চেনা অচেনা
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
দ্বিতীয় পর্ব
সেই রাতে আবীর দিয়াকে বাড়ি পৌঁছে দিল।বাড়ির গেটে দাঁড়িয়ে দিয়া বলল,'এভাবে ঝুঁকি নিয়ে আমায় বাঁচালেন,বাড়ির ভেতর চলুন না,মা বাবার সাথে আপনার আলাপ করিয়ে দেব।'
— 'আই অ্যাম সো সরি ম্যাম,আজ যেতে পারব না।অনেক রাত হয়ে গেছে,ওদিকে আমার মা বাবাও টেনশন করবে।আজ আসি,তবে অন্য একদিন আসব,পাক্কা।'
— 'আচ্ছা বেশ,আসবেন কিন্তু অবশ্যই।'
— 'নিশ্চয়ই ম্যাম।'
আবীর চলে গেল।দিয়ার কাছে ডুপ্লিকেট চাবি ছিল,সেটা দিয়েই দরজা খুলে বাড়িতে ঢুকল সে।দিয়ার মা বাবা অপেক্ষা করছিলেন তার জন্য,সে পৌঁছাতেই চিন্তামুক্ত হলেন তাঁরা।
এরপর বেশ কিছুদিন কেটে গেল।তুহিনকে যতটা সম্ভব অ্যাভয়েড করে চলে এখন দিয়া।তুহিনের মেসেজের রিপ্লাই দেয়না বললেই চলে,ফোনও বেজে বেজে কেটে যায়।অন্যদিকে আবীরকে সোশ্যাল মিডিয়ায় খুঁজে পায় দিয়া,ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠায়।
তুহিনের প্রতি দিয়ার এই ঔদাসীন্য তুহিনের রাগকে দ্বিগুণ বাড়িয়ে তোলে।দিন সাতেক দিয়ার এই উদাসীনতার পর তুহিন শেষে রাগ কন্ট্রোল করতে না পেরে দিয়ার বাড়ি এসে হাজির হয়।দিয়া তখন অফিসের জন্য রেডি হচ্ছে।হঠাৎ কলিংবেলের শব্দ।দিয়ার মা এসে দরজাটা খুললেন।
— 'তুহিন,বাবা,এসো ভেতরে এসো।দিয়া দেখে যা মা,তুহিন এসেছে!'
— 'শুনুন,জুতো মেরে গরুদানের যাস্ট কোনো দরকার নেই।আপনাদের আতিথেয়তা নিজেদের কাছেই রাখুন।'
— 'এ তুমি কি বলছ বাবা,'দিয়ার বাবা এসে বললেন,'আমরা তো কিছুই বুঝতে পারছি না।'
— 'ওহ প্লিজ আঙ্কেল,এত অভিনয়ের কোনো দরকার নেই।এসব যে আপনাদের আস্কারাতেই হয় সেটা বুঝিনা ভেবেছেন?'
— 'হাউ ডেয়ার ইউ তুহিন?আমার মা বাবার সাথে এইভাবে কথা বলার সাহস তোমার হয় কিভাবে?'রাগান্বিত দিয়া বলে উঠল।
— 'তুমি তো আচ্ছা বেয়াদব মেয়েমানুষ দেখছি!'দিয়ার হাতটা জোরে টেনে ধরে তুহিন গর্জন করতে লাগল,'আমার ফোন দিনের পর দিন না ধরে,মেসেজের রিপ্লাই না দিয়ে এখন আমার ওপরেই চিৎকার করছ?'
— 'তুহিন!'দিয়া হাতটা তুহিনের কাছ থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে চেঁচিয়ে উঠল,'তোমার মতো নোংরা মানুষ আমি দুটো দেখিনি।তোমার প্রবলেম তো আমার সাথে,মা বাবাকে এসবের মধ্যে টানছ কেন?ওনারা কিচ্ছু জানেন না এব্যাপারে।'
— 'হ্যাঁ সেই তো,ওনাদের মেয়ে,ওনারা জানেন না!মিথ্যে বলারও সীমা থাকে একটা!'
— 'গেট আউট!যাস্ট গেট আউট!আমার বাড়িতে এসে আমাদেরই অপমান করছ এত বড় স্পর্ধা তোমার!'
