Advertisement

স্বপ্ন আর ইচ্ছেগুলো

 


স্বপ্ন আর ইচ্ছেগুলো

সুচন্দ্রা চক্রবর্তী 


— 'বলি মিথ্যে বলার আর্টটা কোত্থেকে রপ্ত করলি জানতে পারি?'

— 'মিথ্যে?কবে মিথ্যে বললাম আমি?'

— 'আর ন্যাকা সাজিস না স্বপ্ন!পুলিশে চাকরি করি,মিথ্যে বলে আমার কাছ থেকে অন্তত পার পাবি না!'

— 'বেশ,তাহলে তুইই বল ইচ্ছে,আমি কি মিথ্যে বলেছি?'

— 'তোর কোনো বন্ধুরই পক্স হয়নি,আর তোর বাড়িরও সকলেই সুস্থ,সবই জানি আমি!'

— 'আরে ওটা আসলে...'

— 'পক্সটা কোত্থেকে বাগালি আগে বল?'

— 'আরে,সে আমি কি করে জানব?এই সময় তো কতজনেরই এটা হয়....'

— 'আমার পক্স হওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই তোর হয়েছে,স্বীকার কর না সত্যিটা!'

— 'আরে না না,তা কেন...'

_________________________

একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ :  পড়ুন

_________________________

— 'যেদিন সবাই টের পেল আমার পক্স হয়েছে,আমার মা বাপি বাড়ি ছিল না সেই সময়,কেউ আমায় নিয়ে ডক্টরের চেম্বারে যেতে রাজি হল না,কিন্তু তুইই আমায় নিয়ে গেলি।চেম্বারে ভিড় ছিল,আর আমার তখন জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছিল,মাথা ছিঁড়ে যাচ্ছিল যন্ত্রণায়,তখন তোর কোলে মাথা এলিয়ে দিয়েছিলাম আমি।তুই বাধা দিসনি,ভাবিসনি,আমার থেকে পক্সটা তোরও হতে পারে।মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলি,আর নানারকম হাসির কথা বলে আমার মুড ভালো করার চেষ্টা করছিলি।কি ভেবেছিস,আমি তখন শারীরিক ব্যথায় কুঁকড়ে ছিলাম বলে খেয়াল করিনি কিছুই?'

— 'আরে,তুই আমার বন্ধু,বন্ধুর জন্য এটুকু করব না?'

— 'চুপ কর!আমার না হাজারো বন্ধু আছে,কেউ পাড়াতুতো,কেউ ক্লাসমেট,কেউ আত্মীয়।কই কেউ তো একদিনের জন্যও দেখতে আসেনি আমায়!শুধু ফোনে খোঁজ নিয়েছে কেউ কেউ,অনেকে তো আবার তাও নেয়নি ভয়ে,পাছে আমি তাদের আমার বাড়ি আসতে বলি!শুধুই তুইই বন্ধুত্বের খাতিরে এতকিছু করলি!'

— 'আরে ওদের কথা ছাড় তো!ওরা ওদের মতো,আমি আমার মতো।দুনিয়ার সব মানুষ যে একই ছাঁচে গড়া হবেনা সেটাই তো স্বাভাবিক,আর বন্ধু হিসেবে আরেক বন্ধুর জন্য এটুকু তো করাই যায়!'

— 'ওও আচ্ছা,আর বন্ধুর নামে ফেসবুকের পাসওয়ার্ডও দেওয়া যায়,বল?'

— 'এ বাবা,এসব তোকে কে বলল?নিশ্চয়ই আমার ফাজিল বন্ধুগুলো!ওরা সারাদিন আবোলতাবোল বকে,ওদের কথায় কেন কান দিতে যাস?'

— 'আমি কথায় বিশ্বাসী নই,প্রমাণে বিশ্বাসী।'

— 'কি রকম?'

— 'এই সেদিন আমার ল্যাপটপ থেকে খুলেছিলাম তোর প্রোফাইল।'

— 'ইমপসিবল!'

— 'উঁহু,পসিবল।ইচ্ছে৯২ পাসওয়ার্ড দিতেই এক ঝটকায় খুলে গেল তোর প্রোফাইল।আমার নাম ইচ্ছে,আর জন্মসাল ১৯৯২।এরপরও কিছু বলার আছে তোর?'

— 'ওসব কোইনসিডেন্স,কতই তো ঘটে!আর সে অন্য ইচ্ছে,তুই নস!'

— 'আচ্ছা,তাই?তা কে সেই ইচ্ছে,যাকে তুই কলেজজীবন থেকে ভালোবাসিস,কিন্তু বলতে পারিসনি আজও?যার নামে প্রতিবছর ভ্যালেন্টাইনস ডে তে একটা করে লাল গোলাপ কিনে আনিস,কিন্তু দিতে পারিস না,ডাইরির ভাঁজে স্থান পায় শুকনো ফুলগুলো!'

