চেনা অচেনা
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
ষষ্ঠ পর্ব(অন্তিম পর্ব)
পরের সপ্তাহের শুক্রবার কলকাতায় এসে পৌঁছলেন রুমিতারা সপরিবারে।রুমিতা,তাঁর স্বামী ঈশান,এবং তাঁদের একমাত্র ছেলে দীপমাল্য।
— 'ওগো শুনছ!দিয়া কোথায় তুই?শুনে যা!' তুলিকা ভীষণ উৎসাহে সকলকে ডাকাডাকি করতে শুরু করলেন।
— 'কি হল এত হাঁকডাক কেন?'দিয়ার বাবা অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন।
— 'বাহ,হাঁকডাক করব না?'
— 'কই মা,ডাকছিলে?'
— 'হ্যাঁ রে হ্যাঁ,রুমিতারা আজ দুপুরে কলকাতায় পৌঁছেছে।আমরা কালই সন্ধ্যেয় ওদের বাড়ি যাব।'
— 'কালই?'
— 'হ্যাঁ কালই,দিয়া,তুমি কিন্তু আমায় কথা দিয়েছিলে আমার সব কথা তুমি শুনবে।'
— 'আচ্ছা মা,তাই হবে।'
— 'এই তো লক্ষ্মী মেয়ের মতো কথা,' তুলিকা দিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,'শোন মা,অনেক কাজকর্ম হয়েছে।কাল সন্ধ্যেবেলায় ওদের বাড়ি যেতে হবে,একটু সাজগোজ কর দিকি এবার!'
— 'উফ,মা তুমি না!আচ্ছা বেশ,আমি কাল সাজগোজ করেই যাব,এবার খুশি?'
— 'একদম।যা এখন ঘরে গিয়ে রেস্ট নে,আবার ল্যাপটপ নিয়ে বসিস না যেন।'
— 'ওকে মাদার ইন্ডিয়া।'
দিয়া হাসতে হাসতে নিজের ঘরে চলে গেল।এতদিন পর দিয়াকে হাসতে দেখে আশ্বস্ত হলেন দিয়ার মা বাবা।
পরের দিন সকাল থেকেই তুলিকার ব্যস্ততার শেষ নেই।আলমারি চষে সমস্ত শাড়ি বের করে ফেলেছেন,তবু কোনো শাড়িই পছন্দ হচ্ছে না তাঁর মেয়ের জন্য।
— 'উফ,মা,সবকটা শাড়িই তো যথেষ্ট সুন্দর,যে কোনো একটা পরে গেলেই হবে।'
— 'না হবে না!কোন্ শাড়িতে নিজেকে মানায় সেটাও তো জানিস না,খালি আকারেই বড় হয়েছিস!'
— 'মা শোনো,ওই দীপ না কি যেন নাম,ওর যদি আমায় ভালো লাগার হয় আমায় সাধারণ রূপে দেখেই তার পছন্দ হবে,আর যদি না হওয়ার হয় তাহলে সোনার শাড়ি পরিয়েও কোনো লাভের লাভ হবে না,বুঝলে?'
— 'হ্যাঁ একথাটা অবশ্য তুই ভুল বলিসনি।'
— 'হুম,তুহিনের পছন্দ ছিল নীল,আবীরের কালো।ওদের পছন্দের ড্রেস পরেও কিন্তু ওদের মন জয় আমি করতে পারিনি,কাজেই আমি আজ খুব সাধারণ একটা শাড়ি পরেই যাব,আর সাজগোজ আর পাঁচটা দিনের মতোই করব।'
— 'তোর যুক্তিতে ভুল নেই মা,আচ্ছা বেশ তাহলে তাই হোক।'
সন্ধ্যে হতেই দীপমাল্যদের বাড়িতে কলিংবেলের শব্দ হল।দিয়ার মা বাবা খুবই উচ্ছ্বসিত।কিন্তু দিয়ার মুখে হাসি নেই,সে আর পাঁচটা দিনের মতোই সাধারণ সাজে এসেছে।তার বারবার সেই সন্ধ্যেটার কথা মনে পড়ে যাচ্ছে,যেদিন নিজেকে কালো পোশাকে মুড়ে একজনের দরজায় কলিং বেল বাজিয়েছিল,কিন্তু দরজার ওপারের মানুষটা তার মনটাকে কাগজের মতোই মুচড়ে ফেলে দিয়েছিল।মনে পড়ছিল সেই সন্ধ্যেটার কথাও,যেদিন সে নীল শাড়ি পরেছিল,আর পাশের জন তাকে পশুর মতোই অপমান করেছিল।তাই দিয়া নির্বিকার মুখে দাঁড়িয়ে ছিল।
রুমিতা এসে দরজাটা খুললেন,'আরে আরে,এসো এসো ভেতরে এসো।কই গো শুনছ,দ্যাখো কারা এসেছেন!'
