Advertisement

কালো বিড়াল

 


কালো বিড়াল

সুচন্দ্রা চক্রবর্তী 


 — 'এতবার করে বললাম তোকে, মা গরম চা খেতে পারে না,তাও ফুটন্ত চা টা মাকে দিয়েছিস?' দেবব্রত গর্জন করে উঠল।

 — 'আমি আসলে বুঝতে পারিনি গো,'সোমাশ্রী ভয়ে কাঁপতে লাগল,'চা টা এত গরম হয়ে যাবে বুঝতে পারিনি!'

— 'কেন বুঝতে পারিসনি?কচি খুকি নাকি!' অপর্ণাদেবী বাঁকা সুরে বললেন।

— 'আর কক্ষনো এমনটা হবে না মা,ভুল হয়ে গেছে!'

— 'তা বললে তো হবে না!ভুল করেছিস যখন শাস্তি যে পেতেই হবে!'

 — 'হুম মা,উচিত শাস্তি দাও তো ওকে!'

 — 'আমায় ক্ষমা করুন মা,আর এমনটা হবে না!' ভীত সোমাশ্রী অপর্ণাদেবীর পায়ের কাছে বসে পড়ল।

 — 'আরে দূর অলক্ষী,সর তো!' বলেই গরম ধোঁয়া ওড়া চা তিনি ছুড়ে দিলেন সোমাশ্রীর দিকে।

 যন্ত্রণায় ছটফট করতে লাগল ও,তাড়তাড়ি বাথরুমে ছুটল।গরম চা লেগে কাঁধটা ভীষণ জ্বলছে।জল দিল ও পুড়ে যাওয়া জায়গাটায়,ফোস্কা পড়ে গেছে চামড়াটায়।বাথরুম থেকে ও ঘরে গিয়ে বিছানায় একটু বসেছে,অমনি দেবব্রত হাজির সেখানে।

 — 'কি ব্যাপার তোর?পটের বিবি নাকি যে পায়ের ওপর পা তুলে বসে থাকবি আর আমরা তোকে খাওয়াব?ডিনারটা কে বানাবে শুনি?'

— 'আমি যাচ্ছি,এই তো।'

— 'যাচ্ছি আবার কি,এখুনি যা!' বলেই সোমাশ্রীকে টানতে টানতে ঘরের বাইরে বের করে দিল দেবব্রত।সোমাশ্রী ছিটকে পড়ল মেঝেয়,তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে রান্নাঘরে চলে গেল।

  শ্বশুরের অনুপস্থিতিতে সোমাশ্রী এভাবেই শ্বাশুড়ি আর স্বামীর হাতে নির্যাতিত হয়।শ্বশুর খুব স্নেহ করেন সোমাকে,তাই তিনি বাড়িতে থাকলে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে সোমা।

