Advertisement

চেনা অচেনা (তৃতীয় পর্ব)



চেনা অচেনা

সুচন্দ্রা চক্রবর্তী 

তৃতীয় পর্ব

সন্ধ্যেবেলা বাড়ি ফিরে ক্লান্তি কাটাতে দিয়া কফি খাচ্ছিল,হঠাৎ আবীরের ফোন।

— 'হ্যালো আবীর,বলো।'

— 'দিয়া,আগামী পরশু আমার জন্মদিন,ওইদিন তুমি এসো কিন্তু,আমাদের বাড়িতে একটা অনুষ্ঠান হবে ছোট করে,ঠিক সন্ধ্যে সাতটায়।'

— 'পরশু তোমার জন্মদিন? এই রে,দেখেছো একদম ভুলে গেছি।'

— 'আরে ঠিক আছে,তোমার আমার বন্ধুত্বের পর এটাই তো আমার প্রথম জন্মদিন,তুমি কিভাবে জানবে?'

— 'হুম,তা অবশ্য ঠিক।'

— 'হ্যাঁ,আসতেই হবে কিন্তু ওইদিন,কোনো না শুনব না।'

— 'কি যে বলো আবীর, তোমার বার্থডে,আর আমি যাব না,সেটা হয়?'

— 'একদম।ঠিক সন্ধ্যে সাতটায়।'

 দিয়া মনে মনে ভাবে,তার জন্মদিনেই আবীরকে প্রোপোজ করবে সে একতোড়া গোলাপ দিয়ে,এটাই হবে সেদিনের জন্য আবীরের সবচেয়ে বড়ো সারপ্রাইজ। 

— 'দিয়া,কি ভাবছ?কথা বলছ না যে!'

— 'আরে না না,কি ভাবব?তুমি বলো।'

— 'বলছিলাম,ওইদিন তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে,যেটা দেখলে তুমি খুব খুশি হবে আমি সিওর।'

— 'তাই?তা কি সারপ্রাইজ শুনি?'

— 'বা রে,সারপ্রাইজ কি বলে দিলে কি আর সেটা সারপ্রাইজ থাকে?'

— 'হুম তাও ঠিক।'

— 'আচ্ছা আমি এখন রাখি ওকে,মনে হয় একটা ফোন আসছে।'

— 'ওকে,বাই।'

ফোন রেখে দিয়ে দিয়া ভাবতে বসল,কি সারপ্রাইজ হতে পারে?তবে কি ও যা ভাবছে আবীরও তাই ভাবছে?আবীরও নিজের ভালোবাসার কথাটা জানাবে দিয়াকে?

  আর ভাবতে পারেনা দিয়া।তাড়তাড়ি আলমারি খোলে সে।আবীরের প্রিয় রঙ কালো,তাই ব্ল্যাক কালারের সব ড্রেসগুলো বের করে ও।দিয়ার কত প্রিয় ড্রেসই না আলমারিতে বন্দি দিনের পর দিন।তুহিনের জন্য একটাও পছন্দের পোশাকে সাজাতে পারেনি ও নিজেকে।

    অনেক খুঁজে খুঁজে একটা ব্ল্যাক গাউন বের করে ও,ঠিক করে এই ড্রেসটাই পারফেক্ট হবে ওইদিনের জন্য,আর সাথে কালো লেডিস ব্যাগ।আবীর আর চোখই সরাতে পারবে না ওর দিক থেকে।হয়ত বলবে,'আমি কালো ভালোবাসি বলে নিজেকে এভাবে কালোয় মুড়ে ফেললে দিয়া?এত ভালোবাসো আমায়?'