— 'স্পর্ধা তো তোর রে অসভ্য মেয়েছেলে!তুই তুহিন লাহিড়ীকে অ্যাভয়েড করিস,অপমান করিস!'রেগে কাঁপতে লাগল তুহিন,'জানিস তোর মত কত্ত মেয়ে আমার আশেপাশে জন্তুর মতো ঘুরে বেড়ায় সামান্য পাত্তা পাওয়ার আশায়?'
দিয়া আর নিজেকে সামলাতে পারল না,কষিয়ে এক চড় মারল তুহিনের গালে,বলল,'হ্যাঁ ঠিকই বলেছিস তুই,আমি জন্তু।হ্যাঁ জন্তুই তো!তাই তো এতদিন তোকে ভালোবেসেছি অন্ধের মতো।তোর দুঃখে আমিও কেঁদেছি,রাত জেগে তোকে সান্ত্বনা দিয়েছি।আন্টি যখন অসুস্থ ছিলেন গতবছর...'গলা ভারী হয়ে এল দিয়ার,'তখন এই জন্তুটাই দিনের পর দিন রান্না করে টিফিন ক্যারিয়ারে তোদের বাড়ি খাবার পৌঁছে দিয়ে এসেছে।'চোখের জল মুছে ফেলে দিয়া,'আসলে কি বল তো,তোদের মতো মানুষরা পুরুষের নামে কলঙ্ক।তোরা দেখতে পুরুষের মতো,কিন্তু আসলে কাপুরুষ তোরা।এই তোরাই রাস্তায় কোনো মেয়েকে নির্যাতিত হতে দেখলে না দেখার ভান করে পালিয়ে যাস,মেয়েটার চরিত্রের দোষ দিস।অনেক হল,আর নয়।তুই এই মুহূর্তে আমার বাড়ি থেকে বেরোবি,এই মুহূর্তে।'
চড় খেয়ে তুহিন কিছুক্ষণের জন্য হকচকিয়ে গিয়েছিল।সে আশাও করতে পারেনি যে মানুষটা এতদিন তার সমস্ত মেন্টাল টরচার মুখ বুজে সহ্য করেছে,সে আজ এইভাবে ঘুরে দাঁড়াবে।হতবাক তুহিনের মুখে কোনো কথা সরল না,সে চুপচাপ বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।সেই মুহূর্তেই সমস্ত সোশ্যাল মিডিয়া থেকে তুহিনকে ব্লক করল দিয়া।
সেদিন অফিস থেকে খুব খুশি মনে ফিরছিল দিয়া।অন্যদিনের মতো মোবাইলে কুড়িটা মিসড কল নেই,ঘন্টায় ঘন্টায় কৈফিয়ত দেওয়ার ঝামেলা নেই,অপমানিত হওয়ার ভয় নেই।এতদিন পর স্বাধীনতার আসল অর্থটা বুঝতে পারল দিয়া।নিজেকে মুক্ত বিহঙ্গের মতো মনে হচ্ছিল ওর।
বাড়ি ফিরে দিয়া দেখে,আবীর তার ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট অ্যাক্সেপ্ট করেছে,আর তাকে মেসেজও করেছে,'কেমন আছেন ম্যাডাম?'
— 'ভালোই আছি আবীরবাবু।আপনি?'
— 'আমি?আমি আর কেমন থাকব বলুন,এই গান নিয়ে বেশ কেটে যাচ্ছে দিন গুলো।'
— 'আপনি কিন্তু কথা দিয়েছিলেন একদিন আমার বাড়ি আসবেন,কই এলেন না তো?'
— 'মনে আছে ম্যাম,মনে আছে।আসলে এই কটাদিন বড় ব্যস্ত ছিলাম ফাংশান নিয়ে।সামনের সপ্তাহেই যাব,প্রমিস।'
— 'আচ্ছা বেশ,তাই আসবেন।'
— 'পরের সপ্তাহের শনিবার যাই?ওইদিন আমি ফাঁকা আছি।'
— 'তাহলে তো ভালোই হয়,শনিবার আমারও অফিস ছুটি।'
— 'আরিব্বাস,চিলি চিকেনটা দারুণ বানিয়েছেন তো আন্টি!'লাঞ্চ করার সময় আবীর বলল।
— 'আমি এটা বানাইনি বাবা,দিয়া বানিয়েছে।'
— 'ওমা তাই!আপনি তো দারুণ রান্না করেন!'