  সোমার শ্বশুর সুদীপ্ত রায় কলকাতা থেকে বেশ কিছুটা দূরে একটা মফস্বলের কলেজের প্রফেসর।সোমা বিয়ের আগে ওই কলেজেই পড়ত।সোমা দেখতে যথেষ্ট সুন্দরী।ঘন কালো চুল,নীল চোখ,শ্যামলা রঙ,মুখে মায়াজড়ানো হাসি সব মিলিয়ে আকর্ষণীয় যাকে বলে।পড়াশুনায় ব্রিলিয়ান্ট ছিল সে,ক্লাসে ফার্স্ট হত প্রত্যেক পরীক্ষায়।সুদীপ্তবাবুর স্নেহের পাত্রী ছিল ও।ঠিক করেছিলেন,পড়াশুনা শেষ করার পর এই মেয়েকেই পুত্রবধূ করে ঘরে নিয়ে যাবেন।কিন্তু হঠাৎই সোমাশ্রীর জীবনে বিপর্যয় নেমে এল।মাকে সে অনেক ছোটবেলাতেই হারিয়ে ছিল,তারপর বাবা ই ছিল ওর সবকিছু।সোমাশ্রী যখন কলেজে ফাইনাল ইয়ার,তখনই বাবার স্ট্রোক হল।এরপর মানুষটা একেবারে বিছানায় পড়লেন।তখন সামনেই সোমাশ্রীর ফাইনাল ইয়ারের পরীক্ষা।পড়াশুনা করবে না বাবাকে দেখবে তার নেই ঠিক।সোমাশ্রীর দাদা রূপম তখন বলেছিল,'তুই পরীক্ষাটা মন দিয়ে দে,বাবাকে আমি আর তোর বৌদি দেখব।' নিশ্চিন্ত হয়ে সোমা পরীক্ষা দিয়েছিল,যথারীতি সেবারেও সোমা ফার্স্ট হল কলেজে।উচ্চশিক্ষার জন্য ও ভর্তি হল ইউনিভার্সিটিতে।কলেজ ছাড়লেও সুদীপ্তবাবুর সাথে ওর প্রায়ই কথা হত,মাঝে মাঝে পড়ায় কোনো প্রশ্ন থাকলে সুদীপ্তবাবু ওকে হেল্প করতেন।কিন্তু ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার একমাসের মধ্যেই হার্ট অ্যাটাকে ওর বাবা মারা গেলেন।আশ্চর্যভাবে বাবা মারা যাওয়ার পর ওর দাদা বৌদির ব্যবহার পুরোপুরি পালটে গেল।যে দাদা বৌদি ওকে এত ভালোবাসত তারাই ওকে বোঝা মনে করতে লাগল,উঠতে বসতে কথা শোনাতে লাগল।

 — 'দেখ সোমা,অনেক পড়েছিস,আর পড়ে কাজ নেই।তোর পড়ার খরচ চালাতে গেলে যে আমার ছেলেটাকে ভাসিয়ে দিতে হয়!'

 — 'দাদা তুই এত চিন্তা কেন করছিস!মাত্র দু বছরের ব্যাপার,তারপরেই আমি একটা চাকরি ঠিক খুঁজে নেব দেখিস!'

— 'না বাপু,দু বছরটা মোটেও মাত্র নয়।তোমার বাবা একজন মুদিওয়ালা ছিলেন,কোনো কোটিপতি না যে তোমার পড়াশুনার জন্য কোটি কোটি টাকা রেখে গেছেন!' বৌদি অনুপমা মুখ বেঁকিয়ে বলল।

  যদিও রূপম অনুপমা মুখে কিছু বলেনি,কিন্তু ওরা ওদের বাবাকে শেষ সময়ে সেবা করেছিল এই আশায়,যে বাবা সম্পত্তির বেশিরভাগটা রূপমের নামে লিখে দেবেন,কিন্তু উনি সম্পত্তি দুই ছেলেমেয়েকে সমান ভাবে ভাগ করে দিয়ে গেছেন,সেইজন্যেই রূপমদের এত বিরক্তি সোমার প্রতি।

 সোমা বুঝতে পারল,ওর পড়ার খরচ ওকে নিজেকেই চালাতে হবে,সেইজন্য ও সুদীপ্তবাবুকে ফোন করল টিউশনের জন্য।সুদীপ্তবাবু বুঝলেন,অভাবের চাপে এক ব্রিলিয়ান্ট ছাত্রীর লেখাপড়া বন্ধের মুখে,তাই উনি ঠিক করলেন সোমাকে ছেলের বৌ করে বাড়িতে আনবেন তিনি,আর বিয়ের পরেই লেখাপড়ার ব্যবস্থা  করবেন সোমার।আর সেই কারণেই একমাত্র ছেলে দেবব্রতর সাথে বিয়ে দেন সোমার।যদিও সোমার শ্যামলা রঙের জন্য দেবব্রত আর অপর্ণাদেবীর একদমই পছন্দ হয়নি সোমাকে।ওঁরা দুজন চেয়েছিলেন টুকটুকে ফরসা ছেলে দেবব্রতর বৌও তার মতোই হবে,শুধু তাই নয়,পাত্রী বড়োলোক ঘরের হবে এটাও তাদের ইচ্ছা ছিল।কিন্তু সুদীপ্তবাবুর কাছে এসব নিন্দনীয় যুক্তি একেবারেই খাটল না,তিনি সোমাকে ঘরের লক্ষ্মী হিসেবে আনলেন।সোমার দাদা বৌদিও ওর বিয়ে হয়ে যাওয়ায় হাঁপ ছেড়ে বাঁচল।

