Advertisement

চেনা অচেনা (পঞ্চম পর্ব)

 


চেনা অচেনা

সুচন্দ্রা চক্রবর্তী 

পঞ্চম পর্ব

   মায়ের এমন অদ্ভুত আচরণে খুব অবাক হয়ে যায় দিয়া,সাথে কষ্টও পায় ভীষণ।তার জীবনের কষ্টগুলোর সবটাই মা জানে,তবুও এমন কঠোর ব্যবহার কিভাবে করছে মা?ছোট থেকেই মা বাবা খুব একটা বকাবকি করেননি ওকে।পরীক্ষার রেজাল্ট ভালো না হলেও কেউ একটাও কঠিন কথা বলেননি, উলটে দুজনেই ওকে উৎসাহ যুগিয়ে এসেছেন,ঠিক যেন আবীরের মতো।আবীরের মধ্যে মা বাবার ছায়া দেখেছিল বলেই যে আবীরের প্রত্যাখ্যানটা মেনে নিতে পারেনি দিয়া।তুহিনের ব্যাপারটা ছিল একদম আলাদা।সে শুধুই একটা অভ্যাস ছিল,যেটা থেকে সে বেরিয়ে আসতে পারছিল না,আবীরই ছিল তুহিনের সাথে ওই ঘুণধরা পচনশীল সম্পর্কটা থেকে বেরিয়ে আসার সেতু।

  'দিনশেষে আসলে সব মানুষই একা,কেউই বোধহয় মনের ভেতরের জমে থাকা কষ্ট মুছিয়ে দিতে পারেনা,বলা ভালো চায় না।'নিজের মনেই বিড়বিড় করে দিয়া সকালের অ্যালার্ম সেট করে ঘুমোতে গেল।

  পরের দিন সকালে অফিস গিয়েই বসের সাথে দেখা করল দিয়া।

 — 'আমি মুম্বাই যেতে রাজি স্যার।'

— 'বাহ,দিয়া,ভেরি গুড।জানতাম তোমার মতো বুদ্ধিমতী মেয়ে এরকম সিদ্ধান্তই নেবে।কিন্তু তুমি যে কালই বললে বাড়িতে জানিয়ে তারপর...'

— 'হ্যাঁ স্যার,বাড়িতে জানিয়েছি।'

— 'ও আচ্ছা,ওনারা রাজি!বাহ,বাহ, খুব ভালো।'

— 'হুম রাজি।'

— 'আচ্ছা বেশ।পরের মাসের প্রথম সপ্তাহেই তোমায় রওনা দিতে হবে।'

— 'হুম স্যার।'

 দিয়া ভাবল,সঠিক সিদ্ধান্তই সে নিয়েছে।এ শহরের কেউই তাকে চায় না।এর থেকে অচেনা শহরেই চলে যাওয়া ভালো।

  বসের ঘর থেকে বেরিয়ে আসার সময় সুকন্যার সাথে দেখা দিয়ার।

— 'শুনলাম তোর মুম্বাই যাওয়ার খবরটা।সত্যি কত্ত বদলে গেছিস তুই এই ক'মাসে।আমি যে দিয়াকে চিনতাম সে কলকাতা ছাড়া কিছুই বুঝত না,'গলা ভারী হয়ে আসে সুকন্যার,'আমার সাথে কথা বলবিনা জানি,আমিও বলব না,শুধু একটাই কথা বলব,কংগ্র‍্যাচুলেশন,উইশ ইউ অ্যা হ্যাপি জার্নি।'

 সুকন্যা চলে যাচ্ছিল।দিয়া পিছু ডাকল,'সু,শোন।'

— 'সু!তুই আমায় সু বললি দিয়া!' আনন্দে চোখে জল এসে গেল সুকন্যার।

 — 'হ্যাঁ রে,এতদিন তোর সাথে খারাপ ব্যবহার করেছি অনেক,তার জন্য সরি রে!'

