ফিরে দেখা
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
বাসে উঠেই মাথা গরম হয়ে গেল অনন্যার।একে আজ অফিসে কাজের চাপ ছিল প্রচুর,তার ওপর বাস আসতে এত দেরি।যাও বা বাস এল এত ভিড় যে পা দুটো রাখারই জায়গা পাচ্ছিল না।অনেক কষ্টে ভিড় ঠেলেঠুলে ভিতরে চলে গেল,৪৫ মিনিটের জার্নি,তারপর ওর স্টপেজ। এত ভিড়,তবু চোখে ঠুলি পরা কন্ডাকটরের শান্তি নেই মনে।একই হাল বাসের ড্রাইভারেরও। সাইকেলও বোধহয় এর আগে চলে,ভাবছিল অনন্যা।এত গিজগিজে অবস্থা,তবু সব স্টপেজে অন্তত সাতজনকে না তুললে রাতে ঘুম হবে না,বিরক্ত লাগছিল অনন্যার,মনে হচ্ছিল এবার ঝগড়া জুড়ে দেয় কন্ডাকটর-ড্রাইভারের সাথে।অনেক কষ্টে রাগ কন্ট্রোল করে দাঁড়িয়েছিল ও।হঠাৎ পিছন থেকে একজন ছেলে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাচ্ছিল অনন্যার গায়ে,অনেক কষ্টে টাল সামলে নিল ও।বিরক্ত অনন্যা মুখ পুরোপুরি না ঘুরিয়েই বলল,'কি ব্যাপার কি!মেয়ে দেখলেই খালি গায়ে পড়তে ইচ্ছা হয় বুঝি?
- 'সরি ম্যাম,আমি কিন্তু ইচ্ছা করে করিনি....'
গলাটা একটু চেনা ঠেকল অনন্যার।মুখ ঘুরিয়ে বলতে যাচ্ছিল কিছু একটা,কিন্তু পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার মুখটা দেখে আর মুখে কথা সরল না।
নীরবতায় কাটল বেশ কিছুক্ষণ। তারপর ছেলেটাই নীরবতা ভাঙল,'বিয়ে হয়ে গেছে?ভালো আছো নিশ্চয়ই?'
- 'হ্যাঁ,কতটা সুখী সেটা আমায় দেখে বুঝতে পারছ না?'
ছেলেটা অবাক হয়ে দেখল অনন্যাকে।ওর মাথায় সিঁদুর নেই,হাতে শাঁখাপলা যদিও এযুগে কেউ পরে না তেমন,তবুও,সিঁদুর পড়বে না,এমন তো অনন্যা নয়,অন্তত ওর অভিজ্ঞতা তাই বলে।অবশ্য এই পাঁচ বছরে ও পালটে যেতেও পারে,অস্বাভাবিক নয় সেটা।
- 'কি হল,একসময় নাকি দাবি করতে আমার মনের সব কথা নাকি আমার চোখ দেখেই পড়ে ফেলতে পারো!'ব্যাঙ্গের সুরে বলল অনন্যা,' যাকগে,ছাড়ো আমার কথা,তুমি কেমন আছো বলো।বিয়ে করেছ নিশ্চয় এতদিনে?বউ কেমন হয়েছে?'
- 'নাঃ,সেটা আর হল কই?'
- 'কেন?'
- 'অনেক খুঁজলাম তো,কিন্তু তোমার মতো দ্বিতীয় যে আর একটাও পেলাম না!তাই বিয়েটাও আর করা হয়ে উঠল না।'
- 'ইয়ার্কি করার মতো আর নেই আমাদের সম্পর্কটা।'
- 'জানি,তাই তো সত্যিটাই বললাম।কিন্তু তুমি তো কিছুই বললে না তোমার ব্যপারে?'
- 'আমি তোমার মতো নই,আমি বিবাহিতা।আর আমার হাজব্যান্ড যথেষ্ট ভালোবাসে আমায়,তোমার থেকে অনেক বেশি।'
- 'অনু!'
- 'হ্যাঁ বলো।'
- 'সিঁদুর পরোনি কেন?তুমি তো আমাকে বলতে যে সিঁদুর পরতে তুমি ভালোবাসো।'
- 'সো হোয়াট?সেই কৈফিয়ত আমি তোমায় দেব নাকি?ও চায় না তাই আমি....'
- 'আচ্ছা একবার দেখি তো তোমার বরের ছবি?মোবাইলে নিশ্চয় আছে?'
অনন্যা ইতস্তত করতে লাগল হাতে মোবাইলটা নিয়ে,হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল।
- 'ধুর,খালি কাস্টমার কেয়ারের ফোন!শান্তিতে বাঁচতেও দেবে না!'
হঠাৎ ছেলেটা ফোনটা কেড়ে নিল অনন্যার কাছ থেকে।
- 'আরে,ওকি!দাও বলছি!আমার পার্সোনাল জিনিস নেওয়ার অধিকার কে দিল তোমায়?'
- 'তুমি।'ছেলেটা ফোনটা দেখাল অনন্যাকে,'মোবাইলের ওয়ালপেপারে এটা কার ছবি অনু?'
- 'ভুলেও ভেবো না এটা তোমার ছবি!এটা পাঁচ বছর আগের অজিতের ছবি,যেটা তুমি একেবারেই নও!'
- 'ও আচ্ছা।তা এটাও বুঝি তোমার স্বামিজীর ইচ্ছে?'
কিছু না বলে অনন্যা মুখ ঘুরিয়ে রইল।
অজিত অনন্যার হাতটা ধরে বলল,'আজও আমরা একে অপরকে একই ভাবে ভালোবাসি, তুমি যে বিবাহিত নও এটা আমি আগেই বুঝেছি,তোমার চোখ বলছিল তুমি সত্যি বলছ না।অনু,আমরা আবার আগের মতো থাকতে পারি না?কি হল?অনু?'
অনন্যা চোখে তখন সব ঝাপসা দেখছে,গলাও ভারী হয়ে এসেছে।সামনে সীট খালি হল,অজিত বলল,'এটা তো লেডিস সীট, বসে পড়ো।'
- 'না,এই ভিড়ে হাত ধরে একসাথে দাঁড়িয়ে থাকতেই বেশি ভালো লাগছে।'
- 'কিন্তু এখনো তো অনেকক্ষণ তোমার স্টপেজ আসতে।'
অজিতের ঠোঁটে আঙুল দিয়ে চুপ করিয়ে দিল অনন্যা।
গিজগিজ জনারণ্যে আবার ফিরে দেখল দুই প্রাক্তনের সম্পর্ক।

2 মন্তব্যসমূহ
অসাধারণ লাগলো লেখাটি। চমৎকার ভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে চরিত্র গুলি❤️❤️❤️❤️
উত্তরমুছুন🤗🤗🤗❤️❤️❤️❤️
মুছুন