— 'ওই একটু আধটু জানি আর কি।' দিয়া হেসে বলল।
— 'একটু আধটু?কি যে বলেন ম্যাডাম,'প্রশংসার সুরে বলল আবীর,'এ তো অসাধারণ রান্না যাকে বলে।আবার ভেটকি মাছের পাতুড়িটাও তো খেয়ে মনে হচ্ছে কোনো বড় রেস্টুরেন্টের।'
— 'হুম,রান্নাটা আমার একটা শখ বলতে পারেন,ফ্রি থাকলেই রান্নাঘরে ঢুকে পরি।যখন হাইস্কুলে পড়ি,তখন থেকেই মায়ের দেখে দেখে টুকটাক আর কি...'
— 'রান্নাটাকে এত হালকাভাবে নেবেন না দিয়া ম্যাম,রান্না একটা আর্ট,সুন্দর স্বাদের রান্না চাইলেই সবাই করতে পারেনা।'
— 'আচ্ছা,হয়েছে হয়েছে।অনেক প্রশংসা করেছেন।এবার খান দেখি!আপনার কিছু লাগলে বলবেন কিন্তু,লজ্জা করবেন না।'
— 'না না লজ্জা জিনিসটা আমার একটু কমই আছে বুঝলেন।'
— 'আচ্ছা ওকে।'দিয়া হাসতে লাগল।
এরপর মাঝে মাঝেই মেসেজে ওদের কথা বিনিময় হত,কখনও কখনও কফি শপেও আড্ডা হত দুজনের।আস্তে আস্তে বেশ ভালো বন্ধু হয়ে উঠেছিল দুজন দুজনের।আবীর আর তুহিন দুজনে যেন দুই মেরুর মানুষ।আবীর দিয়ার মধ্যে যাবতীয় গুণগুলো খুঁজে নেয় সবসময়।এইভাবেই দিব্যি কেটে গেল কয়েক মাস।
একদিন কফি শপে আবীর বলল,'আচ্ছা এইভাবে আপনি আজ্ঞে আর কতদিন?আমরা একে অপরকে তুমি বলতে পারিনা?'
— 'কেন পারিনা,নিশ্চয়ই পারি,তবে বুঝতেই পারছেন,একটু সময় তো লাগবেই,এতদিন ধরে আপনি বলে এসেছি...'
— 'রিল্যাক্স,দিয়া,রিল্যাক্স।আপনি যেদিন কমফোর্টেবল হবেন সেদিন থেকেই বলবেন।কোনো তাড়াহুড়োর দরকার নেই।'
আস্তে আস্তে দুজন দুজনকে তুমি বলতে শুরু করল,শুরু হল নাম ধরে ডাকা।ধীরে ধীরে দিয়া কেমন যেন নির্ভরশীল হয়ে পড়ল আবীরের প্রতি।একদিন কথা না হলে টেনশন হয়,মুড খারাপ হয়ে যায়।আবার আবীর কথা বললেই মুড মিনিটে ভালো হয়ে যায়।
এইভাবেই চলছিল।হঠাৎ একদিন দিয়া এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখে।ও স্বপ্নে দেখে,ও আর আবীরের বিয়ে হচ্ছে।আবীর পরম যত্নে সিঁদুরে রাঙিয়ে দিচ্ছে ওর সিঁথি।তারপর আবীরের হাত ধরে ওর বাড়ির চৌকাঠ পার হচ্ছে।হঠাৎ মায়ের ডাকে ঘুম ভেঙে যায় দিয়ার।এরকম একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখে হকচকিয়ে যায় দিয়া।আবীরকে তো ও শুধু একজন ভালো বন্ধুই ভাবে,তবে এরকম অদ্ভুত স্বপ্ন ও কেন দেখল?তবে কি অবচেতন মনে ও ভালোবেসে ফেলেছে আবীরকে?দিয়ার মোবাইল জুড়ে শুধুই আবীরের গান,শোনা গান ও বারবার শোনে।একটা স্নিগ্ধতা আছে আবীরের গলায়,একটা মন কাড়া মুগ্ধতা আছে,যা বারবার আবীরের নেশায় মত্ত করে তাকে।আবীরের গলা শুনলে মনটা ফুরফুরে হয়ে যায় তার।তবে কি ও মনে মনে সত্যিই আবীরকে বিয়ে করতে চায়?সারাজীবন পথ চলতে চায় একসাথে? কোনো উত্তর পায় না দিয়া।