— 'দিয়া!' সুকন্যা ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে দিয়াকে।দিয়াও এতদিন পর হঠাৎ কেঁদে ফেলে,চোখের জল আটকাতে পারেনা।

— 'দিয়া,মুম্বাই কি না গেলেই নয়?থেকে যা না ইয়ার কলকাতায়!'

— 'না রে,আমায় যে যেতেই হবে!আর তো ফেরার উপায় নেই!'

— 'আচ্ছা বেশ,তাহলে প্রমিস কর..'

— 'কি প্রমিস করব সু?'

— 'মুম্বাই গিয়ে আমায় মাঝে মাঝেই ভিডিও কল করবি,প্রমিস কর!'

— 'আচ্ছা বাবা,করব।'

 দিয়া ভাবল,সত্যিই সুকন্যাকে সে এতদিন শুধু শুধু দূরে সরিয়ে রেখেছিল।সুকন্যার তো এতে কোনো দোষ ছিল না।আবীর ওকে ভালোবাসেনি এ তো ওর নিজের ভাগ্যের দোষ,সুকন্যার দোষটা কোথায়?সুকন্যা আজও জানেনা যে দিয়া আবীরকে মনে মনে ভালোবাসত,জানলে হয়ত সে নিজেই সরে যাবে ওদের রাস্তা থেকে।

 — 'না,আমাকে যেতেই হবে কলকাতা ছেড়ে,আমি চাই না সু ও আমার মতো একটা কঠিন রাস্তা পার করুক।' দীর্ঘশ্বাস ফেলে দিয়া চলে গেল।

   বাড়ি ফিরতেই আর এক দফা চমকের মুখোমুখি দিয়া।সে ফিরতেই মা বললেন,'শোনো,তোমায় তো বারবার বলার পরও বিয়েতে রাজি হলেনা,তাই আজ রাতে তোমার এ বাড়িতে খাওয়া বন্ধ।বাইরে থেকে খাবার এনে খাও।'

— 'মানে কি মা?'

— 'কেন তুমি বোঝোনি?আমি তো হিব্রু ভাষায় কথা বলিনি,বাংলাতেই বলেছি।তোমার মতো বেয়াদব মেয়ের জন্য আমি রান্না করতে পারব না হাত পুড়িয়ে।'

— 'বেশ,তোমায় করতে হবে না,আমি নিজেই রান্না করে নেব।'

— 'না,একদম না।এটা আমার রান্নাঘর।তোমার মতো অলক্ষ্মীকে এই রান্নাঘরে মানায় না!'

— 'তুলিকা!তুমি কি একেবারেই পাগল হয়ে গেছ!কাকে কি বলছ তুমি?যাকে তুমি অলক্ষ্মী বলছ সে তোমার মেয়ে!সারাদিন খাটা খাটনি করে সবে ফিরল মেয়েটা,আর তুমি...'

— 'শোনো,আর ওই মেয়ের হয়ে সাফাই গেয়ো না কেমন!কদ্দিন ও এভাবে ঘুরে বেড়াবে শুনি?বিয়ে থা করবে না?'

— 'বেশ,বেশ,এত কথার তো দরকার নেই,আমি বাইরে থেকেই খাবার অর্ডার দিচ্ছি,এবার খুশি?'দিয়া গম্ভীর গলায় বলল।

— 'কি রকম বাচাল মেয়ে দেখেছো!তবুও বিয়েতে রাজি হবেন না উনি!বেহায়া কোথাকার!'

