Advertisement

মাছের তেলে মাছভাজা

 


মাছের তেলে মাছভাজা

সুচন্দ্রা চক্রবর্তী


'কিরে,অঙ্কিত কেমন আছে এখন?'রিনি ফিরতেই উদ্বিগ্নমুখে প্রশ্ন করলেন রূপা।

-'ভালো আছে মা।দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই।'নিশ্চিন্তমুখে বলল রিনি।

-'যাক বাবা,বাঁচলাম।তাহলে জ্বরটা ম্যালেরিয়া বা ডেঙ্গু না তো?এখন যাসব হচ্ছে শুনছি ঘরে ঘরে,চিন্তা হয়।'

-'না মা,ওসব কিছু না।প্রভাসকাকু সব টেস্ট ই করেছে।ভয়ের কোনো কারণ নেই।'

-'হ্যাঁ,ওটাই তো ভরসা।যার বাবা একজন ডাক্তার, তার আর কিসের চিন্তা? '

-'হ্যাঁ মা,একদম ঠিক বলেছ।'

-'এবার তুই খেয়ে নে মা।কলেজ থেকে ফিরেই তো ছুটলি অঙ্কিতদের বাড়ি,জলটুকুও মুখে দিসনি।এবার পেটে কিছু পড়ুক।'

-'হ্যাঁ মা,আমাদের কলেজেও অনেকের ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু এসব হয়েছে শুনেছি।তাই অঙ্কিতদার জ্বর শুনে আর স্থির থাকতে পারিনি। ছুটে গেছি।'

-'সে তো আমি জানি।সবই বুঝি।এপাড়ায় তো অনেকেরই জ্বরজ্বালা হয়েছে,কারোর বাড়ি তো তুই এমন পাগলের মতো ছুটে যাসনি। খালি অঙ্কিতের বেলাতেই কেন এমন উদ্বিগ্ন,তা কি বুঝি না ভেবেছিস? '

-'উফফ,মা,কি যে বলো না,ধ্যাত। '

-'চুপ কর।ওরে আমি তোর মা,তোর মনের খবর আমার থেকে ভালো আর কেউ রাখে না রে।যাই হোক,এবার খেয়ে নিবি চল।'

    রিনি আর অঙ্কিতের একই পাড়ায় বাড়ি।অঙ্কিতের বাবা ড: প্রভাস সরকার এখানকার নামকরা ডাক্তার। আর তাঁর সুপুত্র অঙ্কিত নামকরা সাইকোলজিস্ট।অবশ্য রিনি মনে করে,ধুর,ছাই সাইকোলজিস্ট।সাইকোলজির একবিন্দুও জানে না।তা না হলে এতদিন ধরে রিনিকে দেখছে,তবু ওর চোখের ভাষা আজ ও পড়তে পারল না!যত্তসব!

তার মা রূপা সবই বোঝেন। তবু রিনি কিছুতেই স্বীকার করে না।তবে শুধু মায়ের কাছেই নয়,নিজের কাছেও স্বীকার করতে চায় না এতবড় সত্যিটা।কেনই বা করবে?তার থেকে আট বছরের বড়ো অঙ্কিত তো তাকে স্নেহের চোখে দেখেই এতকাল কাটিয়ে দিল,হয়তো বাকি জীবনটাও তাই করবে।রিনি ভাবে,অঙ্কিতদা যে বিদেশে যায় সেমিনারে,আবার কতশত প্রাইজও পেয়েছে নামকরা মনোবিদ হিসেবে,অথচ কিছুই কি শেখেনি?যাক,আর ভেবে কি হবে!বিধাতার লিখন খন্ডাবে কার সাধ্য?'

   সকালে বই নিয়ে বসে রিনি এইসব সাতপাঁচ ভাবছিল, কখন যে মা এসে পিছনে দাঁড়িয়েছে বুঝতেই পারেনি।মায়ের মিষ্টি হাসিতে ওর সম্বিৎ ফিরল।রূপা বললেন,'কাল তোর হিস্ট্রি পাশ পরীক্ষা  না?'

-'হ্যাঁ মা।'

-'তো অনার্সএর বই নিয়ে বসেছিস কেন?'

রিনি খেয়ালই করেনি ওর সামনে কি বই খোলা ছিল।হাতের কাছে যে বইটা পেয়েছে সেটাই টেবিলে খুলে বসেছে।আমতা আমতা করে বলল,'না মানে,ওই......'

-'থাক থাক আর বানিয়ে বলতে হবে না।তা বলছিলাম যে,একটা সাইকোলজির বই দিয়ে যাব কি?'