— 'কিরে,ঘুম থেকে উঠেই আকাশকুসুম কি এত ভাবছিস?'মায়ের ডাকে সম্বিৎ ফেরে দিয়ার।তাড়তাড়ি বিছানা ছেড়ে ব্রাশ করতে চলে যায় ও।
অফিসে দিয়ার এক বান্ধবী আছে সুকন্যা।শুধু বান্ধবী বললে ভুল হবে,ও দিয়ার বেস্ট ফ্রেন্ড।দিয়ার মনের কোনো খবরই ওর অজানা নয়।তুহিন যখন দিয়াকে দিনের পর দিন মানসিক অত্যাচার করত,তখন সুকন্যা পই পই করে বলেছিল তুহিনকে ছেড়ে দিতে।সবসময় দিয়ার বিপদে আপদে পাশে দাঁড়িয়েছে সুকন্যা।
ইদানিং অফিসের কাজে কিছুতেই যেন মন বসাতে পারছে না দিয়া।সঠিক কারণটা ও নিজেও বুঝতে পারছে না।কিছুক্ষণ কাজ করার পরই ইনবক্স চেক করে আবীরের মেসেজ এসেছে কিনা।
দিয়ার এই অস্থিরতা চোখ এড়ায়নি সুকন্যার।একদিন অফিস ছুটির পর ও দিয়াকে চেপে ধরল,'কি হয়েছে বল তো তোর?বেশ কিছুদিন ধরে দেখছি কাজে মন নেই,সবসময় অন্যমনস্ক হয়ে আছিস,কেউ ডাকলেও শুনতে পাচ্ছিস না,হয়েছেটা কি তোর?'
— 'এর কারণটা আমি নিজেও জানিনা রে সু।তোকে আর কি বলব?'
— 'আঙ্কেল আন্টির শরীর ভালো তো?'
— 'হ্যাঁ রে মা বাবা ঠিকই আছে।'
— 'তাহলে কি তুহিন আবার জ্বালাচ্ছে?'
— 'আরে না রে।'
— 'তাহলে....তাহলে....এই,তুই কি কারোর প্রেমে পড়েছিস?'
— 'কি জানি।'
— 'এ আবার কি অদ্ভুত উত্তর ভাই!প্রেমে পড়েছিস কিনা তাও জানিস না?'হাসতে লাগল সুকন্যা।
— 'ধুস,তোর সবেতেই খালি মজা আর ইয়ার্কি।সর তো এখন,বাড়ি ফিরতে দেরি হয়ে যাবে।' লাজুক মুখে চলে এল দিয়া।
— 'হুম,ম্যাডাম নিশ্চয়ই প্রেমের জালেই জড়িয়েছেন,ব্যাপারটা দেখতে হচ্ছে।'বিড়বিড় করে সুকন্যাও অফিস থেকে বেরিয়ে এল।
যত দিন যায়,দিয়া ততই আকৃষ্ট হতে থাকে আবীরের প্রতি।আবীর ওকে মেসেজ না করলেও ও আবীরকে মেসেজ করতে থাকে,ফোনও করে।আবীর ওর হাতের রান্না খেতে ভালোবাসে,তাই রান্না করেও নিয়ে যায় মাঝে মাঝে আবীরের বাড়ি।ক্রমশ ও বুঝতে পারে,আবীরকে সত্যিই ভালোবসে ফেলেছে সে।আবীরের হাসি দেখে সে কেমন নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে।অন্যদিকে বুদ্ধিমতী সুকন্যারও বুঝতে অসুবিধা হয়না যে দিয়া সত্যিই প্রেমে পড়েছে।তবে দিয়া তার আবীরের প্রতি অনুভূতিটা কাউকেই জানায়নি,মা বাবাকে নয়,আবীরকে নয়,এমনকি বেস্ট ফ্রেন্ড সুকন্যাকেও নয়।সবাই জানে,আবীর শুধুই দিয়ার ভালো বন্ধু,তার বেশি কিছু নয়।
এইভাবে এক দেড় মাস যাওয়ার পর দিয়া ভাবে,আর নয়।এবার সময় এসেছে আবীরকে তার মনের কথা বলে দেওয়ার।হয়ত আবীরও মনে মনে তাকেই...দিয়া ঠিক করে একদিন আবীরের সঙ্গে দেখা করে সবটা বলবে সে।
পরবর্তী ভাগ পড়ুন : তৃতীয় পর্ব

0 মন্তব্যসমূহ