Advertisement

বিদঘুটে বিবর্তন


 

বিদঘুটে বিবর্তন 

সুচন্দ্রা চক্রবর্তী 

 দুদিন হল প্রতীমবাবু খেয়াল করেছেন তাঁদের উল্টোদিকের বাড়িটায় নতুন ভাড়াটে এসেছে।বাড়ির মালিকরা থাকে মুম্বাইয়ে,এখানে কদাচিৎ আসে।এলে বাড়ির দোতলায় থাকে,আর একতলায় ভাড়া খাটায়।মেইন রাস্তার ওপরেই বাড়ি,তাই ভাড়াটিয়া দিব্যি জুটে যায়।আগের ভাড়াটিয়ারা চলে গেছে গতমাসে।আর একমাস যেতে না যেতেই নতুন ভাড়াটিয়া হাজির।প্রতীমবাবু মিশুকে লোক,পাড়ায় নতুন কেউ এলেই আলাপ জমানোর জন্য তাঁর প্রাণ উসখুস করে।প্রতীমবাবু পেশায় সরকারি উকিল,রিটায়ার করেছেন বছর ছয়েক হল।একমাত্র ছেলে সুমন রিসার্চের কাজে রাজ্যের বাইরে গেছে।

  এ পর্যন্ত সামনের বাড়িতে যতজন ভাড়াটে এসেছে,সকলের সাথেই আলাপ পরিচয় করেছেন জমিয়ে।

 তবে এবারের নতুন ভাড়াটেদের কেমন যেন একটু অস্বাভাবিক মনে হল প্রতীমবাবুর।যে ভদ্রলোক এসেছেন স্ত্রী এবং মেয়েকে নিয়ে,তিনি বাইরে বেরোলে কথাই বলেন না সেইভাবে কারোর সাথে,সর্বক্ষণ আনমনা থাকেন,চিন্তাগ্রস্ত থাকেন।

 সব শুনে প্রতীমবাবুর স্ত্রী রিমাদেবী বললেন,'সব ব্যাপারেই তোমার খুঁতখুঁতানি!নতুন এসেছেন ওনারা,তাই একটু চুপচাপ আছেন!আর সবাই তো আর তোমার মতো হয়না,যে খালি অন্য লোকদের দিকে নজর,এদিকে নিজের বৌয়ের প্রতি নজর নেই!'

  প্রতীমবাবুর এই মিশুকে আর কৌতূহলী স্বভাব নিয়ে রিমাদেবীর অভিযোগের শেষ নেই।যখন কোনো অনুষ্ঠান বাড়িতে যান স্বামী-স্ত্রী,সেখানে গিয়েও কেবল রহস্য আর অপরাধের গন্ধ শুঁকে বেড়ান প্রতীমবাবু, স্ত্রীর সাজগোজের প্রতি হুঁশই থাকে না তার।রিমাদেবী অভিমানের সুরে বলেন,'কি কুক্ষণে যে তোমায় বিয়ে করেছিলাম!'

 প্রতীমবাবু হেসে বলেন, 'সুন্দরকে তো সকলেই খেয়াল করে,প্রশংসা করে,কিন্তু এ পৃথিবীতে যা কিছু অন্ধকার,যা কিছু অস্বাভাবিক,যা সত্য,তাকে মিথ্যার গভীর থেকে বের করে আনাই যে আমার কাজ।আর তুমি যে হলে একটা সুন্দর ফুল,যার পাপড়ি মেলে.....'

 — 'থাক,থাক,হয়েছে' রিমাদেবী লাজুক হাসি হেসে বলেন,'বুড়োবয়সে যত্ত প্রেম!' বলেই মুখে আঁচলচাপা দিয়ে হাসতে হাসতে চলে যান,আর প্রতীমবাবুও আবার নিজের কাজে মন দেন,অস্বাভাবিক কোনো ঘটনার রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা করেন।

  এদিনও প্রতীমবাবু টেপরেকর্ডারের মতো সেই কথাটাই রিপিট করলেন আবার,আর রিমাদেবীও সলজ্জ হাসি হেসে রান্নাঘরে চলে গেলেন।