— 'তুই আমার ডাইরিও পড়েছিস?কেন শুনি?জানিস না কারোর পার্সোনাল স্পেসে ঢুকতে নেই?'

— 'আর তুই জানিস না এভাবে মনের মানুষটাকে দিনের পর দিন মিথ্যে বলতে নেই?'

— 'মিথ্যে আমি বলিনি।'

— 'এখনো বিয়ে করিসনি কেন?'

— 'বাহ,কবে বিয়ে করব সেটাও তুই ঠিক করবি বুঝি?আর তুইও তো এস্টাব্লিশড,তুই কেন বিয়ে করিসনি?'

— 'কারণ আমি স্বপ্নদীপ সেনকে ছাড়া আর কাউকে বিয়ে করব না তাই!'

— 'ইচ্ছে,কেন পাগলামো করিস বল তো?কোন্ দিক দিয়ে আমি তোর যোগ্য বল!তুই আই.পি.এস অফিসার,আর আমি থিয়েটার করি,কিই বা আয় হয় ওতে?'

— 'ইচ্ছেকে বিয়ে করার যোগ্য সেই পুরুষই,যে ওকে অসুস্থতার রাতে মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয়,যে ওর ব্যর্থতার দিনে ওকে বুকে টেনে নিয়ে ওর কান্না মুছিয়ে দেয়,যে ওর সাফল্যের দিনে গোটা পৃথিবীর কাছে চিৎকার করে বলে,'ইচ্ছে পেরেছে!'

— 'দেখ ইচ্ছে,তুই কিন্তু ছেলেমানুষি করছিস এবার!'

— 'স্বপ্ন,তোর মনে আছে,সেই চার বছর আগের দিনগুলো?আমি তখন একটার পর একটা কমপিটিটিভ এক্সামে ব্যর্থ হচ্ছি,আর ভাঙা মন নিয়ে বাড়ি ফিরছি,সেই দিনগুলোয় তুই আমায় ফুচকা খাওয়াতিস,আইসক্রিম খাওয়াতিস,আর বলতিস,দেখিস,একদিন ঠিক তোর স্বপ্ন ধরা দেবে তোর কাছে!তারপর একদিন আমি হলাম আই.পি.এস অফিসার,গোটা পাড়া,বন্ধুমহল সবাইকে তুই ট্রিট দিলি।তুই ভুলে গেলেও আমি কিন্তু ভুলিনি জানিস দিনগুলোর কথা!এগুলো নিছক বন্ধুর জন্য করেছিস তাই না?'

— 'কিন্তু আঙ্কেল আন্টি কেন মেনে নেবেন আমায়?'

— 'স্বপ্ন,জানিস তো তুই না একটা মাথামোটা,মা বাপিকে আজও চিনলি না,এতদিন এবাড়িতে যাতায়াতের পরও!'

— 'কিন্তু সমাজ?'

— 'কোন্ সমাজের কথা বলছিস স্বপ্ন?যে সমাজ একসময় কোনো পরীক্ষায় চান্স পাইনি বলে আমায় দেখে মুচকি হাসত?বলত,এ মেয়ের দ্বারা কিছুই হবেনা?'

— 'কিন্তু ইচ্ছে....'

— 'চুপ কর,পক্স হয়েছে তোর,রেস্ট নে,অযথা বাজে বকে শরীরের এনার্জি নষ্ট করিস না।স্বপ্ন,তুই বলিস না আমাদের জীবনটা ওই থিয়েটারের মতো,কখনও আলোয় ভরা,কখনও ঘন অন্ধকারে নিমজ্জিত।সেদিন যখন আমি ব্যর্থতার অতলে তলিয়ে যাচ্ছিলাম,তুই উৎসাহ যুগিয়েছিস দিনের পর দিন,এবার যে আমার পালা।তোরও স্বপ্ন কোনো একদিন পূরণ হবে,সিনেমার পর্দার ওপারে একদিন তোকে সবাই দেখবে দেখিস।তোর অধরা স্বপ্নকে তোর হাতের মুঠোয় এনে দেবে তোর ইচ্ছে।'

— 'সত্যি বলছিস?'

— 'হুম,তবে তার আগে আমার সামনে থাকা এই স্বপ্নটিকে যে ইচ্ছের হাতের মুঠোয় আসতে হবে!'

 খিলখিল হাসিতে ঘরের নীরবতা ভেঙে খানখান হয়ে গেল।

 (সমাপ্ত)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

2 মন্তব্যসমূহ