Advertisement

প্রমিস

প্রমিস
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী




 'তোর সাথে আর কথাই বলব না আমি।'

 'রাগ করলি? আরে বিশ্বাস কর, এখানে এমন ফেঁসে গেছি, কি করে যাব বল...'

 'হ্যাঁ, তুই খালি তোর কাজ নিয়েই মর। আবার হাসছে দেখ এমন করে যেন সারাজীবনের সব হাসি একসাথে হাসছে।'

____________________________


একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ :  পড়ুন

______________________________


 'কি করি বল পাগলি, আমি যেখানে আছি এখানে হাসার যে আর সুযোগই নেই...'

 'থাক থাক, আর মিষ্টি কথায় ভোলাতে হবে না। কচি খুকি পেয়েছে আমায়...'

 'আরে না রে, বিশ্বাস কর, আমি মিথ্যে বলছিনা।'

 'তুই দূর হ তো। শয়তান একটা জুটেছে! তুই প্রমিস করেছিলি আমায়, এই তার নমুনা!'

 'আচ্ছা বেশ বাবা, আমি চেষ্টা করছি কলকাতা যাবার...'

 'তুই না এলে আমি কিন্তু এবার পুজোর শপিংই করব না বলে দিলাম। এবার তুই ঠিক কর কি করবি।'

বলেই ফোনটা কেটে দিল সৃজা। মল্লিকা সেই স্কুল লাইফ থেকেই ওর প্রাণের বন্ধু, একেবারে হরিহর আত্মা যাকে বলে। তারপর কলেজ লাইফ থেকেই ওরা আলাদা, একজন মেডিকেল তো অন্যজন ইঞ্জিনিয়ারিং। তবু মনের টান কখনো এতটুকু কমেনি দুজনের। দেখতে দেখতে পাশও করে গেল ওরা, সৃজা আজ আই স্পেশালিষ্ট, আর মল্লিকা প্রায় তিনবছর হল চাকরির জন্য দেশের বাইরে। এত দূরে দুজন থাকলে কি হবে, পুজোর শপিং টা প্রতিবার একসাথে করা চাই ওদের। এই সময়টাই মল্লিকা ক্যালিফোর্নিয়া থেকে কলকাতা ফেরে, আর জমিয়ে শপিং করে দুজন। সৃজার মতে, ড্রেসিং সেন্সটা তেমন নেই ওর নিজের, আর মল্লিকার পছন্দে ড্রেস কিনে প্রশংসাও কম কুড়োয় না ও, তাই মল্লিকাকে ছাড়া শপিং এর কথা ভাবতেই পারে না ও।ওদিকে মল্লিকারও দেশে ফেরার সুযোগ হয়, তাই সারাবছর এই সময়টার জন্য দুজনে অপেক্ষা করে থাকে সাগ্রহে। আজ মল্লিকার ফেরার কথা ছিল, আজ ও ফিরবে সন্ধ্যার সময়, তারপর কাল যাবে দুজনে শপিং এ, এমনটাই ঠিক ছিল। কিন্তু হঠাৎ আগের দিন ফোন করে মল্লিকা বলল, 'সরি রে, এবার বোধহয় আমার যাওয়া হল না।'

তারপর থেকেই সৃজার অভিমান, কারণ মল্লিকা যে প্রমিস করেছিল ওকে যে প্রতিবারই ও আসবে এই সময়টায়।

কত কথা ভাবছিল সৃজা আনমনে। ওদের ছোটোবেলার স্কুল জীবনের কথা। স্কুল ছুটি হলেই দৌড়ে আচার  কিনতে চলে যাওয়া, অবনীকাকুদের বাড়ির গাছের আম চুরি করে পালানো, একদিন তো ধরাও পড়ে গেছিল ওরা, ক্লাস সিক্সে পড়ে তখন ওরা, সেদিনটা ভাবলেই হাসি পায় সৃজার। অবনীকাকু বললেন, 'আচ্ছা! তাই ভাবি রোজ রোজ আমগুলো কোথায় হাওয়া হয়ে যায়! এবার বুঝেছি!'

কিছু না বলে দুজনেই লজ্জায় মাথা নীচু করে দাঁড়িয়েছিল। অবনীকাকু বললেন, 'কিন্তু অন্যায় করলে তো শাস্তি পেতেই হবে। তাই তোমরাও আজ শাস্তি পাবে।'

কাঁচুমাচু মুখে ওরা তাকিয়েছিল। তিনি বললেন, 'তোমাদের বয়স কম। তাই বেশি কঠিন শাস্তি দেব না। কাল থেকে স্কুল ছুটির পর একঘন্টা করে তোমাদের মধ্যে একজন আমার বাড়ির এই আমগাছটা পাহারা দেবে এখানে বসে, চিন্তা নেই বাড়িতে কেউ দেরি হওয়া নিয়ে যাতে কিছু না বলে সেই দায়িত্ব আমার। এবার বলো কে করবে।'

সৃজা বলে উঠল, 'আমি, আমি করব কাকু।'

