Advertisement

অষ্টমী তিথি (চতুর্থ পর্ব)


 

অষ্টমী তিথি

সুচন্দ্রা চক্রবর্তী 

চতুর্থ পর্ব

 এইভাবে কতক্ষণ ঘোরের মধ্যে ছিল তিথি তা সে নিজেই বুঝতে পারেনি।ঘোর যখন কাটল,চোখ মুছে তিথি উঠে বসল।মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দেখে,রাত ন'টা বাজতে আর এক মিনিট বাকি।রূপা বলেছিল রাত ন'টা নাগাদ অষ্টমী তিথি পড়বে।সে এই বাগানবাড়িতে এসেছে সাড়ে পাঁচটার দিকে।গতজন্মের কথাও তার প্রায় সবকিছুই মনে পড়ে গেছে,যদিও অনেক প্রশ্নের উত্তর এখনো তার অজানা,যে অষ্টমীর সখীকে হুবহু তার মায়ের মতো দেখতে কেন?বা তার গতজন্মের পরিচারিকা মালতী এখন কোথায়?সে হঠাৎ শুধু তাকেই দেখা দিয়ে কোথায় চলে যায়?আর সুকান্ত,অর্থাৎ এজন্মের অনিন্দ্যই বা কিভাবে মারা গিয়েছিল গত জন্মে?আর সেই জলের নীচে পাওয়া চিঠিটা অষ্টমীর লেখা সুকান্তকে এই নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই,কিন্তু কি কারণে চিঠিটা সে লিখেছিল তা তার মনে পড়ছে না কিছুতেই।ভারাক্রান্ত মনে তিথি কোনোরকমে উঠে দাঁড়াল,তখনই ন'টা বাজল,আর হঠাৎ এক আশ্চর্য কান্ড ঘটল।টেবিলে যে গয়নার বাক্সটা খোলা অবস্থায় তিথি রেখেছিল,সেই গয়নাগুলো হঠাৎই খুব উজ্জ্বল হয়ে উঠল,আর তীব্র আলো বিকিরণ হতে লাগল।সেই আলো তিথির গায়ে লাগতেই আর এক অদ্ভুত ঘটনা।ক্লান্ত অবসন্ন তিথি হঠাৎই কেমন এক অদ্ভুত ক্ষমতার অধিকারী হল,আর সেই ক্ষমতাবলেই উঠে দাঁড়াল সে,গতজন্মে মায়ের দেওয়া লাল বেনারসি আর গয়নাগুলো পরল ও।এজন্মে ওর চুল যদিও কোঁকড়ানো নয়,আর লম্বাও নয় তেমন,তবু চুল খুলে ফেলল ও।জেগে উঠল পঁচিশ বছর আগের তেজস্বিনী সেই মেয়েটা,সাহসিনী প্রতিবাদী অষ্টমী।যা স্মৃতি তার মনে পড়েছিল,তার পরবর্তী ঘটনার স্মৃতিও ধীরে ধীরে মনে পড়তে লাগল তার।জন্মদিনের সন্ধ্যেবেলায় জমিয়ে অষ্টমীর পুজো চলছিল পুজোমন্ডপে।বাজছিল ঢাক,কাঁসরঘণ্টা।সকলে দিচ্ছিল উলুধ্বনি।হঠাৎই সকলের নজর এড়িয়ে অষ্টমীকে ডাকলেন চামেলীদেবী।

 — 'অষ্টমী মা,তোর সাথে কিছু কথা ছিল,একটু আয় না মা।'

— 'আচ্ছা মা,আসছি।'

 চামেলীদেবী অষ্টমীকে নিয়ে গেলেন বাগানবাড়িতে।সকলে তখন পুজোমন্ডপে ব্যস্ত,বাগানবাড়ি একেবারে ফাঁকা।

অষ্টমীর হাত ধরে তাকে বাগানবাড়ির একটা ঘরে নিয়ে গেলেন চামেলী দেবী।ঘরে অবিনাশ আগে থেকেই উপস্থিত ছিল।ঘরে ঢুকেই ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিলেন রাণীমা।তারপরেই তিনি কাঁদতে লাগলেন,তাঁর সাথে কাঁদতে লাগল অবিনাশও। 

 — 'তোমরা কাঁদছ কেন?কি হয়েছে মা?'

— 'মা রে,কাঁদছি কি সাধে?আমি,অবিনাশ,আর কুমুর কি হবে এবার তুই বল?'

— 'কেন?'

— 'তোর বাবা যে সব সম্পত্তি তোর নামে লিখে দিলেন!অবিনাশ,কুমু,আমি আমরা তিনজন কি এবাড়ির কেউ নই?'

