফেলল হাত দিয়ে ঘষে।চুলের ক্লিপ খুলে ফেলল।একরাশ কালো চুল চোখে মুখে পড়তে লাগল তার।কাজল লেপ্টা মুখে উসকো খুসকো চুল এসে পড়ায় দিয়াকে দেখতে পাগলিনীর মতো লাগছিল।মাটিতে বসে পড়ল দিয়া।কাঁদতে লাগল অঝোরে,মনে জমে থাকা এক দীর্ঘকায় কালবৈশাখীর মেঘ ভেঙে পড়ল বৃষ্টি হয়ে।একে একে সমস্ত ঘটনা মনে পড়ছিল তার।তুহিন,আবীর,সুকন্যা,সবার মুখ ঝাপসা হয়ে ভেসে উঠছিল দিয়ার চোখের সামনে।তার মনে হচ্ছিল,সবাইকে সে অনেকটা ভালোবেসেছে,কিন্তু প্রত্যুত্তরে কি পেয়েছে?সবাই তার ভালোবাসাকে দুমড়ে মুচড়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে।হয়ত এরপর মা বাবা ছাড়া দিয়া আর কখনোই কাউকে ভালোবাসতে পারবে না।হয়ত কোনো বেস্টফ্রেন্ডকেও আর রাখবে না তার জীবনে।এরপর হয়ত অন্য দিয়ার জন্ম হবে,যার মনটা আর আগের দিয়ার মত ফুরফুরে সবুজ নয়,হবে রুক্ষ শুষ্ক একটা মরুভূমি,যেখান থেকে জন্ম নেয় শুধুই লু,কোনো মিঠে দক্ষিণা বায়ু নয়।
কয়েক সপ্তাহ কেটে গেল।সে হাসিখুশি প্রাণোচ্ছল দিয়া আর নেই।তুহিনের থেকেও আবীরকে সে আরও বেশি ভালোবেসেছিল,তাই এই কষ্টটা তার বুকে লেগেছে দ্বিগুণ জোরে।কেমন গম্ভীর রাগী দিয়ার জন্ম হয়েছে।সব সময় শুধু কাজ আর কাজ নিয়েই পড়ে থাকে।পছন্দের রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ করতে যাওয়া নেই,রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে ফুচকা খাওয়া নেই,বাড়ি ফিরে মা বাবার সাথে বসে হাসি মজা ইয়ার্কি করা নেই,দেরি করে ঘুম থেকে ওঠা নেই।সকাল থেকে রাত,শুধুই ল্যাপটপের সামনে বসে থাকে।সুকন্যাও ওর ব্যবহারে অবাক হয়ে গেছে,'এই দিয়াকে তো আমি চিনিনা!এ কোন্ দিয়া!'
অফিসে আজকাল কাজ ছাড়া কারোর সাথে কোনো বাড়তি কথা বলেনা দিয়া,এমনকি সুকন্যার সাথেও নয়।সুকন্যা একদিন তার সাথে জোর করে কথা বলতে এসেছিল,'কি হয়েছে বল তো তোর?এমন অদ্ভুত আচরণ কেন করছিস বল তো?'
— 'সুকন্যা আমার কাজ আছে।প্লিজ রাস্তা ছাড়।'
— 'সুকন্যা!দিয়া তুই যে আগে আমাকে সু বলে ডাকতিস!'
— 'আরে ইয়ার,তুই সর না,আমার কাজ আছে।'
— 'তুই কেন এরকম করছিস বল না দিয়া,আমার তোর এই আচরণ একদম ভালো লাগছে না।কেন অ্যাভয়েড করছিস আমায়?কি হয়েছে তোর বল না?আমি কি না জেনে তোকে কষ্ট দিয়ে ফেলেছি কোনোভাবে?বল না প্লিজ!'
— 'উফ,সুকন্যা,ন্যাকামি বন্ধ কর।আর তোর লাইফে তো কথা বলার লোক আছে,আমি কথা না বললেই বা অত ভাবার কি আছে!'