 কিন্তু শ্বশুরবাড়িতে পা দেওয়ার পরই এক অন্য দুর্বিপাকে পড়ল সোমা।শাশুড়ি আর স্বামী তাকে একদমই পছন্দ করে না,অমানবিক অত্যাচার চলে শ্বশুরের অনুপস্থিতিতে।শাশুড়ি বলেছেন,যদি বাপেরবাড়ি থেকে মোটা টাকার পণ আনতে পারে,তবেই অত্যাচারের হাত থেকে নিষ্কৃতি পাবে সে,আর ঘুণাক্ষরেও এসব কথা শ্বশুরের কানে তুললে বাড়িছাড়া করা হবে তাকে।তাই অসহায় সোমা মার খেয়েও মাটি কামড়ে পড়ে থাকে শ্বশুরবাড়িতে।অত্যাচার সইতে না পেরে একবার সে বাপের বাড়ি ফিরেওছিল,কিন্তু এসব আসলে 'সোমার টাকা আদায় করার অছিলা' বলে তাড়িয়ে দিয়েছে দাদা বৌদি।বৌদি বলেছে,'বিয়ের পর মেয়েদের আর বাপের বাড়িমুখো হতে নেই!'

 শ্বশুরবাড়ির চাপে লেখাপড়াটাও ছাড়তে হয়েছে তাকে।যদিও সুদীপ্তবাবু এসব জানেন না,ওনাকে বোঝানো হয়েছিল সোমা নিজেই আর লেখাপড়া করতে চায় না।একথা শুনে বেশ অভিমান করেছিলেন তিনি ছাত্রীর ওপর,তবুও সোমার কিছুই করার ছিল না,সে শুধু রুদ্ধদ্বারের এপারে চোখের জল ফেলত।

 অন্যদিকে দেবব্রতর অফিসে পদোন্নতি হওয়ায় ও আগে  অফিসের যে ব্রাঞ্চে যেত,এখন আর সেই ব্রাঞ্চে যায় না,অন্য এক ব্রাঞ্চে যাচ্ছে ও।এখানে সমস্ত অফিস কলিগরাই নতুন,কেউই জানেনা দেবব্রত বিবাহিত।এখানেই অন্য এক মহিলা কলিগকে ভালো লাগে দেবব্রতর।এই মেয়েটি টুকটুকে ফরসা,আর বড়ো ঘরের,যেমনটি দেবব্রত আর ওর মা চেয়েছিল।ধীরে ধীরে দেবব্রত আর মেয়েটির মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে।মেয়েটির নাম মোনা।দেবব্রত সোমার অলক্ষ্যে মোনার ছবি দেখায় অপর্ণাদেবীকে।অপর্ণাদেবীর মেয়েটিকে খুব মনে ধরে,কিন্তু ঘরে বৌ থাকা সত্ত্বেও কিভাবে আবার ছেলের বিয়ে দেবেন কিছুতেই বুঝতে পারেন না,কারণ সুদীপ্তবাবু এসব কখনোই হতে দেবেন না।অনেক ভেবে অপর্ণাদেবী এক ফন্দি আঁটেন।তিনি ডেকে পাঠান সোমাকে তাঁর ঘরে।

— 'মা আমায় ডেকেছিলেন?'

— 'হ্যাঁ।শোনো বাছা,তোমায় যে বাপের বাড়ি থেকে টাকাপয়সা আনতে বলেছিলাম জোগাড় হয়নি নিশ্চয়ই?'

— 'মা আসলে..'

— 'থাক।ওই টাকা আমাদের আর লাগবে না।তবে তার বদলে অন্য একটা জিনিস চাই।'

— 'কি জিনিস?'