— 'ছি ছি একি বলছ মা?বাবা নিশ্চয়ই কিছু বুঝেই সবটা আমার নামে লিখে দিয়েছেন।কিন্তু মা,সে তো খাতায় কলমে।এবাড়ি সম্পত্তির ওপর তোমাদেরও সমান অধিকার,আমার মতোই।আর আমি থাকতে কক্ষনো তোমাদের কারোর অযত্ন হতে দেব না।'

— 'কিন্তু কেন অষ্টমী?আমরা কেন তোর ভরসায় থাকব বলতে পারিস?আমাদের নিজেদের কি পায়ের তলার শক্ত মাটি থাকা উচিত নয় তুই বল্?'

— 'হুম,এটা তুমি ভুল বলোনি মা।আচ্ছা বেশ,আজকের রাতটা যাক,আমি কাল সকালে বাবার সাথে কথা বলছি।'

— 'কেন রে মা,তোর বাবাকে এসব জানানোর কি দরকার?মা-মেয়ের মধ্যেই গোপন থাকুক না কিছু কথা!'

— 'মানে?'

— 'এই নে এখানে একটা সই করে দে দিকিনি,' বলেই একটা কাগজ বের করে অষ্টমীর হাতে ধরিয়ে দিলেন চামেলী দেবী,'এই কাগজে লেখা আছে,তোর সব সম্পত্তি তুই তোর মায়ের নামে,অর্থাৎ আমার নামে লিখে দিচ্ছিস।'

— 'না মা,এটা আমি পারব না।বাবা যথেষ্ট বুদ্ধিমান মানুষ,উনি যখন সম্পত্তি আমার নামে করেছেন নিশ্চয়ই অনেক ভেবেচিন্তে করেছেন।তাই বাবাকে না জানিয়ে আমি সই করতে পারব না।'

— 'ও,তুই তাহলে আজও আমায় সৎমাই ভাবিস।আমি আজও তোর মা হয়ে উঠতে পারিনি।' চামেলীদেবী কাঁদতে লাগলেন।

— 'এ তুমি কি বলছ মা?'

— 'নয়ত কি,আমায় বিশ্বাসই তো করিস না!'

— 'এটা বিশ্বাস অবিশ্বাসের কথা নয় মা,এটা সিদ্ধান্তের প্রশ্ন,তাই তো বাবাকে কথাটা বলতেই হবে।'

— 'তাহলে তুই সই করবি না তাই তো?'

— 'না মা এখন সই করতে পারব না।'

এবার চোখের জল মুছে ফেললেন চামেলীদেবী,আর হঠাৎই একটা ছোরা বের করলেন আঁচলের তলা থেকে।চমকে উঠল অষ্টমী।চামেলীদেবী এরপর অবিনাশকে ইশারা করলেন,আর অবিনাশ অষ্টমীর হাতদুটো চেপে ধরল,আর রাণীমা ছোরাটা অষ্টমীর গলায় ঠেকালেন,'কি রে মেয়ে,এখনও কি সই করবি না?'

 অষ্টমী বুদ্ধিমতী মেয়ে,তাই পরিস্থিতি কঠিন বুঝে ও হ্যাঁ বলল।সেই শুনে রাণীমা অবিনাশকে ওর হাতদুটো ছেড়ে দিতে বলে কাগজটা ওর হাতে দিলেন।এরপর অষ্টমী একটা পেন চাইল সইয়ের জন্য।রাণীমা ছোরাটা একটা টেবিলে রেখে যেই পেন আনতে গেলেন,অমনি অষ্টমী ছোরাটা তুলে নিয়েই রাণীমা আর অবিনাশের দিকে ধরল,'তোমরা খুব বোকা ভাবো অষ্টমী চৌধুরীকে,তাই না?বাবা কেন তোমাদের সম্পত্তির কানাকড়ি দেননি সেটা এখন বুঝতে পারছি।' বলেই ছোরাটা ওদের দিকে তাক করে ওই ঘর থেকে বেরিয়ে চলে এল অষ্টমী।মালতী সবটাই খেয়াল করেছিল,অষ্টমী আর মালতী তাড়াতাড়ি বাগানবাড়ির বাইরে চলে এল।

 — 'দিদিমণি,এরা কি সাংঘাতিক গো!এরা তো তোমায় ছাড়বে না!'

— 'হুম জানি,এরা শুধু আমারই না,হয়ত বাবারও ক্ষতি করতে পারে!'

— 'সে কি গো!কি করবে এখন?'