 সারাদিনের পরিশ্রমে ক্লান্ত দিয়া এত অপমান সহ্য করতে পারছিল না।কিছু না বলে চুপচাপ নিজের ঘরে চলে গেল দিয়া।

  গভীর রাতে একটা চিৎকারে ঘুম ভেঙে গেল দিয়ার।চিৎকারটা আসছে মা বাবার ঘর থেকে।চিন্তিত দিয়া তাড়াতাড়ি বিছানা ছেড়ে উঠে দৌড়ে মা বাবার ঘরের দিকে গেল।


 মা বাবার ঘর থেকে এক কান্নাভরা গলায় তীব্র চিৎকার আসছে।কোনোরকমে পড়িমরি করে দিয়া সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে লাগল।মা বাবার ঘরে ঢুকেই হতভম্ব হয়ে গেল সে।তার মা, বাবার ঘুমের ওষুধের শিশিটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন,আর কাঁদতে কাঁদতে বলছেন,'আর আমি বাঁচতে চাই না।এই শিশি আজ আমি খালি করে দেব।আর এত অশান্তি পোষাচ্ছে না।' বাবা কিছুতেই শান্ত করতে পারছেন না মা কে।

 — 'এ কি মা!এরকম করছ কেন?কি হয়েছে?'

— 'নিজেই যত নষ্টের গোড়া হয়ে আবার জিজ্ঞেস করছ কি হয়েছে!লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে বসে আছ,তোমার মতো মেয়ের মা হয়ে বাঁচার চেয়ে মরে যাওয়া অনেক সম্মানের,বুঝলে?'

— 'কেন কি করেছি আমি?'

— 'থাক মা গো,এতদিন যখন বোঝোনি কি হয়েছে আর তোমায় এ জন্মে বুঝতে হবেও না।তার চেয়ে আমি বরং মরি,আমি মরার পর তুমি সব বুঝবে।'কাঁদতে থাকেন দিয়ার মা।

— 'মা প্লিজ,শিশিটা এক্ষুণি সরাও,সরাও বলছি!'

 তার মা তবুও কাঁদতে থাকেন।দিয়া মা কে বুকে টেনে নেয়,'কি হয়েছে বলো?তুমি কেন এরকম বলছ?তুমি না থাকলে আমার, বাবার কি হবে ভেবে দেখেছ?আচ্ছা বেশ,তুমি বলো আমি কি দোষ করেছি,কথা দিচ্ছি তুমি যা বলবে আমি সব শুনব।'

— 'সত্যিই তো!কথা দিচ্ছিস?'

— 'হ্যাঁ মা,আমি কথা দিচ্ছি তোমার সব কথা আমি শুনব।'

— 'আচ্ছা বেশ,তাহলে শোনো,তোমায় বিয়েতে রাজি হতে হবে।'

— 'আচ্ছা মা,আমি বিয়ে করব,তোমার পছন্দের ছেলেকেই করব,এবার খুশি?'

— 'সত্যি!' দিয়ার মা পরম আনন্দে জড়িয়ে ধরেন মেয়েকে,'বেশ,আমি তাহলে কালই আমার বান্ধবী রুমিতাকে ফোন করব।'

— 'বেশ,তাই কোরো।এখন তো অনেক রাত হয়েছে,রাখো তো শিশিটা,আর ঘুমোতে যাও।'

— 'হ্যাঁ রে মা,তুই যে আমায় কত বড়ো শান্তি দিলি নিজেই জানিস না!তোর বিয়েটা দেখে আমি শান্তিতে মরতে পারব।'

— 'মা খবরদার!একদম এই ধরণের কথা তুমি বলবে না।তোমাদের ভালো রাখার জন্য আমি যতদূর যেতে হয় যাবো।'

— 'বেশিদূর যেতে হবে না,কেবল ছাদনাতলা পর্যন্ত গেলেই হবে।' বলেই হাসতে লাগলেন মা,হাসিতে যোগ দিলেন বাবাও।

— 'বেশ,যাব।'

  দিয়া ভাবল,নিজের পছন্দের রাস্তায় এগিয়ে ও তো বারবারই বিফল মনোরথ হয়ে ফিরেছে,এবার না হয় একবার মা বাবার দেখানো রাস্তায় হেঁটেই দেখা যাক।নতুন করে তো হারাবার কিছু নেই তার।