— 'আমার ছেলের জন্য একটা যোগ্য মেয়ে পেয়েছি,খুব ভালো মানাবে ওদের দুজনকে।কিন্তু তুমি তো ভালো করেই জানো তুমি ডিভোর্স না দিলে এই বিয়ে সম্ভব নয়,তাই ডিভোর্সটা দিয়ে দাও,আর দেবুর বাবাকে তুমি বোঝাও যে তুমিই ওকে ডিভোর্স দিচ্ছ,ও তোমায় দিচ্ছে না,কেমন?'

 এতদিন ধরে বহু অত্যাচার সহ্য করে এসেছে ও,কিন্তু এই অন্যায়টা ও কিছুতেই মেনে নিল না।বলল,'না মা,এতদিন অনেক অন্যায় আমি সহ্য করেছি,কিন্তু সহ্য করতে করতে আজ আমাকে আপনারা একেবারে খাদের পাশে এনে দাঁড় করিয়েছেন।বাবাকে অনেক মিথ্যে বলতে বাধ্য করেছেন আপনারা,কিন্তু আর নয়!আমি আজই বাবাকে সবটা বলব!'

 সোমার এমন জেদ দেখে মাথায় আগুন চড়ে গেল অপর্ণাদেবীর।তিনি ছেলের সাথে শলা পরামর্শ করতে লাগলেন,যে মেয়েটাকে রাস্তা থেকে সরিয়ে দিতে হবে।তাই একদিন রাতে সোমার খাবারে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দিলেন অপর্ণারা।সুদীপ্তবাবু তখন এক সেমিনারের জন্য বাড়ি থেকে অনেক দূরে।খাবারটা খাওয়ার পরেই কেমন যেন ঝিমিয়ে পড়ল ও।এই সু্যোগের জন্যই অপেক্ষা করছিল মা ছেলে।ও অঘোরে ঘুমিয়ে পড়তেই ওর হাত পা মুখ বেঁধে ওকে দুজন মিলে ফেলে দিয়ে এলেন বাড়ি থেকে বেশ অনেকটা দূরে এক স্টেশনের রেললাইনে।দ্রুতগামী ট্রেন এসে ছিন্নভিন্ন করে দিল সোমাশ্রীর দেহ।অপর্ণার এক মাসতুতো ভাই রিজু পুলিশে চাকরি করে,তাই কেসটা খুব সহজেই আত্মহত্যা বলে চালানো হল।যদিও বিষন্ন সুদীপ্তবাবু জিজ্ঞেস করেছিলেন মা ছেলেকে,যে ওরা থাকতেও কেন সোমা আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিল,কিন্তু রিজুবাবু সহজেই সোমাকে মানসিক রুগী সাজালেন,আর সবটাই ধামাচাপা পড়ে গেল।

  সোমার মৃত্যুর দেড় বছরের মাথায় বিয়ে হল দেবব্রত-মোনার।যদিও মোনাকে বোঝানো হল,সোমা ছিল মানসিক রুগী,ও শান্তিতে বাঁচতে দিত না দেবব্রতকে তাই একটু শান্তির খোঁজে সে গিয়েছিল মোনার কাছে।

 বেশ নির্বিঘ্নেই কাটছিল রায়বাড়ির দিনগুলো।মোনাকে যথেষ্ট আদরেই রেখেছিলেন অপর্ণাদেবী আর দেবব্রত।মোনা বিড়াল ভালোবাসে ভীষণ,বিশেষত কালো বিড়ালের ওপর ওর অদ্ভুত টান আছে।একদিন যখন মোনা আর দেবব্রত বেড়াতে বেরিয়েছিল অফিসে ছুটির পর,রেললাইনের কাছে একটা কালো বিড়াল ঘুরে বেড়াতে দেখল ওরা।মোনার বিড়ালটাকে দেখে বড্ড ভালো লাগল।কি অপরূপ সৌন্দর্য্য তার।গোটা গায়ে কালো চকচকে লোম,আর নীল দুখানি চোখ।মোনা ওকে কোলে তুলে নিয়ে বলল,'দেবব্রত,আমি ওকে বাড়ি নিয়ে যাব।' দেবব্রত ওর কথায় বিশেষ আপত্তি করল না।