-'মা,আবার শুরু করলে তো সকাল থেকে!আর আমি একজন সাদামাটা বাংলার স্টুডেন্ট, অত বুদ্ধিমতী নই,ওসব সাবজেক্ট মাথায় ঢুকবে না।'

রূপা রিনির মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,'কে বলেছে তুই সাধারণ? বাংলা নিয়ে পড়া স্টুডেন্টরা যে অসাধারণ হয় না,তার কি প্রমাণ আছে তোর কাছে?এই যে তুই কত লেখালেখি করিস,সেগুলো ম্যাগাজিনে বেরোয়,আমি তোর বাবা সবাই পড়ি,কত ভালো সেইসব লেখা,কজন পারে অমন ভালো লিখতে?'

-'না গো,তোমরা তো আমায় ভালোবাসো,তাই আমার ওইসব আবোলতাবোল লেখাগুলোও ভালোবাসো।কিন্তু আমি তো জানি মোটেও ওগুলো ভালো লেখার পর্যায়ে পড়ে না।'

-'হ্যাঁ,তুই তো সব জেনে বসে আছিস!'

-'হ্যাঁ মা,নয়তো কি?ভালো লেখা হলে তো সবাই বলতো,না?'

-'হুম,তো সবাই টা কে?নিশ্চয়ই অঙ্কিত? '

-'ধুর,ছাড়ো তো।সাতাশ বছরের জন্মদিনে ওনার জন্য কবিতা লিখলাম একটা,গিফট প্যাকের উপর রিবন দিয়ে বেঁধেও দিলাম,তা উনি পড়লেন না,বললেন,'আমি বাংলা অতটা পড়তে পারিনা রে,তুইই পড়ে দে।'কি আনরোমান্টিক ভাবো!'

-'আহা,ওরই বা কি দোষ বল!ছোট থেকেই ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়াশোনা, তারপর সাইকোলজি পড়তে দেশের বাইরে।'

-'মা মনে আছে তোমার,অঙ্কিতদা যেদিন বিদেশে যাবে,সেদিন সকালে তুমি,আমি আর বাবা গিয়েছিলাম ওদের বাড়ি?'

-'হ্যাঁ মনে থাকবে না আবার!সেদিন বিকেলেই ওর ফ্লাইট ছিল,তাই ব্রেকফাস্ট করেই রওনা দিয়েছিল।তুই তখন কত ছোট,সবে হাইস্কুলে ভরতি হয়েছিলি।কিন্তু তা বললে কি হবে,তখন থেকেই তো তুমি......'

-'মা থামো তো!দূর!আসল কথাটাই ভুলে গেছ দেখছি।যাবার আগে অঙ্কিতদা আমার একটা ছবি তোমাদের কাছ থেকে চেয়ে নিয়েছিল,মনে আছে?'

-'হ্যাঁ,জানি।'

-'ছবিটা চেয়ে নিয়ে উনি বললেন,'রিনি,আমার তো বোন নেই,তাই তোর ছবিটা সঙ্গে করে নিয়ে গেলাম।''

-'হ্যাঁ,আর তারপর তো তুই কাঁদতে কাঁদতে ওদের বাড়ি থেকে ছুটে চলে এলি।সকলে ভাবল,অঙ্কিত চলে যাচ্ছে,তুই ছেলেমানুষ, তাই কাঁদছিস।কিন্তু আমি আর তোর বাবা জানতাম আসল কারণটা।'

-'হ্যাঁ মা,অঙ্কিতদা চলে যাচ্ছে বলে যত না কষ্ট,তার চেয়ে অনেক বেশি কষ্ট হয়েছিল আমায় বোন বলেছিল বলে।'

-'কিন্তু অঙ্কিতের মা উষাদি কি বলেছিল জানিস?বলেছিল,এমন একটা লক্ষ্মীর মতো মেয়ে যদি আমার অঙ্কুর বৌ হয়ে আসত!'