 পরেরদিন সকালেই প্রতীমবাবু হাজির উল্টোদিকের বাড়িতে,নতুন ভদ্রলোকের সাথে আলাপ করতেই হবে আজ তাঁকে।

  কলিংবেল বাজতেই দরজা খুললেন ভদ্রলোক।প্রতীমবাবুকে দেখে তিনি যেন বিশেষ খুশি হলেন না বলেই মনে হল।তবু মুখে কৃত্রিম হাসি এনে বললেন,'আসুন,ভেতরে আসুন।'

 প্রতীমবাবু এসে সোফায় বসলেন।ভদ্রলোক হাঁক দিলেন, 'স্বাগতা,এদিকে এসো।'

 একজন মাঝবয়সী ভদ্রমহিলা এসে দাঁড়ালেন প্রতীমবাবুর সামনে।ভদ্রলোক পরিচয় করিয়ে দিলেন, 'আমি হলাম মোহন,মোহন সেনগুপ্ত, আর ইনি স্বাগতা সেনগুপ্ত, আমার স্ত্রী।'

 — 'আচ্ছা আচ্ছা।আমি হলাম প্রতীম নস্কর,আপনাদের উল্টোদিকের বাড়িটাই আমার।'

 — 'আজ্ঞে আপনার ব্যাপারে আমি শুনেছি পাড়ায়,আপনি রিটায়ার্ড ল-ইয়ার,রাইট?'

 — 'আজ্ঞে হ্যাঁ,ঠিকই শুনেছেন।আর আপনি কি করেন?'

 — 'আমি একজন সেলসম্যান।'

 — 'আচ্ছা।তা মোহনবাবু, 'একটু থেমে প্রতীমবাবু বললেন, 'একটি মেয়েকে দেখেছি এবাড়িতে,তেরো চোদ্দ বছর বয়স হবে,ও কি আপনার মেয়ে?'

 মোহনবাবু হঠাৎ করেই কেমন যেন নিশ্চুপ হয়ে গেলেন,তিনি আর স্বাগতা মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন।তারপর কাষ্ঠহেসে বললেন,'হ্যাঁ,আমার একমাত্র মেয়ে,ওর নাম মীনাক্ষী।'

 — 'বাঃ,বেশ বেশ।তা তাকেও একবার ডাকুন না,একটু আলাপ করে যাই তার সাথে!'

 অনিচ্ছাসত্ত্বেও মোহনবাবু ডাক দিলেন,'মিনু মা,এদিকে এসো তো মা একবারটি!'

 মিনু এসে দাঁড়াল প্রতীমবাবুর সামনে।হাতে একটা টেডিবিয়ার।

 — 'অত দূরে দাঁড়িয়ে কেন মা?' প্রতীমবাবু সস্নেহে ডাক দিলেন,'এদিকে এসো।'

 মিনু এগিয়ে গেল তাঁর দিকে।একটা চকোলেট বের করে তিনি মিনুর হাতে দিলেন,'এটা তোমার জন্য এনেছি মা,খেয়ো কিন্তু।'

— 'আঙ্কেলকে প্রণাম করো মা।' মোহনবাবু বললেন।

 মিনু প্রণাম করল প্রতীমবাবুকে।কিন্তু তাঁর পায়ে হাত ছোঁয়াতেই প্রতীমবাবু চমকে উঠলেন।তাড়াতাড়ি মিনুর হাতদুটো ধরলেন তিনি।অবাক হয়ে গেলেন তিনি।

  এক কিশোরীর হাত,কোমলতার লেশমাত্র নেই তাতে।এক্কেবারে শুকনো খটখটে চামড়া,বেশিক্ষণ ও চামড়া স্পর্শ করে থাকলে বুঝি হাত ছড়ে যাবে।তাড়াতাড়ি তার হাত ছেড়ে দিলেন প্রতীমবাবু, অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,'মামণির কি হয়েছে?চামড়া অমন কেন?'