   ভাবতে ভাবতে দিয়া লজ্জায় লাল হয়ে যায়।ওদিকে মা খাবার বেড়ে অপেক্ষা করছেন,সেদিকে খেয়াল নেই ওর।

   পরের দিন অফিস গিয়ে থেকেই বড্ড ছটফট করছে দিয়া।কখন যে নির্ধারিত সময়টা আসবে!সময় যেন কিছুতেই কাটতে চায় না।আসলে যখন মানুষ কোনো সময়ের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে,তখনই মনে হয়,সময়নদীর গতিপথ বুঝি স্তিমিত হয়ে গেছে,অপর পারে পৌঁছবে দীর্ঘদিন পর।

  সময় এরপর নিজের স্রোতে ভাসিয়ে দিয়াকে এনে দাঁড় করাল বহু প্রতীক্ষিত সেই সন্ধ্যেতে।চোখে কাজল,পরনে কালো গাউন,হাতে কালো লেডিস ব্যাগ,সব মিলিয়ে দিয়াকে মোহময়ী লাগছিল।ঠিক সন্ধ্যে সাতটায় কলিংবেল বাজল আবীরের দরজায়।

  — 'আরিব্বাস,তোমায় তো দারুণ লাগছে ম্যাডামজি!আমার কালো কি যে ভালো লাগে কি বলব...'

— 'জানি তো বার্থডে বয়,'স্মিত হেসে দিয়া বলল,'সে জন্যই তো কালো পোশাকে নিজেকে সাজানো।'

— 'অসাধারণ লাগছে তোমায়,একটা সেলফি হয়ে যাক!'

— 'নিশ্চয়।'

দিয়া মনে মনে ভাবল,এই সেলফিটাই ও মোবাইলের ওয়ালপেপার বানিয়ে রাখবে।

— 'আর তোমাকেও আজ খুব হ্যাণ্ডসাম লাগছে।'

— 'ও,থ্যাকং ইউ।'

  আবীরের বাড়িতে তখন লোকে লোকারণ্য।আস্তে আস্তে রাত বাড়তে লাগল।সকল অতিথিরা এসে যাওয়ার পর আবীরকে অনুরোধ করা হল গান গাওয়ার জন্য,দিয়াও তাতে সায় দিল।

— 'আচ্ছা আচ্ছা,সবাই যখন বলছেন,আমি একটা গান ধরছি।'

আবীর গান ধরল,'ভালোবেসে সখি নিভৃত যতনে আমার নামটি লিখ তোমার মনের মন্দিরে।'

  কি অসম্ভব রসময় গলা আবীরের,শুনলেই কেমন ঘোরের মধ্যে চলে যায় দিয়া।তার মনে হতে থাকে,তাকে উদ্দেশ্য করেই যেন গানটা গাইছে আবীর।


  গান শেষ হয়ে গেছে বেশ কিছুক্ষণ,তবু ঘোর কাটেনি দিয়ার।আবীর দিয়ার সামনে এসে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,'দিয়া!'

— 'হ্যাঁ হ্যাঁ!'দিয়ার নেশা কাটতেই ও অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল।

— 'কি এত ভাবছ বলো তো?কোন্ স্বপ্নের রাজ্যে বাস করছ?'

— 'আরে না না,কি ভাবব!তুমি বলো না,বলো!' দিয়া নিজেকে সামলে নিল।

— 'হুম,' আবীর এবার সকলের সামনে ঘোষণা করল,'আজ একটা দারুণ সারপ্রাইজ আছে সবার জন্য।'

— 'কি সারপ্রাইজ?'সবাই কৌতূহলী হয়ে পড়ল।

— 'যাস্ট অ্যা মিনিট,' বলেই সব আলো নিভিয়ে দিল আবীর।দিয়া ভাবল এইবার বুঝি আবীর তার মনের কথা জানাবে সকলকে,দিয়ার এতদিনের আশা পূরণ হতে চলেছে এই সন্ধিক্ষণে।

— 'চোখ বোজো সবাই,'আবীর বলল।

 সকলের সাথে সাথে দিয়াও চোখ বন্ধ করল।দিয়ার এবার বুক ধুকপুক করতে লাগল,মনে হল এই বুঝি তার হার্ট বন্ধ হয়ে এল।

 এক মিনিট পর আবীর সবাইকে চোখ খুলতে বলল।

  সবাই চোখ খুলল,দিয়াও।

আবীর দাঁড়িয়ে আছে সলজ্জ হাসিমুখে,আর তার হাতে হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে সুকন্যা,দিয়ার বেস্টফ্রেন্ড সু।

 — 'সু তুই!' দিয়া হকচকিয়ে গেল।

সুকন্য কিছু না বলে লজ্জিত হাসিমুখে মাথা নামিয়ে নিল।

— 'ইয়েস দিয়া ম্যাডাম।তোমার বেস্টফ্রেন্ড।আসলে অনেকদিন ধরেই আমরা একে অপরকে ভালোবাসি,কিন্তু কিছুতেই বলে উঠতে পারছিলাম না একে অপরকে।পরশু ওকে প্রোপোজ করেছি।ও ইচ্ছা করেই তোমায় কিছু বলেনি,ভেবেছিলাম তোমায় সারপ্রাইজ দেব।তা কেমন লাগল সারপ্রাইজটা বলো?'