রুমিতা ওদের ডাইনিং এর সোফাটায় বসতে বললেন,'তোমরা কি খাবে বলো?চা?না কফি?'
ঈশান এসে বসলেন রুমিতার পাশে।
— 'আমরা তো চা,তবে দিয়াটা কফি ভালোবাসে।'
— 'আচ্ছা,বেশ,সুবীর,শোনো তো একবার এদিকে!'হাঁক দিতেই একজন এসে হাজির,'আজ্ঞে ম্যাডাম!'
— 'দুটো চা,আর একটা কফি নিয়ে এসো তো!'
— 'যে আজ্ঞে ম্যাডাম।' সুবীর চলে গেল।
রুমিতারা অবস্থাপন্ন মানুষ,রাজপ্রাসাদের মতো বাড়ি,গাড়ি,আর বাড়িতে প্রচুর কাজের লোকজন।
— 'তারপর দিয়ামা,কেমন চলছে তোমার?'
— 'এই তো ভালোই,আপনারা কেমন আছেন আন্টি?'
— 'আপনারা!'অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন রুমিতা,'এই তুলি,তোর মেয়ে আমাদের আপনি বলছে?আরে,তুমি বলো তুমি,আমি তো তোমার মায়ের ক্লাসমেট ছিলাম!'
— 'ও একটা পাগল,কাকে যে কি বলে!'বলেই দিয়াকে আলতো ধাক্কা দিলেন তুলিকা,'দিয়া তোমার মন কোন্ দিকে?আর এত গম্ভীর কেন এত?হাসতে কি কষ্ট হয়?'
মায়ের বকুনি খেয়ে দিয়া কৃত্রিম হাসি হাসল।
— 'আহা অত বকিস না তো তুলি,তোর মেয়ে যথেষ্ট মিষ্টি।'
— 'মিষ্টি না ছাই,তুই তো জানিস না রুমি তাই বলছিস!'
— 'হ্যাঁ হ্যাঁ খুব জানি,তুই থাম তো!তা দিয়ামা তুমি এত চুপচাপ কেন?তোমার যা জিজ্ঞাস্য আছে বলো,কোনো সংকোচের দরকার নেই,এটা তোমারও বাড়ি।'
— 'আন্টি,আমি আসলে দীপমাল্য বাবুর সাথে একটু কথা বলতে চাই।'
— 'আরে এই কথাটা বলতে এত ইতস্তত করছ,'রুমিতা হেসে উঠলেন।ইতিমধ্যে দীপমাল্যর বাবা ঈশানও সেখানে এসে সকলের সাথে গল্প জুড়েছেন।তিনি দোতলার একটি ঘরের দিকে ইশারা করে বললেন,'ওই ঘরে দীপ আছে,যাও মা,দুজনের যত ইচ্ছা কথা বলে এসো।'
— 'একদমই তাই,'রুমিতা বললেন,'বিয়ের পর একসাথে সারাটাজীবন কাটাবে,দুজনের দুজনকে খুব ভালোভাবে চেনা দরকার।
দিয়া দীপমাল্যর ঘরের দরজায় নক করল।
— 'দিয়া,আসুন।'
দরজাটা ভেজানো ছিল।দিয়া ঠেলে ভেতরে ঢুকল।চেয়ারে বসে একটা ম্যাগাজিনে মুখ গুঁজেছিল দীপ।দিয়া ঘরে আসতেই ম্যাগাজিন থেকে মুখ তুলল সে।
কিন্তু দীপকে দেখেই দিয়ার বড্ড চেনা চেনা লাগল,কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারল না কোথায় দেখেছে!এদিকে নামটাও খুব চেনা।
— 'যদি কিছু মনে না করেন,একটা প্রশ্ন করি আপনাকে?'
