Advertisement

অষ্টমী তিথি (পঞ্চম এবং অন্তিম পর্ব)



 অষ্টমী তিথি

সুচন্দ্রা চক্রবর্তী 

পঞ্চম পর্ব

— 'ছিঃ!আপনারা এত নীচ!এভাবে মানুষ খুন করতে পারেন নির্দ্বিধায়!'

— 'আরে দূর বোকা ছেলে,আমাদের তো বোঝাপড়া  অষ্টমী আর ওর বাপের সাথে,তুমি বাইরের ছেলে,কেন বাপু এসবের মধ্যে নিজেকে জড়াচ্ছ!'

— 'চুপ করুন' সুকান্ত গর্জন করে উঠল,'আমি বাড়ির না বাইরের সেটা আপনার কাছ থেকে শুনব না!'

— 'সে তুমি না ই শুনতে পারো,তবে শুনলে তোমারই লাভ হত।অকালে শুধু শুধু মরে কি লাভ...'

— 'খবরদার,চামেলী চৌধুরী,সুকান্তর দিকে নজর দেবে না একদম!সুকান্ত,তাড়তাড়ি চলো এখান থেকে!'অষ্টমী বলে উঠল।

— 'হুম চলো!'

 সুকান্ত আর অষ্টমী দৌড়াতে লাগল,কিন্তু পেটে আঘাত নিয়ে অষ্টমী বেশিক্ষণ দৌড়াতে পারল না,তাই সুকান্ত দু হাতে ওকে তুলে নিয়ে দৌড়াতে লাগল।হঠাৎই পিছন থেকে রাইফেলের তীব্র শব্দ হল,সুকান্ত গুলিবিদ্ধ হল,অষ্টমীকে নিয়েই মাটিতে লুটিয়ে পড়ল সে।

— 'সুকান্ত!' তীব্র আর্তনাদ করে সুকান্তর নিথর দেহটাকে জড়িয়ে ধরল অষ্টমী।

 এরপরই চামেলীরা এগিয়ে এল অষ্টমীর দিকে।কাছের দুজন মানুষকে চোখের সামনে শেষ হতে দেখেছে ও,তাই ও হয়ে উঠেছে ভয়ঙ্কর।ষন্ডা লোকগুলোর মধ্যে কিছু জনের হাতে মশাল ছিল,অতর্কিতে একজনের হাত থেকে মশাল কেড়ে নিয়ে আগুনসুদ্ধু মশালটা ও ছুড়ে দিল চামেলীদেবীর দিকে।কিন্তু আহত এবং ক্লান্ত হওয়ায় লক্ষ্যভ্রষ্ট হল,চামেলীদেবী একটুর জন্য বেঁচে গেলেন,মশালটা পড়ল তাঁর পাশেই।

 — 'শয়তান মেয়ে,তুই আমায় মারবি!'বলেই চামেলীদেবী মশালটা হাতে তুলে নিলেন আর অষ্টমীর দিকে এগোতে লাগলেন।অষ্টমী প্রাণপণে ছুটতে লাগল,কিন্তু বেশিদূর যেতে পারল না,চামেলীদেবী জ্বলন্ত মশালটা ছুড়ে দিলেন অষ্টমীর গায়ে।দাউদাউ করে জ্বলতে লাগল ও।আর্তনাদ করে দীঘির জলে ঝাঁপ দিল ও,আর তারপরেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল,মরার আগে ও বলল,'আমি আবার ফিরে আসব',বলেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করল।

 হাতের মুঠো শক্ত হচ্ছে তিথির,রাগে চোখ দুটো ভাঁটার মতো জ্বলছে।'আর তোমরা ছাড় পাবেনা,চামেলী অবিনাশ,তোমাদের সুখের দিন শেষ' বলেই বাগানবাড়ি থেকে পুজোমন্ডপের দিকে এগিয়ে গেল তিথি।গতজন্মের অন্যায়ের শোধ সে নেবেই।