 'না না, আমি পাহারা দেব। সৃজু এটা তুই পারবি না।'

 'না মলি, তুই ই পারবি না। চুপ কর না, আমাকেই করতে দে।'

 'আরে পাগলি, তুই তো না খেয়ে থাকতে পারিস না একদম, স্কুল ছুটির পর  অতক্ষণ না খেয়ে তোর কষ্ট হবে।'

 'তোরও তো খুব ঘুম পায় ছুটির পর। বাড়িতে গিয়ে একচোট ঘুম না দিলে তো গায়ে জোরই পাস না।'

 'সে তোকে ভাবতে হবে না ছাড়।'

 'না কেন? আর আমিই আগে বলেছি, তাই আমিই করব।'

 'ব্যস ব্যস, থাক। কাউকেই করতে হবে না। সত্যি আজকের দিনেও এমন নিখাদ বন্ধুত্ব বেঁচে আছে জেনেও কত শান্তি পেলাম। যাও তোমরা নিজের বাড়ি যাও। ঈশ্বর তোমাদের মঙ্গল করুন। আর শোনো, তোমরা যেন সারাজীবনই এমন থেকো, একে অন্যের হাত ধরে, কখনো যেন ছেড়ো না। আর শোনো, জানো তো চুরি করা অন্যায়, তাই আর চুরি কোরো না। তোমাদের যখনই ইচ্ছা হবে আমার কাছে বোলো, যার যত চাই আমি তোমাদের দেব আম।'

শুধু এই ঘটনাটাই নয়, স্কুলে যেকোনো একজনকে ক্লাসের বাইরে বের করে দেওয়া হলেই একসঙ্গে দুজন বেরিয়ে যেত। ওদের বন্ধুত্বের কথা জুনিয়র থেকে সিনিয়র, প্রিন্সিপল থেকে স্কুলের দারোয়ান কারোরই অজানা ছিল না। উচ্চমাধ্যমিকের পর যখন দুজনের জীবন দুদিকে গেল বেঁকে, সেদিন লাল ফোলা চোখে হাতে হাত রেখে প্রমিস করেছিল ওরা, শরীর দুটো যাক না যতদূর খুশি, মনদুটো সারাজীবন জড়িয়ে থাকবে একে অপরকে।

কত কথা ভাবছিল সৃজা। হঠাৎ খেয়াল হল উষ্ণ নোনতা জল ওর গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। চোখের মণিকে কি সত্যিই আলাদা করা যায় চোখ থেকে? চোখের ডাক্তার সৃজা জানে, মণিটা খুবলে নিলেও ওর কালো গায়ে লেগে থাকে চোখের সাদা অংশ। তাকে কি যায় পুরোপুরি সরানো? মলিকে কি যায় সৃজুর থেকে আলাদা করা?

ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে সৃজা হুঁশই নেই। হঠাৎ ঘুম ভাঙল ফোনের রিংটোনে। ওপাশ থেকে মলির গলা, 'কিরে আলসে, ঘুমুচ্ছিলি নাকি পড়ে পড়ে? এত দেরি করে ফোন তুললি যে?'

 'মলি তুই?'

 'হ্যাঁ মহারাণী আমি।'

 'কিন্তু এটা তো তোর নাম্বার নয়। নাম্বার চেঞ্জ করেছিস নাকি?'

 'সে অনেক কথা, অত বলার সময় নেই। তোকে একটা জায়গায় আসতে বলব, বল পারবি?'

 'হ্যাঁ পারবো, কিন্তু তুই যে কাল বললি আসা হবে না তোর?'

 'হ্যাঁ রে, প্রথমে শুনেছিলাম ফ্লাইট টা নাকি ক্যান্সেল হয়েছে। কিন্তু পরে জানলাম ভুল শুনেছি।'

 'শয়তান আজ একবারও জানাতে হত না সেটা? যে তুই আসছিস? এদিকে আমি কেঁদে মরছি।'

 'হি হি, কেমন সারপ্রাইজ দিলাম ম্যাডাম বলুন?'

 'চুপ কর গাধা। বল কোথায় যেতে হবে?'

মলি মেসেজে ঠিকানা দিয়ে দিল। একটা শপিং মলের অ্যাড্রেস। দেরি না করে ট্যাক্সিতে রওনা দিল সৃজা।

মনের মতো করে শপিং, আড্ডা, খাওয়াদাওয়া করে বাড়ি ফিরতে রাত দশটা বেজে গেল সৃজার। কিন্তু বাড়ি ফিরেই অবাক। কেমন যেন শুনশান পরিবেশ বাড়ির। ডাইনিং এর আলো নেভানো, কোনো আওয়াজ নেই, কেমন নিস্তব্ধ ভুতুড়ে বাড়ির মতো। এবার সত্যিই চিন্তায় পড়ে গেল সৃজা। কারোর কোনো বিপদ হল না তো?ছুটে দোতলায় চলে গেল ও। মা অঝোর ধারায় কাঁদছেন একা বসে।

 'কি হয়েছে মা? কাঁদছ কেন?'