— 'অবশ্যই,নো হেজিটেশন।'
— 'আপনার নাম শুনেই কেমন যেন চেনা চেনা লাগছিল,এখন আপনাকে দেখেও কেমন চেনা চেনা লাগছে,মনে হচ্ছে আগে দেখেছি,কোথায় দেখেছি বলুন তো?'
— 'আপনি আমায় চেনেন না?'
— ' না মানে,চেনা চেনা লাগছে,কিন্তু মনে করতে পারছি না...'
— 'ক্রিকেটে ইন্টারেস্ট কম আপনার,তাই তো?'
— 'একদম ঠিক ধরেছেন।আমি স্পোর্টসের ব্যাপারে একদমই ইন্টারেস্টেড নই,তবে বাবা অবশ্য ক্রিকেট ভালোবাসে।বাই দ্য ওয়ে,আপনি কিভাবে জানলেন আমি ক্রিকেট ভালোবাসি না?মা বলেছে তাই না?'
দীপ হাসিমুখে ঘাড় নাড়ল,'আন্টি কিচ্ছু বলেননি।আপনি ক্রিকেট যদি ভালোবাসতেন তবে আমায় চিনতেন।'
— 'কিভাবে?আমি ঠিক বুঝতে পারছি না!'
— 'আমি বেশ কয়েকবছর ইন্ডিয়ান ক্রিকেট টিমে খেলেছি,বোলার ছিলাম।আমার যখন উনিশ বছর বয়স তখনই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলতে শুরু করি।জানেন,চব্বিশ-পঁচিশ বছর পর্যন্ত সকলে দীপমাল্য নন্দীকে টিমের অন্যতম সম্ভাবনাময় বোলার হিসেবে দেখত।তাবড় তাবড় ব্যাটসম্যানরাও আমার বলের সামনে বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারত না।সব কাগজের খেলার খবরের প্রথম পাতাতেই আমার ছবি বেরোতো,তারপর,অনেক ঘটনা,তুখোড় বোলার দীপমাল্য পরিণত হল এক দুর্বল প্লেয়ারে,বল হতে থাকল লক্ষ্যহীন।আস্তে আস্তে টিম আমায় দূরে সরিয়ে দিল।ব্যস,এই আর কি।'
— 'ও আচ্ছা,আচ্ছা,বোলার দীপমাল্য নন্দী!বাবার মুখে আপনার নাম শুনেছি,বাবা ই আপনার ছবি কাগজে বেরোলে আমায় এনে দেখাতো,তাই আপনাকে এত চেনা লাগছিল!কিন্তু আমার ক্রিকেট কেন,কোনো খেলার প্রতিই সেরকম আগ্রহ নেই,তাই আমি আপনার নাম ছবি দেখে থাকলেও মনে রাখিনি।'
— 'ওও আচ্ছা।'
— 'আই অ্যাম সো সরি দীপবাবু,আপনার মতো এত বড় একজন মানুষ,আর আমি বোকার মতো...'
— 'ছি ছি,নিজেকে বোকা বলছেন কেন দিয়া?ক্রিকেট সকলের পছন্দ নাই হতে পারে,সকলের পছন্দ কি সমান হয়?'
— 'কিন্তু আপনি একটু আগে যেটা বলছিলেন,যে চব্বিশ পঁচিশ বছর পর্যন্ত খেলেছিলেন,কিন্তু তারপর অনেক দিন খেলার জগৎ থেকে দূরে আছেন...'