  পুজোমন্ডপে প্রতিবারই অসুস্থ হেমচন্দ্র বাবুকে নিয়ে আসা হয়,হুইল চেয়ারে বসে সম্পূর্ণ পুজোটাই উনি দেখেন।হঠাৎ সেখানে অষ্টমীর সাজে হাজির হল তিথি।ওর এই সাজ দেখে রূপা অস্মিতা ঝুম্পা কুমুদিনী ওরা কিছুটা আশ্চর্য হল,আর রাণীমা আর অবিনাশ রীতিমতো শঙ্কিত হয়ে পড়লেন।আর হেমচন্দ্র বাবুর চোখে মুখে এক অদ্ভুত পরিবর্তন দেখা গেল।উনি ভয় পেলেন না,উলটে যেন খুশি হয়েছেন এমন ভাব করতে লাগলেন।কিছু একটা বলার চেষ্টা করলেন উনি বারবার,কিন্তু ব্যর্থ হলেন।

তিথি ওনার সামনে এগিয়ে গেল,বলল,'বাবা,তুমি আমায় ঠিক চিনেছ,আমি তোমার মেয়ে অষ্টমী।আমি ফিরে এসেছি বাবা!'

 এই কথা শুনে বৃদ্ধ হেমচন্দ্র বাবু সুস্থ হয়ে উঠলেন,উঠে দাঁড়িয়ে পড়লেন চেয়ার থেকে,'অষ্টমী!এসেছিস মা!মা দুর্গা তোকে ফিরিয়ে দিয়েছেন আমার কাছে।'

— 'হ্যাঁ বাবা,উনিই আমায় ফিরিয়ে এনেছেন,কারণ গতজন্মের শোধ নেওয়া যে বাকি বাবা!'বলেই চামেলীদেবী আর অবিনাশের দিকে কটমট করে তাকাল সে।

— 'সে কি মা!কি বলছিস!'

অন্যদিকে রূপা কুমুদিনী অস্মিতারা কিছু বুঝতে পারল না কি ঘটছে,তাই ওরা অবাক বিস্ময়ে শুনতে লাগল ওদের কথোপকথন। 

— 'অষ্টমী!মানে বড়দি!তুমি বড়দি!কি বলছ এসব তিথি!'

— 'হ্যাঁ আমিও কিছুই বুঝতে পারছি না।' রূপা বলল।

— 'ও ঠিকই বলছে,'হেমচন্দ্র বাবু বললেন,'আমার মৃত মেয়েটা আবার ফিরে এসেছে,মা ফিরিয়ে দিয়েছেন ওকে শুভদিনে।কিন্তু মা,কিসব শোধ নেওয়ার কথা কি বলছিলি!'

— 'বলব বাবা,সবটা বলব,অনেকের মুখোশ খুলে দেব,' বলেই গতজন্মের সব কথা খুলে বলল সে।

— 'কি!চামেলী তুমি এত নীচু মানুষ!সম্পত্তির জন্য আমার মেয়েটাকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিলে,আবার ওর মৃত্যুটাকে শুধুমাত্র অ্যাক্সিডেন্ট বলে চালালে!ছি ছি!'

— 'হুম বাবা,ওরা এমনই নীচ!'

— 'শাট আপ তিথি,যাস্ট শাট আপ!দুদিন হল এবাড়িতে এসেছ অতিথি হয়ে,তোমার এত বড়ো সাহস মা আর মেজদার দিকে তুমি আঙুল তুলছ!খুনি বলছ ওদের!' কুমুদিনী রাগী গলায় গর্জন করে উঠল।ওর কথায় সায় দিল রূপাও।

— 'ও ভুল কিছু বলছে না,'পুজোমন্ডপে তিথির মা রেশমির প্রবেশ,সাথে আছে তিথির বাবা রজত,আর সুকান্তর সাজে এসেছে অনিন্দ্যও।'

— 'সুকান্ত!তুমিও এসেছ বাবা!'আনন্দে বৃদ্ধ মানুষটার চোখের জল বাগ মানল না।

— 'হ্যাঁ কাকাবাবু,আসতে যে আমায় হতোই।ওরা যে শুধু অষ্টমীকে নয়,আমাকেও সরিয়ে দিয়েছিল ওদের রাস্তা থেকে!'