-'দূর ছাড়ো,ওই রসকষহীন লোকটা জন্মেও এসব বুঝবে না।'

  অঙ্কিতের প্রতি রিনির এই প্রেম আজকের নয়।সেই ছোট্ট বয়স থেকে,যখন ও ক্লাস ফাইভে পড়ে।ছোট থেকেই রিনির শখ ছিল লম্বা চুল রাখবে,আর রূপাও মেয়ের ইচ্ছায় আপত্তি করেননি।এমনিতে অঙ্কিতদের স্কুলটা ছিল রিনিদের স্কুল থেকে অনেকটা দূরে,কিন্তু সেদিন রিনিদের স্কুল খোলা থাকলেও অঙ্কিতদের স্কুল বন্ধ ছিল।অঙ্কিত তখন পড়ে ক্লাস টুয়েলভে।রিনিদের স্কুলের সামনেই একটা বড়ো বইয়ের দোকান আছে,প্রায় সবরকম বইই পাওয়া যায়,বাংলা মিডিয়ামের তো বটেই,ইংলিশ মিডিয়ামের ও। অঙ্কিত সেদিন এসেছিল ওই দোকানে বই কিনতে।তখনই রিনিদের স্কুলে ছুটির ঘন্টা পড়ে।অন্যদিনের মতোই সেদিনও ভিড় এড়াতে রিনি বেরিয়েছিল সবার শেষে,তার ফ্রেন্ড প্রিয়ার সাথে।দুজনে হাসতে হাসতে স্কুল থেকে বাড়ির পথে যাচ্ছিল,হঠাৎ চার-পাঁচটা বখাটে ছেলে সাইকেল নিয়ে ওদের ধাওয়া করতে শুরু করে।ছেলেগুলো ওদের স্কুলের অদূরেই একটা রকে বসে বসে রোজ আড্ডা মারত।প্রথমে রিনি ব্যাপারটা বোঝেনি,একটু পরে যখন বুঝল,তখন প্রিয়ার হাত ধরে প্রাণপণে দৌড়তে শুরু করল।কিন্তু বেশিদূর যেতে পারল না,ছেলেগুলো সাইকেল নিয়ে ওদের চারিদিকে বৃত্তাকারে ঘুরতে শুরু করল।রিনিকে উদ্দেশ্য করে ওরা বলল,'কি মামনি?অত লম্বা চুল বেঁধে রাখলে হবে?খোলো খোলো,তবেই না মধু খেতে পারব আমরা!'

রিনি ভয় পেয়ে কি করবে বুঝতে না পেরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।ছেলেগুলো আবার বলল,'মালটার কথা কানে যায় না দেখছি।কিরে,চুলটা খুলবি,না আমরাই খুলে দেব?'

রিনি আর প্রিয়া হাত ধরাধরি করে কাঁপতে লাগল।ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল এবার রোমিওগুলোর। একজন রিনির চুল ধরে জোর টান মারল।যন্ত্রণায় রিনি চেঁচিয়ে  উঠল,'আঃ'!

অঙ্কিত তখন দোকানে বই কিনতে ব্যস্ত ছিল,ব্যাপারটা খেয়াল করেনি।হঠাৎ রিনির চিৎকারে ও ঘুরে তাকাল।পা থেকে মাথা পর্যন্ত জ্বলে উঠল তার।ফুটন্ত ম্যাগমা যেন তার শিরায় শিরায় বইতে লাগল।শান্ত নির্বিরোধী ছেলেটা যেন এক মুহূর্তে বিধ্বংসী আগুনে পরিণত হল।রাস্তার পাশেই একটা বড় ইঁটের টুকরো পড়ে ছিল,'জানোয়ার' বলে জোরে চিৎকার করেই সে ইঁটের টুকরোটা ছুড়ে দিল ওই ছেলেটার দিকে,যার নোংরা হাত রিনির চুল টেনে ধরেছিল।টুকরোটা লাগল ছেলেটার বাঁচোখে।চিৎকার করে কাটা কলাগাছের মতো লুটিয়ে পড়ল সে।চোখ থেকে রক্ত পড়তে লাগল তার।অন্য একটা ছেলে অঙ্কিতের দিকে যেতেই বাকিরা তাকে ধরে ফেলে বলল,'ও প্রভাস ডাক্তারের ছেলে,প্রভাস সরকার কিন্তু এখানকার ওসির খুব ভালো বন্ধু।ফাঁসতে না চাস,তো চল কেটে পড়।'

অঙ্কিত চিৎকার করে বলতে লাগল,'আর যদি কোনোদিনও তোদের এই অঞ্চলে দেখি,তাহলে জেলের ঘানি টানিয়ে ছাড়ব রে লম্পটগুলো,রাস্তায় ছোটো মেয়েদের দেখে ইভটিজিং?মস্তানি ছুটিয়ে দেব!'