— 'বলব দিয়া,সবই বলব।আপনার কাছে কিছু লুকোতে চাই না।আমি ছোট থেকেই পড়াশুনায় খুব একটা মনোযোগী ছিলাম না,সময় সুযোগ পেলেই মাঠে চলে যেতাম,তারপর সেখানে গিয়ে কখনও ফুটবল,কখনও ক্রিকেট।আমার মা বাবা যথেষ্ট সাপোর্টিভ ছিলেন চিরকালই,তাঁরা বুঝেছিলেন পড়াশুনা নয়,খেলাধূলাই আমার উন্নতির রাস্তা হবে।তাই নানা জায়গায় ক্রিকেটের কোচিং সেন্টারে ভর্তিও করিয়েছিলেন।তারপর অনেক লড়াই,পরীক্ষা পেরিয়ে আমি আমার স্বপ্নের নাগাল পেলাম।চান্স পেলাম ইন্ডিয়ান ক্রিকেট টিমে ফাস্ট বোলার হিসেবে,তখন আমার বয়স উনিশ বছর।জানেন দিয়া,শুরু থেকেই আমার পারফরমেন্স সকলের মন কেড়েছিল,সকলে আশাবাদী ছিল আমায় নিয়ে।আর আমিও আশা পূরণ করতে পেরেছি সকলের আশীর্বাদে।একটা সময় এমন ছিল,যে এক একটা ওয়ান ডে ম্যাচে আমি নিজেই পাঁচটা উইকেট নিয়েছি।তখন চারিদিকে শুধু দীপমাল্য আর দীপমাল্য।কাগজের পাতায় পাতায়,টিভির চ্যানেলে চ্যানেলে আমার খবর থাকত।আমার বয়স যখন তেইশ বছর,তখন আমার জীবনে একটি মেয়ে আসে।তার নাম মুস্কান আগরওয়াল।ওর চোখ দুটো পাগল করে দিত আমায়,ও আসার পর যেন আমার কেরিয়ারে আরও উন্নতি হতে শুরু করল,আমি মাঠে আরও অ্যাগ্রেসিভ হয়ে উঠলাম।মা বাবাও যথেষ্ট ভালোবাসতেন ওকে।মুস্কান তখন কলেজে সেকেন্ড ইয়ার।দুই পরিবার মিলে ঠিক করলেন,মুস্কান কলেজ পাস করলেই চার হাত এক করা হবে।
তারপর যথারীতি মুস্কান কলেজ পাস করল,তখন আমার বয়স পঁচিশের কাছাকাছি।ঠিক করা হল এবার রীতিমতো ধুমধাম করে বিয়ে দেওয়া হবে।খবরের কাগজে আমাদের বিয়ের খবরটা ঘটা করে ছাপা হল।কিন্তু এনগেজমেন্টের দিন আমার,আর আমার পরিবারের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল।মুস্কান নিখোঁজ হয়ে গেল হঠাৎ।কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না।পরে জানা গেল,আমার ভালোবাসার মানুষটি আর আমায় নয়,আমাদের ইন্ডিয়ান ক্রিকেট টিমের ক্যাপ্টেন সুনীত চোপড়াকে ভালোবাসে,তাই তাকেই সে বিয়ে করবে,আমায় নয়।'
— 'সে কি!আমি মুস্কান চোপড়ার নামও শুনেছি,সে তাহলে...'
— 'হুম।আসলে ও সুনীতের বড়ো ফ্যান।তাই সুনীতকে পাওয়ার জন্য আমায় সেতু হিসেবে ইউজ করেছিল মাত্র।এছাড়াও সুনীত টিমের ক্যাপ্টেন... '
— 'বুঝেছি দীপ,তারপর?'