— 'জানি বাবা,সবটাই আমায় অষ্টমী বলল।' 

— 'আরে ধুর,কারা আপনারা?কতদিন চেনেন আমার মা আর মেজদাকে?এত বড়ো সাহস আমাদের বাড়িতে দাঁড়িয়ে আমাদের বাড়ির মানুষদেরই অপমান করছেন!আপনাদের এই মুহূর্তে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া উচিত!'

 রেশমি আর অনিন্দ্য কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল,ওদের থামিয়ে দিয়ে রূপা বলল,'আর অষ্টমীর ছবি কেউ কখনো দেখেনি,তুমি কিভাবে জানলে তিথি যে তুমি হুবহু তারই মতন দেখতে?'

— 'আমি জানি বৌমা,আমার মেয়েকে কেমন দেখতে তা কি আমি জানব না মা?আর ও হল সুকান্ত,আমার হবু জামাই।আর এই যে ঘটনাগুলো ও বলল,যে ওর জন্মদিনে সম্পত্তি ওর নামে লিখে দিয়েছিলাম,আর সুকান্ত ওকে ওই ছবিখানা উপহার দিয়েছিল,সবটা সত্যি!'

— 'বাবা,তুমি সত্যি বলছ!'

— 'হ্যাঁ কুমু,আমি সত্যিই বলছি মা!'

— 'শুধু তাই নয় কাকাবাবু,'রেশমি বলল,'অষ্টমী মারা যাওয়ার ঠিক এক বছর পরেই তিথির জন্ম হয়েছিল।'

— 'দেখছিস তো কুমু,কিভাবে সব মিলে যাচ্ছে,কিন্তু রেশমি,অষ্টমী মারা যাওয়ার পর তোর আর রজতের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি,কোথায় ছিলি তোরা এতদিন?'

— 'অষ্টমীকে মেরে ফেলার পর রাণীমা আমায় আর রেশমিকে বলেছিলেন,আমরা যেন গ্রাম ছেড়ে অনেক দূরে চলে যাই,কখনো যেন এ গ্রামে না ফিরে আসি,ফিরলে আমাদেরও উনি একই হাল করবেন' রজত বলল,'আর সেইজন্যেই আমি আর রেশমি কলকাতায় চলে যাই,আর কখনো এ গ্রামে ফিরতে পারিনি।'

— 'আর সেখানেই আমরা বিয়ে করি।জানেন কাকাবাবু,'চোখের জল মুছে রেশমি বলল,'একদিন হঠাৎ আমার প্রিয় সখী আমার স্বপ্নে এল,আর বলল,'সই রে,তোর কোলেই ফিরব আবার!'আর তারপরেই জন্ম নিল তিথি।'

— 'তার মানে তিথি আর ওনারা যা বলছেন সবটাই সত্যি!' অবাক রূপা জিজ্ঞেস করল।

— 'না রূপা,ওরা মিথ্যে বলছে,এত সম্পত্তি দেখে ওদের লোভ হয়েছে,তাই এভাবে ষড়যন্ত্র করে আমাদের ফাঁসাচ্ছে' অবিনাশ বলতে লাগল,'রূপা,তুমি অন্তত আমায় বিশ্বাস করো!'

— 'তাই বুঝি অবিনাশ!ওরা নয় সম্পত্তির জন্য গুছিয়ে মিথ্যে বলছে,তা আমিও তো ওদের সমর্থন করছি,আমিও কি সম্পত্তির লোভেই করছি অবিনাশ?' হেমচন্দ্র বাবু রাগী গলায় বললেন।

— 'আরে বাবা,ওরা তোমায় ভুল বোঝাচ্ছে,আর তুমিও বোকা হচ্ছ?অষ্টমীর মৃত্যুটা অ্যাক্সিডেন্টই ছিল,আর কিচ্ছু না!'