— 'সুকান্তকে একটা চিঠি লিখতে হবে।'

 এরপরই অষ্টমী সুকান্তকে চিঠি লেখে।সুকান্ত আজ এবাড়িতে আমন্ত্রিত,একটু পরেই ও আসবে।তাই চিঠিতে ও লিখল,ও যেন এবাড়িতে একা না আসে,যেন লোকবল সঙ্গে আনে।এটাই সেই চিঠি যেটা তিথি জলের তলায় পেয়েছিল।

 চিঠিটা একটা পাথরের বাক্সে ভরে মালতীর হাতে দিয়ে অষ্টমী বলল,'খালি হাতে চিঠিটা নিয়ে গেলে মুশকিল,কেউ সন্দেহ করতে পারে,ভাবতে পারে ওটা কিসের কাগজ,তাই বাক্সটায় ভরেই নিয়ে যাও।কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে বোলো,আমি তোমায় উপহার দিয়েছি,ব্যস।'

— 'আচ্ছা দিদিমণি,তাই হবে।'

মালতী চলে গেল সুকান্তর বাড়ির দিকে।

 অষ্টমী ঠিক করল ব্যাপারটা হেমচন্দ্র বাবুকে এক্ষুণি জানাতে হবে,তাই ও পুজোমন্ডপের দিকে যেতে গেল,কিন্তু কয়েকটা ষন্ডামার্কা লোক হাতে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ওর পথ আটকাল।

— 'কে তোমরা?কি চাও?'অষ্টমী সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল।

হঠাৎই ওদের মধ্যে একটা লোক এসে ওর মুখ চেপে ধরল,আর ওকে টেনে নিয়ে গেল বাগানবাড়িতে ওর ঘরটায়।রাণীমা আর অবিনাশদা ওখানে ছিলেন।

— 'ও,এসব তাহলে তোমরা করাচ্ছ!ছি!তোমাকে আমি একসময় মা বলে ডাকতাম ভেবে আমার ঘৃণা হচ্ছে চামেলী চৌধুরী,'অষ্টমীর চোখে জল এল,'আমার মা সেই ছয় বছর বয়সে মারা গিয়েছিলেন,এরপর আমার যখন সাত বছর বয়স তখন তুমি এবাড়িতে এসে আমার চোখের জল মুছিয়ে বলেছিলে,কে বলেছে তোর মা নেই?আমিই তো তোর মা!সেদিন থেকে আমি সত্যিই ভেবেছিলাম,আমার জীবনে আবার মা এসেছে,আর তুমি কিনা...'

— 'হ্যাঁ,বলেছিলাম,মেয়ের মতো আগলেও রেখেছি আঠারোটা বছর ধরে,কিন্তু কে জানত যে এতদিন পরের মেয়েকে মানুষ করার পরও একচুল সম্পত্তি আমার নামে আসবে না?'

— 'ও,তার মানে তুমি শুধু সম্পত্তির জন্য...'

— 'হ্যাঁ তাই।তোর বাবা যেভাবে অষ্টমী অষ্টমী করে,তাতে আমি জানতাম যে সম্পত্তিগুলো তোরই ভাগে যাবে,কিন্তু এতদিন এত ভালোবাসা দেওয়ার পরও যে তুই শেষ মুহূর্তে বাগড়া দিবি তা করে জানব বল বেইমান মেয়ে!'

— 'বেইমান আমি নই,তুমি!আমি সব কথা বাবাকে আজই জানাব,তারপর বাবা ই তোমার আর অবিনাশের যা ব্যবস্থা নেওয়ার নেবে।কুমু বাচ্চা,ও আমাদের সাথেই থাকবে আমার বোন হয়ে,কিন্তু তোমাদের এবাড়িতে জায়গা হবে না,তোমরা যে কোনোদিন বাবাকেও মেরে ফেলতে পারো।'

— 'হুম তা পারি বৈকি!আর আমাদের কি বাড়ি থেকে তাড়াবি,আগে নিজে তো বাঁচ!'বলেই অষ্টমীর বুড়ো আঙুলে কালি লাগিয়ে জোর করে টিপসই নেওয়ার চেষ্টা করতে লাগলেন চামেলী আর অবিনাশ।