 মোহনবাবু আর স্বাগতা রীতিমতো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছেন,দেখে মনে হল রীতিমতো ভয় পেয়েছেন দুজনে।বেশ কিছুক্ষণ নীরবতার পর স্বাগতা ঢোক গিলে বললেন,'স্কিন ডিজিজ।'

 মোহনবাবু যেন এতক্ষণে মুখে কথা ফিরে পেলেন।স্ত্রীর কথায় সায় দিয়ে বললেন,'বহুদিন ধরেই চর্মরোগে ভুগছে ও,সেকারণেই এমন চামড়া ওর।'

 উত্তরটা বিশেষ পছন্দ হল না প্রতীমবাবুর।তাঁর মনে হল,কিছু একটা গোপন করার চেষ্টা করছেন মোহনবাবুরা।তবুও কথা না বাড়িয়ে 'ও আচ্ছা' বলে চলে এলেন তিনি।

  সেই রাতে কিছুতেই প্রতীমবাবু দু চোখের পাতা এক করতে পারছেন না।তাঁর কেবলই মনে হচ্ছে,কিছু একটা গন্ডগোল রয়েছে।আর সেই গন্ডগোলটা কিছুতেই তিনি ধরতে পারছেন না।

 ঘুম না আসার জন্য তিনি ছাদে গেলেন পায়চারি করতে।তাঁর বাড়ির ছাদ থেকে উল্টোদিকের বাড়ির বাগানটা দিব্যি দেখতে পাওয়া যায়।চিন্তান্বিত প্রতীমবাবু বাগানটার দিকে চেয়ে রইলেন,ভাবলেন,কিছু একটা রহস্য লুকিয়ে আছে মোহনবাবুদের মধ্যে।

 বাগানটা ভালো করে দেখছিলেন তিনি।একটা আমগাছ,দুটো নারকেল গাছ আর চারটে সুপুরি গাছ দাঁড়িয়ে আছে বাগানে।হঠাৎ চোখে পড়ল,আমগাছটার একটু পাশেই একটা ক্যাকটাস গাছ রয়েছে। 'এই গাছটা তো আগে এখানে ছিল না বলেই মনে হচ্ছে,হঠাৎ কোথা থেকে এল?মোহনবাবুরা আনলেন নাকি!' এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎই চোখে পড়ল,ক্যাকটাস গাছটা কেমন যেন নড়ছে।অথচ চারিদিকে কোনো হাওয়া নেই,অন্য গাছগুলো দিব্যি স্থির, অথচ এই গাছটাই নড়ছে।হঠাৎ গাছটা যেন নিজের জায়গা থেকে সরে গেল কিছুটা।এমনটাও কি হয়?গাছ কখনো সরে যেতে পারে নিজে নিজে?হয়ত ভুল দেখেছেন,এই ভেবে প্রতীমবাবু আবার তাকালেন গাছটার দিকে,দেখলেন গাছটা সত্যিই কেমন সরে সরে যাচ্ছে,যেন ওটা হেঁটে চলে বেড়াচ্ছে বাগানময়!ভীষণ আশ্চর্য হয়ে গেলেন প্রতীমবাবু,ভাবলেন টর্চটা এনে ভালোভাবে দেখবেন বিষয়টা কি!তাড়াতাড়ি নিচ থেকে টর্চ নিয়ে এলেন তিনি,আলো ফেললেন বাগানটার দিকে,কিন্তু একি!গাছটা কোথায় গেল?অন্য গাছগুলো দিব্যি নিজের জায়গায় বিরাজ করছে,অথচ ক্যাকটাস গাছটা যেন একেবারে উবে গেল কর্পূরের মতো।এরপর প্রতীমবাবু প্রায় ঘন্টাখানেক অপেক্ষা করলেন ছাদে,যদি আরও কিছু দেখতে পাওয়া যায়!কিন্তু অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও আর সেই গাছটাকে দেখা গেল না,আর সেরকম অস্বাভাবিক কিছুও চোখে পড়ল না।প্রতীমবাবু নিচে চলে গেলেন,ঠিক করলেন পরেরদিন এই বিষয়টা দেখতে হবে।