— 'তাই?তা রাণীমা,অষ্টমীর মৃত্যুটা যদি স্বাভাবিকই হবে তাহলে অষ্টমী মারা যাওয়ার সাথে সাথে সুকান্ত আর মালতীও কেন নিখোঁজ হয়ে গেল?'অনিন্দ্য তীক্ষ্ণ স্বরে প্রশ্ন করল।

— 'একদম তাই!এমনিতেই জীবনে কম পাপ করেননি আপনি,এখন শেষ বয়সে মিথ্যে বলে পাপ আরও বাড়ানোর কি দরকার বলুন তো!' রেশমি বলল।

— 'হুম,সবই বুঝলাম,আপনাদের কোনো কথাই উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়,কিন্তু তবুও আজকের দিনে দাঁড়িয়ে কিভাবে জন্মান্তরের ঘটনায় বিশ্বাস রাখি বলুন তো?আর সত্যি বলতে সবই আপনাদের মুখের কথা,কোনো প্রমাণ আপনারা কি দেখাতে পারেন?'

— 'প্রমাণের কি দরকার কুমু,আমি তো বলছি!তোর বাবার কথাও কি তুই বিশ্বাস করবি না?'

— 'না বাবা,আপনি বুঝতে পারছেন না,অষ্টমী রাজবাড়ির মেয়ে,ওর সম্বন্ধে ইতিহাস জোগাড় করা কি খুব কঠিন কিছু?'রূপা বলল,'আর আমার তো মনে হচ্ছে এই সব কিছু রেশমিদেবী আর ওনার স্বামীর পরিকল্পনা।আদৌ তিথি ওদের মেয়ে কিনা কে জানে,অষ্টমী আর সুকান্তর মতো কাউকে জোগাড় করে এনেছে বোধহয়,তারপর কোন্দল করছে!'

— 'প্রমাণ আছে রূপাদেবী,'হঠাৎ পুলিশের প্রবেশ পুজোমন্ডপে,আর তাদের সাথে রয়েছে কিছু মাঝবয়সী বলশালী চেহারার পুরুষ।

— 'ছ্যা ছ্যা ছ্যা,রাজবাড়িতে পুলিশ ঢুকল বাপু,রাজবাড়ির মান সম্মান আর রইল না!' চামেলীদেবী নাক কুঁচকে বলে উঠলেন।

— 'রাজবাড়ির মান সম্মানের কথা জানিনা,শুধু এটুকু জানি আপনার আর আপনার ছেলের সুখের দিন শেষ',অনিন্দ্য বলল।

— 'একদমই তাই,' অষ্টমী চৌধুরী,সুকান্ত বর্মন এবং মালতী কুন্ডু,এই তিনজনকে মেরে প্রমাণ লোপাটের অভিযোগে চামেলী চৌধুরী এবং অবিনাশ চৌধুরীকে আমরা গ্রেপ্তার করছি।'বলেই পুলিশেরা ওদের হাতে হাতকড়া পরাল।

— 'না এটা আপনি করতে পারেন না অফিসার,কি প্রমাণ আছে আপনার কাছে?' রূপা আর কুমুদিনী ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

— 'কুমুদিনী ম্যাডাম,ওই যে দেখছেন লোকগুলোকে আমরা নিয়ে এসেছি,এদেরই চামেলীদেবী আর ওনার ছেলে অবিনাশ নিযুক্ত করেছিলেন অষ্টমীদের মারার জন্য।'

— 'হ্যাঁ,পঁচিশ বছর আগে ওনারাই টাকা দিয়ে আমাদের লাগিয়েছিলেন,'লোকগুলো সায় দিল।

— 'তাই নাকি?আপনারাও যে মিথ্যে বলছেন না তার প্রমাণ আছে কি?' অবিনাশ বিস্মিত গলায় বলল।