অষ্টমী এরপর চামেলীদেবীর হাতে কামড়ে হাত ছাড়িয়ে নিল,আর ঘর থেকে পালাতে গেল,কিন্তু ষন্ডামার্কা লোকগুলো ঘরের বাইরেই দাঁড়িয়ে ছিল,ওরা অষ্টমীকে ধরে ফেলল।দুজন লোক এসে অষ্টমীর দুটো হাত চেপে ধরল,আর রাণীমা ছোরাটা অষ্টমীর পেটে আমূল বসিয়ে দিলেন।প্রচন্ড যন্ত্রণায় অষ্টমী চিৎকার করে উঠল,কিন্তু পুজোমন্ডপ থেকে বাগানবাড়ি বেশ কিছুটা দূরে থাকায়,আর পুজোর সময় বাজনার শব্দে অষ্টমীর আর্তনাদ কেউ শুনতে পেল না।

তবে কষ্ট হলেও ছোরার আঘাতটা অতটাও গুরুতর ছিল না,তাই রক্তপাত হলেও ওই আঘাতে যে ওর মৃত্যু হবে না তা বুঝতে পেরেছিল অষ্টমী।কিন্তু সে মারা গেছে এমন অভিনয় করে ও মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।

 — 'মা,মনে হচ্ছে মরেছে!'অবিনাশ বলল।

— 'আমারও তাই মনে হচ্ছে,তাহলে টিপসইটা নিয়ে নিই,'বলে চামেলী অষ্টমীর টিপসই নিয়ে নিলেন কাগজে।বুঝতে পেরেও অষ্টমীর প্রতিবাদ করার উপায় ছিল না বলে ও মরার মতোই পড়ে রইল।

কাজ হয়ে যাওয়ার পর চামেলী অবিনাশ আর ষন্ডামার্কা লোকগুলো সেখান থেকে চলে গেল।বেশ কিছুক্ষণ কোনো শব্দ না হওয়ায় অষ্টমী বুঝল,যে ওরা চলে গেছে।বহু কষ্টে উঠে দাঁড়াল ও।ও বুঝতে পারল,এক্ষুনি হেমচন্দ্র বাবুকে সবটা বললে ওরা হয়তো হেমচন্দ্র বাবুকেও শেষ করে দিতে পারে,তাই এখন তার সুকান্তর কাছে যাওয়া দরকার,ও ই এব্যাপারে ওকে সাহায্য করতে পারবে।

 খুব কষ্টে অষ্টমী বাগানবাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় এল।হাঁটতে লাগল সুকান্তর বাড়ির পথে। রাজবাড়ি থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে একটা দীঘি আছে,যে দীঘিতে যাবতীয় রাজবাড়ির পুজোর কাজ সারা হয়।এই দীঘি থেকেই চিঠিটা পেয়েছিল তিথি।এই দীঘিটা পেরিয়ে কয়েকটা বাড়ি পরেই সুকান্তর বাড়ি।

 খুব কষ্ট হচ্ছিল অষ্টমীর হাঁটতে,আঘাত পাওয়া জায়গাটা থেকে রক্তক্ষরণ হচ্ছিল,তবুও সেসবের তোয়াক্কা না করেই ও এগিয়ে চলছিল।দীঘিটার কাছাকাছি আসতেই কিছু মানুষের কথা বলার শব্দ কানে এল ওর।তাড়াতাড়ি দীঘির কাছেই থাকা একটা বটগাছের আড়ালে লুকোলো অষ্টমী।সে দেখল,চিঠিটা দিতে যাওয়ার পথে মালতী ধরা পড়ে গেছে চামেলীদেবীর কিছু পোষা গুন্ডার কাছে।

— 'কোথায় যাচ্ছিস বল্?কার কাছে খবর চালান করতে যাচ্ছিস?'

— 'কি মুশকিল,খবর কেন চালান করতে যাব,দিদিমণি কিছু জিনিস কিনতে পাঠিয়েছিল,সেগুলোই কিনতে যাচ্ছি।'

— 'একদম মিথ্যে বলবি না!প্রাণে বাঁচতে চাস তো সত্যিটা বল কোথায় যাচ্ছিস!' বলে একটা লোক তরবারি বের করল,'কি রে!সত্যিটা বলবি নাকি মরবি!'

— 'আমি,আমি তো সত্যিই বলছি!' মালতী এবার ভয় পেয়ে গেল।

— 'তুমি যে সত্যি বলছ না সেটা তোমার হাবভাব দেখেই বোঝা যাচ্ছে মালতীদি,'হঠাৎ অবিনাশ চলে এল সেখানে,'আর মিথ্যে বলেই বা লাভ কি,তোমার দিদিমণিই তো আর বেঁচে নেই',বলেই পৈশাচিক হাসি হাসল অবিনাশ,তাল মেলাল গুন্ডাগুলোও।

— 'শয়তান!আমার মেয়ে ছিল দিদিমণি,তোরা তাকে মারলি!'উত্তেজিত মালতী অবিনাশের জামা টেনে ধরে,'কেন মারলি শয়তান!ও তোর দিদি জানিস না!'