  পরেরদিন রবিবার।ছুটির মেজাজ শহরের আনাচ কানাচ জুড়ে।সূর্যদেবও আলস্যভরে আড়মোড়া ভাঙছেন।সকালেই দিয়ার মা তুলিকা ফোন করেন তার কলেজ জীবনের বান্ধবী রুমিতাকে।রুমিতামাসির ব্যাপারে কমই শুনেছে দিয়া।শুধু এটুকুই শুনেছে যে,বিয়ের পরই রুমিতামাসি স্বামীর কাজের সূত্রে মুম্বাইয়ে থাকে,কলকাতায় সেভাবে আসাও হয়না ওদের,তাই সামনাসামনিও দিয়া কখনো দেখেনি ওদের কাউকে।এমনকি দিয়ার মায়ের সাথেও বহুদিন যোগাযোগ ছিল না রুমিতামাসির।এক সপ্তাহ আগে হঠাৎ রুমিতামাসি নিজে থেকেই ফোন করেন এবাড়িতে,তার একমাত্র ছেলের সাথে বিয়ে দিতে চান দিয়ার,ব্যস এটুকুই জানে দিয়া।

 — 'হ্যালো রুমিতা বলছিস?আমি তুলিকা বলছিলাম।তোরা কলকাতায় কবে আসছিস?'

— 'কলকাতায় আসার কথা জিজ্ঞেস করছিস,দিয়া মা রাজি হয়েছে এ বিয়েতে?'

— 'হুম রে,' উচ্ছ্বসিত তুলিকা বলতে লাগলেন,'মেয়েটা এতদিন পর সঠিক পথে এসেছে,কি যে আনন্দ হচ্ছে কি বলব..'

— 'আরে ঠিক আছে,কমবয়সী ছেলেমেয়ে,ওরা জীবনের কতটুকু দেখেছে বল?ভুল তো ওদের হতেই পারে!'

— 'হুম,তা ঠিক।তোরা কলকাতায় কবে আসছিস বল?'

— 'পরের সপ্তাহেই যাচ্ছি,কোন্ ডেটে যাচ্ছি সেটা দীপের বাবার সাথে কথা বলে তোকে জানাচ্ছি,ওকে!'

— 'ওকে!'

ফোনটা রেখেই প্রচন্ড খুশি মনে তুলিকা রান্নাঘরের দিকে গেলেন,যাওয়ার আগে দিয়াকে বলে গেলেন,'আজ সব খাবার তোর পছন্দের বানাব মা!'

— 'আচ্ছা,সে নয় বানিয়ো,কিন্তু ওই রুমিতামাসির ছেলের কি যেন নাম..'

— 'দীপমাল্য,দীপমাল্য নন্দী।'

— 'নামটা কেমন যেন আগে শুনেছি মনে হচ্ছে!'

— ' না না,আগে শুনবি কিভাবে!ধুর!তুই কি চিনিস নাকি ওকে!'

— 'না চিনিনা তো,কিন্তু নামটা কেমন যেন চেনা লাগছে,আচ্ছা মা,ওই দীপমাল্য কি করে?আই মিন কোনো চাকরি করে?না ব্যবসা?'

— 'আহা,অত এখনই জেনে কাজ নেই তোমার,আগে ওরা আসুক তো কলকাতায় তারপর দীপমাল্যর মুখ থেকেই না হয় সবটা শুনবি,কেমন?' 

 তুলিকা মুচকি হেসে রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন।অন্যদিকে দিয়া কিছুতেই মনে করতে পারছে না যে  নামটা সে কোথায় শুনেছে!

 'যেখানেই শুনি,রুমিতামাসিরা এলেই সব পরিষ্কার হয়ে যাবে,' এই ভেবেই দিয়া নিজের ঘরে চলে গেল।


পরবর্তী ভাগ পড়ুন : ষষ্ঠ পর্ব

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