  পরেরদিন প্রতীমবাবু সকালে বাইরে ঘুরে বেড়ানোর অছিলায় বাড়িটার দিকে নজর রাখছিলেন,বাড়িটার পাঁচিলের ওপার থেকে ক্রমাগত লক্ষ রাখছিলেন বাড়িটার দিকে।অস্বাভাবিক কিছুই চোখে পড়ল না সেরকম।মোহনবাবু কাজে বেরিয়েছেন,স্বাগতা রান্না করছেন,আর মিনু পুতুল-টেডি নিয়ে খেলতে ব্যস্ত।

  আস্তে আস্তে দুপুর গড়িয়ে বিকেল,বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে হল।তবু প্রতীমবাবুর চোখ সরল না বাড়িটা থেকে।হঠাৎ দেখলেন,মিনু কেমন যেন অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করল।কেমন যেন ওর চামড়া সবুজ হয়ে যেতে লাগল,চোখ-মুখ-মাথা-হাত-পা সব কেমন যেন গুটিয়ে আসতে লাগল।প্রতীমবাবু দেখলেন,কিশোরী নয়,যেন একটা ক্যাকটাস ঘুরে বেড়াচ্ছে বাড়িময়।দেখে প্রতীমবাবুর কেমন যেন মাথা ঘুরতে লাগল।এমনটাও কি সম্ভব?একটা জলজ্যান্ত মেয়ে এভাবে গাছ হয়ে গেল নিমেষে?

 একটু পরেই মোহনবাবু ফিরলেন।তিনি ফেরাতে স্বাগতা যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন,প্রায় কেঁদে ফেলে বললেন,'ওই দেখো,মিনু!'

 মোহনবাবু আর স্বাগতাদেবী তাড়াতাড়ি ক্যাকটাসটাকে একরকম টেনে হিঁচড়ে একটা ঘরে নিয়ে গিয়ে বন্ধ করে দিলেন।স্বাগতা বললেন,'ভোর না হওয়া পর্যন্ত একদম ঘরের বাইরে বেরোবে না তুমি!কাল রাতে আমাদের চোখ এড়িয়ে তুমি বাগানে গিয়েছিলে!আজ যেন এরকম কাণ্ড আর না হয়!'

 — 'হ্যাঁ রে মিনু মা',বিষাদের সুর মোহনবাবুর গলায়,'তুই কি চাস এ পাড়া থেকে আমাদের বাস উঠুক?যদি এসব ঘটনা পাঁচটা লোকের কানে যায়,তাহলে তারা দুদণ্ড বাঁচতে দেবে আমাদের শান্তিতে?'

  এক ভীষণ হতাশায় গলার স্বর ডুবে গেল মোহনবাবু আর স্বাগতার।

  হঠাৎ কলিংবেল বাজল বাড়ির দরজায়।মোহনবাবু গিয়ে দরজাটা খুললেন।

 — 'প্রতীমবাবু আপনি?'

  মোহনবাবুর কথার উত্তর না দিয়ে প্রতীমবাবু সোজা বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়লেন,আর দরজাটা বন্ধ করে দিলেন ভেতর থেকে।

 স্বাগতাও ততক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছেন।মোহনবাবুর হাতদুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে প্রতীমবাবু বললেন,'আমি সবটাই জেনে গেছি মোহনবাবু।'

 মোহনবাবু আর স্বাগতার মাথায় যেন বজ্রপাত হল।কোনোরকমে সামলে নিয়ে বললেন,'কি জেনে গেছেন আপনি?'

 — 'মিনু মা র কথা।'মোহনবাবুর হাতটা শক্ত করে ধরলেন প্রতীমবাবু, 'আমি কাউকে কিচ্ছুটি বলব না বিশ্বাস করুন।মিনু মা যে আমার মেয়ের মতোই।সে এভাবে কষ্ট পাচ্ছে দেখে আমারও বড়ো কষ্ট হল বিশ্বাস করুন।মোহনবাবু, প্লিজ সবটা আমায় খুলে বলুন,দেখি ই না সমাধান বের করতে পারি কিনা!'