— 'হুম সৎদিদি,জানি।কিন্তু তুমি এবার তো সত্যিটা বলো যে কোথায় যাচ্ছ!'

— 'বলব না,তোদের মতো শয়তানদের আমি কিচ্ছু বলব না।কিন্তু আজ আমি যাকে যা জানাবার জানাবোই,দেখি তোরা কি করে আটকাস আমায়!' বলেই মালতী লোক গুলোর হাত ছাড়িয়ে এগোতে গেল,আর তখনই অবিনাশ গুন্ডাদের কাছ থেকে তরবারিটা নিয়ে মালতীর বুকে বিদ্ধ করল।এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে গেল ওর শরীরটা।চিৎকার করে মালতী লুটিয়ে পড়ল,আর ওর হাত থেকে চিঠি ভরা বাক্সটা ছিটকে পড়ে গেল দীঘির জলে।বাক্সটা অবিনাশদের নজরে পড়েনি,ও গুন্ডাদের নির্দেশ দিল যেন মালতীর লাশটা দূরে কোথাও সরিয়ে দেয়,যাতে কেউ ওকে না খুঁজে পায়।

 অষ্টমী গাছের আড়াল থেকে সবটা দেখছিল।মায়ের মতো মালতীদির মৃত্যু দেখে ও প্রচন্ড কষ্ট পেল,চোখ জলে ভরে এল,তবু টুঁ শব্দটাও করল না,কারণ আহত অবস্থায় বাধা দিতে গেলে ওরা অষ্টমীকেও মেরে ফেলবে,আর ওকে মেরে ফেললে হেমচন্দ্র বাবুকে মারতে আর কতক্ষণ!

 মালতীর লাশটা নিয়ে গুন্ডাগুলো কোথায় যেন চলে গেল,আর অবিনাশও ফিরল রাজবাড়ির অভিমুখে।

 বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে অষ্টমী আড়াল থেকে বেরিয়ে এল,আর তখনই ও দেখল,উল্টোদিক থেকে সুকান্ত হেঁটে আসছে।রাজবাড়ির দিকেই যাচ্ছিল ও।এক মুহূর্তও নষ্ট না করে ও ছুটে গেল সুকান্তর কাছে।অষ্টমীর এমন অবস্থা দেখে আশঙ্কিত হয়ে পড়ল সুকান্ত,'অষ্টমী কি হয়েছে তোমার!এমন অবস্থা হল কি করে!'বুকে টেনে নিল ও অষ্টমীকে।

 অনেক কষ্টে সবটা খুলে বলল অষ্টমী।সমস্তটা শুনে সুকান্তর মাথায় আগুন চড়ে গেল,ও বলল,'রাণীমা আর অবিনাশকে আমি কিছুতেই ছাড়ব না!এর দাম ওদের দিতেই হবে!'

— 'আমিও তাই চাই সুকান্ত,'হাঁপাতে হাঁপাতে অষ্টমী বলল,'কিন্তু ওরা খুব সাংঘাতিক,যা করতে হবে খুব সাবধানে,নয়তো ওরা তোমারও ক্ষতি করে দিতে পারে!'

— 'জানি,কিন্তু শাস্তি আমি ওদের দেবোই,কিন্তু এখন তোমার চিকিৎসা দরকার,আর ওরা এখন তোমায় হায়নার মতো খুঁজবে,তাই তোমাকে গা ঢাকা দিতে হবে আপাতত।'

 — 'কাকে গা ঢাকা দিতে হবে বাবা সুকান্ত?' চকিতে সুকান্ত পিছন ফিরে দেখে চামেলীদেবী দাঁড়িয়ে,সেই সঙ্গে অবিনাশ আর ষন্ডামার্কা লোকগুলো।

— 'বড়দি,আমরা জানতাম তুমি বুদ্ধিমতী।কিন্তু সেই তুমি এরকম একটা বোকার মতো কাজ করলে?' অবিনাশ বাঁকা হাসি হাসল।

— 'যা বলেছিস অবি!অষ্টমী,তুই বাগানবাড়ি থেকে পালিয়ে এলি,কিন্তু তোর ক্ষতস্থান থেকে তো রক্ত পড়তে পড়তে গেছে রাস্তা জুড়ে,আর সেই চিহ্ন দেখেই তো ধরে ফেললাম যে তুই এদিকেই এসেছিস!'


পরবর্তী ভাগ পড়ুন : পঞ্চম পর্ব

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