— 'দারুণ,দারুণ,দুজনকে পাশাপাশি দারুণ মানিয়েছে,'উচ্ছ্বসিত অভ্যাগতগণ করতালি দিতে লাগলেন।

 দিয়ার মুখ দিয়ে কথা সরছিল না।সদ্য মন ভেঙে কাচের মতো চূর্ণ বিচূর্ণ হয়েছে যার,তার সে শক্তিই বা কই যে কথা ঠেলে গলা দিয়ে উগরোবে!প্রাণপণে চোখের জল আটকাল দাঁতে দাঁত চেপে,কৃত্রিম হাসি এনে বলল,আরে বাহ্,এতো পুরো রাজযোটক!'

— 'যাহ্,বকিস না।'সুকন্যার মুখটা লজ্জায় লাল হয়ে গেছে।

 বুকে পাথর চাপা দিয়ে সুকন্যাকে জড়িয়ে ধরল দিয়া।এক নিশ্বাসে বলল,'সু,তুই নিজেও জানিস না তুই কাকে পেয়েছিস জীবনে।আগলে রাখিস মূল্যবান সম্পদটাকে।'

— 'সম্পদটা নয়,বল সম্পদ দুটো।'

— 'কেন?'

— 'বাহ রে,' সুকন্যা দিয়ার গালদুটো আলতো করে টিপে দিয়ে বলল,'তুই ও তো আমার জীবনের একটা মূল্যবান সম্পদ।এ যুগে তোর মতো ভালো বন্ধু কটা পাওয়া যায় শুনি?'

 হাসতে থাকে দিয়া,খুব হাসতে থাকে।অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে।

— 'আরে,তোমার আবার কি হল দিয়া?এভাবে হাসছ যে!'

— 'হাসছি আমি নিজের ওপর আবীর,নিজের ওপর।তোমরা দুজনেই আমার কত কাছের বন্ধু,এভাবে লুকিয়ে প্রেম করলে,আমি টেরটাই পেলাম না।কি বোকা তাই না আমি?কি বোকা!' আবার হাসতে থাকে দিয়া।

— 'হুম,তোকে ভালোই বোকা বানালাম আমরা,'সুকন্যা হেসে বলল,'তবে জানিস এই বদ বুদ্ধিটা আবীরের।আমি বারবার বলেছিলাম বলে দিই তোকে...'

— 'ইটস ওকে,মাই ডিয়ার,'দিয়া বলল,'আচ্ছা আমি তাহলে আসি এখন?'

— 'কি?এখনই চলে যাবে?আরে কেকই তো কাটা হল না!ডিনারটাও তো বাকি!'

— 'আই অ্যাম সো সরি আবীর।আসলে শরীরটা বড্ড খারাপ করছে,খুব মাথা যন্ত্রণা করছে।আজ আমি যাই প্লিজ,পরে একদিন আসব প্রমিস।'

— 'সে কি রে!এই তো ভালো ছিলি হঠাৎ কি হল!' সুকন্যা ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

— 'আরে অত টেনশন করার কিছু নেই,বাড়ি গিয়ে রেস্ট নিলেই ঠিক হয়ে যাবে।'

— 'তুমি একা যেতে পারবে তো?না আমি ড্রপ করে দেব?'

— 'আরে না না,আমি একাই যেতে পারব,তুমি ব্যস্ত হয়োনা আবীর।আজ তোমার ডে,আই মিন তোমাদের ডে,এনজয় ইয়োর ডে,এনজয়!'

  বিধ্বস্ত দিয়া কোনোরকমে সেখান থেকে বেরিয়ে এল।


পরবর্তী ভাগ পড়ুন : চতুর্থ পর্ব

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