  বিপদের সময় এমন এক ভরসার মানুষকে পেয়ে মোহনবাবু আর স্বাগতা আনন্দে যেন আত্মহারা হয়ে পড়লেন,অসহায় মা বাবার চোখ থেকে আনন্দাশ্রু ঝরে পড়ল।

 — 'সবটা বলব প্রতীমবাবু,'মোহনবাবু বলতে লাগলেন,'তখন মিনুর দেড় বছর বয়স।সবে হাঁটতে শিখছে,আর যেখানে যা পাচ্ছে মুখে দিচ্ছে।স্বাগতার একটা ক্যাকটাসের ভারী শখ ছিল জানেন,সেজন্য বেশ কয়েকটা ক্যাকটাস ছিল বাড়িতে।একদিন মিনু মা হঠাৎ একটা ক্যাকটাসের পাতা ছিঁড়ে একেবারে মুখে দিয়েছে।একটু পরেই হঠাৎ কান্না শুনে আমি আর স্বাগতা ছুটে গিয়ে দেখি,মিনু মা মেঝেতে পড়ে কাঁদছে,আর মুখ থেকে রক্ত পড়ছে।তাড়াতাড়ি হসপিটালে নিয়ে গেলাম।অপারেশনের পর ডাক্তারবাবু বললেন, 'পাতা বেরিয়ে গেছে,মেয়ে একদম সুস্থ।'

  ভগবানকে ধন্যবাদ দিয়ে মেয়েকে বাড়ি নিয়ে এলাম নিশ্চিন্ত মনে।কিভাবে জানব সেদিন থেকেই আসল ঝামেলার শুরু হবে!'

 — 'আজ্ঞে হ্যাঁ প্রতীমবাবু,সেদিন থেকেই আমার মিনু মার এই অবস্থা।দিনের বেলা মিনু দিব্যি একটা সুস্থ সবল মেয়ে,আর সূর্য ডুবলেই ওর চামড়া সবুজ হয়ে ওঠে,তারপর কি ঘটে আপনি তো দেখেছেনই নিজের চোখে।আবার যেই ভোরের আলো ফোটে,আবার একটা স্বাভাবিক মানুষ হয়ে ওঠে ও।তবে ওর চামড়াটা বড্ড খসখসে,একদম যেন ক্যাকটাসের মতো!'

  — 'আপনারা চিন্তা করবেন না একদম,একবার যখন সমস্যার কথা বলেছেন আমার কাছে,আপনাদের এ সমস্যা আমি দূর করবই!আমার কাছে এসে আজ পর্যন্ত কোনো মানুষ খালি হাতে ফেরেনি,আপনারাও ফিরবেন না!'

 — 'এ সমস্যা থেকে সত্যিই নিষ্কৃতি পাব আমরা?আপনি সত্যি বলছেন?'

— 'সব সমস্যারই একটা সমাধান থাকেই মোহনবাবু,কেবল সেই সমাধানটা খুঁজে নিতে জানতে হয়,'প্রতীমবাবু বললেন,'আর আমিই খুঁজে বের করব সেই সমাধান!'

 পরের দিন দিল্লিতে থাকা গবেষণারত ছেলেকে ফোন করে সবটা জানালেন তিনি।সুমন সবটা মন দিয়ে শুনে বলল,'আমাকে একটা দিন সময় দাও,আমি এর সমাধান খুঁজে বের করবই!'

 পরেরদিন সুমনের ফোন এল।অনেক পুরোনো রিসার্চ পেপার,বই ঘেঁটে সমাধান খুঁজে পেয়েছে সে।প্রতীমবাবুকে সে জানাল সবটা।

 পরেরদিনই সকালে টবে বসানো একটা ক্যাকটাস গাছ হাতে মোহনবাবুদের বাড়ি হাজির হলেন প্রতীমবাবু।

 — 'ক্যাকটাস আনলেন?আমাদের মিনু মা র এই ঘটনা ঘটার পরের দিন থেকে বাড়িতে আর কোনো ক্যাকটাস গাছ আমরা রাখি না!'