 কালো বিড়াল দেখে প্রথমে কিছুটা আপত্তি করলেও মোনার অনুরোধ ফেলতে পারলেন না অপর্ণাদেবী।বিড়ালটার ঠাঁই হল রায়বাড়িতে।মোনা ভালোবেসে ওর নাম রাখল সুমি।

 বিড়ালটা সুদীপ্তবাবুর বড়ো ন্যাওটা হয়েছে।সুদীপ্তবাবুরও কেমন যেন মায়া পড়ে গেছে বিড়ালটার ওপর।মোনার থেকেও সুদীপ্তবাবুর কাছেই ও বেশি থাকে।অপর্ণাদেবী আর দেবব্রত ওকে আদর করতে চাইলে ও দূরে সরে যায়,কোলেও উঠতে চায় না।মোনা হেসে বলে,'সুমিটার আমি আর বাবা ছাড়া কাউকেই পছন্দ নয় দেখছি!'

  একদিন শীতের দুপুরে অপর্ণাদেবী ছাদে বসে রোদ পোহাচ্ছেন,হঠাৎ গুটি গুটি পায়ে বিড়ালটাও সেখানে এসে হাজির।ওর মুখে কি যেন একটা রয়েছে।ওর মুখে কি আছে দেখার জন্য অপর্ণাদেবী এগিয়ে গিয়ে দেখলেন,সোমাশ্রীর একটা ছবি ও মুখে নিয়ে ঘুরছে।ছবিটা কেড়ে নেওয়ার জন্য যেই অপর্ণাদেবী ওকে স্পর্শ করতে গেলেন,অমনি বিড়ালটা অপর্ণাদেবীর হাতে আঁচড়ে দিল,রক্ত পড়তে লাগল ওঁর হাত থেকে।অপর্ণাদেবী যথেষ্ট রাগান্বিত হলেন,ক্ষিপ্ত হয়ে বিড়ালটাকে তুলে ছুড়ে ফেলতে যাচ্ছিলেন,হঠাৎই মোনা সেখানে হাজির।

 — 'মা,এ আপনি কি করছেন?আমার সুমিকে আছাড় মারতে যাচ্ছেন!' অপর্ণাদেবীর কোল থেকে সুমিয়ে ছিনিয়ে নিল মোনা।

 — 'তোমার বিড়ালটা বড্ড অসভ্য মা,ধরতে গেলেই কেমন আঁচড়ে কামড়ে দেয়!'

— 'একদমই না।কই আমায় তো কোনোদিনও আঁচড়ায় নি ও!আসলে ওরাও ভালোবাসা বোঝে,ওকে মন থেকে ভালোবাসুন,দেখবেন ও ও আপনাকে অ্যাক্সেপ্ট করবে।'

 মোনার কোলে থাকা সুমি তখন মায়াময় চোখ দুটো মেলে অপর্ণাদেবীকে দেখছিল।এই নীল চোখদুটো বড্ড চেনা চেনা লাগল অপর্ণাদেবীর।

 — 'শোন দেবু,ওই বিড়ালটাকে মোনার অলক্ষ্যে বাড়ির বাইরে রেখে আয়!'

— 'কেন মা?ও আবার কি করল?'

— 'না বাপু,ওর ওই নীল চোখদুটো দেখলেই কেমন যেন ওই অলক্ষ্মীটার কথা মনে পড়ে!'

— 'উফ মা,কি পাগলের মতো বকছ!'

 — 'নারে,আমি সত্যি বলছি!'