   ছেলেগুলো আর কথা না বাড়িয়ে আহত ছেলেটাকে নিয়ে সেই যে পগার পার হল,তারপর আর এই চত্বরে  কেউ কোনোদিনও দেখেনি তাদের একজনকেও।অঙ্কিত রিনির কাছে ছুটে গিয়ে বলল,'তোর লাগেনি তো?চল তোদের আমি বাড়ি  পৌঁছে দিই।'

   সেইদিন থেকেই অঙ্কিত রিনির চোখে হিরো হয়ে উঠল।নায়ক যেমন নায়িকার বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়ে,ঠিক তেমন।আজ দশটা বছর ধরে সে অঙ্কিতকে ভালোবাসে পাগলের মতো।কিন্তু হায়,একতরফা ভালোবাসা যে মানুষকে খুব কষ্ট দেয়,ক্ষতবিক্ষত করে দেয় ভেতরটা।রূপা কতবার বলেছেন,'ভেতরে ভেতরে এত কষ্ট পাস,ওকে বলে দে মনের কথা।'

  কিন্তু রিনির ভয়,ও যে অঙ্কিতকে শুধু ভালোবাসে না,সম্মানও করে।কি করে ও বলবে ওকে নিজের মনের কথা?বললে যদি অঙ্কিতের স্নেহটুকু থেকেও ও বঞ্চিত হয়?অঙ্কিতদার চোখে যদি সে একবার ছোটো হয়ে যায়,তাহলে যে লজ্জায়,অপমানে ও শেষ হয়ে যাবে।

যদিও রূপা বলেন,'রোজ তিলে তিলে কষ্ট পেয়ে মরার থেকে ভালো একেবারে মরে যাওয়া।তুই বলে দে।যদি ও না বলে দেয়,আমরা তো আছি তোর পাশে,এখনও কি তুই খুব ভালো আছিস?তোকে এইভাবে কষ্ট পেতে দেখতে আর যে ভালো লাগে না।'

  রূপার মতো একজন মা যে মেয়ের জীবনে থাকে,তার জীবনে দ্বিতীয় বেস্টফ্রেন্ডের দরকার পড়ে না।রিনিরও হয়নি।জীবনের

কোনো সিদ্ধান্ত মাকে না বলে ও কখনো নেয়নি।তবু মায়ের এই কথাটা ও মানতে নারাজ।রূপার হাজার পীড়াপীড়ি সত্ত্বেও রিনিকে টলায় কার সাধ্য!

  এইভাবেই টানাপোড়েন,হাসি,রাগ,মাঝে মাঝে অঙ্কিতদের বাড়ি ছুটে যাওয়ার নানা অজুহাত -- দিনগুলো কাটছিল ভালোই রিনির।অঙ্কিতের অনুপস্থিতিতে রিনি তার উপর কত রাগ করে,কিন্তু অঙ্কিতের বাড়ি গিয়ে  যেই তাকে 'রিনি যে' বলে হাসিমুখে ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে দেখতো,অমনি রিনির সব রাগ-অভিমান গলে জল হয়ে যেত।মনে হত,ওই নিষ্পাপ চোখদুটো আর অমন মধুর স্নিগ্ধতামাখানো হাসি যার সম্পদ, তার কোনো দোষ থাকতেই পারে না।অভিমানের বরফ গলে জল করে যখন রিনি বাড়ি ফিরত,রূপা ওই কোমল-স্নিগ্ধ জলে ধুয়ে যাওয়া রিনির মনের শীতলতা টের পেতেন,আর ভাবতেন,'শুধু শীতলতাই দেখেছিস পাগলি, যেদিন উষ্ণতা অনুভব করবি সেদিন বুঝবি সত্যিকারের ভালোবাসার কি মানে!'

  অঙ্কিতের হাজার ব্যস্ততা থাকা সত্ত্বেও এই যে রিনির এক ডাকে ও ঘরের বাইরে চলে আসত,এইটুকুই ছিল রিনির জীবনের সবচেয়ে বড়ো পাওনা,সে কারণ যাই হোক।কিন্তু রিনি বোধহয় জানত না,এই সামান্য পাওনাটুকুও মর্মান্তিকভাবে হাতছাড়া হবে তার।

  হঠাৎ উড়ে এসে জুড়ে বসল দূরের এক অচেনা পাখি।বাড়ি কলকাতায়।প্রথম যেদিন তাকে এই পাড়ায় দেখেছিল রিনি,সেদিনই বুঝেছিল এ তল্লাটের নয়।ওদের পাড়াতেই বিমলকাকুর একতলায় ভাড়া এসেছে।মেয়েটি আর একজন বয়স্ক মানুষ। বোধহয় ওর বাবা হবেন।কলেজ ফেরত রিনি দেখেছিল একটা গাড়ি থেকে ওদের জিনিসপত্র নামানো হচ্ছে,আর মেয়েটি ওই বয়স্ক ভদ্রলোককে বিমলকাকুর বাড়ির দিকে নিয়ে যাচ্ছে।ভদ্রলোক বিড়বিড় করে কিসব যেন বলছেন নিজের মনে,এদিক ওদিক তাকাচ্ছেন,আর থেকে থেকে হাত-পা ছুড়ছেন।রিনি সেদিন এইটুকু দেখেই বাড়ি ফিরে এসেছিল।