— 'তারপর আর কি,আমি মানসিক দিক থেকে বিপর্যস্ত হয়ে পড়লাম,এক এক সময় তো মনে হত নিজেকেই শেষ করে দিই।যে মানুষের জীবনে ভালোবাসাই নেই,তার নাম খ্যাতি অর্থে আর কি যায় আসে!আমার পারফরমেন্স খুব খারাপ হতে শুরু করল এরপর।এমনকি সুনীতও আমায় নিয়ে মুচকি মুচকি হাসত,আমার মুস্কানও সুনীতের কাঁধে মাথা রেখে আমায় নিয়ে ব্যঙ্গ করত।' দীর্ঘশ্বাস ফেলে দীপ,'পর পর কেবল নো বল,ফুলটস বল,যে বোলারের সামনে তাবড় ব্যাটসম্যানরাও সমঝে খেলত,সেই বোলারকে আর কেউ গ্রাহ্যই করত না একসময়।ম্যাচের বেশিরভাগ বাউন্ডারি,ওভার বাউন্ডারি আমার বলেই হতে লাগল।ফিল্ডার হিসেবেও আমার পারফরমেন্স খারাপ হতে শুরু করল,একের পর এক সহজ ক্যাচ ফেলেছি হাত থেকে।এরপর কে আর আমায় টিমে রাখবে বলুন?'একবুক হতাশা নিয়ে দীপ বিছানায় বসে পড়ে।
— 'আপনি একটু জল খান,গলা শুকিয়ে গেছে আপনার,'দিয়া জলের গ্লাসটা এগিয়ে দিল দীপের দিকে।অবাক হয়ে ভাবল,সে নিজে প্রকৃত ভালোবাসার কাঙাল,অথচ মুস্কান ভালোবাসা পেয়েও হেলায় হারিয়েছে।অজান্তেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে দিয়া।
— 'জানেন দিয়া,'জল খেয়ে দীপ আবার বলতে শুরু করে,'সেই পঁচিশ বছর বয়সে ক্রিকেট দুনিয়া আমায় দূরে সরিয়ে দিয়েছে।যদিও শুধু আমার বিফলতাই একমাত্র কারণ নয়,সুনীতও পার্সোনালি আমায় পছন্দ করত না,কারণটা নিশ্চয়ই আপনি বুঝতে পারছেন...'
— 'হুম পারছি,কারণটা হল মুস্কান।'
— 'এক্স্যাক্টলি!'দীপ একটু থেমে বলতে শুরু করে,'তারপর আজ আমার ঊনত্রিশ বছর বয়স,চারটে বছর মাঠ থেকে দূরে ঘরের কোণায় বসে আছি।আর মিডিয়ার কথা তো ছেড়েই দিন,ওদের মধ্যে বেশিরভাগই রসিয়ে রসিয়ে আমায় প্রশ্ন করত মুস্কানের ব্যাপারে,কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দিত,নিজেদের মনগড়া গল্প লিখত রংচং মাখিয়ে,যে যত আমার ব্যর্থতার খবর শোনাতে পারবে রসগ্রাহী করে,তার চ্যানেলের তত টি আর পি।বিশ্বাস করুন দমবন্ধ হয়ে আসত আমার,কতবার যে সুইসাইড অ্যাটেম্পট করেছি আপনি ভাবতে পারবেন না,নেহাত মা বাবার জন্যই বেঁচে গিয়েছি বারবার।'
— 'আপনার সব কথাই শুনলাম দীপ।শুধু এটাই বলব,আপনি মনটাকে আরও শক্ত করতে শিখুন,কারণ মনে রাখবেন নরম মাটিতে সবাই আঘাত করে বেশি।আপনার মতো মন আমারও ভেঙেছে,কিন্তু সেই কষ্ট আমার মনকে নরম করেনি,বরং করেছে ইঁটের মতো শক্ত।এতটাই শক্ত যে,কেউ দাঁত বসাতে পারবে না দিয়ার এই মনটাতে।'
— 'আপনারও মন ভেঙেছিল?আমারই মতো?'
— 'না,ঠিক আপনার মতো নয়,একটু অন্যরকম,'দিয়া নিজের জীবনের যাবতীয় বৃত্তান্ত প্রকাশ করে দীপের কাছে,'জানেন দীপ,এই জ্বালাগুলো আমায় দুর্বল করতে পারেনি,বরং করেছে বেপরোয়া,অপ্রতিরোধ্য।সেদিনের অলস ঘুমকাতুরে মেয়েটার আজ মুম্বাই থেকে ডাক এসেছে,ভাবতে পারেন?'