— 'হ্যাঁ আছে অবিনাশবাবু,' লোকগুলোর মধ্যে একটা লোক এসে বলল,'আমিই ওদের গুরু।আমরা এ গাঁয়ের লোক নই।আমরা পাশের গাঁ শিমুলতলার লোক।রাণীমা আমায় একখান চিঠি লিখেছিলেন এ গাঁয়ে আসার জন্য,সে চিঠিটা আজও আমার কাছে আছে।'

— 'কই দেখি সেই চিঠি!'কুমুদিনী হতাশ গলায় বলল।

— 'ওই চিঠি আমার কাছে আছে' বলে অফিসার কুমুদিনীর হাতে চিঠিটা দিলেন।

 — 'এ তো মায়ের হাতের লেখা,বৌদি দেখো!'কুমু বলল।

— 'হুম,আর চিঠির নীচের দিকে এই সইটাও তো মায়ের,'রূপা বলল,'মায়ের সই আমি চিনি!'

— 'হ্যাঁ চিঠিটা আমি রেখেছিলাম,কারণ আমি জানতাম পরে এটা কাজে লাগতে পারে।'

— 'মিথ্যে,এরা সব মিথ্যে বলছে কুমু,ওরা আমার সই জাল করেছে!'

— 'চুপ করো মা,এনাফ ইজ এনাফ!এই চিঠিটা দেখেই বোঝা যাচ্ছে অনেক পুরোনো এটা,কাগজটা লালচে হয়ে গেছে,লেখাগুলোও কেমন আবছা হয়ে গেছে,'কুমু বলল,'ছি! আমার মা একজন খুনি!' বলেই কান্নায় ভেঙে পড়ল ও,মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।

— 'তুমি খুনি!আমি একটা খুনির সাথে এতদিন ঘর করলাম' রূপা এসে অবিনাশের জামা টেনে ধরল,'তুমি এত নোংরা একটা মানুষ!ছি!'

— 'রূপা তুমি বিশ্বাস করো,এসব মিথ্যে!'

— 'চুপ,আর একটাও কথা বলবে না তোমরা কেউ!'রূপা হতাশায় মাটিতে বসে পড়ল।

— 'অফিসার,এক্ষুণি এদের অ্যারেস্ট করে নিয়ে যান আমাদের চোখের সামনে থেকে!' কুমুদিনী চেঁচিয়ে উঠল,'এদের মুখও আমি দেখতে চাই না!'

— 'কিন্তু একটা ব্যাপার এখনো পরিষ্কার হল না,'অনিন্দ্য বলল,'রাণীমার ভাড়া করা গুন্ডাগুলো এভাবে নিজেদের অপরাধ স্বীকার করে নিল কেন?'

— 'দাদাবাবু,তখন যুবক ছিলাম,টাকার লোভে পড়ে মানুষ খুন করেছি,কিন্তু এর দাম যে পরে দিতে হবে তা তখন বুঝিনি!'লোকগুলোর মধ্যে প্রধান বলল।

—'মানে?'

— 'আর বলবেন না দাদাবাবু,এতদিন দিব্যি চলছিল,রাণীমা আমাদের টাকাপয়সা দিয়ে সাহায্য করতেন,কিন্তু হঠাৎ এই এক হপ্তা আগে আমাদের বাড়ির ছেলেপুলেরা রোগে পড়ল।সে এক অদ্ভুত রোগ,কোনো ডাক্তার বদ্যি সে রোগ সারাতে পারল না।হঠাৎ আমি একদিন স্বপ্নে দেখলাম,অষ্টমী দিদিমণি বলছেন,আমাদের সমস্ত সত্যিটা পুলিশকে জানিয়ে দিতে,তাহলেই নাকি আমাদের ছেলেপুলেরা সুস্থ হয়ে উঠবে!আর সত্যিই,এখন আমাদের ছেলেপুলেরা একদম ঠিক আছে।আসলে পাপ করলে যে শাস্তি পেতেই হয়!'

— 'কিন্তু আরও একটা প্রশ্নের উত্তরও যে আমি পেলাম না,'তিথি বলল,'আমার ঘরের চাবিটা মায়ের গয়নার বাক্সে গেল কিভাবে?'