— 'ওটাই তো ভুল করেছেন মোহনবাবু!'

— 'মানে?'

— 'শুনুন,গতকাল ছেলের কাছে আপনাদের এই সমস্যার সমাধান শুনেছি!'

— 'সমাধান পেয়েছেন?' অসহায় মা বাবার চোখে মুখে এক আশার আলো দেখা যায়।

— 'হ্যাঁ,শুনুন মন দিয়ে।আপনাদের বাড়িতে যে কোনো ক্যাকটাস গাছ নেই তা আমি আগেই খেয়াল করেছিলাম,তাই আজ নিজেই গাছ হাতে হাজির হলাম।এই গাছটা সারাটাদিন রোদে রেখে দেবেন।তারপর সূর্য ডোবার আগের মুহূর্তে যেই দেখবেন মিনু মা র চামড়া সবুজ হতে শুরু করেছে,তাড়াতাড়ি এই গাছ থেকে একটা পাতা ছিঁড়ে নিয়ে সেটাকে বেঁটে জলে গুলে সিরিঞ্জে ভরে ইনজেক্ট করতে হবে মিনুমার শরীরে।তারপর দেখবেন রেজাল্ট!'

 — 'অর্থাৎ.....'

 — 'হুঁ,ঠিক ধরেছেন মশাই,বিষে বিষক্ষয়!'

 এরপর ক্যাকটাস গাছটিকে রোদে রেখে সারাটাদিন অপেক্ষা করতে লাগলেন মোহনবাবু, স্বাগতা আর প্রতীমবাবু।তারপর বিকেল গড়িয়ে যেই সন্ধ্যা নামব নামব,অমনি মিনুর চামড়া সবুজ হতে শুরু করল হঠাৎ! তাড়াতাড়ি প্রতীমবাবুর কথামতো ইনজেকশন  দিলেন স্বাগতা মিনুকে।অমনি মিনু কেমন যেন গোঙাতে লাগল,তারপরেই অজ্ঞান হয়ে গেল।মুখ থেকে একটা সবুজ রস বেরিয়ে এল তার।সেইসাথেই এক আশ্চর্য কান্ড ঘটল।মিনুর চামড়া সবুজ থেকে আবার স্বাভাবিক হতে শুরু করল।তার চামড়ায় সেই খসখসে ভাবও উধাও।চোখেমুখে জল দিয়ে জ্ঞান ফেরানো হল মিনুর।

 — 'বুঝলেন মশাই,সব বিপদ কেটে গেছে।এখন থেকে মিনু মা আর পাঁচটা স্বাভাবিক মানুষের মতোই বেড়ে উঠবে।'

 — 'কিন্তু প্রতীমবাবু,একটা ব্যাপার আমার কাছে পরিষ্কার হল না,তা হল ওই সবুজ রসটা কিসের ছিল?যেটা অজ্ঞান থাকা অবস্থায়....'

— 'বলছি,শুনুন।আসলে দেড়বছর বয়সে যে পাতা ওর শরীরে গিয়েছিল,সে পাতায় একটা কাঁটা ছিল,আর সেই কাঁটা ওর গলায় ফুটে রক্তপাত হয়েছিল।আর তখনই পাতার রসটা ওর রক্তে মিশে গিয়েছিল।ডাক্তারবাবু পাতাসমেত কাঁটা টা ওর গলা থেকে বের করেছিলেন ঠিকই,কিন্তু রক্তে মিশে যাওয়া রস বের করতে পারেননি।একমাত্র সূর্যের রোদমাখা পাতার রসই পারে মিনুমার শরীরে মিশে যাওয়া সেই বিষ,অর্থাৎ রস বের করতে।এখন সব বিপদ কেটে গেছে।আর কোনো ভয় নেই।'

 প্রতীমবাবু ফিরে এলেন নিজের বাড়িতে।আসার সময় দেখলেন মিনু হাত পা ছড়িয়ে রান্নাবাটি খেলছে বারান্দায়।তার হাসিতে ঝলমল করছে যেন চারিদিক।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

4 মন্তব্যসমূহ