— 'সবটা শুনলাম দিয়া,আপনি খুব স্ট্রং একজন মানুষ।খুব ভালো,এই জেদটা রাখুন,এই জেদই একদিন আপনাকে উন্নতির শিখরে নিয়ে যাবে দেখবেন।সকলে আপনার মতো এত স্ট্রং হয়না।'
— 'এখানেই তো ভুলটা করলেন দীপ,শুধু আমি না,প্রত্যেকটি মানুষের মধ্যেই এই জেদ,ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস আছে,কিন্তু সুপ্ত আছে।আপনার মধ্যেও আছে।শুধু ভেতরের সিংহটাকে জাগাতে হবে।কে বলতে পারে,হয়ত আপনি আগের দীপমাল্য নন্দীর চেয়েও বেশি ভালো পারফর্ম করতে পারবেন,হতে পারবেন বিশ্বের প্রথম দিকের একজন বোলার।'
— 'আপনি সত্যি বলছেন দিয়া?আমি পারব?সত্যি পারব আমি ঘুরে দাঁড়াতে?'
— 'পারবেন দীপ,পারতে যে আপনাকে হবেই।সুনীত,মুস্কানকে যোগ্য জবাব দিতে হবে না?'
এরপর কেটে গেছে প্রায় এক বছর।দিয়া এখন কাজের সূত্রে মুম্বাইতে থাকে,আর দীপমাল্যরাও কলকাতা থেকে ফিরে এসেছে মুম্বাইতে।সামনের মাসে দীপের সাথে দিয়ার বিয়ে।দিয়া আর দীপ দুজনেই দুজনকে পেয়ে আগের মতো হাসিখুশি প্রাণবন্ত মানুষ হয়ে গেছে,কিন্তু ওদের জেদ,লড়াকু মানসিকতা,হার না মেনে অদম্য উৎসাহে এগিয়ে চলার শক্তি আছে অফুরান।দিয়ার উৎসাহে আবার বল হাতে নিয়েছে দীপ।দিনরাত অভ্যাস করে সে,ঠিক যেন চার-পাঁচ বছর আগের দীপ।
এগিয়ে আসে শুভদিনটি।আলোকোজ্জ্বল সন্ধ্যেয় দিয়াকে নিজের হাতে সাজাচ্ছিলেন তার মা তুলিকা।সাজাতে সাজাতে বললেন,'তোকে অনেক কঠিন কথা বলেছি মা বিয়েতে রাজি করানোর জন্য,অলক্ষ্মী বলেছি,আত্মহত্যার অভিনয় করেছি।'
— 'অভিনয়?'
— 'হ্যাঁ রে,প্রতি পদক্ষেপে তোর প্রতি কঠোর ব্যবহার থেকে শুরু করে সেদিন রাতে ঘুমের ওষুধ খেতে যাওয়া সবটাই আমার অভিনয় ছিল।আসলে তখন তুই এতটাই শক্ত মানুষ হয়ে গিয়েছিলি যে ওরকম আচরণ করা ছাড়া তোকে বিয়েতে রাজি করানোর কোনো উপায় ছিল না।তোর মুখে সারাজীবনের জন্য হাসি দেখার জন্য ক্ষণিকের জন্য যদি কষ্ট দিয়ে থাকি তোকে,মা হিসেবে খুব কি অন্যায় করেছি বল্?'
— 'না মা,তুমি কোনো ভুল করোনি।তখন তুমি যদি কঠিন না হতে,তবে কি আজ আমার জীবনে আজকের দিনটা আসত?কিন্তু মা আমার একটা প্রশ্ন এখনো আছে..'
— ' কি বল?'
— 'রুমিতামাসি তোমার ক্লাসমেট ছিল,তার ছেলে একজন এত নামী খেলোয়াড়,সেটা তুমি জানতে না আগে?'
— 'না রে মা,আমাদের দুই বান্ধবীর বিয়ের পরেই আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই একে অপরের কাছ থেকে,এমনকি রুমির ফোন নাম্বারটাও বদলে যায়,আগের ফোনে ওকে পাইনি আর,তাই ওর ছেলের নামটা অব্দি জানতাম না,আসলে কি বলতো,বিয়ের পর মেয়েদের পুরোনো জীবনটা অনেক দূরে সরে যায়!'
— 'কিন্তু মা,সোশ্যাল মিডিয়া আছে তো!'