 'তুই সহ্য করতে পারবি না মা। জানতে চাস না।'

 'মানে? কি বলছ এসব? আর বাবা ভাই ওরা কোথায়?'

 'ওরা মলিদের বাড়ি গেছে।'

 'মলিদের বাড়ি?' নিশ্চয়ই অকর্মাটা বাড়িতেও সারপ্রাইজ দিয়ে চমকে দিয়েছে সকলকে আর ফোন না করে আসার জন্য খুব বকুনিও খাচ্ছে সবার  কাছে,'তা বাবার যাওয়ার কি দরকার ছিল, আমায় বললেই তো হত, আমি যেতাম।'

 'মারে', সৃজার মা এবার হাউহাউ করে কেঁদে উঠলেন, 'কার জন্য যাবি মা ওবাড়িতে? যার জন্য যেতিস সে তো সবাইকে ফাঁকি দিয়ে চলে গেছে।'

 'মানে? কার কি হয়েছে? মা কি বলছ স্পষ্ট করেই বলো।'

কেঁদেকেটে মা যেটা বললেন তার মানে করলে এটাই দাঁড়ায়, গতকাল সন্ধ্যেয় একটা অ্যাক্সিডেন্টে স্পট ডেড হয়েছে মল্লিকা। 

 'না মা এটা কিছুতেই সম্ভব নয়, একটু আগেই তো শপিং করলাম ওর সাথে, কত ঘুরলাম। তোমাদের বুঝতে ভুল হয়েছে নিশ্চয়ই, মেয়েটাকে তো কম দিন চিনি না, দুষ্টু বুদ্ধির অভাব নেই মাথায়, নিশ্চয়ই শয়তানি করছে।'

মা কিছু না বুঝে হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন। হঠাৎ সৃজার ফোনে মলির মেসেজ ঢুকল, 'একবার বাড়ির বাইরে আয়।'

বাইরে এসে সৃজা দেখে, মলি দাঁড়িয়ে আছে।

 'জানতাম এসব তোর শয়তানি। মজা করারও তো লিমিট থাকা উচিত ভাই, এভাবে সবাইকে চিন্তায় ফেলে খুব অন্যায় করেছিস তুই। এখন চল তোকে বাড়ি ফিরিয়ে দিয়ে আসি।' সৃজা মলির হাতটা নিজের মুঠোয় সজোরে চেপে ধরে টেনে নিয়ে চলল বাড়ির দিকে।

 'আমার কথাটা শোন, তোকে কাকীমা যা বললেন সেটাই সত্যি রে...'

 'চুপ! যা বলার নিজের বাড়িতে গিয়ে বলবি।'

 'সৃজু কেন বুঝছিস না, সেটা আর পসিবল না...'

 'তোকে চুপ করতে বলেছি তো নাকি! আজ যদি কাকীমাকে দিয়ে তোকে মার না খাইয়েছি তো আমার নামও....'

হঠাৎ সৃজা দেখল বাবা আর ভাই, ওদের দিকেই আসছে। বাবা এসেই বললেন, 'একি,এত রাতে একা একা কি করছ রাস্তায়? '

 'একা কই? এই দেখো বদমাইশটাকে কেমন কব্জা...'মুখ ঘুরিয়েই সৃজা অবাক! মলি কই? কর্পূরের মতো উবে গেল নাকি?'

সৃজার বাবা ওকে বাড়িতে এনেই কাগজটা ছুড়ে দিলেন সৃজার দিকে, 'দেখো এটা, পাগলামো কোরো না।'

কাগজটা দেখে আর সামলাতে পারল না সৃজা। মলির মৃত মুখের ছবি, আর পাশে লেখা 'ক্যালিফোর্নিয়ায় দুর্ঘটনার শিকার এক বাঙালি তরুণী মল্লিকা দেব।'

প্রমিস আজও রাখে মল্লিকা। রোজ রাতের অন্ধকারে সবাই যখন ঘুমের দেশে পাড়ি দেয় মলি তখন চুপিচুপি আসে কোনো অজানা এক দেশ থেকে তার সৃজুর কাছে। কত গল্প করে দুজনে। সৃজা বলে, 'হ্যাঁ রে, কষ্ট হয়না তোর আমার কাছে আসতে?'

 'তোর জন্য হাজারবছর কষ্ট করতে রাজি আমি। আমি সেদিনই চিরকালের মত এ পৃথিবী ছাড়ব যেদিন তুই ছাড়বি।'

 'হ্যাঁ রে, সেদিন আমরা দুজন হাত ধরে পাড়ি দেব নাম না জানা ঘুমের দেশে, কি মজাই না হবে সেদিন।আমি সেইদিনের অপেক্ষাতেই আছি।'

(সমাপ্ত)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ

  1. ভীষন ভীষন মন ভালো করা। খুব ভালো লাগলো পড়ে ❤️❤️❤️💜💜💜

    উত্তরমুছুন