— 'আরে ইয়ার,হয়েছেটা কি তোর!'
দিয়া কোনো উত্তর না দিয়েই গটগট করে হেঁটে বেরিয়ে গেল।
আজকাল শুধুই কাজের দিকে মন দেওয়ায় অফিসে দিয়ার বস যথেষ্ট খুশি,দিনে দিনে তার উন্নতি হচ্ছে।সম্প্রতি দিয়ার পদোন্নতিও হয়েছে।আগে দিয়া আর সুকন্যা ছিল একই পদে,বর্তমানে দিয়া সুকন্যার থেকে উঁচু পদে আছে।পদোন্নতি,স্যালারি বাড়ার পরও দিয়ার বিশেষ হাবভাবের পরিবর্তন হল না,ওর চোখেমুখে এতটুকু খুশির আমেজও দেখা গেল না।সুকন্যা,আবীর ফোন করে কংগ্র্যাচুলেট করেছিল ওকে,ও শুধুই থ্যাংকস বলে ফোন রেখে দিয়েছে।
পছন্দের খাওয়াদাওয়া,জামাকাপড়,সাজগোজের প্রতি নেশা এসব তো অনেক আগেই দিয়ার কাছ থেকে বিদায় নিয়েছে।তার মা বাবা সবটাই জানেন।তাঁরা যথেষ্ট কষ্ট পান মেয়ের এহেন পরিবর্তনে।অনেক চেষ্টা করেন যাতে কিছুটা হলেও তার রুক্ষতাটুকু দূর হয়,তবু কোনো ফল হয়না।দিয়া শুধুই কর্তব্য পালন করে সকলের প্রতি রোবটের মতো,মন বস্তুটি যেন ওর নেই।
এইভাবে মাস চারেক কাটার পর একদিন দিয়া যখন ব্রেকফাস্ট করতে বসেছে,তখন হঠাৎ মা বললেন,'আমি আর তোর বাবা তোর বিয়ে ঠিক করেছি।তৈরি হ বিয়ের জন্য।'
— 'আমি বিয়ে করব না।'
— 'পাগলামি কোরো না দিয়া।পরের বছরই আঠাশে পা দেবে।এখন বিয়ে না করলে কবে করবে?'
— 'মা প্লিজ!আমি তো বলেছি আমি বিয়ে করব না!কতবার রিপিট করব এক কথা!'
— 'দেখো দিয়া আমরা শুধু বলেছি তোমায় বিয়ে করতে হবে,তোমার বিয়েতে মত আছে কিনা একবারও জানতে চেয়েছি?'
— 'মা!এ তুমি কি বলছ!আমার মত ছাড়া আমার বিয়ে!'
— 'তোমার মত তো সেই কলেজ জীবন থেকেই মেনে আসছি মা আমার,'রাগী গলায় বললেন দিয়ার মা,'কখনও তুহিন,কখনও আবীর!অনেক হয়েছে নিজের পছন্দে চলা,এবার মা বাবার কথা মানো দেখি!থিতু হও,সারাজীবন আমরা তোমায় ঘাড়ে নিয়ে চলতে পারবনা!'
— 'মা!আমি কি তোমাদের বোঝা হয়ে গেছি!'
— 'হ্যাঁ হয়ে গেছ!এত বয়স হতে চলল কদ্দিন আর ধিঙ্গিপনা করে ঘুরে বেড়াবে শুনি!এমনিতেই তোমার জন্য কম ঝক্কি পোয়াতে হয়নি,কিন্তু আর না বাপু!এবার বিয়ে করো,করে আমাদের রেহাই দাও!'
— 'একি গো!তুমি দিয়াকে এভাবে বলছ কেন?' দিয়ার বাবা অবাক হয়ে বলে উঠলেন।
— 'তুমি থামো তো!তোমার প্রশ্রয়েই না আজ ওর এই দশা।আদর দিয়ে বাঁদর করেছ।আজ শুধু আমি বলব,তুমি আর তোমার মেয়ে শুনবে।শোনো দিয়া,এ বিয়ে তোমায় করতেই হবে বলে দিলাম!'