— 'ধুস,'তুলিকা হেসে বললেন,'আমরা পুরোনো দিনের মানুষ,ওসব ব্যবহার করতে জানিনা।আসলে রুমি তো বিয়ের পরই কলকাতা ছেড়ে মুম্বাই পাড়ি দিয়েছিল,তাই হাজার জিনিসের ভিড়ে আমার নম্বরটা হারিয়ে গিয়েছিল,আর ওরও নম্বর বদলে গিয়েছিল।এরপর কোনোভাবে আমার নম্বরটা ও জোগাড় করেছিল,আর তারপরই ফোন করেছিল আমায়।ও বুঝেছিল,হতাশ দীপের জীবনে একটা আলো নিয়ে আসা মানুষের বড্ড দরকার।'
বিয়েটা ধুমধাম করে হয়ে গেল।বহু লড়াই,পরিশ্রমের পথ পেরিয়ে দীপ আবার ফিরে এল ইন্ডিয়ান ক্রিকেট টিমে।এ যেন চার-পাঁচ বছর আগের দীপমাল্যর চেয়েও বেশি আগ্রাসী।
এরপর চলে এল দীপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার দিন।দিয়াও এসেছে ওর সঙ্গে।যদিও দীপের যেসব দিন ম্যাচ থাকে,শত কাজ থাকলেও দিয়া ঠিক ম্যানেজ করে চলে আসে।
এই দিনটি হল ভারত বনাম অস্ট্রেলিয়ার ওয়ান ডে ম্যাচের তৃতীয় দিন।প্রথম দিন ইন্ডিয়া টিম জিতলেও দ্বিতীয় দিন অস্ট্রেলিয়া জিতেছে,তাই আজকের ম্যাচটা খুব গুরুত্বপূর্ণ দুই দলের কাছেই।অন্যদিকে দীপকে ফর্মে ফিরতে দেখে বেশ মুষড়ে পড়েছে সুনীত।পরপর দুদিনই শূন্য রানে আউট হয়েছে সে,ফিল্ডার হিসেবেও পারফরমেন্স যথেষ্ট খারাপ।
খেলা শুরু হল।অস্ট্রেলিয়া টসে জিতে ব্যাটিং করতে নামল,আর ইন্ডিয়া ফিল্ডিং।মাঠে নামার আগে দিয়াকে জড়িয়ে ধরল দীপ।দিয়া সেই অনুপ্রেরণামূলক কথাগুলোই বলল যেগুলো ও সবসময়ই বলে।
— 'তুমিই তো ইন্সপিরেশন আমার,' বলে দিয়ার কপালে চুম্বন করে আত্মবিশ্বাসের সাথে মাঠে নামল দীপ।
সেদিন দীপের পারফরমেন্স ছিল দেখার মতো।একের পর এক বোল্ড,ক্যাচ,এল.বি.ডব্লিউয়ের সাহায্যে খুব সহজেই কুপোকাত করে ফেলল প্রতিপক্ষকে।যথেষ্ট কম রানেই অল আউট হয়ে গেল বিপক্ষীয় দল।গ্যালারি জুড়ে চিৎকার,'দীপমাল্য,উই লাভ ইউ!'
আনন্দে চোখ ভিজে গেল দিয়ার।
ব্যাট করতে নেমে খুব সহজেই জিতে গেল ইন্ডিয়া।যদিও অন্য দুদিনের মতো আজও সুনীত শূন্যতেই আউট হল,আর মুস্কান ভ্রূ কুঁচকালো।
সেদিনের ম্যান অফ দ্য ম্যাচই শুধু নয়,ম্যান অফ দ্য সিরিজও হল দীপ।পুরস্কার হাতে নিয়ে সে বলল,'বিহাইন্ড এভরি সাকসেসফুল ম্যান,দেয়ার ইজ আ ওম্যান,'বলেই দিয়ার দিকে প্রেমমিশ্রিত শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে তাকাল দীপ।চোখের জল মুছে দিয়াও এক জয়ের হাসি হাসল।
(সমাপ্ত)

0 মন্তব্যসমূহ