  কিন্তু মেয়েটির সঙ্গে রিনির চোখাচোখি হওয়া যে এই প্রথম নয়,বিধাতা বোধহয় তেমনই লিখেছিলেন। অঙ্কিতের জ্বর থেকে সেরে ওঠার পর রিনি একদিন গিয়েছিল তাদের বাড়ি খোঁজখবর নিতে।অঙ্কিতের বাবা-মাও খুব ভালোবাসেন রিনিকে।প্রভাস তো প্রায়ই বলেন,'আমার তো মেয়ে নেই,তোর মতো একটা মিষ্টি  মেয়ে থাকলে বেশ হত।'

আর অঙ্কিতের মা উষা রিনি গেলেই কিছু না কিছু খাওয়ান।খেতে খেতে রিনি বলে,'কেন প্রভাসকাকু,আমি তো তোমাদের মেয়েই। তোমরা কি মেয়ের থেকে কখনো কম ভালবেসেছ আমায়?'রিনির মন শুধু গোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে,'তোমাদের ছেলে যদি এমন করে আমায় ভালবাসত,তাহলে তো স্থায়ীভাবেই তোমাদের মেয়ে হয়ে যেতাম।'

  সেদিনও যথারীতি রিনি আর প্রভাস গল্প করছিলেন,কিন্তু অন্যদিনের মতো অঙ্কিত রিনির গলা শুনে বেরিয়ে এল না।হয়ত শরীর দুর্বল, এই ভেবে রিনি আশ্বস্ত হয়েছিল,হঠাৎ সেই মেয়েটির আগমন তাদের বাড়িতে।ঢুকেই জিজ্ঞেস করল,'এটাই কি ডঃ অঙ্কিত সরকারের বাড়ি?'

-'হ্যাঁ,কেন বলুন তো?'প্রভাস জিজ্ঞেস করেন।

-'ওনার সঙ্গে একটু দরকার ছিল,উনি জানেন,একটু কাইন্ডলি ওনাকে ডেকে দেবেন?'

-'অঙ্কিতদার বোধহয় শরীরটা ভালো নেই।'রিনি বলে উঠল।

-'ওহ,সরি সরি।আমি তাহলে চলে যাচ্ছি,পরে আসবো।আসলে উনিই ফোনে আসতে বললেন তো,তাই....'

    কথাটা শেষ হল না,তার আগেই অঙ্কিত ঘর বেরিয়ে এল।বলল,'আপনি?'

-'আমি অর্চনা পাত্র।আপনাকে সকালে ফোন করেছিলাম,আপনিই বললেন সন্ধেবেলায় আসতে,কিন্তু এসে শুনলাম আপনার শরীর ভালো নেই।'

-'ওহ,আপনিই মিস পাত্র?আর কে বলল আমার শরীর খারাপ?নিশ্চয় রিনি?ওই পাগলীর কথা শুনবেন না,ও একটু বেশিই চিন্তা করে আমায় নিয়ে।আসুন,আমার ঘরে আসুন,ওখানেই কথা হবে।'অর্চনা আর অঙ্কিত ভেতরে গেল।

রিনি উঠে পড়ল।উষা বললেন,'ও কি রে,কিছুই তো খেলি না,খেয়ে যা মা।'

-'না,কাকীমা,আমার খিদে নেই।আসছি আমি।'রিনি একছুটে বেরিয়ে গেল।

রিনির বাড়িতে কলিংবেলের আওয়াজ। গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে রিনি বেলটা বাজিয়ে চলেছে।রূপা চেঁচিয়ে বললেন,'আসছি, আসছি। কে যে ভর সন্ধেবেলায় এমন অসভ্যের মতো বেল বাজাচ্ছে!'দরজা খুলেই রূপা হতবাক,'রিনি তুই?কি রে এই তো গেলি অঙ্কিতদের বাড়ি,এত তাড়াতাড়ি চলে এলি?'