— 'আর যদি না করি তো!
— 'তোমায় এক সপ্তাহ সময় দিলাম এব্যাপারে সিদ্ধান্ত জানানোর জন্য।যদি বিয়েতে রাজি না হও,এবাড়ির পাট তোমার চুকবে।অন্য বাড়ি খুঁজে নিও থাকার জন্য!'
দিয়া কোনো উত্তর দিল না।যে মা তার বন্ধুর মতো,তার এমন ব্যবহারে দিয়া হতবাক হয়ে গেল।তাই কিছু না বলে চুপচাপ অফিসের জন্য বেরিয়ে গেল সে।
অন্যদিকে দিনের পর দিন দিয়ার কাজের আরও উন্নতি হওয়ায় এক সুবর্ণ সুযোগ এসে গেল তার কাছে।অফারটা নিয়ে এলেন বসই।দিয়া যে কোম্পানিতে কাজ করে তার মেইন অফিস মুম্বাইতে,আর একটা শাখা হল কলকাতার অফিসটা,যেখানে দিয়া এতদিন কাজ করছিল।গতবারের মিটিং য়ে দিয়ার অসাধারণ প্রেজেন্টেশনে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন কোম্পানির উপরমহলের মানুষরা।তাঁরা দিয়াকে মেইন অফিসে নিয়ে যেতে চান।
— 'মুম্বাই?একবার বাড়িতে কথা বলতে হবে যে স্যার।'
— 'নিশ্চয়ই,বাড়িতে কথা বলো।দু সপ্তাহ টাইম আছে তোমার হাতে।তবে আমার পার্সোনাল মত যদি চাও,তো আমি বলব,এরকম অফার সচরাচর আসেনা।তোমার যখন এসেছে,হাতছাড়া না করাই ভালো।'
— 'ওকে স্যার,থ্যাংক ইউ।'
দিয়া বাড়িতে ফিরে মা বাবাকে বলল,'তোমাদের আর চিন্তা করতে হবেনা।আমি তোমাদের বোঝা বলছিলে না,আর বেশিদিন আমায় সহ্য করতে হবেনা।'
— 'এমন কেন বলছিস মা!' দিয়ার বাবা বললেন।
— 'কোম্পানি চায় আমি মুম্বাইয়ের মেইন অফিসে জয়েন করি।আর আমিও এব্যাপারে রাজি।যাস্ট দু তিনটে সপ্তাহ,তার পরেই আমি মুম্বাই রওনা দিচ্ছি।'
— 'তুই মুম্বাই চলে যাবি?সত্যি?' দিয়ার মা খুশি হলেন।
— 'হুম,তোমার জন্য এটা একটা সুখবর আমি জানি।আর কয়েকটা সপ্তাহ আমি কলকাতায় আছি,তারপরেই..'
— 'বাহ,বাহ,খুব ভালো।আর বিয়ের ব্যাপারে কি ভাবলে?'
— 'মা,ওই ব্যাপারে আমার মতামত সকালেই জানিয়ে দিয়েছি।এখন নতুন করে আর কি জানাবো?'
— 'এত জেদ কেন রে তোর মেয়ে?দুবার কষ্ট পেয়েছিস বলে কি তৃতীয়বারও কষ্টই পাবি?একবার আমাদের পছন্দকে ভরসা করে দেখ না মা!'
— 'কি আশ্চর্য!আমি তো বললাম আমার বিয়ে করার বিন্দুমাত্রও ইচ্ছা নেই!এক কথা কেন যে বারবার বলো!'
দিয়া সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় নিজের ঘরে চলে গেল।
পরবর্তী ভাগ পড়ুন : পঞ্চম পর্ব

0 মন্তব্যসমূহ