— 'আমিই রেখেছি,' চামেলীদেবী এবার কবুল করলেন,'তোর মৃত্যুর পরই আমরা তোর মায়ের দেওয়া অত গয়নার লোভ সামলাতে না পেরে নিতে গিয়েছিলাম সব গয়নাগুলো,কিন্তু অদ্ভুত ভাবেই ও গয়নায় আমরা কেউ হাত পর্যন্ত দিতে পারিনি,যে হাত দিত তারই শক পাওয়ার মতো অনুভূতি হত।তাই আমরা ভেবেছিলাম,ও গয়না যদি আমি না পাই তো কাউকে পেতে দেব না,তাই বাক্সটা মাটির তলায় পুঁতে দিয়েছিলাম,আর যেহেতু কেউই ওই গয়নাগুলো ছুঁতে পারত না,তাই চাবিটা ওই বাক্সে রাখাই নিরাপদ মনে করেছি।'চামেলীদেবী কাঁদতে শুরু করলেন।

— 'কিন্তু তুমি এটা জানতে না চামেলী চৌধুরী,যে গয়নাগুলো কেউই ছুঁতে পারবে না,শুধু আমি ছাড়া।তাই আমি যখন গয়নাগুলো ছুঁয়েছি,কোনো অসুবিধায় পড়িনি কিন্তু!'

 পুলিশ রাণীমা আর অবিনাশসহ লোকগুলোকে অ্যারেস্ট করে গাড়িতে তুলল।

  অন্যদিকে পুজো তখনও শেষ হয়নি,বাকি পুজোটা সারা হল।

 পরেরদিন অষ্টমী তিথি,অষ্টমী তথা তিথির জন্মদিন।ধুমধাম করে পালন করা হল জন্মদিন।

  ধীরে ধীরে কেটে গেল অষ্টমী,নবমী।এল দশমী।সিঁদুর খেলার সময় অনিন্দ্য সবার অলক্ষ্যে তিথির সিঁথি রাঙিয়ে দিল।তিথি লাজুক মুখে পুজোমন্ডপ থেকে চলে গেল নিজের ঘরে,সেই বাগানবাড়ির দোতলা ঘরে।ইতিমধ্যেই ঘরটা পরিষ্কার করে বাসযোগ্য করা হয়েছে হেমচন্দ্র বাবুর হুকুমে।

 বিসর্জনের পালা এল মায়ের।কিন্তু মৃন্ময়ী মূর্তির চোখদুটো দেখে তিথি বিস্মিত হল,কারণ মা দুর্গার চোখদুটো দেখে মনে হচ্ছিল,ওই চোখে যেন কোনো দুঃখ নেই,শুধু আনন্দ আছে,কোনো কন্যাহারা পিতাকে সব ফিরিয়ে দেওয়ার আনন্দ।

 বিসর্জন করে ফেরার সময় হঠাৎ মালতী এল তিথির সামনে।তিথি কাঁদতে কাঁদতে বলল,'সবাই ফিরল,শুধু তুমিই ফিরলে না মালতীদি!'

 — 'হুম ফিরিনি,কিন্তু ফিরব না যে তা কি বলা যায় গো দিদিমণি!যদি মা চান,হয়ত আমিও ফিরব কোনো একদিন!'

 মালতী হাঁটা দিল এক অজানা পথে।তিথি চেষ্টা করল তাকে একবার ছুঁতে,কিন্তু সে স্পর্শের অতীত।চলতে চলতে এক সময় অদৃশ্য হয়ে গেল মালতী। পড়ন্ত  রোদ এসে তখন গ্রামের রাস্তঘাট রাঙিয়ে দিচ্ছে।দীঘিটায় তখন সকলে মায়ের বিসর্জনের কাজে ব্যস্ত।ওইদিক থেকে শব্দ ভেসে  এল,'আসছে বছর আবার হবে।'

(সমাপ্ত)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