রিনি কোনো কথা না বলে ছুটে ভেতরে চলে গেল,নিজের ঘরে।ঝাঁপিয়ে পড়ল বিছানায়,বালিশটাকে আঁকড়ে ধরল।রূপা ছুটে এলেন একবুক আশঙ্কা, উদ্বিগ্নতা নিয়ে।আজ থেকে দশ বছর আগেকার দিনটার যে পুনরাবৃত্তি ঘটল,যেদিন অঙ্কিত বিদেশ চলে গিয়েছিল।

  রূপা রিনির মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,'কি হয়েছে মা?অঙ্কিত আবার কিছু বলেছে?'

রিনি রাগে অভিমানে ফুঁসছিল।মায়ের স্নেহের ছোঁয়ায় সব রাগ-অভিমান গলে চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগল।কাঁদতে কাঁদতে সবটা খুলে বলল রিনি।

-'সে কি!তোর ডাক শুনে সে বাইরে এল না অথচ ওই মেয়েটা কি যেন নাম.....'

-'অর্চনা। '

-'হ্যাঁ,ও ডাকতেই বেরিয়ে এল?'

-'শুধু তাই নয় মা,অর্চনাকে নিয়ে উনি ভেতরে চলে গেলেন।কি এমন জরুরি কথা যে সবার সামনে বলা চলে না?'

-'আচ্ছা,এমন তো হতে পারে সত্যিই কোনো জরুরি দরকারে এসেছিল মেয়েটা,তুই ভুল বুঝছিস হয়ত!'

-'না মা,কোনো ভুল হচ্ছে না আমার।অঙ্কিতদার জীবনে আমার থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ মানুষ এসে গেছে।'রিনি কাঁদতে কাঁদতে রূপাকে জড়িয়ে ধরে।

  ওদিকে পাড়াতেও একটা চাপা গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে।এপাড়ায় সকলের মতে রিনিই ছিল সবচেয়ে সুন্দরী। তার এলোকেশী চুল যখন সে ছাদের হাওয়ায় মেলে ঘুরে বেড়ায়, তখন কোনো নামী নায়িকার থেকে তাকে কোনো অংশে কম মনে হয় না।কিন্তু ওই অর্চনা এসে শুধু অঙ্কিত কেই নয়,বোধহয় তার এই সুন্দরী তকমাটাও দূরে সরিয়ে দিল।কানাঘুষো শোনা যাচ্ছে,শর্ট চুল আর স্টিলেটো পরিহিত আধুনিকা অর্চনা রূপে-চেহারায় লম্বা চুল ঘরোয়া রিনিকে অনেক পেছনে ফেলে এগিয়ে যায়।সেদিন রাস্তায় তুলি আর অনুস্কা রিনিকে বলতে এসেছিল,'কি গো সুন্দরী, তোমাকে টেক্কা দেওয়ার তো লোক চলে এসেছে।'

-'টেক্কা দেওয়ার লোক?'

-'হ্যাঁ,ওই যে অর্চনা,কাল দেখলাম।একটা গাড়ি থেকে নামল।কানের দুলের ডিজাইন টা কি দারুণ ছিল রে ভাই!ওকে একদম বলিউডের হিরোইন লাগছিল রে!'

-'হ্যাঁ,তো কি করব আমি?'রিনি ঝাঁঝিয়ে ওঠে।

-'আরে ভাই,তোর তো আর কিছুই করার নেই।সৌন্দর্যএ তো ও তোকে হারিয়েই দিল।'

-'তো যা না,ওকেই এসব বলগে।আমার কাছে কেন এসেছিস আদিখ্যেতা করতে?'রিনি একছুটে চলে এল সেখান থেকে।

-'আরে ইয়ার শোন,আমরা তো ইয়ার্কি করছিলাম....'

  পাড়ার সুন্দরী তো সে কোনোদিন হতে চায়নি।সে শুধু একজন মানুষেরই মন চেয়েছিল,কিন্তু সেই তাকে এমন দূরে সরিয়ে দিল!অঙ্কিত দের বাড়িতে রিনির যাতায়াত কমতে লাগল।তুলি আর অনুস্কা মারফতই ওর কানে খবর এল,ও বাড়িতে ইদানীং অর্চনার যাতায়াত বেড়েছে।অনুস্কা আবার দেখেছে আজকাল শুধু অর্চনা একা নয়,ওই বয়স্ক ভদ্রলোককেও সঙ্গে নিয়ে যায় ওবাড়ি।রিনি দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলল,'হ্যাঁ,তা তো নিয়ে যাবেই,পাকা কথাটা সারতে হবে না!'