— 'ধুর,যত অযৌক্তিক কথাবার্তা!' দেবব্রত বিরক্ত হয়ে চলে গেল।

 অপর্ণাদেবী বুঝলেন,ছেলে তার কথা বিশ্বাস করছে না,তাই তিনি নিজেই অলুক্ষুণে বিড়ালটাকে বাড়ির বাইরে ফেলে দিয়ে আসবেন।সেই মতো একদিন রাতে সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়েছে,অপর্ণাদেবী চুপিচুপি বিড়ালটাকে মোনার ঘর থেকে নিয়ে বেরিয়ে এলেন।বিড়ালটা গভীর ঘুমে মগ্ন,অপর্ণাদেবীর কোলে উঠেও ঘুম ভাঙেনি ওর।

 'হুহ,ঘুমুচ্ছে দেখো!যেন কতকাল ঘুমোয়নি!' নিজের মনেই বিড়বিড় করে সুমিকে কোলে নিয়ে অপর্ণাদেবী সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামতে লাগলেন।হঠাৎই ঘটে গেল এক দুর্ঘটনা।সিঁড়িতে পা পিছলে পড়ে গেলেন অপর্ণাদেবী।মাথায় গুরুতর চোট নিয়ে তিনি হসপিটালে ভর্তি হলেন।

  ডাক্তারবাবু কয়েকটা ওষুধ লিখে দিয়ে ইমিডিয়েটলি কিনে আনতে বললেন।

 — 'আমি কিনে আনছি ডক্টর,আপনি শুধু দেখুন মা যেন সুস্থ হয়ে যান!' উদগ্রীব গলায় দেবব্রত বলল।

— 'তার জন্য ইমিডিয়েটলি ওষুধগুলো দরকার দেবব্রতবাবু।ওষুধগুলো কয়েকঘন্টার মধ্যে না আনতে পারলে ওনাকে বাঁচানো অসম্ভব।'

— 'আচ্ছা ডক্টর,আমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আনছি,' বলেই প্রেসক্রিপশনটা ডাক্তারবাবুর কাছ থেকে নিয়ে হাসপাতালের বাইরে এল দেবব্রত। হঠাৎই এক দমকা হাওয়ায় প্রেসক্রিপশনটা দেবব্রতর হাত থেকে উড়ে মেঝেতে পড়ে গেল।দেবব্রত ওটা তুলতে গেল,কিন্তু হঠাৎই কোত্থেকে সুমি এসে প্রেসক্রিপশনটা মুখে নিয়ে ছুটতে শুরু করল।দেবব্রত অসহায়ের মতো ছুটতে লাগল বিড়ালটার পিছনে।ও পাগলের মতো খালি সুমির পিছনে ছুটছে,রাস্তাঘাটের গাড়ি খেয়াল করছে না।বহু রাস্তা,মাঠ পেরিয়ে সুমিকে ফলো করতে করতে দেবব্রত একটা স্টেশনে পৌঁছল।এরপরই সুমি হঠাৎ প্রেসক্রিপশনটা মুখে নিয়ে রেললাইনে ঝাঁপ দিল।আগুপিছু না ভেবে দেবব্রতও অনুসরণ করল ওকে,একটা ট্রেন আসছিল সেটা খেয়াল করেনি ও।ট্রেনের চাকায় পিষ্ট হল দেবব্রত,শরীরটা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল।অন্যদিকে সময় মত ওষুধ নিয়ে আসতে না পারার জন্য অপর্ণাদেবীও মৃত্যুবরণ করলেন হাসপাতালের বেডে।সেই রাতেই কিছু দুষ্কৃতির গুলিতে মৃত্যু হল থানাফেরত অপর্ণাদেবীর সেই ভাই রিজুবাবুর।অদ্ভুতভাবে ওদের মৃত্যুর পর বিড়ালটাও নিখোঁজ হয়ে গেল,কোথাও ওর চিহ্ন পাওয়া যায়নি।বিড়ালটা মোনা আর সুদীপ্তবাবুর খুব কাছের ছিল,তাই ওঁরা দুজনে কম কসরত করেননি ওকে খুঁজে বের করার জন্য,কিন্তু ওই নীল মায়াময় চোখের কালো বিড়ালটা যেন কর্পূরের মতোই মিলিয়ে গেছে এক অদৃশ্য জগতে।

(সমাপ্ত)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

2 মন্তব্যসমূহ