দেখতে দেখতে দু'মাস কেটে গেল।রিনি অঙ্কিতদের বাড়ি তো দূর,ওই রাস্তামুখো হওয়ারই নাম করে না।ওদিকে অর্চনারও এ তল্লাট ছেড়ে যাওয়ার কোনো লক্ষণই নেই।প্রভাস আর উষা কতবার ফোনে রিনিকে আসতে বলেছেন,বারবার নানা অজুহাত দিয়ে রিনি এড়িয়ে গেছে।

    ওদিকে প্রকৃতিও সময়ের স্রোতে গা ভাসাতে ভাসাতে মাঘমাসের শুক্লপক্ষে এসে পড়ল।বাগদেবীর আরাধনার তোড়জোড় শুরু হল চারিদিকে।প্রভাস আর উষা বাড়ি বয়ে এসে সপরিবার রিনিকে অনেক করে আসতে বলে গেছেন।ওদিকে তুলি আর অনুস্কা মারফত খবর এসেছে,ওই ঢঙী (নামটি রিনির দেওয়া) অর্চনারও নাকি ও বাড়িতে নেমন্তন্ন আছে,ও আজ শাড়ি পরবে,হলুদ শাড়ি।সেই কথা শুনে রিনিও আলমারি চষে একটা জম্পেশ লাল পাড় হলুদ শাড়ি বের করেছে।সঙ্গে লাল লিপস্টিক।রূপা বলেছেন,'চুলটা খুলে রাখিস,খোলা চুলে সৌন্দর্য আরও খোলতাই হয়।'

  ভালো করে সেজেগুজে মা-বাবার মাঝে মধ্যমণি হয়ে রিনি চলল অঙ্কিতদের বাড়ির দিকে।অর্চনাকে আজ দেখে নেবে সে ---- কত সুন্দর শাড়ি পড়তে পারে!রিনির বাবা প্রকাশ বললেন,'রিনিমাকে যে চিনতেই পারছি না আমি!'

   রিনির এসব শোনার সময় নেই।তাড়াতাড়ি আজ ও বাড়ি পৌঁছতে হবে,অর্চনা অঙ্কিতের মাথা ঘুরিয়ে দেবার আগেই।হনহন করে হাঁটতে লাগল সে।দশ মিনিটের রাস্তা পাঁচ মিনিটে পার করল।জুতো বাইরে খুলেই ও ঢুকে পড়ল বাড়ির ভেতরে।কিন্তু বাড়ির ভিতর ঢুকেই গায়ের চামড়াটা ওর কেমন জ্বালাজ্বালা করতে লাগল।অর্চনা তার আগেই পৌঁছে গেছে,আর অঙ্কিতদা দিব্যি খোশগল্পে মশগুল ঢঙ্গীর সাথে।রিনিকে যেন সে দেখেও দেখছে না।ওদিকে উষা রিনিকে দেখতে পেয়েই ছুটে এলেন,'রিনিমা,আয়,আয়,ভেতরে আয়।পুজো এখনো শুরু হয়নি।তোর জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।বাড়ির মেয়ে না এলে কি পুজো শুরু হয় বল?'উষা রিনির হাত ধরে পুজোমন্ডপে নিয়ে গেলেন।

  পুজো শেষ হল।রিনি পুজোমন্ডপ ছেড়ে বেরিয়ে আসতেই অঙ্কিত বাঁকা হাসি  হেসে বলল,'রাণীমার বুঝি আমাদের কথা এতদিন পর মনে পড়ল?'

অঙ্কিতের কথা বলার এই ধরণে মাথা গরম হয়ে গেল রিনির।কিছু না বলে ও চলে আসছিল,অঙ্কিত ওর পথ আটকে বলল,'অর্চনাকে কি অপূর্ব লাগছিল না আজ দেখতে?'

আর রিনি সইতে পারল না।চোখ ফেটে জল এল।কাঁদতে কাঁদতে বলল,'ঠিকই বলেছ।তোমার পাশে ওকে খুব সুন্দর মানাবে।আর দেরি কেন?এই মাঘ মাসেই বিয়েটা সেরে ফেল না!'

রিনি দৌড়ে চলে আসছিল,হঠাৎ পিছন থেকে ভেসে এল অঙ্কিতের কণ্ঠস্বর ----

'হে প্রিয়তমা,এহেন হিমেল বাতাসের আঁচল জড়ানো শিশিরভেজা উজ্জ্বল দিনে,


যেওনা আমায় ছেড়ে, আমি  যে বাঁধতে চেয়েছি ঘর শুধু তোমারি সনে।'

চমকে ফিরে তাকাল রিনি।অঙ্কিত এগিয়ে এসে রিনির হাতদুটো চেপে ধরল,'অনেক কষ্ট দিয়েছিস তুই এই দু'মাস,আর নয়।আমাকে এইভাবে কষ্ট দেওয়ার অধিকার নেই তোর।'

রিনি কাঁদতে লাগল।কিন্তু এই কান্না বুঝি আর রাগ-অভিমান-দুঃখের নয়।

-'ও আমি কষ্ট দিয়েছি,আর তুমি দাওনি আমায় দশ বছর ধরে?অঙ্কিতদা,বিশ্বাস করো,বিগত দশ বছরেও আমি এত কষ্ট পাইনি যা এই গত দু'মাসে পেয়েছি।অর্চনাকে নিয়ে তোমার এত বাড়াবাড়ি যে সহ্য হয় না কিছুতেই।'

-'বোকা,চুপ কর।শুধু অর্চনাকে আমার বাড়ি আসতে দেখেই রাগ করেছিস,ও কেন আসত সেটা কি জানার চেষ্টা করেছিস?'

-'জানতে কিছুই বাকি নেই আমার।'

-'হ্যাঁ,সেই,তুমি তো সবজান্তা। ওরে অর্চনার কাকা একজন মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষ। অর্চনা অনেক চেষ্টা করেছে ওঁকে সুস্থ করার,কিন্তু পারেনি।শেষে আমার খোঁজ পেয়ে ছুটে এসেছে আমার কাছে,ওই বয়স্ক মানুষটাকে সুস্থ করতে।আর অর্চনার সাথে আমি যেটুকু কথা বলি,সেটার সবটাই চিকিৎসা সংক্রান্ত।'

-'ওহ সরি অঙ্কিতদা,ভেরি সরি।বুঝতে পারিনি আমি একদম।কিন্তু আজ সকালে ওর সাথে অত হেসে কথা বলছিলে,আর আমায় তো পাত্তাই দিলে না।'

-'এর উত্তর তো মা ই দিল তখন।অর্চনা এই বাড়ির গেস্ট,আর তুই এই বাড়ির মেয়ে।রিনি জানিস,সেই স্কুলজীবন থেকে তোকে আমি ভালবাসি। অন্য কোনো মেয়েকে কখনো কল্পনাই করতে পারিনা তোর জায়গায়।কিন্তু কোনোদিন বলতে পারিনি, বললে যদি তোর চোখে ছোট হয়ে যাই আমি,তুই সম্মান করিস আমায়,সেই সম্মানের জায়গাটা যদি হারিয়ে ফেলি সেই ভয়ে তোকে 'বোন' বলেছি সবসময়। কিন্তু অর্চনার প্রতি তোর এই রাগই সে ভুল ভাঙিয়েছে আমার।'

-'আর এই 'বোন' শব্দটা আমাকে ভেতরে ভেতরে কতটা ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে জানো?'

-'আজ সব ভাঙা জোড়া লাগাবো বলেই তো বাংলা কবিতা 'প্রিয়তমা'-র প্রথম দু'লাইন মুখস্থ করেছি অতি কষ্টে।'

-'হুম,তাতো বুঝলাম, কিন্তু ওটা কার লেখা জানো কি?'

-'হ্যাঁ,অঙ্কিতা সরকার।ওই 'ছুটি' ম্যাগাজিনে বেরিয়েছে।দারুণ লিখেছে কিন্তু!'

-'ওটা তো ছদ্মনাম,লেখিকার আসল নাম হল রিনি চৌধুরী।'রিনি হেসে মুখ ফিরিয়ে নিল।

-'মানে তুই?এ বাবা,তোর কবিতা দিয়েই তোকে প্রোপোজ!'অঙ্কিত সশব্দে হেসে উঠল।

-'একে বাংলায় কি বলে জানো?অবশ্য তুমি কি করে জানবে,তুমি তো আবার বাংলায় অষ্টরম্ভা!'

-'তাতে কি?তুই তো আছিস,তোর কাছেই না হয় শিখে নেব বাংলা। তা কি বলে ওটাকে বাংলায়?'

-'মাছের তেলে মাছভাজা। '

এক অট্টহাসির ঝড় উঠল।মাঘের দুপুরের মিষ্টি রোদ আর ঝরা পাতা সাক্ষী থাকল ওদের এই সুমধুর মিলনের।


-সমাপ্ত-

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

2 মন্তব্যসমূহ